৫৬ (ki pai ki joma kori)

কী পাই, কী জমা করি,

      কী দেবে, কে দেবে--

দিন মিছে কেটে যায়

      এই ভেবে ভেবে।

চ'লে তো যেতেই হবে--

      "কী যে দিয়ে যাব'

বিদায় নেবার আগে

      এই কথা ভাবো।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

কাঠবিড়ালি
Verses
কাঠবিড়ালির ছানাদুটি
          আঁচলতলায় ঢাকা,
পায় সে কোমল করুণ হাতে
          পরশ সুধামাখা।
                   এই দেখাটি দেখে এলেম
                    ক্ষণকালের মাঝে,
সেই থেকে আজ আমার মনে
          সুরের মতো বাজে।
চাঁপাগাছের আড়াল থেকে
          একলা সাঁঝের তারা
একটুখানি ক্ষীণ মাধুরী
          জাগায় যেমনধারা,
তরল কলধ্বনি যেমন
          বাজে জলের পাকে
গ্রামের ধারে বিজন ঘাটে
          ছোটো নদীর বাঁকে,
লেবুর ডালে খুশি যেমন
          প্রথম জেগে ওঠে
একটু যখন গন্ধ নিয়ে
          একটি কুঁড়ি ফোটে,
দুপুর বেলায় পাখি যেমন--
          দেখতে না পাই যাকে--
ঘন ছায়ায় সমস্ত দিন
          মৃদুল সুরে ডাকে,
তেমনিতরো ওই ছবিটির
          মধুরসের কণা
ক্ষণকালের তরে আমায়
          করেছে আনমনা।
দুঃখসুখের বোঝা নিয়ে
          চলি আপন মনে,
তখন জীবন-পথের ধারে
          গোপন কোণে কোণে
হঠাৎ দেখি চিরাভ্যাসের
          অন্তরালের কাছে
                   লক্ষ্মীদেবীর মালার থেকে
                    ছিন্ন পড়ে আছে
         ধূলির সঙ্গে মিলিয়ে গিয়ে
                    টুকরো রতন কত--
         আজকে আমার এই দেখাটি
                    দেখি তারির মতো।
আরো দেখুন
বিয়াল্লিশ
Verses
শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র দত্ত প্রিয়বরেষু
তুমি গল্প জমাতে পার।
বসো তোমার কেদারায়,
ধীরে ধীরে টান দাও গুড়গুড়িতে,
উছলে ওঠে আলাপ
তোমার ভিতর থেকে
হালকা ভাষায়,
যেন নিরাসক্ত ঔৎসুক্যে,
তোমার কৌতুকে-ফেনিল মনের
কৌতূহলের উৎস থেকে।
ঘুরেছ নানা জায়গায়, নানা কাজে,
আপন দেশে, অন্য দেশে।
মনটা মেলে রেখেছিলে চারদিকে,
চোখটা ছিলে খুলে।
মানুষের যে-পরিচয়
তার আপন সহজভাবে,
যেমন-তেমন অখ্যাত ব্যাপারের ধারায়
দিনে দিনে যা গাঁথা হয়ে ওঠে,
সামান্য হলেও যাতে আছে
সত্যের ছাপ,
অকিঞ্চিৎকর হলেও যার আছে বিশেষত্ব,
সেটা এড়ায়নি তোমার দৃষ্টি।
সেইটে দেখাই সহজ নয়,
পণ্ডিতের দেখা সহজ।
শুনেছি তোমার পাঠ ছিল সায়ান্সে,
শুনেছি শাস্ত্রও পড়েছ সংস্কৃত ভাষায়;
পার্সি জবানিও জানা আছে।
গিয়েছ সমুদ্রপারে,
ভারতে রাজসরকারের
ইম্পীরিয়ল রথযাত্রার লম্বা দড়িতে
"হেঁইয়ো' ব'লে দিতে হয়েছে টান।
অর্থনীতি রাষ্ট্রনীতি
মগজে বোঝাই হয়েছে কম নয়,
পুঁথির থেকেও কিছু,
মানুষের প্রাণযাত্রা থেকেও বিস্তর।
তবু সব-কিছু নিয়ে
তোমার যে পরিচয় মুখ্য
সে তোমার আলাপ-পরিচয়ে।
তুমি গল্প জমাতে পার।
তাই যখন-তখন দেখি,
তোমার ঘরে মানুষ লেগেই আছে,
কেউ তোমার চেয়ে বয়সে ছোটো
কেউ বয়সে বেশি।
গল্প করতে গিয়ে মাস্টারি কর না,
এই তোমার বাহাদুরি।
তুমি মানুষকে জান, মানুষকে জানাও,
জীবলীলার মানুষকে।
একে নাম দিতে পারি সাহিত্য,--
সব-কিছুর কাছে-থাকা।
তুমি জমা করেছ তোমার মনে
নানা লোকের সঙ্গ,
সেইটে দিতে পার সবাইকে
অনায়াসে,--
সেইটেকে জ্ঞানবিজ্ঞানের তকমা পরিয়ে
পণ্ডিত-পেয়াদা সাজাও না
থমকিয়ে দিতে ভালোমানুষকে।
তোমার জ্ঞানবিজ্ঞানের ভাণ্ডারটা
পূর্ণ আছে যথাস্থানেই।
সেটা বৈঠকখানাকে কোণ-ঠেসা করে রাখেনি।
যেখানে আসন পাত'
গল্পের ভোজে
সেখানে ক্ষুধিতের পাতের থেকে ঠেকিয়ে রাখ
লাইব্রেরি ল্যাবরেটরিকে।
একটিমাত্র কারণ,--
মানুষের 'পরে আছে তোমার দরদ,--
যে-মানুষ চলতে চলতে হাঁপিয়ে ওঠে
সুখদুঃখের দুর্গম পথে,
বাঁধা পড়ে নানা বন্ধনে
ইচ্ছায় অনিচ্ছায়,--
যে-মানুষ বাঁচে,
যে-মানুষ মরে
অদৃষ্টের গোলকধাঁদার পাকে।
সে-মানুষ রাজাই হোক ভিখিরিই হোক
তার কথা শুনতে মানুষের অসীম আগ্রহ।
তার কথা যে-লোক পারে বলতে সহজেই
সে-ই পারে,
অন্যে পারে না।
বিশেষ এই হাল-আমলে।
আজ মানুষের জানাশোনা
তার দেখাশোনাকে
দিয়েছে আপাদমস্তক ঢেকে।
একটু ধাক্কা পেলে
তার মুখে নানা কথা অনর্গল ছিটকে পড়ে--
নানা সমস্যা, নানা তর্ক,
একান্ত মানুষের আসল কথাটা
যায় খাটো হয়ে।
আজ বিপুল হল সমস্যা,
বিচিত্র হল তর্ক,
দুর্ভেদ্য হল সংশয়,--
আজকের দিনে
সেইজন্যেই এত করে বন্ধুকে খুঁজি,
মানুষের সহজ বন্ধুকে
যে গল্প জমাতে পারে।
এ দুর্দিনে
মাস্টারমশায়কেও অত্যন্ত দরকার।
তাঁর জন্যে ক্লাস আছে
পাড়ায় পাড়ায়--
প্রায়মারি, সেকেণ্ডারি।
গল্পের মজলিস জোটে দৈবাৎ।
সমুদ্রের ওপারে
একদিন ওরা গল্পের আসর খুলেছিল,
তখন ছিল অবকাশ;
ওরা ছেলেদের কাছে শুনিয়েছিল,
রবিন্‌সন্‌ ক্রুসো,
সকল বয়সের মানুষের কাছে
ডন্‌ কুইক্‌সোট্‌।
দুরূহ ভাবনার আঁধি লাগল
দিকে দিকে;
লেক্‌চারের বান ডেকে এল,
জলে স্থলে কাদায় পাঁকে
গেল ঘুলিয়ে।
অগত্যা
অধ্যাপকেরা জানিয়ে দিলে
একেই বলে গল্প।
বন্ধু,
দুঃখ জানাতে এলুম
তোমার বৈঠকে।
আজকাল-এর ছাত্রেরা দেয়
আজকাল-এর দোহাই।
আজকাল-এর মুখরতায়
তাদের অটুট বিশ্বাস।
হায় রে আজকাল
কত ডুবে গেল কালের মহাপ্লাবনে
মোটাদামের মার্কা-মারা
পসরা নিয়ে।
যা চিরকাল-এর
তা আজ যদি বা ঢাকা পড়ে
কাল উঠবে জেগে।
তখন মানুষ আবার বলবে খুশি হয়ে,--
গল্প বলো।
আরো দেখুন
মিলভাঙা
Verses
এসেছিলে কাঁচা জীবনের
        পেলব রূপটি নিয়ে --
     এনেছিলে আমার হৃদয়ের প্রথম বিস্ময়,
            রক্তে প্রথম কোটালের বান।
      আধোচেনার ভালোবাসার মাধুরী
            ছিল যেন ভোরবেলাকার
      কালো ঘোমটার সূক্ষ্ম সোনার কাজ--
            গোপন শুভদৃষ্টির আবরণ।
      মনের মধ্যে তখনো
     অসংশয় হয় নি পাখির কাকলি;
      বনের মর্মর একবার জাগে
           একবার যায় মিলিয়ে।
      বহুলোকের সংসারের মাঝখানে
            চুপিচুপি তৈরি হতে লাগল
                      আমাদের দুজনের নিভৃত জগৎ।
            পাখি যেমন প্রতিদিন
                 খড়কুটো কুড়িয়ে এনে বাসা বাঁধে
                      তেমনি সেই জগতের উপকরণ সামান্য,
                         চল্‌তি মুহূর্তের খসে-পড়া
                                উড়ে-আসা সঞ্চয় দিয়ে গাঁথা
                          তার মূল্য ছিল তার রচনায়,
                                    নয় তার বস্তুতে।
      শেষে একদিন দুজনের নৌকো-বাওয়া থেকে
                       কখন একলা গেছ নেমে;
                    আমি ভেসে চলেছি স্রোতে,
                তুমি বসে রইলে ও পারের ডাঙায়।
মিলল না আর আমার হাতে তোমার হাতে
                   কাজে কিম্বা খেলায়।
      জোড় ভেঙে ভাঙল আমাদের জীবনের গাঁথনি।
          যে দ্বীপের শ্যামল ছবিখানি সদ্য আঁকা পড়েছে
                সমুদ্রের লীলাচঞ্চল তরঙ্গপটে
                       তাকে যেমন দেয় মুছে
                     এক জোয়ারের তুমুল তুফানে,
          তেমনি মিলিয়ে গেল আমাদের কাঁচা জগৎ
                     সুখদুঃখের নতুন-অঙ্কুর-মেলা
                                শ্যামল রূপ নিয়ে।
      তার পরে অনেক দিন গেছে কেটে।
           আষাঢ়ের আসন্নবর্ষণ সন্ধ্যায়
                 যখন তোমাকে দেখি মনে মনে,
                       দেখতে পাই তুমি আছ
            সেইদিনকার কচি যৌবনের মায়া দিয়ে ঘেরা।
                     তোমার বয়স গেছে থেমে।
            তোমার সেই বসন্তের আমের বোলে
                       আজও তেমনি গন্ধেরই ঘোষণা;
                তোমার সেদিনকার মধ্যাহ্ন
      আজ মধ্যাহ্নেও ঘুঘুর ডাকে তেমনি বিরহাতুর।
                  আমার কাছে তোমার স্মরণ রয়ে গেছে
           প্রকৃতির বয়সহারা এই-সব পরিচয়ের দলে।
                       সুন্দর তুমি বাঁধা রেখায়,
                       প্রতিষ্ঠিত তুমি অচল ভূমিতে।
আমার জীবনধারা
    কোথাও রইল না থেমে।
      দুর্গমের মধ্যে, গভীরের মধ্যে,
            মন্দভালোর দ্বন্দ্ববিরোধে,
                 চিন্তায় সাধনায় আকাঙক্ষায়,
কখনো সফলতায়, কখনো প্রমাদে,
                 চলে এসেছি তোমার জানা সীমার
                       বহুদূর বাইরে;
            সেখানে আমি তোমার কাছে বিদেশী।
        সেই তুমি আজ এই মেঘ-ডাকা সন্ধ্যায়
                যদি এসে বস আমার সামনে
                       দেখতে পাবে আমার চোখে
                             দিক-হারানো চাহনি
                       অজানা আকাশের সমু্‌দ্রপারে
                              নীল অরণ্যের পথে।
তুমি কি পাশে বসে শোনাবে
      সেদিনকার কানে-কানে কথার উদ্‌বৃত্ত।
            কিন্তু ঢেউ করছে গর্জন,
                 শকুন করছে চীৎকার,
                       মেঘ ডাকছে আকাশে,
                          মাথা নাড়ছে নিবিড় শালের বন।
                       তোমার বাণী হবে খেলার ভেলা
                          খেপাজলের ঘূর্ণিপাকে।
      সেদিন আমার সব মন
            মিলেছিল তোমার সব মনে,
      তাই প্রকাশ পেয়েছে নূতন গান
            প্রথম সৃষ্টির আনন্দে।
                      মনে হয়েছে,
           বহু যুগের আশ মিটল তোমাতে আমাতে।
            সেদিন প্রতিদিনই বয়ে এনেছে
                   নূতন আলোর আগমনী
      আদিকালে সদ্য-চোখ-মেলা তারার মতো।
আজ আমার যন্ত্রে
             তার চড়েছে বহুশত,
                 কোনোটা নয় তোমার জানা।
            যে সুর সেধে রেখেছ সেদিন
                 সে সুর লজ্জা পাবে এর তারে।
            সেদিন যা ছিল ভাবের লেখা
                 আজ হবে তা দাগা-বুলোনো।
            তবু জল আসে চোখে।
      এই সেতারে নেমেছিল তোমার আঙুলের
                          প্রথম দরদ;
                 এর মধ্যে আছে তার জাদু।
      এই তরীটিকে প্রথম দিয়েছিলে ঠেলে
      কিশোর-বয়সের শ্যামল পারের থেকে;
               এর মধ্যে আছে তার বেগ।
      আজ মাঝনদীতে সারিগান গাইবে যখন
               তোমার নাম পড়বে বাঁধা
                       তার হঠাৎ তানে।
আরো দেখুন