দুয়ারে তোমার ভিড় ক'রে যারা আছে, ভিক্ষা তাদের চুকাইয়া দাও আগে। মোর নিবেদন নিভৃতে তোমার কাছে-- সেবক তোমার অধিক কিছু না মাগে। ভাঙিয়া এসেছি ভিক্ষাপাত্র, শুধু বীণাখানি রেখেছি মাত্র, বসি এক ধারে পথের কিনারে বাজাই সে বীণা দিবসরাত্র। দেখো কতজন মাগিছে রতনধূলি, কেহ আসিয়াছে যাচিতে নামের ঘটা-- ভরি নিতে চাহে কেহ বিদ্যার ঝুলি, কেহ ফিরে যাবে লয়ে বাক্যের ছটা। আমি আনিয়াছি এ বীণাযন্ত্র, তব কাছে লব গানের মন্ত্র, তুমি নিজ-হাতে বাঁধো এ বীণায় তোমার একটি স্বর্ণতন্ত্র। নগরের হাটে করিব না বেচাকেনা, লোকালয়ে আমি লাগিব না কোনো কাজে। পাব না কিছুই,রাখিব না কারো দেনা, অলস জীবন যাপিব গ্রামের মাঝে। তরুতলে বসি মন্দ-মন্দ ঝংকার দিব কত কী ছন্দ, যত গান গাব তব বাঁধা তারে বাজিবে তোমার উদার মন্দ্র।
অনেক দিনের কথা সে যে অনেক দিনের কথা; পুরানো এই ঘাটের ধারে ফিরে এল কোন্ জোয়ারে পুরানো সেই কিশোর প্রেমের করুণ ব্যাকুলতা? সে যে অনেক দিনের কথা। আজকে মনে পড়েছে সেই নির্জন অঙ্গন। সেই প্রদোষের অন্ধকারে এল আমার অধর-পারে ক্লান্ত ভীরু পাখির মতো কম্পিত চুম্বন। সেদিন নির্জন অঙ্গন। তখন জানা ছিল না তো ভালোবাসার ভাষা -- যেন প্রথম দখিন বায়ে শিহর লেগেছিল গায়ে, চাঁপাকুঁড়ির বুকের মাঝে অস্ফুট কোন্ আশা, সে যে অজানা কোন্ ভাষা। সেই সেদিনের আসাযাওয়া, আধেক জানাজানি, হঠাৎ হাতে হাতে ঠেকা, বোবা চোখের চেয়ে দেখা, মনে পড়ে ভীরু হিয়ার না-বলা সেই বাণী -- সেই আধেক জানাজানি। এই জীবনে সেই তো আমার প্রথম ফাগুন মাস। ফুটল না তার মুকুলগুলি, শুধু তারা হাওয়ায় দুলি অবেলাতে ফেলে গেছে চরম দীর্ঘশ্বাস -- আমার প্রথম ফাগুন মাস। ঝরে-পড়া সেই মুকুলের শেষ-না-করা কথা আজকে আমার সুরে গানে পায় খুঁজে তার গোপন মানে, আজ বেদনায় উঠল ফুটে তার সেদিনের ব্যথা -- সেই শেষ-না-করা কথা। পারে যাওয়ার উধাও পাখি সেই কিশোরের ভাষা, প্রাণের পারের কুলায় ছাড়ি শূন্য আকাশ দিল পাড়ি, আজ এসে মোর স্বপন-মাঝে পেয়েছে তার বাসা -- আমার সেই কিশোরের ভাষা।