৭৫ (adhkhana bel)

     আধখানা বেল

       খেয়ে কানু বলে,--

          'কোথা গেল বেল

                   একখানা।'

     আধা গেলে শুধু

       আধা বাকি থাকে,

          যত করি আমি

                 ব্যাখ্যানা,

 

সে বলে, 'তাহলে মহা ঠকিলাম,

আমি তো দিয়েছি ষোল আনা দাম।'--

     হাতে হাতে সেটা করিল প্রমাণ

          ঝাড়া দিয়ে তার

              ব্যাগখানা।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

পুনর্মিলন
Verses
        কিসের হরষ কোলাহল
       শুধাই তোদের, তোরা বল্‌।
আনন্দ-মাঝারে সব উঠিতেছে ভেসে ভেসে
        আনন্দে হতেছে কভু লীন--
চাহিয়া ধরণী-পানে নব আনন্দের গানে
        মনে পড়ে আর-এক দিন।
সে তখন ছেলেবেলা--রজনী প্রভাত হলে,
তাড়াতাড়ি শয্যা ছাড়ি ছুটিয়া যেতেম চলে;
সারি সারি নারিকেল বাগানের এক পাশে,
বাতাস আকুল করে আম্রমুকুলের বাসে।
          পথপাশে দুই ধারে
          বেলফুল ভারে ভারে
ফুটে আছে, শিশুমুখে প্রথম হাসির প্রায়--
          বাগানে পা দিতে দিতে
          গন্ধ আসে আচম্বিতে,
নর্‌গেস্‌ কোথা ফুটে খুঁজে তারে পাওয়া দায়।
মাঝেতে বাঁধানো বেদী, জুঁইগাছ চারি ধারে--
সূর্যোদয় দেখা দিত প্রাচীরের পরপারে।
          নবীন রবির আলো
         সে যে কী লাগিত ভালো
সর্বাঙ্গে সুবর্ণসুধা অজস্র পড়িত ঝরে--
প্রভাত ফুলের মতো ফুটায়ে তুলিত মোরে।
           এখনো সে মনে আছে
           সেই জানালার কাছে
বসে থাকিতাম একা জনহীন দ্বিপ্রহরে।
           অনন্ত আকাশ নীল,
           ডেকে চলে যেত চিল
জানায়ে সুতীব্র তৃষা সুতীক্ষ্ন করুণ স্বরে।
           পুকুর গলির ধারে,
          বাঁধা ঘাট এক পারে--
কত লোক যায় আসে, স্নান করে, তোলে জল--
রাজহাঁস তীরে তীরে
সারাদিন ভেসে ফিরে,
ডানা দুটি ধুয়ে ধুয়ে করিতেছে নিরমল।
পূর্ব ধারে বৃদ্ধ বট
মাথায় নিবিড় জট,
ফেলিয়া প্রকাণ্ড ছায়া দাঁড়ায়ে রহস্যময়।
আঁকড়ি শিকড়-মুঠে
প্রাচীর ফেলেছে টুটে,
খোপেখাপে ঝোপেঝাপে কত-না বিস্ময় ভয়।
বসি শাখে পাখি ডাকে সারাদিন একতান-
চারিদিক স্তব্ধ হেরি কী যেন করিত প্রাণ।
মৃদু তপ্ত সমীরণ গায়ে লাগিত এসে,
সেই সমীরণস্রোতে কত কি আসিত ভেসে
কোন্‌ সমুদ্রের কাছে
মায়াময় রাজ্য আছে,
সেথা হতে উড়ে আসে পাখির ঝাঁকের মতো
কত মায়া, কত পরী, রূপকথা কত শত।
আরেকটি ছোটো ঘর মনে পড়ে নদীকূলে,
সম্মুখে পেয়ারাগাছ ভরে আছে ফলে ফুলে।
বসিয়া ছায়াতে তারি ভুলিয়া শৈশবখেলা,
জাহ্নবীপ্রবাহ-পানে চেয়ে আছি সারাবেলা।
ছায়া কাঁপে, আলো কাঁপে, ঝুরু ঝুরু বহে বায়--
ঝর ঝর মর মর পাতা ঝরে পড়ে যায়।
সাধ যেত যাই ভেসে
কত রাজ্যে কত দেশে,
দুলায়ে দুলায়ে ঢেউ নিয়ে যাবে কত দূর--
কত ছোটো ছোটো গ্রাম
নূতন নূতন নাম,
অভ্রভেদী শুভ্র সৌধ, কত নব রাজপুর।
কত গাছ, কত ছায়া জটিল বটের মূল--
তীরে বালুকার 'পরে,
ছেলেমেয়ে খেলা করে,
সন্ধ্যায় ভাসায় দীপ, প্রভাতে ভাসায় ফুল।
ভাসিতে ভাসিতে শুধু দেখিতে দেখিতে যাব
কত দেশ, কত মুখ, কত-কী দেখিতে পাব।
কোথা বালকের হাসি,
কোথা রাখালের বাঁশি,
সহসা সুদূর হতে অচেনা পাখির গান।
         কোথাও বা দাঁড় বেয়ে
         মাঝি গেল গান গেয়ে,
কোথাও বা তীরে বসে পথিক ধরিল তান।
শুনিতে শুনিতে যাই আকাশেতে তুলে আঁখি
আকাশেতে ভাসে মেঘ, আকাশেতে ওড়ে পাখি।
হয়তো বরষা কাল-- ঝর ঝর বারি ঝরে,
পুলকরোমাঞ্চ ফুটে জাহ্নবীর কলেবরে--
          থেকে  থেকে ঝন্‌ ঝন্‌
          ঘন বাজ-বরিষন,
থেকে থেকে বিজলীর চমকিত চকমকি।
           বহিছে পুরব বায়,
           শীতে শিহরিছে কায়,
গহন জলদে দিবা হয়েছে আঁধারমুখী।
           সেই, সেই ছেলেবেলা
           আনন্দে করেছি খেলা
প্রকৃতি গো, জননী গো, কেবলি তোমারি কোলে।
তার পরে কী যে হল-- কোথা যে গেলেম চলে।
হৃদয় নামেতে এক বিশাল অরণ্য আছে,
          দিশে দিশে নাহিকো কিনারা,
          তারি মাঝে হ'নু, পথহারা।
          সে বন আঁধারে ঢাকা
           গাছের জটিল শাখা
           সহস্র স্নেহের বাহু দিয়ে
           আঁধার পালিছে  বুকে নিয়ে।
নাহি রবি, নাহি শশী, নাহি গ্রহ, নাহি তারা,
          কে জানে কোথায় দিগ্‌বিদিক।
          আমি শুধু একেলা পথিক।
          তোমারে গেলেম ফেলে,
          অরণ্যে গেলেম চলে,
          কাটালেম কত শত দিন
          ম্রিয়মাণ সুখশান্তিহীন।
আজিকে একটি পাখি পথ দেখাইয়া  মোরে
         আনিল এ অরণ্য-বাহিরে
         আনন্দের সমুদ্রের তীরে।
         সহসা দেখিনু রবিকর,
         সহসা শুনিনু কত গান।
         সহসা পাইনু পরিমল,
         সহসা খুলিয়া গেল প্রাণ।
দেখিনু ফুটিছে ফুল, দেখিনু উড়িছে পাখি,
         আকাশ পুরেছে কলস্বরে।
জীবনের ঢেউগুলি ওঠে পড়ে চারিদিকে,
         রবিকর নাচে তার 'পরে।
চারি দিকে বহে বায়ু, চারিদিকে ফুটে আলো,
         চারিদিকে অনন্ত আকাশ
চারিদিক পানে চাই--চারিদিকে প্রাণ ধায়,
        জগতের অসীম বিকাশ।
কেহ এসে বসে কোলে, কেহ ডাকে সখা ব'লে,
       কাছে এসে কেহ করে খেলা।
কেহ হাসে, কেহ গায়, কেহ আসে, কেহ যায়--
       এ কী হেরি আনন্দের মেলা!
যুবক যুবতি হাসে, বালক বালিকা নাচে
       দেখে যে রে জুড়ায় নয়ন।
ও কে হোথা গান গায়, প্রাণ কেড়ে নিয়ে যায়,
        ও কী শুনি অমিয়-বচন।
        তাই আজি শুধাই তোমারে
       কেন এ আনন্দ চারিধারে!
বুঝেছি গো বুঝেছি গো, এতদিন পরে বুঝি
       ফিরে পেলে হারানো সন্তান।
তাই বুঝি দুই হাতে জড়ায়ে লয়েছ বুকে,
        তাই বুঝি গাহিতেছ গান।
ভালোবাসা খুঁজিবারে গেছিনু অরণ্যমাঝে,
        হৃদয়ে হইনু পথহারা,
        বরষিনু অশ্রুবারিধারা।
ভ্রমিলাম দূরে দূরে--কে জানিত বল্‌ দেখি
        হেথা এত ভালোবাসা আছে।
যেদিকেই চেয়ে দেখি সেইদিকে ভালোবাসা
          ভাসিতেছে নয়নের কাছে।
মা আমার,  আজ আমি কত শত দিন পরে
          যখনি রে দাঁড়ানু সম্মুখে,
অমনি চুমিলি মুখ, কিছু নাই অভিমান,
         অমনি লইলি তুলে বুকে।
ছাড়িব না তোর কোল, রব হেথা অবিরাম,
        তোর কাছে শিখিব রে স্নেহ,
সবারে বাসিব ভালো--কেহ না নিরাশ হবে
         মোরে ভালো বাসিবে যে কেহ।
আরো দেখুন
নিমন্ত্রণ
Verses
মনে পড়ে, যেন এককালে লিখিতাম
          চিঠিতে তোমারে প্রেয়সী অথবা প্রিয়ে।
একালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম--
          থাক্‌ সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে।
তুমি দাবি কর কবিতা আমার কাছে
          মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে লেখা,
আমার কাব্য তোমার দুয়ারে যাচে
          নম্র চোখের কম্প্র কাজলরেখা।
সহজ ভাষায় কথাটা বলাই শ্রেয়--
          যে-কোনো ছুতায় চলে এসো মোর ডাকে,
সময় ফুরালে আবার ফিরিয়া যেয়ো,
          বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে।
গৌরবরন তোমার চরণমূলে
          ফল্‌সাবরন শাড়িটি ঘেরিবে ভালো;
বসনপ্রান্ত সীমন্তে রেখো তুলে,
          কপোলপ্রান্তে সরু পাড় ঘন কালো।
          
একগুছি চুল বায়ু-উচ্ছ্বাসে কাঁপা
          ললাটের ধারে থাকে যেন অশাসনে।
ডাহিন অলকে একটি দোলনচাঁপা
          দুলিয়া উঠুক গ্রীবাভঙ্গির সনে।
বৈকালে গাঁথা যূথীমুকুলের মালা
          কণ্ঠের তাপে ফুটিয়া উঠিবে সাঁঝে;
দূরে থাকিতেই গোপনগন্ধে-ঢালা
          সুখসংবাদ মেলিবে হৃদয়মাঝে।
এই সুযোগেতে একটুকু দিই খোঁটা--
          আমারই দেওয়া সেই ছোট্ট চুনির দুল,
রক্তে জমানো যেন সে অশ্রুর ফোঁটা,
          কতদিন সেটা পরিতে করেছ ভুল।
আরেকটা কথা বলে রাখি এইখানে,
          কাব্যে সে কথা হবে না মানানসই,
সুর দিয়ে সেটা গাহিব না কোনো গানে--
          তুচ্ছ শোনাবে, তবু সে তুচ্ছ কই।
একালে চলে না সোনার প্রদীপ আনা,
সোনার বীণাও নহে আয়ত্তগত।
          বেতের ডালায় রেশমি-রুমাল-টানা
                   অরুণবরন আম এনো গোটাকত।
গদ্য জাতীয় ভোজ্যও কিছু দিয়ো,
          পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।
তা হোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়;
          জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।
ওই দেখো, ওটা আধুনিকতার ভূত
          মুখেতে জোগায় স্থূলতার জয়ভাষা;
জানি, অমরার পথহারা কোনো দূত
          জঠরগুহায় নাহি করে যাওয়া-আসা।
          তথাপি পষ্ট বলিতে নাহি তো দোষ
                   যে কথা কবির গভীর মনের কথা--
উদরবিভাগে দৈহিক পরিতোষ
          সঙ্গী জোটায় মানসিক মধুরতা।
শোভন হাতের সন্দেশ, পানতোয়া,
          মাছমাংসের পোলাও ইত্যাদিও
যবে দেখা দেয় শোভামাধুর্যে-ছোঁওয়া
          তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়!
বুঝি অনুমানে, চোখে কৌতুক ঝলে;
          ভাবিছ বসিয়া সহাস ওষ্ঠাধরা,
এ সমস্তই কবিতার কৌশলে
          মৃদুসংকেতে মোটা ফরমাশ করা।
আচ্ছা, নাহয় ইঙ্গিত শুনে হেসো;
          বরদানে, দেবী, নাহয় হইবে বাম;
খালি হাতে যদি আস তবে তাই এসো,
          সে দুটি হাতেরও কিছু কম নহে দাম!
সেই কথা ভালো, তুমি চলে এসো একা,
          বাতাসে তোমার আভাস যেন গো থাকে;
স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা,
          সন্ধ্যাতারাটি শিরীষডালের ফাঁকে।
তার পরে যদি ফিরে যাও ধীরে ধীরে
          ভুলে ফেলে যেও তোমার যূথীর মালা;
ইমন বাজিবে বক্ষের শিরে শিরে,
          তার পরে হবে কাব্য লেখার পালা।
যত লিখে যাই ততই ভাবনা আসে,
          লেফাফার 'পরে কার নাম দিতে হবে;
মনে মনে ভাবি গভীর দীর্ঘশ্বাসে,
          কোন্‌ দূর যুগে তারিখ ইহার কবে।
          মনে ছবি আসে-- ঝিকিমিকি বেলা হল,
                   বাগানের ঘাটে গা ধুয়েছ তাড়াতাড়ি;
কচি মুখখানি, বয়স তখন ষোলো;
          তনু দেহখানি ঘেরিয়াছে ডুরে শাড়ি।
কুঙ্কুমফোঁটা ভুরুসংগমে কিবা,
          শ্বেতকরবীর গুচ্ছ কর্ণমূলে;
পিছন হইতে দেখিনু কোমল গ্রীবা
          লোভন হয়েছে রেশমচিকন চুলে।
তাম্রথালায় গোড়ে মালাখানি গেঁথে
          সিক্ত রুমালে যত্নে রেখেছ ঢাকি;
ছায়া-হেলা ছাদে মাদুর দিয়েছ পেতে--
          কার কথা ভেবে বসে আছ জানি না কি!
আজি এই চিঠি লিখিছে তো সেই কবি;
          গোধূলির ছায়া ঘনায় বিজন ঘরে,
দেয়ালে ঝুলিছে সেদিনের ছায়াছবি--
শব্দটি নেই, ঘড়ি টিক্‌টিক্‌ করে।
ওই তো তোমার হিসাবের ছেঁড়া পাতা,
          দেরাজের কোণে পড়ে আছে আধুলিটি।
কতদিন হল গিয়েছ, ভাবিব না তা,
          শুধু রচি বসে নিমন্ত্রণের চিঠি।
মনে আসে, তুমি পুব-জানালার ধারে
          পশমের গুটি কোলে নিয়ে আছ বসে;
উৎসুক চোখে বুঝি আশা কর কারে,
          আলগা আঁচল মাটিতে পড়েছে খসে।
অর্ধেক ছাদে রৌদ্র নেমেছে বেঁকে,
          বাকি অর্ধেক ছায়াখানি দিয়ে ছাওয়া;
পাঁচিলের গায়ে চীনের টবের থেকে
          চামেলি ফুলের গন্ধ আনিছে হাওয়া।
এ চিঠির নেই জবাব দেবার দায়,
          আপাতত এটি দেরাজে দিলেম রেখে।
পার যদি এসো শব্দবিহীন পায়,
          চোখ টিপে ধোরো হঠাৎ পিছন থেকে।
আকাশে চুলের গন্ধটি দিয়ো পাতি,
          এনো সচকিত কাঁকনের রিনিরিন,
আনিয়ো মধুর স্বপ্নসঘন রাতি,
          আনিয়ো গভীর আলস্যঘন দিন।
তোমাতে আমাতে মিলিত নিবিড় একা--
          স্থির আনন্দ, মৌন মাধুরীধারা,
মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা,
          তব করতল মোর করতলে হারা।
আরো দেখুন
70
Verses
FLOWER, HAVE pity for the worm,
it is not a bee,
its love is a blunder and a burden.
আরো দেখুন