নিমন্ত্রণ (nimontron)

মনে পড়ে, যেন এককালে লিখিতাম

          চিঠিতে তোমারে প্রেয়সী অথবা প্রিয়ে।

একালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম--

          থাক্‌ সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে।

তুমি দাবি কর কবিতা আমার কাছে

          মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে লেখা,

আমার কাব্য তোমার দুয়ারে যাচে

          নম্র চোখের কম্প্র কাজলরেখা।

সহজ ভাষায় কথাটা বলাই শ্রেয়--

          যে-কোনো ছুতায় চলে এসো মোর ডাকে,

সময় ফুরালে আবার ফিরিয়া যেয়ো,

          বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে।

গৌরবরন তোমার চরণমূলে

          ফল্‌সাবরন শাড়িটি ঘেরিবে ভালো;

বসনপ্রান্ত সীমন্তে রেখো তুলে,

          কপোলপ্রান্তে সরু পাড় ঘন কালো।

          

একগুছি চুল বায়ু-উচ্ছ্বাসে কাঁপা

          ললাটের ধারে থাকে যেন অশাসনে।

ডাহিন অলকে একটি দোলনচাঁপা

          দুলিয়া উঠুক গ্রীবাভঙ্গির সনে।

বৈকালে গাঁথা যূথীমুকুলের মালা

          কণ্ঠের তাপে ফুটিয়া উঠিবে সাঁঝে;

দূরে থাকিতেই গোপনগন্ধে-ঢালা

          সুখসংবাদ মেলিবে হৃদয়মাঝে।

এই সুযোগেতে একটুকু দিই খোঁটা--

          আমারই দেওয়া সেই ছোট্ট চুনির দুল,

রক্তে জমানো যেন সে অশ্রুর ফোঁটা,

          কতদিন সেটা পরিতে করেছ ভুল।

আরেকটা কথা বলে রাখি এইখানে,

          কাব্যে সে কথা হবে না মানানসই,

সুর দিয়ে সেটা গাহিব না কোনো গানে--

          তুচ্ছ শোনাবে, তবু সে তুচ্ছ কই।

একালে চলে না সোনার প্রদীপ আনা,

সোনার বীণাও নহে আয়ত্তগত।

          বেতের ডালায় রেশমি-রুমাল-টানা

                   অরুণবরন আম এনো গোটাকত।

গদ্য জাতীয় ভোজ্যও কিছু দিয়ো,

          পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।

তা হোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়;

          জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।

ওই দেখো, ওটা আধুনিকতার ভূত

          মুখেতে জোগায় স্থূলতার জয়ভাষা;

জানি, অমরার পথহারা কোনো দূত

          জঠরগুহায় নাহি করে যাওয়া-আসা।

          তথাপি পষ্ট বলিতে নাহি তো দোষ

                   যে কথা কবির গভীর মনের কথা--

উদরবিভাগে দৈহিক পরিতোষ

          সঙ্গী জোটায় মানসিক মধুরতা।

শোভন হাতের সন্দেশ, পানতোয়া,

          মাছমাংসের পোলাও ইত্যাদিও

যবে দেখা দেয় শোভামাধুর্যে-ছোঁওয়া

          তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়!

বুঝি অনুমানে, চোখে কৌতুক ঝলে;

          ভাবিছ বসিয়া সহাস ওষ্ঠাধরা,

এ সমস্তই কবিতার কৌশলে

          মৃদুসংকেতে মোটা ফরমাশ করা।

আচ্ছা, নাহয় ইঙ্গিত শুনে হেসো;

          বরদানে, দেবী, নাহয় হইবে বাম;

খালি হাতে যদি আস তবে তাই এসো,

          সে দুটি হাতেরও কিছু কম নহে দাম!

সেই কথা ভালো, তুমি চলে এসো একা,

          বাতাসে তোমার আভাস যেন গো থাকে;

স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা,

          সন্ধ্যাতারাটি শিরীষডালের ফাঁকে।

তার পরে যদি ফিরে যাও ধীরে ধীরে

          ভুলে ফেলে যেও তোমার যূথীর মালা;

ইমন বাজিবে বক্ষের শিরে শিরে,

          তার পরে হবে কাব্য লেখার পালা।

যত লিখে যাই ততই ভাবনা আসে,

          লেফাফার 'পরে কার নাম দিতে হবে;

মনে মনে ভাবি গভীর দীর্ঘশ্বাসে,

          কোন্‌ দূর যুগে তারিখ ইহার কবে।

          মনে ছবি আসে-- ঝিকিমিকি বেলা হল,

                   বাগানের ঘাটে গা ধুয়েছ তাড়াতাড়ি;

কচি মুখখানি, বয়স তখন ষোলো;

          তনু দেহখানি ঘেরিয়াছে ডুরে শাড়ি।

কুঙ্কুমফোঁটা ভুরুসংগমে কিবা,

          শ্বেতকরবীর গুচ্ছ কর্ণমূলে;

পিছন হইতে দেখিনু কোমল গ্রীবা

          লোভন হয়েছে রেশমচিকন চুলে।

তাম্রথালায় গোড়ে মালাখানি গেঁথে

          সিক্ত রুমালে যত্নে রেখেছ ঢাকি;

ছায়া-হেলা ছাদে মাদুর দিয়েছ পেতে--

          কার কথা ভেবে বসে আছ জানি না কি!

আজি এই চিঠি লিখিছে তো সেই কবি;

          গোধূলির ছায়া ঘনায় বিজন ঘরে,

দেয়ালে ঝুলিছে সেদিনের ছায়াছবি--

শব্দটি নেই, ঘড়ি টিক্‌টিক্‌ করে।

ওই তো তোমার হিসাবের ছেঁড়া পাতা,

          দেরাজের কোণে পড়ে আছে আধুলিটি।

কতদিন হল গিয়েছ, ভাবিব না তা,

          শুধু রচি বসে নিমন্ত্রণের চিঠি।

মনে আসে, তুমি পুব-জানালার ধারে

          পশমের গুটি কোলে নিয়ে আছ বসে;

উৎসুক চোখে বুঝি আশা কর কারে,

          আলগা আঁচল মাটিতে পড়েছে খসে।

অর্ধেক ছাদে রৌদ্র নেমেছে বেঁকে,

          বাকি অর্ধেক ছায়াখানি দিয়ে ছাওয়া;

পাঁচিলের গায়ে চীনের টবের থেকে

          চামেলি ফুলের গন্ধ আনিছে হাওয়া।

এ চিঠির নেই জবাব দেবার দায়,

          আপাতত এটি দেরাজে দিলেম রেখে।

পার যদি এসো শব্দবিহীন পায়,

          চোখ টিপে ধোরো হঠাৎ পিছন থেকে।

আকাশে চুলের গন্ধটি দিয়ো পাতি,

          এনো সচকিত কাঁকনের রিনিরিন,

আনিয়ো মধুর স্বপ্নসঘন রাতি,

          আনিয়ো গভীর আলস্যঘন দিন।

তোমাতে আমাতে মিলিত নিবিড় একা--

          স্থির আনন্দ, মৌন মাধুরীধারা,

মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা,

          তব করতল মোর করতলে হারা।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

The Child-Angel
Verses
THEY CLAMOUR and fight, they doubt and despair, they know no end to their wranglings.
Let your life come amongst them like a flame of light, my child,
unflickering and pure, and delight them into silence.
They are cruel in their greed and their envy, their words are like hidden knives thirsting for blood.
Go and stand amidst their scowling hearts, my child, and let your gentle eyes fall upon them like the forgiving peace of the evening over the strife of the day.
Let them see your face, my child, and thus know the meaning of all things; let them love you and thus love each other.
Come and take your seat in the bosom of the limitless, my child. At sunrise open and raise your heart like a blossoming flower, and at sunset bend your head and in silence complete the worship of the day.
আরো দেখুন
রাজমিস্ত্রী
Verses
বয়স আমার হবে তিরিশ,
          দেখতে আমায় ছোটো,
আমি নই, মা, তোমার শিরিশ,
          আমি হচ্ছি নোটো।
আমি যে রোজ সকাল হলে
যাই শহরের দিকে চলে
          তমিজ মিঞার গোরুর গাড়ি চড়ে।
সকাল থেকে সারা দুপর
ইঁট সাজিয়ে ইঁটের উপর
          খেয়ালমতো দেয়াল তুলি গড়ে।
ভাবছ তুমি নিয়ে ঢেলা
ঘর-গড়া সে আমার খেলা,
          কক্‌খনো না সত্যিকার সে কোঠা।
ছোটো বাড়ি নয় তো মোটে,
তিনতলা পর্যন্ত ওঠে,
          থামগুলো তার এমনি মোটা মোটা।
কিন্তু যদি শুধাও আমায়
ঐখানেতেই কেন থামায়?
          দোষ কী ছিল ষাট-সত্তর তলা?
ইঁট সুরকি জুড়ে জুড়ে
একেবারে আকাশ ফুঁড়ে
          হয় না কেন কেবল গেঁথে চলা?
গাঁথতে গাঁথতে কোথায় শেষে
ছাত কেন না তারায় মেশে?
          আমিও তাই ভাবি নিজে নিজে।
কোথাও গিয়ে কেন থামি
যখন শুধাও, তখন আমি
          জানি নে তো তার উত্তর কী যে।
যখন খুশি ছাতের মাথায়
          উঠছি ভারা বেয়ে।
সত্যি কথা বলি, তাতে
          মজা খেলার চেয়ে।
সমস্ত দিন ছাত-পিটুনী
গান গেয়ে ছাত পিটোয় শুনি,
          অনেক নিচে চলছে গাড়িঘোড়া।
বাসনওআলা থালা বাজায়;
সুর করে ঐ হাঁক দিয়ে যায়
          আতাওআলা নিয়ে ফলের ঝোড়া।
সাড়ে চারটে বেজে ওঠে,
ছেলেরা সব বাসায় ছোটে
          হো হো করে উড়িয়ে দিয়ে ধুলো।
রোদ্দুর যেই আসে পড়ে
পুবের মুখে কোথায় ওড়ে
          দলে দলে ডাক দিয়ে কাকগুলো।
আমি তখন দিনের শেষে
ভারার থেকে নেমে এসে
          আবার ফিরে আসি আপন গাঁয়ে।
জান তো, মা, আমার পাড়া
যেখানে ওই খুঁটি গাড়া
          পুকুরপাড়ে গাজনতলার বাঁয়ে।
তোরা যদি শুধাস মোরে
খড়ের চালায় রই কী করে?
          কোঠা যখন গড়তে পারি নিজে;
আমার ঘর যে কেন তবে
সব-চেয়ে না বড়ো হবে?
          জানি নে তো তার উত্তর কী যে!
আরো দেখুন
কোথায়
Verses
হায় কোথা যাবে!
অনন্ত অজানা দেশ, নিতান্ত যে একা তুমি,
পথ কোথা পাবে!
হায়, কোথা যাবে!
কঠিন বিপুল এ জগৎ,
খুঁজে নেয় যে যাহার পথ।
স্নেহের পুতলি তুমি সহসা অসীমে গিয়ে
কার মুখে চাবে।
হায়, কোথা যাবে!
মোরা কেহ সাথে রহিব না,
মোরা কেহ কথা কহিব না।
নিমেষ যেমনি যাবে, আমাদের ভালোবাসা
আর নাহি পাবে।
হায়, কোথা যাবে!
মোরা বসে কাঁদিব হেথায়,
শূন্যে চেয়ে ডাকিব তোমায়;
মহা সে বিজন মাঝে হয়তো বিলাপধ্বনি
মাঝে মাঝে শুনিবারে পাবে,
হায়, কোথা যাবে!
দেখো, এই ফুটিয়াছে ফুল,
বসন্তেরে করিছে আকুল;
পুরানো সুখের স্মৃতি বাতাস আনিছে নিতি
কত স্নেহভাবে,
হায়, কোথা যাবে!
খেলাধূলা পড়ে না কি মনে,
কত কথা স্নেহের স্মরণে।
সুখে দুখে শত ফেরে সে-কথা জড়িত যে রে,
সেও কি ফুরাবে!
হায়, কোথা যাবে!
চিরদিন তরে হবে পর,
এ-ঘর রবে না তব ঘর।
যারা ওই কোলে যেত, তারাও পরের মতো,
বারেক ফিরেও নাহি চাবে।
হায়, কোথা যাবে!
হায়, কোথা যাবে!
যাবে যদি, যাও যাও, অশ্রু তব মুছে যাও,
এইখানে দুঃখ রেখে যাও।
যে বিশ্রাম চেয়েছিলে, তাই যেন সেথা মিলে,
আরামে ঘুমাও।
যাবে যদি, যাও।
আরো দেখুন