উনচল্লিশ (ora ese amake bolechhilo)

ওরা এসে আমাকে বলে,

কবি, মৃত্যুর কথা শুনতে চাই তোমার মুখে।

আমি বলি,

মৃত্যু যে আমার অন্তরঙ্গ,

জড়িয়ে আছে আমার দেহের সকল তন্তু।

তার ছন্দ আমার হৃৎস্পন্দনে,

আমার রক্তে তার আনন্দের প্রবাহ।

বলছে সে,--চলো চলো,

চলো বোঝা ফেলতে ফেলতে,

চলো মরতে মরতে নিমেষে নিমেষে

আমারি টানে, আমারি বেগে।

বলছে, চুপ করে বস যদি

যা-কিছু আছে সমস্তকে আঁকড়িয়ে ধরে

তবে দেখবে, তোমার জগতে

ফুল গেল বাসি হয়ে,

পাঁক দেখা দিল শুকনো নদীতে,

ম্লান হল তোমার তারার আলো।

বলছে, "থেমো না, থেমো না,

পিছনে ফিরে তাকিয়ো না,

পেরিয়ে যাও পুরোনোকে জীর্ণকে ক্লান্তকে অচলকে।

"আমি মৃত্যু-রাখাল

সৃষ্টিকে চরিয়ে চরিয়ে নিয়ে চলেছি

যুগ হতে যুগান্তরে

নব নব চারণ-ক্ষেত্রে।

"যখন বইল জীবনের ধারা

আমি এসেছি তার পিছনে পিছনে,

দিইনি তাকে কোনো গর্তে আটক থাকতে।

তীরের বাঁধন কাটিয়ে কাটিয়ে

ডাক দিয়ে নিয়ে গেছি মহাসমুদ্রে,

সে সমুদ্র আমিই।

"বর্তমান চায় বর্তিয়ে থাকতে।

সে চাপাতে চায়

তার সব বোঝা তোমার মাথায়,

বর্তমান গিলে ফেলতে চায়

তোমার সব-কিছু আপন জঠরে।

তার পরে অবিচল থাকতে চায়

আকণ্ঠপূর্ণ দানবের মতো

জাগরণহীন নিদ্রায়।

তাকেই বলে প্রলয়।

এই অনন্ত অচঞ্চল বর্তমানের হাত থেকে

আমি সৃষ্টিকে পরিত্রাণ করতে এসেছি,

অন্তহীন নব নব অনাগতে।"

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

ছত্রিশ
Verses
শীতের রোদ্দুর।
সোনা-মেশা সবুজের ঢেউ
স্তম্ভিত হয়ে আছে সেগুন বনে।
বেগনি-ছায়ার ছোঁওয়া-লাগা
ঝুরি-নামা বৃদ্ধ বট
ডাল মেলেছে রাস্তার ওপার পর্যন্ত।
ফলসাগাছের ঝরা পাতা
হঠাৎ হাওয়ায় চমকে বেড়ায় উড়ে
ধুলোর সাঙাত হয়ে।
কাজ-ভোলা এই দিন
উধাও বলাকার মতো
লীন হয়ে চলেছে নিঃসীম নীলিমায়।
ঝাউগাছের মর্মরধ্বনিতে মিশে
মনের মধ্যে এই কথাটি উঠছে বেজে,
"আমি আছি।"
কুয়োতলার কাছে
সামান্য ঐ আমের গাছ;
সারা বছর ও  থাকে আত্মবিস্মৃত,
বনের সাধারণ সবুজের আবরণে
ও থাকে ঢাকা।
এমন সময় মাঘের শেষে
হঠাৎ মাটির নিচে
শিকড়ে শিকড়ে তার শিহর লাগে,
শাখায় শাখায় মুকুলিত হয়ে ওঠে বাণী--
"আমি আছি,"
চন্দ্রসূর্যের আলো আপন ভাষায়
স্বীকার করে তার সেই ভাষা।
অলস মনের শিয়রে দাঁড়িয়ে
হাসেন অন্তর্যামী,
হঠাৎ দেন ঠেকিয়ে সোনার কাঠি
প্রিয়ার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি দিয়ে,
কবির গানের সুর দিয়ে,
তখন যে-আমি ধূলিধূসর সামান্য দিনগুলির
মধ্যে মিলিয়ে ছিল,
সে দেখা দেয় এক নিমেষের অসমান্য আলোকে।
সে-সব দুর্মূল্য নিমেষ
কোনো রত্নভাণ্ডারে থেকে যায় কি না জানিনে;
এইটুকু জানি--
তারা এসেছে আমার আত্মবিস্মৃতির মধ্যে,
জাগিয়েছে আমার মর্মে
বিশ্বমর্মের নিত্যকালের সেই বাণী
"আমি আছি।"
আরো দেখুন
এপারে-ওপারে
Verses
রাস্তার ওপারে
     বাড়িগুলি ঘেঁষাঘেঁষি সারে সারে।
          ওখানে সবাই আছে
ক্ষীণ যত আড়ালের আড়ে-আড়ে কাছে-কাছে।
              যা-খুশী প্রসঙ্গ নিয়ে
                   ইনিয়ে-বিনিয়ে
          নানা কণ্ঠে বকে যায় কলস্বরে।
                   অকারণে হাত ধরে;
               যে যাহারে চেনে
      পিঠেতে চাপড় দিয়ে নিয়ে যায় টেনে
                   লক্ষ্যহীন অলিতে গলিতে,
          কথা-কাটাকাটি চলে গলাগলি চলিতে চলিতে।
বৃথাই কুশলবার্তা জানিবার ছলে
     প্রশ্ন করে বিনা কৌতূহলে।
          পরস্পরে দেখা হয়,
               বাঁধা ঠাট্টা করে বিনিময়।
     কোথা হতে অকস্মাৎ ঘরে ঢুকে
               হেসে ওঠে অহেতু কৌতুকে।
      "আনন্দবাজার' হতে সংবাদ-উচ্ছিষ্ট ঘেঁটে ঘেঁটে
          ছুটির মধ্যাহ্নবেলা বিষম বিতর্কে যায় কেটে।
সিনেমা-নটীর ছবি নিয়ে দুই দলে
          রূপের তুলনা-দ্বন্দ্ব চলে,
   উত্তাপ প্রবল হয় শেষে
          বন্ধুবিচ্ছেদের কাছে এসে।
     পথপ্রান্তে দ্বারের সম্মুখে বসি
ফেরিওয়ালাদের সাথে হুঁকো-হাতে দর-কষাকষি।
          একই সুরে দম দিয়ে বার বার
   গ্রামোফোনে চেষ্টা চলে থিয়েটরি গান শিখিবার।
কোথাও কুকুরছানা ঘেউ-ঘেউ আদরের ডাকে
               চমক লাগায় বাড়িটাকে।
          শিশু কাঁদে মেঝে মাথা হানি,
  সাথে চলে গৃহিণীর অসহিষ্ণু তীব্র ধমকানি।
          তাস-পিটোনির শব্দ, নিয়ে জিত হার
               থেকে থেকে বিষম চিৎকার।
যেদিন ট্যাক্সিতে চ'ড়ে জামাই উদয় হয় আসি
          মেয়েতে মেয়েতে হাসাহাসি,
                   টেপাটেপি, কানাকানি,
অঙ্গরাগে লাজুকেরে সাজিয়ে দেবার টানাটানি।
          দেউরিতে ছাতে বারান্দায়
নানাবিধ আনাগোনা ক্ষণে ক্ষণে ছায়া ফেলে যায়।
     হেথা দ্বার বন্ধ হয় হোথা দ্বার খোলে,
দড়িতে গামছা ধুতি ফর্‌ফর্‌ শব্দ করি ঝোলে।
          অনির্দিষ্ট ধ্বনি চারি পাশে
            দিনে রাত্রে কাজের আভাসে।
     উঠোনে অনবধানে-খুলে-রাখা কলে
               জল বহে যায় কলকলে;
     সিঁড়িতে আসিতে যেতে
          রাত্রিদিন পথ স্যাঁত্‌সেঁতে।
      বেলা হলে ওঠে ঝন্‌ঝনি
              বাসন-মাজার ধ্বনি।
      বেড়ি হাতা খুন্তি রান্নাঘরে
ঘরকরনার সুরে ঝংকার জাগায় পরস্পরে।
     কড়ায় সর্ষের তেল চিড়্‌বিড়্‌ ফোটে,
তারি মধ্যে কইমাছ অকস্মাৎ ছ্যাঁক্‌ করে ওঠে।
বন্দেমাতরম্‌-পেড়ে শাড়ি নিয়ে তাঁতিবউ ডাকে
         বউমাকে।
    খেলার ট্রাইসিকেলে
ছড়্‌ ছড়্‌ খড়্‌ খড়্‌  আঙিনায় ঘোরে কার ছেলে।
যাদের উদয় অস্ত আপিসের দিক্‌চক্রবালে
     তাদের গৃহিণীদের সকালে বিকালে
দিন পরে দিন যায়
     দুইবার জোয়ার-ভাঁটায়
         ছুটি আর কাজে।
হোথা পড়া-মুখস্থের একঘেয়ে অশ্রান্ত আওয়াজে
               ধৈর্য হারাইছে পাড়া,
          এগ্‌জামিনেশনে দেয় তাড়া।
প্রাণের প্রবাহে ভেসে
          বিবিধ ভঙ্গীতে ওরা মেশে।
               চেনা ও অচেনা
          লঘু আলাপের ফেনা
                   আবর্তিয়া তোলে
          দেখাশোনা আনাগোনা গতির হিল্লোলে।
রাস্তার এপারে আমি নিঃশব্দ দুপুরে
          জীবনের তথ্য যত ফেলে রেখে দূরে
               জীবনের তত্ত্ব যত খুঁজি
                   নিঃসঙ্গ মনের সঙ্গে যুঝি,
     সারাদিন চলেছে সন্ধান
          দুরূহের ব্যর্থ সমাধান।
       মনের ধূসর কূলে
প্রাণের জোয়ার মোরে একদিন দিয়ে গেছে তুলে।
    চারি দিকে তীক্ষ্ণ আলো ঝক্‌ঝক্‌ করে
          রিক্তরস উদ্দীপ্ত প্রহরে।
               ভাবি এই কথা--
     ওইখানে ঘনীভূত জনতার বিচিত্র তুচ্ছতা
       এলোমেলো আঘাতে সংঘাতে
নানা শব্দ নানা রূপ জাগিয়ে তুলিছে দিনরাতে।
     কিছু তার টেঁকে নাকো দীর্ঘকাল,
          মাটিগড়া মৃদঙ্গের তাল
              ছন্দটারে তার
          বদল করিছে বারংবার।
   তারি ধাক্কা পেয়ে মন
               ক্ষণে-ক্ষণ
          ব্যগ্র হয়ে ওঠে জাগি
     সর্বব্যাপী সামান্যের সচল স্পর্শের লাগি।
              আপনার উচ্চতট হতে
নামিতে পারে না সে যে সমস্তের ঘোলা গঙ্গাস্রোতে।
আরো দেখুন
পদধ্বনি
Verses
        আঁধারে প্রচ্ছন্ন ঘন বনে
                  আশঙ্কার পরশনে
        হরিণের থরথর হৃৎপিণ্ড যেমন--
                সেইমতো রাত্রি দ্বিপ্রহরে
                     শয্যা মোর ক্ষণতরে
                            সহসা কাঁপিল অকারণ।
           পদধ্বনি, কার পদধ্বনি
                  শুনিনু তখনি।
        মোর জন্মনক্ষত্রের অদৃশ্য জগতে
মোর ভাগ্য মোর তরে বার্তা লয়ে ফিরিছে কি পথে।
           পদধ্বনি, কার পদধ্বনি।
অজানার যাত্রী কে গো। ভয়ে কেঁপে উঠিল ধরণী।
        এই কি নির্মম সেই যে আপন চরণের তলে
                পদে পদে চিরদিন
                     উদাসীন
                পিছনের পথ মুছে চলে।
        এ কি সেই নিত্যশিশু, কিছু নাহি চাহে--
                নিজের খেলেনা চূর্ণ
                   ভাসাইছে অসম্পূর্ণ
                          খেলার প্রবাহে?
                ভাঙিয়া স্বপ্নের ঘোর,
                     ছিঁড়ি মোর
                শয্যায় বন্ধনমোহ, এ রাত্রিবেলায়
মোরে কি করিবে সঙ্গী প্রলয়ের ভাসান-খেলায়।
                  হোক তাই--
               ভয় নাই, ভয় নাই,
           এ খেলা খেলেছি বারম্বার
                   জীবনে আমার ।
           জানি জানি-- ভাঙিয়া নূতন করে তোলা,
ভুলায়ে পূর্বের পথ অপূর্বের পথে দ্বার খোলা,
                  বাঁধন গিয়েছে যবে চুকে
            তারি ছিন্ন রশিগুলি কুড়ায়ে কৌতুকে
বার বার গাঁথা হল দোলা।
      নিয়ে যত মুহূর্তের ভোলা
             চিরস্মরণের ধন
      গোপনে হয়েছে আয়োজন।
পদধ্বনি, কার পদধ্বনি
      চিরদিন শুনেছি এমনি
        বারে বারে।
      একি বাজে মৃত্যুসিন্ধুপারে।
    একি মোর আপন বক্ষেতে।
ডাকে মোরে ক্ষণে ক্ষণে কিসের সংকেতে।
    তবে কি হবেই যেতে।
        সব বন্ধ করিব ছেদন?
ওগো কোন্‌ বন্ধু তুমি, কোন্‌ সঙ্গী দিতেছ বেদন
        বিচ্ছেদের তীর হতে।
      তরী কি ভাসাব স্রোতে।
             হে বিরহী,
      আমার অন্তরে দাও কহি
        ডাকো মোরে কী খেলা খেলাতে
             আতঙ্কিত নিশীথবেলাতে?
      বারে বারে দিয়েছ নিঃসঙ্গ করি--
এ শূন্য প্রাণের পাত্র কোন্‌ সঙ্গসুধা দিয়ে ভরি
        তুলে নেবে মিলন-উৎসবে।
      সূর্যাস্তের পথ দিয়ে যবে
  সন্ধ্যাতারা উঠে আসে নক্ষত্রসভায়,
        প্রহর না যেতে যেতে
             কী সংকেতে
সব সঙ্গ ফেলে রেখে অস্তপথে ফিরে চলে যায়।
             সেও কি এমনি
                   শোনে পদধ্বনি।
তারে কি বিরহী
    বলে কিছু দিগন্তের অন্তরালে রহি।
        পদধ্বনি, কার পদধ্বনি।
                  দিনশেষে
        কম্পিত বক্ষের মাঝে এসে
     কী শব্দে ডাকিছে কোন্‌ অজানা রজনী।
আরো দেখুন