এপারে-ওপারে (epare opare)

রাস্তার ওপারে

     বাড়িগুলি ঘেঁষাঘেঁষি সারে সারে।

          ওখানে সবাই আছে

ক্ষীণ যত আড়ালের আড়ে-আড়ে কাছে-কাছে।

              যা-খুশী প্রসঙ্গ নিয়ে

                   ইনিয়ে-বিনিয়ে

          নানা কণ্ঠে বকে যায় কলস্বরে।

                   অকারণে হাত ধরে;

               যে যাহারে চেনে

      পিঠেতে চাপড় দিয়ে নিয়ে যায় টেনে

                   লক্ষ্যহীন অলিতে গলিতে,

          কথা-কাটাকাটি চলে গলাগলি চলিতে চলিতে।

বৃথাই কুশলবার্তা জানিবার ছলে

     প্রশ্ন করে বিনা কৌতূহলে।

          পরস্পরে দেখা হয়,

               বাঁধা ঠাট্টা করে বিনিময়।

     কোথা হতে অকস্মাৎ ঘরে ঢুকে

               হেসে ওঠে অহেতু কৌতুকে।

      "আনন্দবাজার' হতে সংবাদ-উচ্ছিষ্ট ঘেঁটে ঘেঁটে

          ছুটির মধ্যাহ্নবেলা বিষম বিতর্কে যায় কেটে।

সিনেমা-নটীর ছবি নিয়ে দুই দলে

          রূপের তুলনা-দ্বন্দ্ব চলে,

   উত্তাপ প্রবল হয় শেষে

          বন্ধুবিচ্ছেদের কাছে এসে।

     পথপ্রান্তে দ্বারের সম্মুখে বসি

ফেরিওয়ালাদের সাথে হুঁকো-হাতে দর-কষাকষি।

          একই সুরে দম দিয়ে বার বার

   গ্রামোফোনে চেষ্টা চলে থিয়েটরি গান শিখিবার।

কোথাও কুকুরছানা ঘেউ-ঘেউ আদরের ডাকে

               চমক লাগায় বাড়িটাকে।

          শিশু কাঁদে মেঝে মাথা হানি,

  সাথে চলে গৃহিণীর অসহিষ্ণু তীব্র ধমকানি।

          তাস-পিটোনির শব্দ, নিয়ে জিত হার

               থেকে থেকে বিষম চিৎকার।

যেদিন ট্যাক্সিতে চ'ড়ে জামাই উদয় হয় আসি

          মেয়েতে মেয়েতে হাসাহাসি,

                   টেপাটেপি, কানাকানি,

অঙ্গরাগে লাজুকেরে সাজিয়ে দেবার টানাটানি।

          দেউরিতে ছাতে বারান্দায়

নানাবিধ আনাগোনা ক্ষণে ক্ষণে ছায়া ফেলে যায়।

     হেথা দ্বার বন্ধ হয় হোথা দ্বার খোলে,

দড়িতে গামছা ধুতি ফর্‌ফর্‌ শব্দ করি ঝোলে।

          অনির্দিষ্ট ধ্বনি চারি পাশে

            দিনে রাত্রে কাজের আভাসে।

     উঠোনে অনবধানে-খুলে-রাখা কলে

               জল বহে যায় কলকলে;

     সিঁড়িতে আসিতে যেতে

          রাত্রিদিন পথ স্যাঁত্‌সেঁতে।

      বেলা হলে ওঠে ঝন্‌ঝনি

              বাসন-মাজার ধ্বনি।

      বেড়ি হাতা খুন্তি রান্নাঘরে

ঘরকরনার সুরে ঝংকার জাগায় পরস্পরে।

     কড়ায় সর্ষের তেল চিড়্‌বিড়্‌ ফোটে,

তারি মধ্যে কইমাছ অকস্মাৎ ছ্যাঁক্‌ করে ওঠে।

বন্দেমাতরম্‌-পেড়ে শাড়ি নিয়ে তাঁতিবউ ডাকে

         বউমাকে।

    খেলার ট্রাইসিকেলে

ছড়্‌ ছড়্‌ খড়্‌ খড়্‌  আঙিনায় ঘোরে কার ছেলে।

যাদের উদয় অস্ত আপিসের দিক্‌চক্রবালে

     তাদের গৃহিণীদের সকালে বিকালে

দিন পরে দিন যায়

     দুইবার জোয়ার-ভাঁটায়

         ছুটি আর কাজে।

হোথা পড়া-মুখস্থের একঘেয়ে অশ্রান্ত আওয়াজে

               ধৈর্য হারাইছে পাড়া,

          এগ্‌জামিনেশনে দেয় তাড়া।

প্রাণের প্রবাহে ভেসে

          বিবিধ ভঙ্গীতে ওরা মেশে।

               চেনা ও অচেনা

          লঘু আলাপের ফেনা

                   আবর্তিয়া তোলে

          দেখাশোনা আনাগোনা গতির হিল্লোলে।

রাস্তার এপারে আমি নিঃশব্দ দুপুরে

          জীবনের তথ্য যত ফেলে রেখে দূরে

               জীবনের তত্ত্ব যত খুঁজি

                   নিঃসঙ্গ মনের সঙ্গে যুঝি,

     সারাদিন চলেছে সন্ধান

          দুরূহের ব্যর্থ সমাধান।

       মনের ধূসর কূলে

প্রাণের জোয়ার মোরে একদিন দিয়ে গেছে তুলে।

    চারি দিকে তীক্ষ্ণ আলো ঝক্‌ঝক্‌ করে

          রিক্তরস উদ্দীপ্ত প্রহরে।

               ভাবি এই কথা--

     ওইখানে ঘনীভূত জনতার বিচিত্র তুচ্ছতা

       এলোমেলো আঘাতে সংঘাতে

নানা শব্দ নানা রূপ জাগিয়ে তুলিছে দিনরাতে।

     কিছু তার টেঁকে নাকো দীর্ঘকাল,

          মাটিগড়া মৃদঙ্গের তাল

              ছন্দটারে তার

          বদল করিছে বারংবার।

   তারি ধাক্কা পেয়ে মন

               ক্ষণে-ক্ষণ

          ব্যগ্র হয়ে ওঠে জাগি

     সর্বব্যাপী সামান্যের সচল স্পর্শের লাগি।

              আপনার উচ্চতট হতে

নামিতে পারে না সে যে সমস্তের ঘোলা গঙ্গাস্রোতে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

14
Verses
অনেককালের যাত্রা আমার
              অনেক দূরের পথে,
প্রথম বাহির হয়েছিলেম
             প্রথম-আলোর রথে।
গ্রহে তারায় বেঁকে বেঁকে
পথের চিহ্ন এলেম এঁকে
কত যে লোক-লোকান্তরের
    অরণ্যে পর্বতে।
সবার চেয়ে কাছে আসা
  সবার চেয়ে দূর।
বড়ো কঠিন সাধনা, যার
  বড়ো সহজ সুর।
পরের দ্বারে ফিরে, শেষে
আসে পথিক আপন দেশে-
বাহির-ভুবন ঘুরে মেলে
              অন্তরের ঠাকুর।
"এই যে তুমি" এই কথাটি
            বলব আমি ব'লে
কত দিকেই চোখ ফেরালেম
            কত পথেই চ'লে।
ভরিয়ে জগৎ লক্ষ ধারায়
"আছ-আছ"র স্রোত বহে যায়
"কই তুমি কই" এই কাঁদনের
              নয়ন-জলে গ'লে।
আরো দেখুন
23
Verses
II.40. tinwir sanjh ka gahira awai
THE SHADOWS of evening fall thick and deep, and the darkness of love envelops the body and the mind.
Open the window to the west, and be lost in the sky of love;
Drink the sweet honey that steeps the petals of the lotus of the heart.
Receive the waves in your body: what splendour is in the region of the sea!
Hark! the sounds of conches and bells are rising.
Kabir says: 'O brother, behold! the Lord is in this vessel of my body.'
আরো দেখুন
বুধু
Verses
               মাঠের শেষে গ্রাম,
                সাতপুরিয়া নাম।
     চাষের তেমন সুবিধা নেই কৃপণ মাটির গুণে,
     পঁয়ত্রিশ ঘর তাঁতির বসত, ব্যাবসা জাজিম বুনে।
     নদীর ধারে খুঁড়ে খুঁড়ে পলির মাটি খুঁজে
     গৃহস্থেরা ফসল করে কাঁকুড়ে তরমুজে
ঐখানেতে বালির ডাঙা, মাঠ করছে ধু ধু,
ঢিবির 'পরে বসে আছে গাঁয়ের মোড়াল বুধু।
     সামনে মাঠে ছাগল চরছে ক'টা--
     শুকনো জমি, নেইকো ঘাসের ঘটা।
কী যে ওরা পাচ্ছে খেতে ওরাই সেটা জানে,
     ছাগল ব'লেই বেঁচে আছে প্রাণে।
আকাশে আজ হিমের আভাস, ফ্যাকাশে তার নীল,
     অনেক দূরে যাচ্ছে উড়ে চিল।
হেমন্তের এই রোদ্‌দুরটা লাগছে অতি মিঠে,
ছোটো নাতি মোগ্‌লুটা তার জড়িয়ে আছে পিঠে।
স্পর্শপুলক লাগছে দেহে, মনে লাগছে ভয়--
              বেঁচে থাকলে হয়।
গুটি তিনটি মরে শেষে ঐটি সাধের নাতি,
              রাত্রিদিনের সাথি!
গোরুর গাড়ির ব্যাবসা বুধুর চলছে হেসে-খেলেই,
নাড়ি ছেঁড়ে এক পয়সা খরচ করতে গেলেই।
কৃপণ ব'লে গ্রামে গ্রামে বুধুর নিন্দে রটে,
সকালে কেউ নাম করে না উপোস পাছে ঘটে।
ওর যে কৃপণতা সে তো ঢেলে দেবার তরে,
যত কিছু জমাচ্ছে সব মোগ্‌লু নাতির 'পরে।
পয়সাটা তার বুকের রক্ত, কারণটা তার ঐ--
এক পয়সা আর কারো নয় ঐ ছেলেটার বই।
না খেয়ে, না প'রে, নিজের শোষণ ক'রে প্রাণ
যেটুকু রয় সেইটুকু ওর প্রতি দিনের দান।
দেব্‌তা পাছে ঈর্ষাভরে নেয় কেড়ে মোগ্‌লুকে,
              আঁকড়ে রাখে বুকে।
এখনো তাই নাম দেয়নি, ডাক নামেতেই ডাকে,
নাম ভাঁড়িয়ে ফাঁকি দেবে নিষ্ঠুর দেব্‌তাকে।
আরো দেখুন