আশার নৈরাশ্য (aashaar nairaashya)

       ওরে আশা, কেন তোর হেন দীনবেশ!

    নিরাশারই মতো যেন     বিষণ্ণ বদন কেন--

        যেন অতি সংগোপনে

        যেন অতি সন্তর্পণে

    অতি ভয়ে ভয়ে প্রাণে করিস প্রবেশ।

    ফিরিবি কি প্রবেশিবি ভাবিয়া না পাস,  

   কেন, আশা,কেন তোর কিসের তরাস।

   আজ আসিয়াছ দিতে যে সুখ-আশ্বাস,

নিজে তাহা কর না বিশ্বাস,

        তাই হেন মৃদু গতি,

       তাই উঠিতেছে ধীরে দুখের নিশ্বাস।

    বসিয়া মরমস্থলে     কহিছ চোখের জলে--

       "বুঝি হেন দিন রহিবে না,

       আজ যাবে, আসিবে তো কাল,

       দুঃখ যাবে, ঘুচিবে যাতনা।"

    কেন, আশা, মোরে কেন হেন প্রতারণা।

       দুঃখক্লেশে আমি কি ডরাই,

       আমি কি তাদেব চিনি নাই।

       তারা সবে আমারি কি নয়।

       তবে, আশা, কেন এত ভয়।

       তবে কেন বসি মোর পাশ

       মোরে, আশা, দিতেছ আশ্বাস।

       বলো, আশা, বসি মোর চিতে,

       "আরো দুঃখ  হইবে বহিতে,

  হৃদয়ের যে প্রদেশ         হয়েছিল ভস্মশেষ

       আর যারে হত না সহিতে,

       আবার নূতন প্রাণ পেয়ে

       সেও পুন থাকিবে দহিতে।

          করিয়ো না ভয়,

       দুঃখ-জ্বালা আমারি কি নয়?

       তবে কেন হেন ম্লান মুখ

       তবে কেন হেন দীন বেশ?

       তবে কেন এত ভয়ে ভয়ে

       এ হৃদয়ে করিস প্রবেশ?

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

আতঙ্ক
Verses
বটের জটায় বাঁধা ছায়াতলে
                       গোধূলিবেলায়
           বাগানের জীর্ণ পাঁচিলেতে
                       সাদাকালো দাগগুলো
                       দেখা দিত ভয়ংকর মূর্তি ধরে।
           ওইখানে দৈত্যপুরী,
                 অদৃশ্য কুঠুরি থেকে তার
      মনে-মনে শোনা যেত হাঁউমাউখাঁউ।
           লাঠি হাতে কুঁজোপিঠ
      খিলিখিলি হাসত ডাইনিবুড়ী।
                     কাশিরাম দাস
      পয়ারে যা লিখেছিল হিড়িম্বার কথা
           ইট-বের-করা সেই পাঁচিলের 'পরে
                    ছিল তারি প্রত্যক্ষ কাহিনী।
      তারি সঙ্গে সেইখানে নাককাটা সূর্পণখা
                 কালো কালো দাগে
                       করেছিল কুটুম্বিতা।
      সতেরো বৎসর পরে
           গিয়েছি সে সাবেক বাড়িতে।
                 দাগ বেড়ে গেছে,
      মুগ্ধ নতুনের তুলি পুরোনোকে দিয়েছে প্রশ্রয়।
      ইঁটগুলো মাঝে-মাঝে খসে গিয়ে
                 পড়ে আছে রাশকরা।
           গায়ে গায়ে লেগেছে অনন্তমূল,
                 কালমেঘ লতা,
                 বিছুটির ঝাড়;
           ভাঁটিগাছে হয়েছে জঙ্গল।
                 পুরোনো বটের পাশে
           উঠেছে ভেরেণ্ডাগাছ মস্তবড়ো হয়ে।
      বাইরেতে সূর্পণখা-হিড়িম্বার চিহ্নগুলো আছে,
           মনে তারা কোনোখানে নেই।
      স্টেশনে গেলেম ফিরে একবার খুব হেসে নিয়ে
                 জীবনের ভিত্তিটার গায়ে
                       পড়েছে বিস্তর কালো দাগ,
                 মূঢ় অতীতের মসীলেখা;
                       ভাঙা গাঁথুনিতে
           ভীরু কল্পনার যত জটিল কুটিল চিহ্নগুলো।
                       মাঝে-মাঝে
                 যেদিন বিকেলবেলা
                       বাদলের ছায়া নামে
                 সারি সারি তালগাছে
                       দিঘির পাড়িতে,
                    দূরের আকাশে
                 স্নিগ্ধ সুগম্ভীর
               মেঘের গর্জন ওঠে গুরুগুরু,
           ঝিঁ ঝিঁ ডাকে বুনো খেজুরের ঝোপে,
                 তখন দেশের দিকে চেয়ে
           বাঁকাচোরা আলোহীন পথে
                ভেঙেপড়া দেউলের মূর্তি দেখি;
                 দীর্ণ ছাদে, তার জীর্ণ ভিতে
                 নামহীন অবসাদ,-
           অনির্দিষ্ট শঙ্কাগুলো নিদ্রাহীন পেঁচা,
                 নৈরাশ্যের অলীক অত্যুক্তি যত,
             দুর্বলের স্বরচিত শত্রুর চেহারা।
                 ধিক্‌ রে ভাঙনলাগা মন,
      চিন্তায় চিন্তায় তোর কত মিথ্যা আঁচড় কেটেছে।
           দুষ্টগ্রহ সেজে ভয়
                 কালোচিহ্নে মুখভঙ্গি করে।
           কাঁটা-আগাছার মতো
                 অমঙ্গল নাম নিয়ে
                      আতঙ্কের জঙ্গল উঠেছে।
           চারিদিকে সারি সারি জীর্ণ ভিতে
           ভেঙেপড়া অতীতের বিরূপ বিকৃতি।
                 কাপুরুষে করিছে বিদ্রূপ।
আরো দেখুন
চাঞ্চল্য
Verses
      নিশ্বাস রুধে দু চক্ষু মুদে
           তাপসের মতো যেন
      স্তব্ধ ছিলি যে ওরে বনভূমি,
           চঞ্চল হলি কেন।
      হঠাৎ কেন রে দুলে ওঠে শাখা,
      যাবে না ধরায় আর ধরে রাখা,
      ঝট্‌পট্‌ করে হানে যেন পাখা
           খাঁচায় বনের পাখি।
      ওরে আমলকী, ওরে কদম্ব,
           কে তোদের গেল ডাকি।
               'ঐ যে ঈশানে উড়েছে নিশান,
                       বেজেছে বিষাণ বেগে--
           আমার বরষা কালো বরষা যে
                       ছুটে আসে কালো মেঘে।'
      ওরে নীলজল, অতল অটল
           ভরা ছিলি কূলে কূলে,
      হঠাৎ এমন শিহরি শিহরি
           উঠিলি কেন রে দুলে।
      তালতরুছায়া করে টলমল--
      কেন কলকল, কেন ছলছল--
      কী কথা বলিতে হলি চঞ্চল,
           ফুটিতে চাহে না বাক্‌--
      কাঁদিয়া হাসিয়া সাড়া দিতে চাস,
           কার শুনেছিস ডাক।
               'ঐ-যে আকাশে পুবের বাতাসে
                       উতলা উঠেছে জেগে--
               আজি মোর বর মোর কালো ঝড়
                       ছুটে আসে কালো মেঘে।'
      পরান আমার, রুধিয়া দুয়ার
           আপনার গৃহ-মাঝে
ছিলি এতদিন বিশ্রামহীন
           কী জানি কত কী কাজে।
      আজিকে হঠাৎ কী হল রে তোর,
      ভেঙে যেতে চায় বুকের পাঁজর,
      অকারণে বহে নয়নের লোর,
           কোথা যেতে চাস ছুটে।
      কে রে সে পাগল ভাঙিল আগল,
           কে দিল দুয়ার টুটে।
             'জানি না তো আমি কোথা হতে নামি
                    কী ঝড়ে আঘাত লেগে
             জীবন ভরিয়া মরণ হরিয়া
                    কে আসিছে কালো মেঘে।'
আরো দেখুন
36
Verses
আমার খোলা জানালাতে
শব্দবিহীন চরণপাতে
      কে এলে গো, কে গো তুমি এলে।
একলা আমি বসে আছি
অস্তলোকের কাছাকাছি
      পশ্চিমেতে দুটি নয়ন মেলে।
অতিসুদূর দীর্ঘ পথে
আকুল তব আঁচল হতে
      আঁধারতলে গন্ধরেখা রাখি
জোনাক-জ্বালা বনের শেষে
কখন এলে দুয়ারদেশে
      শিথিল কেশে ললাটখানি ঢাকি।
তোমার সাথে আমার পাশে
কত গ্রামের নিদ্রা আসে--
      পান্থবিহীন পথের বিজনতা,
ধূসর আলো কত মাঠের,
বধূশূন্য কত ঘাটের
      আঁধার কোণে জলের কলকথা।
শৈলতটের পায়ের 'পরে
তরঙ্গদল ঘুমিয়ে পড়ে,
      স্বপ্ন তারি আনলে বহন করি।
কত বনের শাখে শাখে
পাখির যে গান সুপ্ত থাকে
      এনেছ তাই মৌন নূপুর ভরি।
মোর ভালে ওই কোমল হস্ত
এনে দেয় গো সূর্য-অস্ত,
      এনে দেয় গো কাজের অবসান--
সত্যমিথ্যা ভালোমন্দ
সকল সমাপনের ছন্দ,
      সন্ধ্যানদীর নিঃশেষিত তান।
আঁচল তব উড়ে এসে
লাগে আমার বক্ষে কেশে,
      দেহ যেন মিলায় শূন্য'পরি,
চক্ষু তব মৃত্যুসম
স্তব্ধ আছে মুখে মম
      কালো আলোয় সর্বহৃদয় ভরি।
যেমনি তব দখিন-পাণি
তুলে নিল প্রদীপখানি,
      রেখে দিল আমার গৃহকোণে,
গৃহ আমার এক নিমেষে
ব্যাপ্ত হল তারার দেশে
      তিমিরতটে আলোর উপবনে।
আজি আমার ঘরের পাশে
গগনপারের কারা আসে
      অঙ্গ তাদের নীলাম্বরে ঢাকি।
আজি আমার দ্বারের কাছে
অনাদি রাত স্তব্ধ আছে
      তোমার পানে মেলি তাহার আঁখি।
এই মুহূর্তে আধেক ধরা
লয়ে তাহার আঁধার-ভরা
      কত বিরাম, কত গভীর প্রীতি,
আমার বাতায়নে এসে
দাঁড়ালো আজ দিনের শেষে--
      শোনায় তোমায় গুঞ্জরিত গীতি।
চক্ষে তব পলক নাহি,
ধ্রুবতারার দিকে চাহি
      তাকিয়ে আছ নিরুদ্দেশের পানে।
নীরব দুটি চরণ ফেলে
আঁধার হতে কে গো এলে
      আমার ঘরে আমার গীতে গানে।--
কত মাঠের শূন্যপথে,
কত পুরীর প্রান্ত হতে,
      কত সিন্ধুবালুর তীরে তীরে,
কত শান্ত নদীর পারে,
কত স্তব্ধ গ্রামের ধারে,
      কত সুপ্ত গৃহদুয়ার ফিরে,
কত বনের বায়ুর 'পরে
এলো চুলের আঘাত ক'রে
      আসিলে আজ হঠাৎ অকারণে।
বহু দেশের বহু দূরের
বহু দিনের বহু সুরের
      আনিলে গান আমার বাতায়নে।
আরো দেখুন