মরিয়া (moriya)

                   মেঘ কেটে গেল

                        আজি এ সকাল বেলায়।

                   হাসিমুখে এসো

                        অলস দিনেরি খেলায়।

               আশানিরাশার সঞ্চয় যত

                        সুখদুঃখেরে ঘেরে

               ভ'রে ছিল যাহা সার্থক আর

                        নিষ্ফল প্রণয়েরে,

               অকূলের পানে দিব তা ভাসায়ে      

                       ভাঁটার গাঙের ভেলায়।

                        যত বাঁধনের

                             গ্রন্থন দিব খুলে,

                        ক্ষণিকের তরে

                             রহিব সকল ভুলে।

                        যে গান হয় নি গাওয়া,

                        যে দান হয় নি পাওয়া

                   পুবেন হাওয়ায় পরিতাপ তার

                             উড়াইব অবহেলায়।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

রাজপুতানা
Verses
     এই ছবি রাজপুতানার;
  এ দেখি মৃত্যুর পৃষ্ঠে বেঁচে থাকিবার
            দুর্বিষহ বোঝা।
  হতবুদ্ধি অতীতের এই যেন খোঁজা
            পথভ্রষ্ট বর্তমানে অর্থ আপনার,
                     শূন্যেতে হারানো অধিকার।
  ঐ তার গিরিদুর্গে অবরুদ্ধ নিরর্থ ভ্রূকুটি
            ঐ তার জয়স্তম্ভ তোলে ক্রুদ্ধ মুঠি
                     বিরুদ্ধ ভাগ্যের পানে।
মৃত্যুতে করেছে গ্রাস তবুও যে মরিতে না জানে,
   ভোগ করে অসম্মান অকালের হাতে
                     দিনে রাতে,
                 অসাড় অন্তরে
            গ্লানি অনুভব নাহি করে,
আপনারি চাটুবাক্যে আপনারে ভুলায় আশ্বাসে--
                      জানে না সে,
         পরিপূর্ণ কত শতাব্দীর পণ্যরথ
              উত্তীর্ণ না হতে পথ
         ভগ্নচক্র পড়ে আছে মরুর প্রান্তরে,
ম্রিয়মাণ আলোকের প্রহরে প্রহরে
              বেড়িয়াছে অন্ধ বিভাবরী
    নাগপাশে; ভাষাভোলা ধূলির করুণা লাভ করি
              একমাত্র শান্তি তাহাদের।
    লঙ্ঘন যে করে নাই ভোলামনে কালের বাঁধের
                   অন্তিম নিষেধসীমা--
    ভগ্নস্তূপে থাকে তার নামহীন প্রচ্ছন্ন মহিমা;
                   জেগে থাকে কল্পনার ভিতে
    ইতিবৃত্তহারা তার ইতিহাস উদার ইঙ্গিতে।
কিন্তু এ নির্লজ্জ কারা! কালের উপেক্ষাদৃষ্টি-কাছে
              না থেকেও তবু আছে।
                   একি আত্মবিস্মরণমোহ,
    বীর্যহীন ভিত্তি-'পরে কেন রচে শূন্য সমারোহ।
         রাজ্যহীন সিংহাসনে অত্যুক্তির রাজা,
                       বিধাতার সাজা।
              
              হোথা যারা মাটি করে চাষ
         রৌদ্রবৃষ্টি শিরে ধরি বারো মাস,
              ওরা কভু আধামিথ্যা রূপে
           সত্যেরে তো হানে না বিদ্রূপে।
              ওরা আছে নিজ স্থান পেয়ে;
    দারিদ্র৻ের মূল্য বেশি লুপ্তমূল্য ঐশ্বর্যের চেয়ে।
এদিকে চাহিয়া দেখো টিটাগড়।
    লোষ্ট্রে লৌহে বন্দী হেথা কালবৈশাখীর পণ্যঝড়।
              বণিকের দম্ভে নাই বাধা,
    আসমুদ্র পৃথ্বীতলে দৃপ্ত তার অক্ষুণ্ন মর্যাদা।
         প্রয়োজন নাহি জানে ওরা
              ভূষণে সাজায়ে হাতিঘোড়া
    সম্মানের ভান করিবার,
      ভুলাইতে ছদ্মবেশী সমুচ্চ তুচ্ছতা আপনার।
    শেষের পংক্তিতে যবে থামিবে ওদের ভাগ্যলিখা,
              নামিবে অন্তিম যবনিকা,
       উত্তাল রজতপিণ্ড-উদ্ধারের শেষ হবে পালা,
            যন্ত্রের কিঙ্করগুলো নিয়ে ভস্মডালা
                   লুপ্ত হবে নেপথ্যে যখন,
  পশ্চাতে যাবে না রেখে প্রেতের প্রগল্‌ভ প্রহসন।
    উদাত্ত যুগের রথে বল্গাধরা সে রাজপুতানা
              মরুপ্রস্তরের স্তরে একদিন দিল মুষ্টি হানা;
        তুলিল উদ্ভেদ করি কলোল্লোলে মহা-ইতিহাস
প্রাণে উচ্ছ্বসিত, মৃত্যুতে ফেনিল; তারি তপ্তশ্বাস
         স্পর্শ দেয় মনে, রক্ত উঠে আবর্তিয়া বুকে--
                       সে যুগের সুদূর সম্মুখে
         স্তব্ধ হয়ে ভুলি এই কৃপণ কালের দৈন্যপাশে-
              জর্জরিত, নতশির অদৃষ্টের অট্টহাসে,
              গলবদ্ধ পশুশ্রেণীসম চলে দিন পরে দিন
                               লজ্জাহীন।
                       জীবনমৃত্যুর দ্বন্দ্ব-মাঝে
    সেদিন যে দুন্দুভি মন্দ্রিয়াছিল তার প্রতিধ্বনি বাজে
         প্রাণের কুহরে গুমরিয়া। নির্ভয় দুর্দান্ত খেলা,
    মনে হয়, সেই তো সহজ, দূরে নিক্ষেপিয়া ফেলা
আপনারে নিঃসংশয় নিষ্ঠুর সংকটে। তুচ্ছ প্রাণ
    নহে তো সহজ; মৃত্যুর বেদিতে যার কোনো দান
নাই কোনো কালে সেই তো দুর্ভর অতি,
    আপনার সঙ্গে নিত্য বাল্যপনা দুঃসহ দুর্গতি।
প্রচণ্ড সত্যেরে ভেঙে গল্পে রচে অলস কল্পনা
              নিষ্কর্মার স্বাদু উত্তেজনা,
    নাট্যমঞ্চে ব্যঙ্গ করি বীরসাজে
তারস্বর আস্ফালনে উন্মত্ততা করে কোন্‌ লাজে।
        তাই ভাবি হে রাজপুতানা,
     কেন তুমি মানিলে না যথাকালে প্রলয়ের মানা,
          লভিলে না বিনষ্টির শেষ স্বর্গলোক;
                   জনতার চোখ
                       দীপ্তিহীন
        কৌতুকের দৃষ্টিপাতে পলে পলে করে যে মলিন।
              শঙ্করের তৃতীয় নয়ন হতে
        সম্মান নিলে না কেন যুগান্তের বহ্নির আলোতে।
আরো দেখুন
অস্পষ্ট
Verses
আজি ফাল্গুনে দোলপূর্ণিমারাত্রি,
     উপছায়া-চলা বনে বনে মন
            আবছা পথের যাত্রী।
ঘুম-ভাঙানিয়া জোছনা--
     কোথা থেকে যেন আকাশে কে বলে,
            "একটুকু কাছে বোসো না।'
ফিস্‌ফিস্‌ করে পাতায় পাতায়,
          উস্‌খুস্‌ করে হাওয়া।
ছায়ার আড়ালে গন্ধরাজের
          তন্দ্রাজড়িত চাওয়া।
চন্দনিদহে থইথই জল
          ঝিক্‌ঝিক্‌ করে আলোতে,
জামরুলগাছে ফুলকাটা কাজে
          বুনুনি সাদায় কালোতে।
প্রহরে প্রহরে রাজার ফটকে
          বহুদূরে বাজে ঘণ্টা।
জেগে উঠে বসে ঠিকানা-হারানো
          শূন্য-উধাও মনটা।
বুঝিতে পারি নে কত কী শব্দ--
          মনে হয় যেন ধারণা,
রাতের বুকের ভিতরে কে করে
          অদৃশ্য পদচারণা।
গাছগুলো সব ঘুমে ডুবে আছে,
          তন্দ্রা তারায় তারায়,
কাছের পৃথিবী স্বপ্নপ্লাবনে
          দূরের প্রান্তে হারায়।
রাতের পৃথিবী ভেসে উঠিয়াছে
          বিধির নিশ্চেতনায়,
আভাস আপন ভাষার পরশ
          খোঁজে সেই আনমনায়।
রক্তের দোলে যে-সব বেদনা
          স্পষ্ট বোধের বাহিরে
ভাবনাপ্রবাহে বুদ্‌বুদ্‌ তারা,
          স্থির পরিচয় নাহি রে।
প্রভাত-আলোক আকাশে আকাশে
          এ চিত্র দিবে মুছিয়া,
পরিহাসে তব অবচেতনার
          বঞ্চনা যাবে ঘুচিয়া।
চেতনার জালে এ মহাগহনে
          বস্তু যা-কিছু টিঁকিবে,
সৃষ্টি তারেই স্বীকার করিয়া
          স্বাক্ষর তাহে লিখিবে।
তবু কিছু মোহ, কিছু কিছু ভুল
          জাগ্রত সেই প্রাপণার
প্রাণতন্তুতে রেখায় রেখায়
          রঙ রেখে যাবে আপনার।
এ জীবনে তাই রাত্রির দান
          দিনের রচনা জড়ায়ে
চিন্তা-কাজের ফাঁকে ফাঁকে সব
          রয়েছে ছড়ায়ে ছড়ায়ে।
বুদ্ধি যাহারে মিছে বলে হাসে
          সে যে সত্যের মূলে
আপন গোপন রসসঞ্চারে
          ভরিছে ফসলে ফুলে।
অর্থ পেরিয়ে নিরর্থ এসে
          ফেলিছে রঙিন ছায়া--
বাস্তব যত শিকল গড়িছে,
          খেলেনা গড়িছে মায়া।
আরো দেখুন
ঝড়
Verses
       অন্ধ কেবিন আলোয় আঁধার গোলা,
       বন্ধ বাতাস কিসের গন্ধে ঘোলা ।
  মুখ ধোবার ওই ব্যাপারখানা দাঁড়িয়ে আছে সোজা,
            ক্লান্ত চোখের বোঝা।
            দুলছে কাপড় সনফ এ
       বিজলি-পাখার হাওয়ার ঝাপট লেগে।
            গায়ে গায়ে ঘেঁষে
        জিনিসপত্র আছে কায়ক্লেশে।
            বিছানাটা কৃপণ-গতিকের
       অনিচ্ছাতে ক্ষণকালের সহায় পথিকের।
            ঘরে আছে যে-কটা আসবাব
       নিত্য যতই দেখি, ভাবি ওদের মুখের ভাব
            নারাজ ভৃত্যসম--
            পাশেই থাকে মম,
       কোনোমতে করে কেবল কাজ-চলা-গোছ সেবা।
এমন ঘরে আঠারো দিন থাকতে পারে কেবা।
       কষ্ট ব'লে একটা দানব ছোট্টো খাঁচায় পুরে
            নিয়ে চলে আমায় কত দূরে।
       নীল আকাশে নীল সাগরে অসীম আছে বসে,
            কী জানি কোন্‌ দোষে
          ঠেলেঠুলে চেপেচুপে মোরে
    সেখান হতে করেছে একঘরে।
       হেনকালে ক্ষুদ্র দুখের ক্ষুদ্র ফাটল বেয়ে
            কেমন করে এল হঠাৎ ধেয়ে
বিশ্বধরার বক্ষ হতে বিপুল দুখের প্রবল বন্যাধারা।
       এক নিমেষে আমারে সে করলে আত্মহারা,
            আনলে আপন বৃহৎ সান্ত্বনারে,
আনলে আপন গর্জনেতে ইন্দ্রলোকের অভয়-ঘোষণারে।
            মহাদেবের তপের জটা হতে
  মুক্তিমন্দাকিনী এল কূল-ডোবানো স্রোতে;
       বললে আমায় চিত্ত ঘিরে ঘিরে_
   ভস্ম আবার ফিরে পাবে জীবন-অগ্নিরে।
  বললে -- আমি সুরলোকের অশ্রুজলের দান,
মরুর পাথর গলিয়ে ফেলে ফলাই অমর প্রাণ,
      মৃত্যুজয়ের ডমরুরব শোনাই কলস্বরে,
মহাকালের তাণ্ডবতাল সদাই বাজাই উদ্দাম নির্ঝরে।
           স্বপ্নসম টুটে
  এই কেবিনের দেওয়াল গেল ছুটে।
           রোগশয্যা মম
  হল উদার কৈলাসেরই শৈলশিখর-সম।
           আমার মনপ্রাণ
      উঠল গেয়ে রুদ্রেরই জয়গান।
  সুপ্তির জড়িমাঘোরে
  তীরে থেকে তোরা ওরে
           করেছিস ভয়
  যে ঝড় সহসা কানে
  বজ্রের গর্জন আনে--
           "নয়, নয়, নয়।'
  তোরা বলেছিলি তাকে,
        "বাঁধিয়াছি ঘর।
  মিলেছে পাখির ডাকে
        তরুর মর্মর।
  পেয়েছি তৃষ্ণার জল,
  ফলেছে ক্ষুধার ফল,
ভাণ্ডারে হয়েছে ভরা লক্ষ্মীর সঞ্চয়।'
  ঝড়, বিদ্যুতের ছন্দে
  ডেকে ওঠে মেঘমন্দ্রে--
           "নয়, নয়, নয়।'
  সমুদ্রে আমার তরী;
  আসিয়াছি ছিন্ন করি
        তীরের আশ্রয়।
  ঝড় বন্ধু তাই কানে
  মাঙ্গল্যের মন্ত্র আনে--
        "জয়, জয়, জয়।'
  আমি-যে সে প্রচণ্ডেরে
        করেছি বিশ্বাস--
  তরীর পালে সে যে রে
        রুদ্রেরই নিশ্বাস।
  বলে সে বক্ষের কাছে,
  "আছে আছে, পার আছে,
সন্দেহবন্ধন ছিঁড়ি লহ পরিচয়।'
  বলে ঝড় অবিশ্রান্ত,
  "তুমি পান্থ, আমি পান্থ--
           জয়, জয়, জয়।'
  যায় ছিঁড়ে, যায় উড়ে--
  বলেছিলি মাথা খুঁড়ে,
        "এ দেখি প্রলয়।'
  ঝড় বলে,"ভয় নাই,
  যাহা দিতে পারো তাই
        রয়, রয়, রয়।'
চলেছি সম্মুখ-পানে
        চাহিব না পিছু।
  ভাসিল বন্যার টানে
        ছিল যত কিছু।
  রাখি যাহা তাই বোঝা--
  তারে খোওয়া, তারে খোঁজা,
নিত্যই গণনা তারে, তারি নিত্য ক্ষয়।
  ঝড় বলে, "এ তরঙ্গে
  যাহা ফেলে দাও রঙ্গে
        রয়, রয়, রয়।'
  এ মোর যাত্রীর বাঁশি
  ঝঞ্ঝার উদ্দাম হাসি
        নিয়ে গাঁথে সুর--
  বলে সে, "বাসনা-অন্ধ,
  নিশ্চলশৃঙ্খলবদ্ধ
        দূর, দূর, দূর।'
  গাহে, "পশ্চাতের কীর্তি,
        সম্মুখের আশা
  তার মধ্যে ফেঁদে ভিত্তি
        বাঁধিস নে বাসা।
  নে তোর মৃদঙ্গে শিখে
  তরঙ্গের ছন্দটিকে,
বৈরাগীর নৃত্যভঙ্গি চঞ্চল সিন্ধুর।
  যত লোভ-- যত শঙ্কা--
  দাসত্বের জয়ডঙ্কা
        দূর, দূর, দূর।'
  এসো গো ধ্বংসের নাড়া,
  পথভোলা, ঘরছাড়া,
        এসো গো দুর্জয়।
  ঝাপটি মৃত্যুর ডানা
  শূন্যে দিয়ে যাও হানা--
         "নয়, নয়, নয়।'
  আবেশের রসে মত্ত
             আরামশয্যায়
  বিজড়িত যে জড়ত্ব
        মজ্জায় মজ্জায়--
  কার্পণ্যের বন্ধ দ্বারে
  সংগ্রহের অন্ধকারে
   যে আত্মসংকোচ নিত্য গুপ্ত হয়ে রয়
  হানো তারে হে নিঃশঙ্ক,
  ঘোষুক তোমার শঙ্খ--
        "নয়, নয়, নয়।'
আরো দেখুন