দেওয়া-নেওয়া (deoya neoya)

বাদল দিনের প্রথম কদমফুল

          আমায় করেছ দান,

আমি তো দিয়েছি ভরা শ্রাবণের

          মেঘমল্লারগান।

সজল ছায়ার অন্ধকারে

          ঢাকিয়া তারে

এনেছি সুরের শ্যামল খেতের

          প্রথম সোনার ধান।

আজ এনে দিলে যাহা

          হয়তো দিবে না কাল,

রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল।

          স্মৃতিবন্যার উছল প্লাবনে

          আমার এ গান শ্রাবণে শ্রাবণে

          ফিরিয়া ফিরিয়া বাহিবে তরণী

                   ভরি তব সম্মান।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

ফাঁকি
Verses
বিনুর বয়স তেইশ তখন, রোগে ধরল তারে।
                   ওষুধে ডাক্তারে
               ব্যাধির চেয়ে আধি হল বড়ো;
নানা ছাপের জমল শিশি, নানা মাপের কৌটো হল জড়ো।
     বছর দেড়েক চিকিৎসাতে করলে যখন অস্থি জরজর
          তখন বললে, "হাওয়া বদল করো।"
     এই সুযোগে বিনু এবার চাপল প্রথম রেলের গাড়ি,
          বিয়ের পরে ছাড়ল প্রথম শ্বশুরবাড়ি।
          নিবিড় ঘন পরিবারের আড়ালে আবডালে
          মোদের হত দেখাশুনো ভাঙা লয়ের তালে;
                   মিলন ছিল ছাড়া ছাড়া,
        চাপা হাসি টুকরো কথার নানান জোড়াতাড়া।
আজকে হঠাৎ ধরিত্রী তার আকাশভরা সকল আলো ধরে
                   বরবধূরে নিলে বরণ করে।
          রোগা মুখের মস্ত বড়ো দুটি চোখে
     বিনুর যেন নতুন করে শুভদৃষ্টি হল নতুন লোকে।
               রেল-লাইনের ওপার থেকে
          কাঙাল যখন ফেরে ভিক্ষা হেঁকে,
               বিনু আপন বাক্স খুলে
          টাকা সিকে যা হাতে পায় তুলে
                   কাগজ দিয়ে মুড়ে
                   দেয় সে ছুঁড়ে ছুঁড়ে।
          সবার দুঃখ দূর না হলে পরে
আনন্দ তার আপনারি ভার বইবে কেমন করে।
     সংসারের ঐ ভাঙা ঘাটের কিনার হতে
আজ আমাদের ভাসান যেন চিরপ্রেমের স্রোতে,--
          তাই যেন আজ দানে ধ্যানে
     ভরতে হবে সে যাত্রাটি বিশ্বের কল্যাণে।
          বিনুর মনে জাগছে বারেবার
নিখিলে আজ একলা শুধু আমিই কেবল তার;
          কেউ কোথা নেই আর
     শ্বশুর ভাশুর সামনে পিছে ডাইনে বাঁয়ে;
     সেই কথাটা মনে ক'রে পুলক দিলক গাঁয়ে।
     বিলাসপুরের ইস্টেশনে বদল হবে গাড়ি;
                   তাড়াতাড়ি
     নামতে হল। ছ-ঘণ্টা কাল থামতে হবে যাত্রিশালায়,
          মনে হল এ এক বিষম বালাই।
          বিনু বললে, "কেন, এ তো বেশ।"
     তার মনে আজ নেই যে খুশির শেষ।
পথের বাঁশি পায়ে পায়ে তারে যে আজ করেছে চঞ্চলা,--
     আনন্দে তাই এক হল তার পৌঁছনো আর চলা।
          যাত্রিশালার দুয়ার খুলে আমায় বলে।--
          "দেখো, দেখো, এক্কাগাড়ি কেমন চলে।
     আর দেখছ বাছুরটি ঐ, আ মরে যাই, চিকন নধর দেহ,
          মায়ের চোখে কী সুগভীর স্নেহ।
          ঐ যেখানে দিঘির উঁচু পাড়ি,--
     শিশুগাছের তলাটিতে পাঁচিলঘেরা ছোট্ট বাড়ি
                   ঐ যে রেলের কাছে,--
ইস্টেশনের বাবু থাকে?--আহা ওরা কেমন সুখে আছে।"
     যাত্রীঘরে বিছানাটা দিলেম পেতে,
বলে দিলেম, "বিনু এবার চুপটি করে ঘুমোও আরামেতে।"
                   প্ল্যাটফরমে চেয়ার টেনে
পড়তে শুরু করে দিলেম ইংরেজি এক নভেল কিনে এনে।
          গেল কত মালের গাড়ি, গেল প্যাসেঞ্জার,
               ঘণ্টা তিনেক হয়ে গেল পার।
          এমন সময় যাত্রীদের দ্বারের কাছে        
     বাহির হয়ে বললে বিনু, "কথা একটা আছে।"
               ঘরে ঢুকে দেখি কে এক হিন্দুস্থানি মেয়ে
                   আমার মুখে চেয়ে
     সেলাম করে বাহির হয়ে রইল ধরে বারান্দাটার থাম।
                   বিনু বললে, "রুক্‌মিনী ওর নাম।
          ঐ যে হোথায় কুয়োর ধারে সারবাঁধা ঘরগুলি
          ঐখানে ওর বাসা আছে, স্বামী রেলের কুলি;
                   তেরো-স কোন্‌ সনে
          দেশে ওদের আকাল হল,--স্বামী-স্ত্রী দুইজনে
               পালিয়ে এল জমিদারের অত্যাচারে।
সাত বিঘে ওর জমি ছিল কোন্‌-এক গাঁয়ে কী-এক নদীর ধারে--"
                   বাধা দিয়ে আমি বললেম হেসে,
"রুক্‌মিনীর এই জীবনচরিত শেষ না হতেই গাড়ি পড়বে এসে।
          আমার মতে, একটু যদি সংক্ষেপেতে সার
               অধিক ক্ষতি হবে না তায় কারো।"
     বাঁকিয়ে ভুরু, পাকিয়ে চক্ষু,বিনু বললে ক্ষেপে--
               "কক্‌খোনো না, বলব না সংক্ষেপে।
আপিস যাবার তাড়া তো নেই, ভাবনা কিসের তবে।
          আগাগোড়া সব শুনতেই হবে।"
     নভেল-পড়া নেশাটুকু কোথায় গেল মিশে।
          রেলের কুলীর লম্বা কাহিনী সে
     বিস্তারিত শুনে গেলেম আমি।
আসল কথা শেষে ছিল, সেইটে  কিছু দামি।
          কুলীর মেয়ের বিয়ে হবে, তাই
                   পঁইচে তাবিজ বাজুবন্ধ গড়িয়ে দেওয়া চাই;
অনেক টেনেটুনে তবু পঁচিশ টাকা খরচ হবে তারি;
                   সে ভাবনাটা ভারি
          রুক্‌মিনীরে করেছে বিব্রত।
          তাই এবারের মতো
               আমার 'পরে ভার
          কুলী নারীর ভাবনা ঘোচাবার।
আজকে গাড়ি চড়ার আগে একেবারে থোকে
          পঁচিশ টাকা দিতেই হবে ওকে।
                   অবাক কান্ড এ কী।
          এমন কথা মানুষ শুনেছে কি।
জাতে হয়তো মেথর হবে, কিংবা নেহাত ওঁচা,
          যাত্রীঘরের করে ঝাড়ামোছা,
                   পঁচিশ টাকা দিতেই হবে তাকে!
এমন হলে দেউলে হতে কদিন বাকি থাকে।
          "আচ্ছা, আচ্ছা, হবে, হবে। আমি দেখছি মোট
                   এক-শ টাকার আছে একটা নোট,
          সেটা আবার ভাঙানো নেই!"
                   বিনু বললে, "এই
             ইস্টিশনেই ভাঙিয়ে নিলেই হবে।"
                             "আচ্ছা, দেব তবে"
এই বলে সেই মেয়েটাকে আড়ালেতে নিয়ে গেলেম ডেকে,--
          আচ্ছা করেই দিলেম তারে হেঁকে,--
     "কেমন তোমার নোকরি থাকে দেখব আমি!
প্যাসেঞ্জারকে ঠকিয়ে বেড়াও! ঘোচাব নষ্টামি!"
                   কেঁদে যখন পড়ল পায়ে ধরে
          দু-টাকা তার হাতে দিয়ে দিলেম বিদায় করে।
               জীবন-দেউল আঁধার করে নিবল হঠাৎ আলো।
                   ফিরে এলেম দু-মাস যেই ফুরাল।
                  বিলাসপুরে এবার যখন এলেম নামি,
                             একলা আমি।
                  শেষ নিমেষে নিয়ে আমার পায়ের ধূলি
               বিনু আমায় বলেছিল, "এ জীবনের যা-কিছু আর ভুলি
                   শেষ দুটি মাস অনন্তকাল মাথায় রবে মম
                  বৈকুণ্ঠেতে নারায়ণীর সিঁথের 'পরে নিত্য-সিঁদুর সম।
                             এই দুটি মাস সুধায় দিলে ভরে
                  বিদায় নিলেম সেই কথাটি স্মরণ করে।"
                   ওগো অন্তর্যামী,
                   বিনুরে আজ জানাতে চাই আমি
          সেই দু-মাসের অর্ঘ্যে আমার বিষম বাকি,
                   পঁচিশ টাকার ফাঁকি।
          দিই যদি আজ রুক্‌মিনীরে লক্ষ টাকা
               তবুও তো ভরবে না সেই ফাঁকা।
বিনু যে সেই দু-মাসটিরে নিয়ে গেছে আপন সাথে,
          জানল না তো ফাঁকিসুদ্ধ দিলেম তারি হাতে।
          বিলাসপুরে নেমে আমি শুধাই সবার কাছে
               "রুক্‌মিনী সে কোথায় আছে?"
                   প্রশ্ন শুনে অবাক মানে,--
               রুক্‌মিনী কে তাই বা ক-জন জানে।
          অনেক ভেবে "ঝামরু কুলির বউ" বললেম যেই,
          বললে সবে, "এখন তারা এখানে কেউ নেই।"
               শুধাই আমি, "কোথায় পাব তাকে।"
ইস্টেশনের বড়োবাবু রেগে বলেন, "সে খবর কে রাখে।"
          টিকিটবাবু বললে হেসে, "তারা মাসেক আগে
          গেছে চলে দার্জিলিঙে কিংবা খসরুবাগে,
                   কিংবা আরাকানে।"
          শুধাই যত, "ঠিকানা তার কেউ কি জানে।"--
তারা কেবল বিরক্ত হয়, তার ঠিকানায় কার কাছে কোন্‌ কাজ।
          কেমন করে বোঝাই আমি--ওগো আমার আজ
          সবার চেয়ে তুচ্ছ তারে সবার চেয়ে পরম প্রয়োজন;
          ফাঁকির বোঝা নামাতে মোর আছে সেই একজন।
                   "এই দুটি মাস সুধায় দিলে ভরে"
          বিনুর মুখে শেষ কথা সেই বইব কেমন করে।
                             রয়ে গেলেম দায়ী
                    মিথ্যা আমার হল চিরস্থায়ী।
আরো দেখুন
সম্ভাষণ
Verses
রোজই ডাকি তোমার নাম ধরে,
                     বলি "চারু'।
            হঠাৎ ইচ্ছা হল আর-কিছু বলি,
                        যাকে বলে সম্ভাষণ,
            যেমন বলত সত্যযুগের ভালোবাসায়।
              সব চেয়ে সহজ ডাক-- প্রিয়তমে।
            সেটা আবৃত্তি করেছি মনে মনে,
                        তার উত্তরে মনে-মনেই শুনেছি তোমার উচ্চহাসি।
                বুঝেছি, মন্দমধুর হাসি এ যুগের নয়;
                     এ যে নয় অবন্তী, নয় উজ্জয়িনী।
আটপহুরে নামটাতে দোষ কী হল
            এই তোমার প্রশ্ন।
                 বলি তবে।
                     কাজ ছিল না বেশি,
                 সকাল সকাল ফিরেছি বাসায়।
         হাতে বিকেলের খবরের কাগজ,
                 বসেছি বারান্দায়, রেলিঙে পা দুটো তোলা।
                     হঠাৎ চোখে পড়ল পাশের ঘরে
         তোমার বৈকালিকী সাজের ধারা।
                      বাঁধছিলে চুল আয়নার সামনে
            বেণী পাকিয়ে পাকিয়ে, কাঁটা বিঁধে বিঁধে।
         এমন মন দিয়ে দেখি নি তোমাকে অনেক দিন;
              দেখি নি এমন বাঁকা করে মাথা-হেলানো
                     চুল-বাঁধার কারিগরিতে,
                 এমন দুই হাতের মিতালি
                     চুড়িবালার ঠুনঠুনির তালে।
                 শেষে ওই ধানিরঙের আঁচলখানিতে
                      কোথাও কিছু ঢিল দিলে,
                        আঁট করলে কোথাও বা,
                 কোথাও একটু টেনে দিলে নীচের দিকে,
                   কবিরা যেমন ছন্দ বদল করে
                        একটু আধটু বাঁকিয়ে চুরিয়ে।
              আজ প্রথম আমার মনে হল
                   অল্প মজুরির দিন-চালানো
                        একটা মানুষের জন্যে
                   নিজেকে তো সাজিয়ে তুলছে
                        আমাদের ঘরের পুরোনো বউ
            দিনে দিনে নতুন-দাম দেওয়া রূপে।
এ তো নয় আমার আটপহুরে চারু।
                        ঠিক এমনি করেই দেখা দিত অন্যযুগের অবন্তিকা
            ভালোলাগার অপরূপবেশে
                   ভালোবাসার চকিত চোখে।
                        অমরুশতকের চৌপদীতে
            --শিখরিণীতে হোক, স্রগ্ধরায় হোক--
                 ওকে তো ঠিক মানাতো।
            সাজের ঘর থেকে বসবার ঘরে
              ওই যে আসছে অভিসারিকা,
            ও যেন কাছের কালে আসছে
                   দূরের কালের বাণী।
                        বাগানে গেলেম নেমে।
                   ঠিক করেছি আমিও আমার সোহাগকে দেব মর্যাদা
         শিল্পে-সাজিয়ে-তোলা মানপত্রে।
            যখন ডাকব তোমাকে ঘরে
                     সে হবে যেন আবাহনী।
                          সামনেই লতা ভরেছে সাদা ফুলে--
                          বিলিতি নাম, মনে থাকে না--
                               নাম দিয়েছি তারাঝরা;
                             রাতের বেলায় গন্ধ তার
                               ফুলবাগানের প্রলাপের মতো।
                   এবার সে ফুটেছে অকালে,
                               সবুর সয় নি শীত ফুরোবার।
                          এনেছি তার একটি গুচ্ছ,
                   তারও একটি সই থাকবে আমার নিবেদনে।
            আজ গোধূলিলগ্নে তুমি ক্লাসিক যুগের চারুপ্রভা,
                 আমি ক্লাসিকযুগের অজিতকুমার।
                     দুটি কথা আজ বলব আমি,
সাজানো কথা--
                          হাসতে হয় হেসো।
                        সে কথা মনে মনে গড়ে তুলেছি
            যেমন করে তুমি জড়িয়ে তুলেছ তোমার খোঁপা।
                      বলব, "প্রিয়ে, এই পরদেশী ফুলের মঞ্জরী
         আকাশে চেয়ে খুঁজছিল বসন্তের রাত্রি,
              এনেছি আমি তাকে দয়া করে
                   তোমার ওই কালো চুলে।"
আরো দেখুন
108
Verses
রৌদ্রী তপস্যার তাপে জ্বলন্ত বৈশাখে
মোর জন্ম রবিদৌত্যে যদি এনে থাকে
      নব আলোকের লিপিখানি
            সে মোর সৌভাগ্য বলে জানি।
আরো দেখুন