জরতী (joroti)

হে জরতী,

           অন্তরে আমার

                 দেখেছি তোমার ছবি।

   অবসানরজনীতে দীপবর্তিকার

           স্থিরশিখা আলোকের আভা

               অধরে ললাটে -- শুভ্র কেশে।

   দিগন্তে প্রণামনত শান্ত-আলো প্রত্যুষের তারা

                 মুক্ত বাতায়ন থেকে

           পড়েছে নিমেষহীন নয়নে তোমার।

                 সন্ধ্যাবেলা

           মল্লিকার মালা ছিল গলে

               গন্ধ তার ক্ষীণ হয়ে

                 বাতাসকে করুণ করেছে --

      উৎসবশেষের যেন অবসন্ন অঙ্গুলির

                 বীণাগুঞ্জরণ।

              শিশিরমন্থর বায়ু,

           অশথের শাখা অকম্পিত।

      অদূরে নদীর শীর্ণ স্বচ্ছ ধারা কলশব্দহীন,

           বালুতটপ্রান্তে চলে ধীরে

                 শূন্যগৃহ-পানে

      ক্লান্তগতি বিরহিণী বধূর মতন।

      হে জরতী মহাশ্বেতা,

      দেখেছি তোমাকে

      জীবনের শারদ অম্বরে

      বৃষ্টিরিক্ত শুচিশুক্ল লঘু স্বচ্ছ মেঘে।

           নিয়ে শস্যে ভরা খেত দিকে দিকে,

                   নদী ভরা কূলে কূলে,

           পূর্ণতার স্তব্ধতায় বসুন্ধরা স্নিগ্ধ সুগম্ভীর।

      হে জরতী, দেখেছি তোমাকে

           সত্তার অন্তিম তটে,

                 যেখানে কালের কোলাহল

                প্রতিক্ষণে ডুবিছে অতলে।

                নিস্তরঙ্গ সেই সিন্ধুনীরে

                       তীর্থস্নান ক'রি

      রাত্রির নিকষকৃষ্ণ শিলাবেদিমূলে

                 এলোচুলে করিছ প্রণাম

                       পরিপূর্ণ সমাপ্তিরে।

      চঞ্চলের অন্তরালে অচঞ্চল যে শান্ত মহিমা

                 চিরন্তন,

              চরম প্রসাদ তার

           নামিল তোমার নম্র শিরে

        মানসসরোবরের অগাধ সলিলে

                 অস্তগত তপনের সর্বশেষ আলোর মতন।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

প্রবীণ
Verses
বিশ্বজগৎ যখন করে কাজ
স্পর্ধা ক'রে পরে ছুটির সাজ।
আকাশে তার আলোর ঘোড়া চলে,
কৃতিত্বেরে লুকিয়ে রাখে পরিহাসের ছলে।
বনের তলে গাছে গাছে শ্যামল রূপের মেলা,
ফুলে ফলে নানান্‌ রঙে নিত্য নতুন খেলা।
বাহির হতে কে জানতে পায়, শান্ত আকাশতলে
প্রাণ বাঁচাবার কঠিন কর্মে নিত্য লড়াই চলে।
চেষ্টা যখন নগ্ন হয়ে শাখায় পড়ে ধরা,
তখন খেলার রূপ চলে যায়, তখন আসে জরা।
বিলাসী নয় মেঘগুলো তো জলের ভারে ভরা,
চেহারা তার বিলাসিতার রঙের ভূষণ পরা।
বাইরে ওরা বুড়োমিকে দেয় না তো প্রশ্রয়--
অন্তরে তাই চিরন্তনের বজ্রমন্দ্র রয়।
জল-ঝরানো ছেলেখেলা যেমনি বন্ধ করে
ফ্যাকাশে হয় চেহারা তার, বয়স তাকে ধরে।
দেহের মাঝে হাজার কাজে বহে প্রাণের বায়ু--
পালের তরীর মতন যেন ছুটিয়ে চলে আয়ু,
বুকের মধ্যে জাগায় নাচন, কণ্ঠে লাগায় সুর,
সকল অঙ্গ অকারণে উৎসাহে ভরপুর।
রক্তে যখন ফুরোবে ওর খেলার নেশা খোঁজা
তখনি কাজ অচল হবে, বয়স হবে বোঝা।
ওগো তুমি কী করছ, ভাই, স্তব্ধ সারাক্ষণ--
বুদ্ধি তোমার আড়ষ্ট যে, ঝিমিয়ে-পড়া মন।
নবীন বয়স যেই পেরোল খেলাঘরের দ্বারে
মরচে-পড়া লাগল তালা, বন্ধ একেবারে।
ভালোমন্দ বিচারগুলো খোঁটায় যেন পোঁতা।
আপন মনের তলায় তুমি তলিয়ে গেলে কোথা।
চলার পথে আগল দিয়ে বসে আছ স্থির--
বাইরে এসো, বাইরে এসো, পরমগম্ভীর।
কেবলই কি প্রবীণ তুমি, নবীন নও কি তাও।
দিনে দিনে ছি ছি কেবল বুড়ো হয়েই যাও।
আশি বছর বয়স হবে ওই যে পিপুলগাছ,
এ আশ্বিনের রোদ্‌দুরে ওর দেখলে বিপুল নাচ?
পাতায় পাতায় আবোল-তাবোল, শাখায় দোলাদুলি,
পান্থ হাওয়ার সঙ্গে ও চায় করতে কোলাকুলি।
ওগো প্রবীণ, চলো এবার সকল কাজের শেষে
নবীন হাসি মুখে নিয়ে চরম খেলার বেশে।
আরো দেখুন
18
Verses
নিরুদ্দেশ
শ্রীমান দিলীপকুমারের উদ্দেশে--
                      বহুদিন কেন তব সহাস্য
                      দেখি নি অমল কমল আস্য,
                            তব মুখ হতে স্বরসুধাস্রোতে
                                শুনি নি সরস ভাবের ভাষ্য!
                      কেন যে তোমার এ ঔদাস্য
                            অবশ্য ক'রে লিখো লিখো মোরে
                                 কারণটা যদি হয় প্রকাশ্য।
                      সুহৃজ্জনের বিস্মরণের--
                      মন হতে তারে নিঃসারণের--
                             চর্চায় আজি হলে তুমি রাজি
                                এ কথা নেহাত অবিশ্বাস্য।
ইতি
আরো দেখুন
নারীপ্রগতি
Verses
শুনেছিনু নাকি মোটরের তেল
পথের মাঝেই করেছিল ফেল,
তবু তুমি গাড়ি ধরেছ দৌড়ে--
হেন বীরনারী আছে কি গৌড়ে।
নারীপ্রগতির মহাদিনে আজি
নারীপদগতি জিনিল এ বাজি।
হায় কালিদাস, হায় ভবভূতি,
এই গতি আর এই-সব জুতি
তোমাদের গজগামিনীর দিনে
কবিকল্পনা নেয় নি তো চিনে;
কেনে নি ইস্‌টিশনের টিকেট;
হৃদয়ক্ষেত্রে খেলে নি ক্রিকেট;
চণ্ড বেগের ডাণ্ডাগোলায়--
তারা তো মন্দ-মধুর দোলায়
শান্ত মিলন-বিরহ-বন্ধে
বেঁধেছিল মন শিথিল ছন্দে।
রেলগাড়ি আর মোটরের যুগে
বহু অপঘাত চলিয়াছি ভুগে--
তাহারি মধ্যে এল সম্প্রতি
এ দুঃসাহস, এ তড়িৎগতি;
পুরুষেরে দিল দুর্দাম তাড়া,
দুর্বার তেজে নিষ্ঠুর নাড়া।
ভূকম্পনের বিগ্রহবতী
প্রলয়ধাতার নিগ্রহ অতি
বহন করিয়া এসেছে বঙ্গে
পাদুকামুখর চরণভঙ্গে।
সে ধ্বনি শুনিয়া পরলোকে বসি,
কবি কালিদাস, পড়িল কি খসি
উষ্ণীষ তব; দুরুদুরু বুকে
ছন্দ কিছু কি জুটিয়াছে মুখে।
একটি প্রশ্ন শুধাব এবার--
অকপটে তারি জবাব দেবার
আগে একবার ভেবে দেখো মনে,
উত্তর পেলে রাখিব গোপনে--
স্নিগ্ধচ্ছায়া ছিলে যে অতীতে
তেয়াগিয়া তাহা তড়িৎগতিতে
নিতে চাও কভু তীব্রভাষণ
আধুনিকাদের কবির আসন?
মেঘদূত ছেড়ে বিদ্যুৎ-দূত
লিখিতে পাবে কি ভাষা মজবুত।
আরো দেখুন