বর্ষশেষ (borshoshesh)

যাত্রা হয়ে আসে সারা, - আয়ুর পশ্চিমপথশেষে

                 ঘনায় মৃত্যুর ছায়া এসে।

      অস্তসূর্য আপনার দাক্ষিণ্যের শেষ বন্ধ টুটি

                ছড়ায় ঐশ্বর্য তার ভরি দুই মুঠি।

বর্ণসমারোহে দীপ্ত মরণের দিগন্তের সীমা,

          জীবনের হেরিনু মহিমা।

এই শেষ কথা নিয়ে নিশ্বাস আমার যাবে থামি--

          কত ভালোবেসেছিনু আমি।

অনন্ত রহস্য তারি উচ্ছলি আপন চারি ধার

          জীবন মৃত্যুরে দিল করি একাকার;

বেদনার পাত্র মোর বারম্বার দিবসে নিশীথে

          ভরি দিল অপূর্ব অমৃতে।

দুঃখের দুর্গম পথে তীর্থযাত্রা করেছি একাকী,

          হানিয়াছে দারুণ বৈশাখী।

কত দিন সঙ্গীহীন, কত রাত্রি দীপালোকহারা,

          তারি মাঝে অন্তরেতে পেয়েছি ইশারা।

নিন্দার কণ্টকমাল্যে বক্ষ বিঁধিয়াছে বারে বারে,

          বরমাল্য জানিয়াছি তারে।

আলোকিত ভুবনের মুখপানে চেয়ে নির্নিমেষ

          বিস্ময়ের পাই নাই শেষ।

যে লক্ষ্মী আছেন নিত্য মাধুরীর পদ্ম-উপবনে,

          পেয়েছি তাঁহার স্পর্শ সর্ব অঙ্গে-মনে।

যে-নিশ্বাস তরঙ্গিত নিখিলের অশ্রুতে হাসিতে,

          তারে আমি ধরেছি বাঁশিতে।

যাঁহারা মানুষরূপে দৈববাণী অনির্বচনীয়

           তাঁহাদের জেনেছি আত্মীয়।

কতবার পরাভব, কতবার কত লজ্জা ভয়,

          তবু কণ্ঠে ধ্বনিয়াছে অসীমের জয়।

অসম্পূর্ণ সাধনায় ক্ষণে ক্ষণে ক্রন্দিত আত্মার

          খুলে গেছে অবরুদ্ধ দ্বার।

লভিয়াছি জীবলোকে মানবজন্মের অধিকার,

          ধন্য এই সৌভাগ্য আমার।

যেথা যে অমৃতধারা উৎসারিল যুগে যুগান্তরে

          জ্ঞানে কর্মে ভাবে, জানি সে আমারি তরে।

পূর্ণের যে কোনো ছবি মোর প্রাণে উঠেছে উজ্জ্বলি

          জানি তাহা সকলের বলি।

ধূলির আসনে বসি ভূমারে দেখেছি ধ্যানচোখে

          আলোকের অতীত আলোকে।

অণু হতে অণীয়ান মহৎ হইতে মহীয়ান,

          ইন্দ্রিয়ের পারে তার পেয়েছি সন্ধান।

ক্ষণে ক্ষণে দেখিয়াছি দেহের ভেদিয়া যবনিকা

          অনির্বাণ দীপ্তিময়ী শিখা।

যেখানেই যে-তপস্বী করেছে দুষ্কর যজ্ঞযাগ,

          আমি তার লভিয়াছি ভাগ।

মোহবন্ধমুক্ত যিনি আপনারে করেছেন জয়,

          তাঁর মাঝে পেয়েছি আমার পরিচয়।

যেখানে নিঃশঙ্ক বীর মৃত্যুরে লঙ্ঘিল অনায়াসে,

          স্থান মোর সেই ইতিহাসে।

শ্রেষ্ঠ হতে শ্রেষ্ঠ যিনি, যতবার ভুলি কেন নাম,

          তবু তাঁরে করেছি প্রণাম।

অন্তরে লেগেছে মোর স্তব্ধ আকাশের  আশীর্বাদ;

          উষালোকে আনন্দের পেয়েছি প্রসাদ।

এ আশ্চর্য বিশ্বলোকে জীবনের বিচিত্র গৌরবে

          মৃত্যু মোর পরিপূর্ণ হবে।

আজি এই বৎসরের বিদায়ের শেষ আয়োজন--

           মৃত্যু, তুমি ঘুচাও গুণ্ঠন।

কত কী গিয়েছে ঝরে-- জানি জানি, কত স্নেহ প্রীতি

          নিবায়ে গিয়েছে দীপ, রাখে নাই স্মৃতি।

মৃত্যু, তব হাত পূর্ণ জীবনের মৃত্যুহীন ক্ষণে,

          ওগো শেষ, অশেষের ধনে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

মুদিত আলোর কমল-কলিকাটিরে
Verses
          মুদিত আলোর কমল-কলিকাটিরে
                রেখেছে সন্ধ্যা আঁধার-পর্ণপুটে
          উতরিবে যবে নব-প্রভাতের তীরে
                তরুণ কমল আপনি উঠিবে ফুটে।
উদয়াচলের সে তীর্থপথে আমি
চলেছি একেলা সন্ধ্যার অনুগামী,
                দিনান্ত মোর দিগন্তে পড়ে লুটে।
            সেই প্রভাতের স্নিগ্ধ সুদূর গন্ধ
                  আঁধার বাহিয়া রহিয়া রহিয়া আসে।
            আকাশে যে গান ঘুমাইছে নিঃস্পন্দ
                  তারাদীপগুলি কাঁপিছে তাহারি শ্বাসে।
  অন্ধকারের বিপুল গভীর আশা,
  অন্ধকারের ধ্যাননিমগ্ন ভাষা
                  বাণী খুঁজে ফিরে আমার চিত্তাকাশে।
            জীবনের পথ দিনের প্রান্তে এসে
                  নিশীথের পানে গহনে হয়েছে হারা।
            অঙ্গুলি তুলি তারাগুলি অনিমেষে
                  মাভৈঃ বলিয়া নীরবে দিতেছে সাড়া।
  ম্লান দিবসের শেষের কুসুম তুলে
  এ কূল হইতে নবজীবনের কূলে
                  চলেছি আমার যাত্রা করিতে সারা।
            হে মোর সন্ধ্যা, যাহা-কিছু ছিল সাথে
                  রাখিনু তোমার অঞ্চলতলে ঢাকি।
            আঁধারের সাথি, তোমার করুণ হাতে
                  বাঁধিয়া দিলাম আমার হাতের রাখি।
  কত যে প্রাতের আশা ও রাতের গীতি,
  কত যে সুখের স্মৃতি ও দুখের প্রীতি--
                  বিদায়বেলায় আজিও রহিল বাকি।
                  যা-কিছু পেয়েছি, যাহা-কিছু গেল চুকে,
                        চলিতে চলিতে পিছে যা রহিল পড়ে,
                  যে মণি দুলিল যে ব্যথা বিঁধিল বুকে,
                        ছায়া হয়ে যাহা মিলায় দিগন্তরে--
  জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা--
  ধুলায় তাদের যত হোক অবহেলা,
                        পূর্ণের পদ-পরশ তাদের 'পরে।
আরো দেখুন
পর-বিচারে গৃহভেদ
Verses
আম্র কহে, এক দিন, হে মাকাল ভাই,
আছিনু বনের মধ্যে সমান সবাই--
মানুষ লইয়া এল আপনার রুচি,
মূল্যভেদ শুরু হল, সাম্য গেল ঘুচি।
আরো দেখুন
126
Verses
      স্বর্গের চোখের জলে
               ঝরে পড়ে বৃষ্টি--
      হাজার হাজার হাসি
               মর্ত্যে করে সৃষ্টি।
আরো দেখুন