তিন বছরের বিরহিণী জানলাখানি ধরে কোন্ অলক্ষ্য তারার পানে তাকাও অমন করে। অতীত কালের বোঝার তলায় আমরা চাপা থাকি, ভাবী কালের প্রদোষ-আলোয় মগ্ন তোমার আঁখি। তাই তোমার ওই কাঁদন-হাসির সবটা বুঝি না যে, স্বপন দেখে অনাগত তোমার প্রাণের মাঝে। কোন্ সাগরের তীর দেখেছ জানে না তো কেউ, হাসির আভায় নাচে সে কোন্ সুদূর অশ্রু-ঢেউ। সেখানে কোন্ রাজপুত্তুর চিরদিনের দেশে তোমার লাগি সাজতে গেছে প্রতিদিনের বেশে। সেখানে সে বাজায় বাঁশি রূপকথারই ছায়ে, সেই রাগিণীর তালে তোমার নাচন লাগে গায়ে। আপনি তুমি জানো না তো আছ কাহার আশায়, অনামারে ডাক দিয়েছ চোখের নীরব ভাষায়। হয়তো সে কোন্ সকালবেলা শিশির-ঝলা পথে জাগরণের কেতন তুলে আসবে সোনার রথে, কিম্বা পূর্ণ চাঁদের লগ্নে, বৃহস্পতির দশায়-- দুঃখ আমার, আর সে যে হোক, নয় সে দাদামশায়।
চতুর্দিকে বহ্নিবাষ্প শূন্যাকাশে ধায় বহুদূরে, কেন্দ্রে তার তারাপুঞ্জ মহাকাল-চক্ররথে ঘুরে। কত বেগ, কত তাপ, কত ভার, কত আয়তন, সূক্ষ্ম অঙ্কে করেছে গণন পণ্ডিতেরা লক্ষ কোটি ক্রোশ দূর হতে দুর্লক্ষ্য আলোতে। আপনার পানে চাই, লেশমাত্র পরিচয় নাই। এ কি কোনো দৃশ্যাতীত জ্যোতি। কোন্ অজানারে ঘিরি এই অজানার নিত্য গতি। বহুযুগে বহুদূরে স্মৃতি আর বিস্মৃতি-বিস্তার, যেন বাষ্পপরিবেশ তার ইতিহাসে পিণ্ড বাঁধে রূপে রূপান্তরে। "আমি' উঠে ঘনাইয়া কেন্দ্র-মাঝে অসংখ্য বৎসরে। সুখদুঃখ ভালোমন্দ রাগদ্বেষ ভক্তি সখ্য স্নেহ এই নিয়ে গড়া তার সত্তাদেহ; এরা সব উপাদান ধাক্কা পায়, হয় আবর্তিত, পুঞ্জিত, নর্তিত। এরা সত্য কী যে বুঝি নাই নিজে। বলি তারে মায়া-- যাই বলি শব্দ সেটা, অব্যক্ত অর্থের উপচ্ছায়া। তার পরে ভাবি, এ অজ্ঞেয় সৃষ্টি "আমি' অজ্ঞেয় অদৃশ্যে যাবে নাবি। অসীম রহস্য নিয়ে মুহূর্তের নিরর্থকতায় লুপ্ত হবে নানারঙা জলবিম্বপ্রায়, অসমাপ্ত রেখে যাবে তার শেষকথা আত্মার বারতা। তখনো সুদূরে ঐ নক্ষত্রের দূত ছুটাবে অসংখ্য তার দীপ্ত পরমাণুর বিদ্যুৎ অপার আকাশ-মাঝে, কিছুই জানি না কোন্ কাজে। বাজিতে থাকিবে শূন্যে প্রশ্নের সুতীব্র আর্তস্বর, ধ্বনিবে না কোনোই উত্তর।