১০৬ (he mor chitto punyo tirthe)

       হে মোর চিত্ত,পূণ্য তীর্থে

              জাগো রে ধীরে--

       এই ভারতের মহামানবের

              সাগরতীরে।

                    হেথায় দাঁড়ায়ে দু-বাহু বাড়ায়ে

                           নমি নর-দেবতারে,

                    উদার ছন্দে পরমানন্দে

                           বন্দন করি তাঁরে।

         ধ্যান-গম্ভীর এই যে ভূধর,

         নদীজপমালাধৃত প্রান্তর,

         হেথায় নিত্য হেরো পবিত্র

              ধরিত্রীরে

         এই ভারতের মহামানবের

              সাগরতীরে।

 

              কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে

                    কত মানুষের ধারা

              দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে

                    সমুদ্রে হল হারা।

                           হেথায় আর্য, হেথা অনার্য

                           হেথায় দ্রাবিড়, চীন--

                           শক-হুন-দল পাঠান মোগল

                                  এক দেহে হল লীন।

                   পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার,

                   সেথা হতে সবে আনে উপহার,

                   দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে

                           যাবে না ফিরে,

                    এই ভারতের মহামানবের

                           সাগরতীরে।

 

              রণধারা বাহি জয়গান গাহি

                    উন্মাদ কলরবে

              ভেদি মরুপথ গিরিপর্বত

                    যারা এসেছিল সবে,

                           তারা মোর মাঝে সবাই বিরাজে

                                  কেহ নহে নহে দূর,

                           আমার শোণিতে রয়েছে ধ্বনিতে

                                  তারি বিচিত্র সুর।

                    হে রুদ্রবীণা, বাজো, বাজো, বাজো,

                    ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজো,

                    বন্ধ নাশিবে, তারাও আসিবে

                           দাঁড়াবে ঘিরে

                    এই ভারতের মহামানবের

                           সাগরতীরে।

 

হেথা একদিন বিরামবিহীন

              মহা ওংকারধ্বনি,

       হৃদয়তন্ত্রে একের মন্ত্রে

              উঠেছিল রনরনি।

                    তপস্যাবলে একের অনলে

                           বহুরে আহুতি দিয়া

                    বিভেদ ভুলিল, জাগায়ে তুলিল

                           একটি বিরাট হিয়া।

              সেই সাধনার সে আরাধনার

              যজ্ঞশালায় খোলা আজি দ্বার,

              হেথায় সবারে হবে মিলিবারে

                    আনতশিরে--

             এই ভারতের মহামানবের

                    সাগরতীরে।

 

       সেই হোমানলে হেরো আজি জ্বলে

              দুখের রক্ত শিখা,

       হবে তা সহিতে মর্মে দহিতে

              আছে সে ভাগ্যে লিখা।

                    এ দুখ বহন করো মোর মন,

                           শোনো রে একের ডাক।

                    যত লাজ ভয় করো করো জয়

                           অপমান দূরে থাক।

              দুঃসহ ব্যথা হয়ে অবসান

              জন্ম লভিবে কী বিশাল প্রাণ।

              পোহায় রজনী, জাগিছে জননী

                    বিপুল নীড়ে,

              এই ভারতের মহামানবের

                    সাগরতীরে।

 

       এসো হে আর্য, এসো অনার্য,

              হিন্দু মুসলমান।

       এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ,

              এসো এসো খৃস্টান।

                   এসো ব্রাহ্মণ শুচি করি মন

                    ধরো হাত সবাকার,

                   এসো হে পতিত করো অপনীত

                    সব অপমানভার।

              মার অভিষেকে এসো এসো ত্বরা

              মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা,

              সবারে-পরশে-পবিত্র-করা

                    তীর্থনীরে।

              আজি ভারতের মহামানবের

                    সাগরতীরে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সন্ধ্যা
Verses
  
অয়ি সন্ধ্যে,
    অনন্ত আকাশতলে বসি একাকিনী,
          কেশ এলাইয়া
    মৃদু মৃদু ও কী কথা   কহিস আপন মনে
          গান গেয়ে গেয়ে,
        নিখিলের মুখপানে চেয়ে।
    প্রতিদিন শুনিয়াছি, আজও তোর কথা
          নারিনু বুঝিতে।
    প্রতিদিন শুনিয়াছি,  আজও তোর গান
          নারিনু শিখিতে।
        চোখে লাগে ঘুমঘোর,  
        প্রাণ শুধু ভাবে হয় ভোর।
      হৃদয়ের অতিদূর দূর দূরান্তরে
      মিলাইয়া কণ্ঠস্বর তোর কন্ঠস্বরে
          উদাসী প্রবাসী যেন
      তোর সাথে তোরি গান করে।
    
    অয়ি সন্ধ্যা, তোরি যেন স্বদেশের প্রতিবেশী
       তোরি যেন আপনার ভাই
    প্রাণের প্রবাসে মোর দিশা হারাইয়া
          বেড়ায় সদাই।
          শোনে যেন স্বদেশের গান,
          দূর হতে কার পায় সাড়া
          খুলে দেয় প্রাণ।
          যেন কী পুরোনো স্মৃতি
          জাগিয়া উঠে রে ওই গানে।
          ওই তারকার মাঝে  যেন তার গৃহ ছিল,
          হাসিত কাঁদিত ওইখানে।
          আর বার ফিরে যেতে চায়
          পথ তবু খুঁজি না পায়।
    কত-না পুরানো কথা, কত-না হারানো গান,
           কত না প্রাণের দীর্ঘশ্বাস,  
   শরমের  আধো হাসি,      সোহাগের আধো বাণী,
          প্রণয়ের আধো মৃদু ভাষ,
          সন্ধ্যা, তোর ওই অন্ধকারে
          হারাইয়া গেছে একেবারে।
          পূর্ণ করি অন্ধকার তোর
          তারা সবে ভাসিয়া বেড়ায়
          যুগান্তের প্রশান্ত হৃদয়ে
          ভাঙাচোরা জগতের প্রায়।
    যবে এই নদীতীরে        বসি তোর পদতলে
          তারা সবে দলে দলে আসে  
          প্রাণেরে ঘেরিয়া চারি পাশে;
    হয়তো একটি হাসি       একটি আধেক হাসি
          সমুখেতে ভাসিয়া বেড়ায়,
          কভু ফোটে কভু বা মিলায়।
    আজি আসিয়াছি সন্ধ্যা, বসি তোর অন্ধকারে
             মুদিয়া নয়ন
    সাধ গেছে গাহিবারে--মৃদু  স্বরে শুনাবারে
             দু-চারিটি গান।
    যেথায় পুরোনো গান      যেথায় হারানো হাসি
             যেথা আছে বিস্মৃত স্বপন
    সেইখানে সযতনে        রেখে দিস গানগুলি,
             রচে দিস সমাধিশয়ন।
             জানি সন্ধ্যা, জানি তোর স্নেহ,
             গোপনে ঢাকিবি তার দেহ
    বসিয়া সমাধি-'পরে      নিষ্ঠুরকৌতুকভরে
             দেখিস হাসে না যেন কেহ।
             ধীরে শুধু ঝরিবে শিশির,
             মৃদু শ্বাস ফেলিবে সমীর।
             স্তব্ধতা কপোলে হাত দিয়ে
             একা সেথা রহিবে বসিয়া,  
             মাঝে মাঝে দু-একটি তারা
             সেথা আসি পড়িবে খসিয়া।
আরো দেখুন
97
Verses
ঝরনা উথলে ধরার হৃদয় হতে
      তপ্তবারির স্রোতে--
গোপনে লুকানো অশ্রু কী লাগি
      বাহিরিল এ আলোতে।
আরো দেখুন
মেঘদূত
Verses
কবিবর, কবে কোন্‌ বিস্মৃত বরষে
কোন্‌ পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে
লিখেছিলে মেঘদূত! মেঘমন্দ্র শ্লোক
বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক
রাখিয়াছে আপন আঁধার স্তরে স্তরে
সঘনসংগীতমাঝে পুঞ্জীভূত করে।
সেদিন সে উজ্জয়িনীপ্রাসাদশিখরে
কী না জানি ঘনঘটা, বিদ্যুৎ-উৎসব,
উদ্দামপবনবেগ গুরুগুরু রব।
গম্ভীর নির্ঘোষ সেই মেঘসংঘর্ষের
জাগায়ে তুলিয়াছিল সহস্র বর্ষের
অন্তর্গূঢ় বাষ্পাকুল বিচ্ছেদ ক্রন্দন
এক দিনে। ছিন্ন করি কালের বন্ধন
সেই দিন ঝরে পড়েছিল অবিরল
চিরদিবসের যেন রুদ্ধ অশ্রুজল
আর্দ্র করি তোমার উদার শ্লোকরাশি।
সেদিন কি জগতের যতেক প্রবাসী
জোড়হস্তে মেঘপানে শূন্যে তুলি মাথা
গেয়েছিল সমস্বরে বিরহের গাথা
ফিরি প্রিয়গৃহপানে? বন্ধনবিহীন
নবমেঘপক্ষ-'পরে করিয়া আসীন
পাঠাতে চাহিয়াছিল প্রেমের বারতা
অশ্রুবাষ্প-ভরা-- দূর বাতায়নে যথা
বিরহিণী ছিল শুয়ে ভূতলশয়নে
মূক্তকেশে, ম্লান বেশে, সজল নয়নে?
তাদের সবার গান তোমার সংগীতে
পাঠায়ে কি দিলে, কবি, দিবসে নিশীথে
দেশে দেশান্তরে, খুঁজি' বিরহিণী প্রিয়া?
শ্রাবণে জাহ্নবী যথা যায় প্রবাহিয়া
টানি লয়ে দিশ-দিশান্তের বারিধারা
মহাসমুদ্রের মাঝে হতে দিশাহারা।
পাষাণশৃঙ্খলে যথা বন্দী হিমাচল
আষাঢ়ে অনন্ত শূন্যে হেরি মেঘদল
স্বাধীন-গগনচারী, কাতরে নিশ্বাসি
সহস্র কন্দর হতে বাষ্প রাশি রাশি
পাঠায় গগন-পানে; ধায় তারা ছুটি
উধাও কামনা-সম; শিখরেতে উঠি
সকলে মিলিয়া শেষে হয় একাকার,
সমস্ত গগনতল করে অধিকার।
সেদিনের পরে গেছে কত শত বার
প্রথম দিবস স্নিগ্ধ নববরষার।
প্রতি বর্ষা দিয়ে গেছে নবীন জীবন
তোমার কাব্যের 'পরে করি বরিষন
নববৃষ্টিবারিধারা, করিয়া বিস্তার
নবঘনস্নিগ্ধচ্ছায়া, করিয়া সঞ্চার
নব নব প্রতিধ্বনি জলদমন্দ্রের,
স্ফীত করি স্রোতোবেগ তোমার ছন্দের
বর্ষাতরঙ্গিণীসম।
                 কত কাল ধরে
কত সঙ্গীহীন জন, প্রিয়াহীন ঘরে,
বৃষ্টিক্লান্ত বহুদীর্ঘ লুপ্ততারাশশী
আষাঢ়সন্ধ্যায়, ক্ষীণ দীপালোকে বসি
ওই ছন্দ মন্দ মন্দ করি উচ্চারণ
নিমগ্ন করেছে নিজ বিজনবেদন!
সে সবার কন্ঠস্বর কর্ণে আসে মম
সমুদ্রের তরঙ্গের কলধ্বনি-সম
তব কাব্য হতে।
              ভারতের পূর্বশেষে
আমি বসে আজি; যে শ্যামল বঙ্গদেশে
জয়দেব কবি, আর এক বর্ষাদিনে
দেখেছিলা দিগন্তের তমালবিপিনে
শ্যামচ্ছায়া, পূর্ণ মেঘে মেদুর অম্বর।
আজি অন্ধকার দিবা, বৃষ্টি ঝরঝর্‌,
দুরন্ত পবন অতি, আক্রমণে তার
অরণ্য উদ্যতবাহু করে হাহাকার।
বিদ্যুৎ দিতেছে উঁকি ছিঁড়ি মেঘভার
খরতর বক্র হাসি শূন্যে বরষিয়া।
অন্ধকার রুদ্ধগৃহে একেলা বসিয়া
পড়িতেছি মেঘদূত; গৃহত্যাগী মন
মুক্তগতি মেঘপৃষ্ঠে লয়েছে আসন,
উড়িয়াছে দেশদেশান্তরে। কোথা আছে
সানুমান আম্রকূট; কোথা বহিয়াছে
বিমল বিশীর্ণ রেবা বিন্ধ্যপদমূলে
উপলব্যথিতগতি; বেত্রবতীকূলে
পরিণতফলশ্যাম জম্বুবনচ্ছায়ে
কোথায় দশার্ণ গ্রাম রয়েছে লুকায়ে
প্রস্ফুটিত কেতকীর বেড়া দিয়ে ঘেরা;
পথতরুশাখে কোথা গ্রামবিহঙ্গেরা
বর্ষায় বাঁধিছে নীড়, কলরবে ঘিরে
বনস্পতি; না জানি সে কোন্‌ নদীতীরে
যূথীবনবিহারিণী বনাঙ্গনা ফিরে,
তপ্ত কপোলের তাপে ক্লান্ত কর্ণোৎপল
মেঘের ছায়ার লাগি হতেছে বিকল;
ভ্রূবিলাস শেখে নাই কারা সেই নারী
জনপদবধূজন, গগনে নেহারি
ঘনঘটা, ঊর্ধ্বনেত্রে চাহে মেঘপানে,
ঘননীল ছায়া পড়ে সুনীল নয়ানে;
কোন্‌ মেঘশ্যামশৈলে মুগ্ধ সিদ্ধাঙ্গনা
স্নিগ্ধ নবঘন হেরি আছিল উন্মনা
শিলাতলে, সহসা আসিতে মহা ঝড়
চকিত চকিত হয়ে ভয়ে জড়সড়
সম্বরি বসন ফিরে গুহাশ্রয় খুঁজি,
বলে, "মা গো, গিরিশৃঙ্গ উড়াইল বুঝি!"
কোথায় অবন্তিপুরী; নির্বিন্ধ্যা তটিনী;
কোথা শিপ্রানদীনীরে হেরে উজ্জয়িনী
স্বমহিমচ্ছায়া-- সেথা নিশিদ্বিপ্রহরে
প্রণয়চাঞ্চল্য ভুলি ভবনশিখরে
সুপ্ত পারাবত, শুধু বিরহবিকারে
রমণী বাহির হয় প্রেম-অভিসারে
সূচিভেদ্য অন্ধকারে রাজপথমাঝে
ক্বচিৎ-বিদ্যুতালোকে; কোথা সে বিরাজে
ব্রহ্মাবর্তে কুরুক্ষেত্র; কোথা কন্‌খল,
যেথা সেই জহ্নুকন্যা যৌবনচঞ্চল,
গৌরীর ভ্রুকুটিভঙ্গী করি অবহেলা
ফেনপরিহাসচ্ছলে করিতেছে খেলা
লয়ে ধূর্জটির জটা চন্দ্রকরোজ্জ্বল।
এইমতো মেঘরূপে ফিরি দেশে দেশে
হৃদয় ভাসিয়া চলে, উত্তরিতে শেষে
কামনার মোক্ষধাম অলকার মাঝে,
বিরহিণী প্রিয়তমা যেথায় বিরাজে
সৌন্দর্যের আদিসৃষ্টি। সেথা কে পারিত
লয়ে যেতে, তুমি ছাড়া, করি অবায়িত
লক্ষ্মীর বিলাসপুরী-- অমর ভুবনে!
অনন্ত বসন্তে যেথা নিত্য পুষ্পবনে
নিত্য চন্দ্রালোকে, ইন্দ্রনীলশৈলমূলে
সুবর্ণসরোজফুল্ল সরোবরকূলে
মণিহর্ম্যে অসীম সম্পদে নিমগনা
কাঁদিতেছে একাকিনী বিরহবেদনা।
মুক্ত বাতায়ন হতে যায় তারে দেখা
শয্যাপ্রান্তে লীনতনু ক্ষীণ শশীরেখা
পূর্বগগনের মূলে যেন অস্তপ্রায়।
কবি, তব মন্ত্রে আজি মুক্ত হয়ে যায়
রুদ্ধ এই হৃদয়ের বন্ধনের ব্যথা;
লভিয়াছি বিরহের স্বর্গলোক, যেথা
চিরনিশি যাপিতেছে বিরহিণী প্রিয়া
অনন্তসৌন্দর্যমাঝে একাকী জাগিয়া।
আবার হারায়ে যায়-- হেরি চারি ধার
বৃষ্টি পড়ে অবিশ্রাম; ঘনায়ে আঁধার
আসিছে নির্জননিশা; প্রান্তরের শেষে
কেঁদে চলিয়াছে বায়ূ অকূল-উদ্দেশে।
ভাবিতেছি অর্ধরাত্রি অনিদ্রনয়ান,
কে দিয়েছে হেন শাপ, কেন ব্যবধান?
কেন ঊর্ধ্বে চেয়ে কাঁদে রুদ্ধ মনোরথ?
কেন প্রেম আপনার নাহি পায় পথ?
সশরীরে কোন্‌ নর গেছে সেইখানে,
মানসসরসীতীরে বিরহশয়ানে,
রবিহীন মণিদীপ্ত প্রদোষের দেশে
জগতের নদী গিরি সকলের শেষে।
আরো দেখুন