৩ (jhinedar jomidar )

ঝিনেদার জমিদার কালাচাঁদ রায়রা

সে-বছর পুষেছিল একপাল পায়রা।

বড়োবাবু খাটিয়াতে বসে বসে পান খায়,

পায়রা আঙিনা জুড়ে খুঁটে খুঁটে ধান খায়।

হাঁসগুলো জলে চলে আঁকাবাঁকা রকমে,

পায়রা জমায় সভা বক্‌-বক্‌ -বকমে।

খবরের কাগজেতে shock দিল বক্ষে,

প্যারাগ্রাফে ঠোক্কর লাগে তার চক্ষে।

তিন দিন ধ'রে নাকি দুই দলে পোড়াদয়

ঘুড়ি-কাটাকাটি নিয়ে মাথা ফাটাফাটি হয়।

কেউ বলে ঘুড়ি নয়, মনে হয় সন্ধ--

পোলিটিকালের যেন পাওয়া যায় গন্ধ।

"রানাঘাট-সমাচারে' লিখেছে রিপোর্টার--

আঠারোই অঘ্রানে শুরু হতে ভোরটার

বেশি বৈ কম নয় ছয়সাত হাজারে

গুণ্ডার দল এল সবজির বাজারে।

এ খবর একেবারে লুকোনোই দরকার,

গাপ করে দিল তাই ইংরেজ সরকার।

ভয় ছিল কোনোদিন প্রশ্নের ধাক্কায়

পার্লিয়ামেণ্টের হাওয়া পাছে পাক খায়।

এডিটর বলে, এতে পুলিসের গাফেলি।

পুলিশ বলে যে, চলো বুঝেসুঝে পা ফেলি;

ভাঙল কপাল যত কপালেরই দোষ সে,

এসব ফসল ফলে কন্‌গ্রেসি শস্যে।

সবজির বাজারেতে মুলো মোচা সস্তায়

পাওয়া গেল বাসি মাল ঝাঁকা ঝুড়ি বস্তায়।

ঝুড়ি থেকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মেরেছিল চালতা,

যশোরের কাগজেতে বেরিয়েছে কাল তা।

"মহাকাল' লিখেছিল, ভাষা তার শানানো--

চালতা ছোঁড়ার কথা আগাগোড়া বানানো;

বড়ো বড়ো লাউ নাকি ছুঁড়েছে দু পক্ষে,

শচীবাবু দেখেছে সে আপনার চক্ষে।

দাঙ্গায় হাঙ্গামে মিছে ক'রে লোক গোনা,

সংবাদী সমাজের কখনো এ যোগ্য না।

আর-এক সাক্ষীর আর-এক জবানি--

বেল ছুঁড়ে মেরেছিল দেখেছে তা ভবানী।

যার নাকে লেগেছিল সে গিয়েছে ভেবড়ে,

ভাগ্যেই নাক তার যায় নাই থেবড়ে।

শুনে এডিটর বলে, এ কি বিশ্বাস্য--

কে না জানে নাসাটা যে সহজেই নাশ্য।

জানি না কি ও পাড়ায় কোনোখানে নাই বেল;

ভবানী লিখল, এ যে আগাগোড়া লাইবেল।

মাঝে মাঝে গায়ে প'ড়ে চেঁচায় আদিত্য--

আমারে আরোপ করা মিথ্যাবাদিত্ব!

কোন্‌ বংশে যে মোর জন্ম তা জান তো,

আমার পায়ের কাছে করো মাথা আনত।

আমার বোনের যোগ বিবাহের সূত্রে

ভজু গোস্বামীদের পুত্রের পুত্রে।

এডিটর লেখে, তব ভগ্নীর স্বামী যে

গো বটে গোয়ালবাসী, জানি তাহা আমি যে।

ঠাট্টার অর্থটা ব্যাকরণে খুঁজতে

দেরি হল, পরদিনে পারল সে বুঝতে।

মহা রেগে বলে, তব কলমের চালনা

এখনি ঘুচাতে পারি, বাড়াবাড়ি ভালো না।

ফাঁস করে দিই যদি, হবে সে কি খোশনাম,

কোথায় তলিয়ে যাবে সাতকড়ি ঘোষ নাম।

জানি তব জামাইয়ের জ্যাঠাইয়ের যে বেহাই

আদালতে কত ক'রে পেয়েছিল সে রেহাই।

ঠাণ্ডা মেজাজ মোর সহজে তো রাগি নে,

নইলে তোমার সেই আদরের ভাগিনে

তার কথা বলি যদি-- এই ব'লে বলাটা

শুরু ক'রে ঘেঁটে দিল পঙ্কের তলাটা।

তার পরে জানা গেল গাঁজাখুরি সবটাই,

মাথা-ফাটাফাটি আদি মিছে জনরবটাই।

মাছ নিয়ে বকাবকি করেছিল জেলেটা,

পচা কলা ছুঁড়ে তারে মেরেছিল ছেলেটা।

আসল কথাটা এই অটলা ও পটলা

বাধালো ধর্মঘটে জন ছয়ে জটলা।

শুধু কুলি চারজন করেছিল গোলমাল--

লালপাগড়ি সে এসে বলেছিল,তোল্‌ মাল।

গুড়ের কলসিখানা মেতে উঠে ফেটেছিল,

রাজ্যের খেঁকিগুলো শুঁকে শুঁকে চেটেছিল;

বক্তৃতা করেছিল হরিহর শিকদার--

দোকানিরা বলেছিল, এ যে ভারি দিকদার।

সাদা এই প্রতিবাদ লিখেছিল তারিণী,

গ্রামের নিন্দে সে-যে সইতেই পারে নি।

নেহাত পারে না যারা পাব্‌লিশ না ক'রে

সব-শেষ পাতে দিল বর্জই আখরে।

প্রতিবাদটুকু কোনো রেখা নাহি রেখে যায়,

বেল থেকে তাল হয়ে গুজবটা থেকে যায়।

ঠিকমতো সংবাদ লিখেছিল সজনী--

সহ্য না হল সেটা, শুনেছে বা ক'জনই।

জ্যাঠাইয়ের বেহাইয়ের মামলাটা ছাড়াতে

যা ঘটেছে হাসি তার থেকে গেল পাড়াতে।

আদরের ভাগনের কী কেলেঙ্কারি সে,

বারাসতে বরিশালে হয়ে গেছে জারি সে।

হিতসাধনী সভার চাঁদাচুরি কাণ্ড

ছড়িয়ে পড়েছে আজ সারা ব্রহ্মাণ্ড।

ছেলেরা দুভাগ হল মাগুরার কলেজে--

এরা যদি বলে বেল, ওরা লাউ বলে যে।

চালতার দল থাকে উভয়ের মাঝেতে,

তারা লাগে দু দলের সভা-ভাঙা কাজেতে।

দলপতি পশ্চাতে রব তোলে বাহবার,

তার পরে গোলেমালে হয়ে পড়ে যা হবার।

ভয়ে ভয়ে ছি-ছি বলে কলেজের কর্তারা,

তার পরে মাপ চেয়ে চলে যায় ঘর তারা।

একদা দু এডিটরে দেখা হল গাড়িতে,

পনেরো মিনিট শুধু ছিল ট্রেন ছাড়িতে।

ফোঁস করে ওঠে ফের পুরাতন কথা সেই,

ঝাঁজ তার পুরো আছে আগে ছিল যথা সেই।

একজন বলে বেল, লাউ বলে অন্যে,

দুজনেই হয়ে ওঠে মারমুখো হন্যে।

দেখছি যা ব্যপার সে নয় কম তর্কের,

মুখে বুলি ওঠে আত্মীয় সম্পর্কের।

পয়লা দরের knave, idiot কি কেবল,

সে,humbug, cad unspeakable--

এই মতো বাছা বাছা ইংরেজি কটুতা

প্রকাশ করিতে থাকে দুজনের পটুতা।

অনুচর যারা, তারা খেপে ওঠে কেউ কেউ--

কুকুরটা কী ভেবে যে ডেকে ওঠে ভেউ-ভেউ।

হাওড়ায় ভিড় জমে, দেখে সবে রঙ্গ--

গার্ড এসে করে দিল যাত্রাই ভঙ্গ।

গার্ডকে সেলাম করি; বলি, ভাই বাঁচালি,

টার্মিনাসেতে এল বেলছোঁড়া পাঁচালি।

ঝিনেদার জমিদার বসে বসে পান খায়,

পায়রা আঙিনা জুড়ে খুঁটে খুঁটে ধান খায়

হেলেদুলে হাঁসগুলো চলে বাঁকা রকমে,

পায়রা জমায় সভা বক্‌-বক্‌-বকমে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

উদাসীন
Verses
হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি,
      ছুটি নে কাহারো পিছুতে।
মন নাহি মোর কিছুতেই, নাই
                     কিছুতে।
      নির্ভয়ে ধাই সুযোগ-কুযোগ বিছুরি,
      খেয়াল-খবর রাখি নে তো কোনো-কিছুরি--
      উপরে চড়িতে যদি নাই পাই সুবিধা      
                 সুখে পড়ে থাকি নিচুতেই, থাকি
                                        নিচুতে।
                 হাল ছেড়ে আজ বসে আছি আমি
                        ছুটি নে কাহারো পিছুতে--
                 মন নাহি মোর কিছুতেই, নাই
                                       কিছুতে।
যেথা-সেথা ধাই, যাহা-তাহা পাই--
        ছাড়ি নেকো ভাই, ছাড়ি নে।
তাই ব'লে কিছু কাড়াকাড়ি ক'রে
                        কাড়ি নে।
            যাহা যেতে চায় ছেড়ে দিই তারে তখুনি,
            বকি নে কারেও, শুনি নে কাহারো বকুনি--
            কথা যত আছে মনের তলায় তলিয়ে
                 ভুলেও কখনো সহসা তাদের
                                 নাড়ি নে।
                 যেথা-সেথা ধাই, যাহা-তাহা পাই--
                        ছাড়ি নেকো ভাই, ছাড়ি নে।
                 তাই ব'লে কিছু তাড়াতাড়ি ক'রে
                                     কাড়ি নে।
মন-দে'য়া-নে'য়া অনেক করেছি,
            মরেছি হাজার মরণে--
নূপুরের মতো বেজেছি চরণে
                        চরণে।
            আঘাত করিয়া ফিরেছি দুয়ারে দুয়ারে,
            সাধিয়া মরেছি ইঁহারে তাঁহারে উঁহারে--
            অশ্রু গাঁথিয়া রচিয়াছি কত মালিকা,      
                 রাঙিয়াছি তাহা হৃদয়-শোণিত-
                                 বরনে।
                  মন-দে'য়া-নে'য়া অনেক করেছি,
                        মরেছি হাজার মরণে
                 নূপুরের মতো বেজেছি চরণে
                                 চরণে।
এতদিন পরে ছুটি আজ ছুটি,
            মন ফেলে তাই ছুটেছি;
তাড়াতাড়ি ক'রে খেলাঘরে এসে
                        জুটেছি।
            বুকভাঙা বোঝা নেব না রে আর তুলিয়া,
            ভুলিবার যাহা একেবারে যাব ভুলিয়া--
যাঁর বেড়ি তাঁরে ভাঙা বেড়িগুলি ফিরায়ে
     বহুদিন পরে মাথা তুলে আজ
                             উঠেছি।
     এতদিন পরে ছুটি আজ ছুটি,
            মন ফেলে তাই ছুটেছি।
     তাড়াতাড়ি ক'রে খেলাঘরে এসে
                             জুটেছি।
কত ফুল নিয়ে আসে বসন্ত
            আগে পড়িত না নয়নে--
তখন কেবল ব্যস্ত ছিলাম
                  চয়নে।
         মধুকরসম ছিনু সঞ্চয়প্রয়াসী;
         কুসুমকান্তি দেখি নাই, মধু-পিয়াসী--
         বকুল কেবল দলিত করেছি আলসে      
              ছিলাম যখন নিলীন বকুল-
                                 শয়নে।
               কত ফুল নিয়ে আসে বসন্ত
                     আগে পড়িত না নয়নে
               তখন কেবল ব্যস্ত ছিলাম
                                 চয়নে।
দূরে দূরে আজ ভ্রমিতেছি আমি,
            মন নাহি মোর কিছুতে;
তাই ত্রিভুবন ফিরিছে আমারি
                       পিছুতে।
        সবলে কারেও ধরি নে বাসনা-মুঠিতে,
        দিয়েছি সবারে আপন বৃন্তে ফুটিতে--
        যখনি ছেড়েছি উচ্চে উঠার দুরাশা
              হাতের নাগালে পেয়েছি সবারে
                                নিচুতে।
               দূরে দূরে আজ ভ্রমিতেছি আমি,
                      মন নাহি মোর কিছুতে--
               তাই ত্রিভুবন ফিরিছে আমারি
                                 পিছুতে।
আরো দেখুন
20
Verses
MY HEART, like a peacock on a rainy day,
spreads its plumes tinged with rapturous colours of thoughts,
and in its ecstasy seeks some vision in the sky,
with a longing for one whom it does not know.
My heart dances.
The clouds rumble from sky to sky
the shower sweeps horizons,
the doves shiver in silence in their nests,
the frogs croak in the flooded fields,
and the clouds rumble.
O who is she on the king's tower
that has loosened the braid of her dark hair,
has drawn over her breasts the blue veil?
She wildly starts and runs in the sudden flashes of lightning
and lets the dark hair dance on her bosom.
Ah my heart dances like a peacock,
the rain patters on the new leaves of summer,
the tremor of the crickets' chirp troubles the shade of the tree,
the river overflows its bank washing the village meadows.
My heart dances.
আরো দেখুন
মানী
Verses
উচ্চপ্রাচীরে রুদ্ধ তোমার
                 ক্ষুদ্র ভুবনখানি
           হে মানী, হে অভিমানী।
           মন্দিরবাসী দেবতার মতো
                 সম্মানশৃঙ্খলে
           বন্দী রয়েছে পূজার আসনতলে।
      সাধারণজন-পরশ এড়ায়ে
           নিজেরে পৃথক করি
      আছ দিনরাত গৌরবগুরু
            কঠিন মূর্তি ধরি।
          সবার যেখানে ঠাঁই
      বিপুল তোমার মর্যাদা নিয়ে
           সেথায় প্রবেশ নাই।
               অনেক উপাধি তব,
      মানুষ-উপাধি হারায়েছ শুধু
          সে ক্ষতি কাহারে কব।
            ভক্তেরা মন্দিরে
      পূজারির কৃপা বহু-দামে কিনে
           পূজা দিয়ে যায় ফিরে
      ঝিল্লিমুখর বেণুবীথিকার ছায়ে
           আপন নিভৃত গাঁয়ে।
      তখন একাকী বৃথা বিচিত্র
           পাষাণভিত্তি-মাঝে
      দেবতার বুকে জান সে কী ব্যথা বাজে।
           বেদির বাঁধন করি ধূলিসাৎ
                 অচলেরে দিয়ে নাড়া
      মানুষের মাঝে সে-যে পেতে চায় ছাড়া।
      হে রাজা, তোমার পূজাঘেরা মন
           আপনারে নাহি জানে।
          প্রাণহীন সম্মানে
      উজ্জ্বল রঙে রঙকরা তুমি ঢেলা ড্ড
      তোমার জীবন সাজানো পুতুল
           স্থূল মিথ্যার খেলা।
      আপনি রয়েছ আড়ষ্ট হয়ে
         আপনার অভিশাপে,
           নিশ্চল তুমি নিজ গর্বের চাপে।
          সহজ প্রাণের মান নিয়ে যারা
           মুক্ত ভুবনে ফিরে
          মরিবার আগে তাদের পরশ
           লাগুক তোমার শিরে।
আরো দেখুন