প্রেয়সী (preyasi)

হে প্রেয়সী, হে শ্রেয়সী, হে বীণাবাদিনী,

আজি মোর চিত্তপদ্মে বসি একাকিনী

ঢালিতেছ স্বর্গসুধা; মাথার উপর

সদ্যস্নাত বরষার স্বচ্ছ নীলাম্বর

রাখিয়াছে স্নিগ্ধহস্ত আশীর্বাদে ভরা;

সম্মুখেতে শষ্যপূর্ণ হিল্লোলিত ধরা

বুলায় নয়নে মোর অমৃতচুম্বন;

উতলা বাতাস আসি করে আলিঙ্গন;

অন্তরে সঞ্চার করি আনন্দের বেগ

বহে যায় ভরা নদী; মধ্যাহ্নের মেঘ

স্বপ্নমালা গাঁথি দেয় দিগন্তের ভালে।

তুমি আজি মুগ্ধমুখী আমারে ভুলালে,

ভুলাইলে সংসারের শতলক্ষ কথা--

বীণাস্বরে রচি দিলে মহা নীরবতা।

          

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সন্ধ্যায়
Verses
          ওগো তুমি, অমনি সন্ধ্যার মতো হও।
সুদূর পশ্চিমাচলে             কনক-আকাশতলে
          অমনি নিস্তব্ধ চেয়ে রও।
অমনি সুন্দর শান্ত              অমনি করুণ কান্ত
          অমনি নীরব উদাসিনী,
ওইমতো ধীরে ধীরে               আমার জীবনতীরে
          বারেক দাঁড়াও একাকিনী।
জগতের পরপারে             নিয়ে যাও আপনারে
          দিবসনিশার প্রান্তদেশে।
থাক্‌ হাস্য-উৎসব,             না আসুক কলরব
          সংসারের জনহীন শেষে।
এস তুমি চুপে চুপে           শ্রান্তিরূপে নিদ্রারূপে,
          এস তুমি নয়ন-আনত।
এস তুমি ম্লান হেসে         দিবাদগ্ধ আয়ুশেষে
          মরণের আশ্বাসের মতো।
আমি শুধু চেয়ে থাকি         অশ্রুহীন শ্রান্ত-আঁখি,
          পড়ে থাকি পৃথিবীর 'পরে--
খুলে দাও কেশভার,              ঘনস্নিগ্ধ অন্ধকার
          মোরে ঢেকে দিক স্তরে স্তরে।
রাখো এ কপালে মম            নিদ্রার আবেশ-সম
          হিমস্নিগ্ধ করতলখানি।
বাক্যহীন স্নেহভরে             অবশ দেহের 'পরে
          অঞ্চলের প্রান্ত দাও টানি।
তার পরে পলে পলে            করুণার অশ্রুজলে
          ভরে যাক নয়নপল্লব।
সেই স্তব্ধ আকুলতা              গভীর বিদায়ব্যথা
          কায়মনে করি অনুভব।
আরো দেখুন
যখন তোমায় আঘাত করি
Verses
যখন তোমায় আঘাত করি
      তখন চিনি।
শত্রু হয়ে দাঁড়াই যখন
      লও যে জিনি।
এ প্রাণ যত নিজের তরে
তোমারি ধন হরণ করে
ততই শুধু তোমার কাছে
      হয় সে ঋণী।
উজিয়ে যেতে চাই যতবার
      গর্বসুখে,
তোমার স্রোতের প্রবল পরশ
      পাই যে বুকে।
আলো যখন আলসভরে
নিবিয়ে ফেলি আপন ঘরে
লক্ষ তারা জ্বালায় তোমার
      নিশীথিনী।
আরো দেখুন
মুক্তি
Verses
     ডাক্তারে যা বলে বলুক নাকো,
               রাখো রাখো খুলে রাখো,
শিয়রের ওই জানলা দুটো,--গায়ে লাগুক হাওয়া।
     ওষুধ? আমার ফুরিয়ে গেছে ওষুধ খাওয়া।
     তিতো কড়া কত ওষুধ খেলেম এ জীবনে,
               দিনে দিনে ক্ষণে ক্ষণে।
          বেঁচে থাকা, সেই যেন এক রোগ;
          কত রকম কবিরাজি, কতই মুষ্টিযোগ,
     একটুমাত্র অসাবধানেই, বিষম কর্মভোগ।
     এইটে ভালো, ঐটে মন্দ, যে যা বলে সবার কথা মেনে,
                   নামিয়ে চক্ষু, মাথায় ঘোমটা টেনে,
        বাইশ বছর কাটিয়ে দিলেম এই তোমাদের ঘরে।
                   তাই তো ঘরে পরে,
               সবাই আমায় বললে লক্ষ্মী সতী,
                   ভালোমানুষ অতি!
          এ সংসারে এসেছিলেম ন-বছরের মেয়ে,
          তার পরে এই পরিবারের দীর্ঘ গলি বেয়ে
দশের ইচ্ছা বোঝাই-করা এই জীবনটা টেনে টেনে শেষে
               পৌঁছিনু আজ পথের প্রান্তে এসে।
                   সুখের দুখের কথা
               একটুখানি ভাবব এমন সময় ছিল কোথা।
এই জীবনটা ভালো, কিংবা মন্দ, কিংবা যা-হ'ক-একটা-কিছু
          সে-কথাটা বুঝব কখন, দেখব কখন ভেবে আগুপিছু।
                    একটানা এক ক্লান্ত সুরে
               কাজের চাকা চলছে ঘুরে ঘুরে।
          বাইশ বছর রয়েছি সেই এক-চাকাতেই বাঁধা
                   পাকের ঘোরে আঁধা।
     জানি নাই তো আমি যে কী, জানি নাই এ বৃহৎ বসুন্ধরা
               কী অর্থে যে ভরা।
          শুনি নাই তো মানুষের কী বাণী
     মহাকালের বীণায় বাজে। আমি কেবল জানি,
     রাঁধার পরে খাওয়া, আবার খাওয়ার পরে রাঁধা,
          বাইশ বছর এক-চাকাতেই বাঁধা।
     মনে হচ্ছে সেই চাকাটা--ঐ যে থামল যেন;
          থামুক তবে। আবার ওষুধ কেন।
     বসন্তকাল বাইশ বছর এসেছিল বনের আঙিনায়।
               গন্ধে বিভোল দক্ষিণ বায়
          দিয়েছিল জলস্থলের মর্ম-দোলায় দোল;
          হেঁকেছিল, "খোল্‌ রে দুয়ার খোল্‌।"
সে যে কখন আসত যেত জানতে পেতেম না যে।
                   হয়তো মনের মাঝে
          সংগোপনে দিত নাড়া; হয়তো ঘরের কাজে
          আচম্বিতে ভুল ঘটাত; হয়তো বাজত বুকে
          জন্মান্তরের ব্যথা; কারণ-ভোলা দুঃখে সুখে
হয়তো পরান রইত চেয়ে যেন রে কার পায়ের শব্দ শুনে,
                   বিহ্বল ফাল্গুনে।
          তুমি আসতে আপিস থেকে, যেতে সন্ধ্যাবেলায়
               পাড়ায় কোথা শতরঞ্জ খেলায়।
                   থাক্‌ সে-কথা।
আজকে কেন মনে আসে প্রাণের যত ক্ষণিক ব্যাকুলতা।
          প্রথম আমার জীবন এই বাইশ বছর পরে
               বসন্তকাল এসেছে মোর ঘরে।
          জানলা দিয়ে চেয়ে আকাশ-পানে
     আনন্দে আজ ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠছে প্রাণে--
               আমি নারী, আমি মহীয়সী,
আমার সুরে সুর বেঁধেছে জ্যোৎস্না-বীণায় নিদ্রাবিহীন শশী।
          আমি নইলে মিথ্যা হত সন্ধ্যাতারা ওঠা,
               মিথ্যা হত কাননে ফুল-ফোটা।
                   বাইশ বছর ধরে
     মনে ছিল বন্দী আমি অনন্তকাল তোমাদের এই ঘরে।
          দুঃখ তবু ছিল না তার তরে,
অসাড় মনে দিন কেটেছে, আরো কাটত আরো বাঁচলে পরে।
                   যেথায় যত জ্ঞাতি
          লক্ষ্মী বলে করে আমার খ্যাতি;
     এই জীবনে সেই যেন মোর পরম সার্থকতা--
          ঘরের কোণে পাঁচের মুখের কথা!
               আজকে কখন মোর
               কাটল বাঁধন-ডোর।
     জনম-মরণ এক হয়েছে ওই যে অকূল বিরাট মোহানায়,
               ঐ অতলে কোথায় মিলে যায়
               ভাঁড়ার-ঘরের দেয়াল যত
                   একটু ফেনার মতো।
               এতদিনে প্রথম যেন বাজে
          বিয়ের বাঁশি বিশ্ব-আকাশ মাঝে।
তুচ্ছ বাইশ বছর আমার ঘরের কোণের ধুলায় পড়ে থাক।
          মরণ-বাসরঘরে আমায় যে দিয়েছে ডাক
     দ্বারে আমার প্রার্থী সে যে, নয় সে কেবল প্রভু,
               হেলা আমায় করবে না সে কভু।
                   চায় সে আমার কাছে
     আমার মাঝে গভীর গোপন যে সুধারস আছে
               গ্রহতারার সভার মাঝখানে সে
ঐ যে আমার মুখে চেয়ে দাঁড়িয়ে হোথায় রইল নির্নিমেষে।
                   মধুর ভুবন, মধুর আমি নারী,
          মধুর মরণ, ওগো আমার অনন্ত ভিখারি।
                   দাও, খুলে দাও দ্বার,
     ব্যর্থ বাইশ বছর হতে পার করে দাও কালের পারাবার।
আরো দেখুন