নাট্যশেষ (natyoshesh)

দূর অতীতের পানে পশ্চাতে ফিরিয়া চাহিলাম;

হেরিতেছি যাত্রী দলে দলে। জানি সবাকার নাম,

চিনি সকলেরে। আজ বুঝিয়াছি, পশ্চিম-আলোতে

ছায়া ওরা। নটরূপে এসেছে নেপথ্যলোক হতে

দেহ-ছদ্মসাজে; সংসারের ছায়ানাট্য অন্তহীন,

সেথায় আপন পাঠ আবৃত্তি করিয়া রাত্রিদিন

কাটাইল; সূত্রধার অদৃষ্টের আভাসে আদেশে

চালাইল নিজ নিজ পালা, কভু কেঁদে, কভু হেসে

নানা ভঙ্গি নানা ভাবে। শেষে অভিনয় হলে সারা,

দেহবেশ ফেলে দিয়ে নেপথ্যে অদৃশ্যে হল হারা।

যে খেলা খেলিতে এল হয়তো কোথাও তার আছে

নাট্যগত অর্থ কোনোরূপ, বিশ্বমহাকবি-কাছে

প্রকাশিত। নটনটী রঙ্গসাজে ছিল যতক্ষণ

সত্য বলে জেনেছিল প্রত্যহের হাসি ও ক্রন্দন,

উত্থানপতন বেদনায়। অবশেষে যবনিকা

নেমে এল; নিবে গেল একে একে প্রদীপের শিখা;

ম্লান হল অঙ্গরাগ; বিচিত্র চাঞ্চল্য গেল থেমে;

যে নিস্তব্ধ অন্ধকারে রঙ্গমঞ্চ হতে গেল নেমে

          স্তুতি নিন্দা সেথায় সমান, ভেদহীন মন্দ ভালো,

          দুঃখসুখভঙ্গি অর্থহীন, তুল্য অন্ধকার আলো,

লুপ্ত লজ্জাভয়ের ব্যঞ্জনা। যুদ্ধ উত্তারিয়া সীতা

পরক্ষণে প্রিয়হস্ত রচিতে বসিল তার চিতা;

সে পালায় অবসানে নিঃশেষে হয়েছে নিরর্থক

সে দুঃসহ দুঃখদাহ--শুধু তারে কবির নাটক

কাব্যডোরে বাঁধিয়াছে, শুধু তারে ঘোষিতের গান,

শিল্পের কলায় শুধু রচে তাহা আনন্দের দান।

জনশূন্য ভাঙাঘাটে আজি বৃদ্ধ বটচ্ছায়াতলে

গোধূলির শেষ আলো আষাঢ়ে ধূসর নদীজলে

মগ্ন হল। ওপারের লোকালয় মরীচিকাসম

চক্ষে ভাসে। একা বসে দেখিতেছি মনে মনে, মম

দূর আপনার ছবি নাট্যের প্রথম অঙ্কভাগে

কালের লীলায়। সেদিনের সদ্য-জাগা চক্ষে জাগে

অস্পষ্ট কী প্রত্যাশার অরুণিম প্রথম উন্মেষ;

সম্মুখে সে চলেছিল, না জানিয়া শেষের উদ্দেশ,

নেপথ্যের প্রেরণায়। জানা না-জানার মধ্যসেতু

নিত্য পার হতেছিল কিছু তার না বুঝিয়া হেতু।

অকস্মাৎ পথমাঝে কে তারে ভেটিল একদিন,

দুই অজানার মাঝে দেশকাল হইল বিলীন

সীমাহীন নিমেষেই; পরিব্যাপ্ত হল জানাশোনা

জীবনের দিগন্ত পারায়ে। ছায়ায়-আলোয়-বোনা

আতপ্ত ফাল্গুনদিনে মর্মরিত চাঞ্চল্যের স্রোতে

কুঞ্জপথে মেলিল সে স্ফুরিত অঞ্চলতল হতে

কনকচাঁপার আভা। গন্ধে শিহরিয়া গেল হাওয়া

শিথিল কেশের স্পর্শে। দুজনে করিল আসাযাওয়া

অজানা অধীরতায়।

                             সহসা সে রাত্রে সে গেল চলি

যে রাত্রি হয় না কভু ভোর। অদৃষ্টের যে অঞ্জলি

এনেছিল সুধা, নিল ফিরে। সেই যুগ হল গত

চৈত্রশেষে অরণ্যের মাধবীর সুগন্ধের মতো।

তখন সেদিন ছিল সবচেয়ে সত্য এ ভুবনে,

সমস্ত বিশ্বের যন্ত্র বাঁধিত সে আপন বেদনে

আনন্দ ও বিষাদের সুরে। সেই সুখ দুঃখ তার

জোনাকির খেলা মাত্র, যারা সীমাহীন অন্ধকার

পূর্ণ করে চুম্‌কির কাজে বিঁধে আলোকের সূচি;

সে রাত্রি অক্ষত থাকে, বিনা চিহ্নে আলো যায় ঘুচি।

সে ভাঙা যুগের 'পরে কবিতার অরণ্যলতায়

ফুটিছে ছন্দের ফুল, দোলে তার গানের কথায়।

সেদিন আজিকে ছবি হৃদয়ের অজন্তাগুহাতে

অন্ধকার ভিত্তিপটে; ঐক্য তার বিশ্বশিল্প-সাথে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

মুক্তি
Verses
চক্ষু কর্ণ বুদ্ধি মন সব রুদ্ধ করি,
বিমুখ হইয়া সর্ব জগতের পানে,
শুদ্ধ আপনার ক্ষুদ্র আত্মাটিরে ধরি
মুক্তি-আশে সন্তরিব কোথায় কে জানে!
পার্শ্ব দিয়ে ভেসে যাবে বিশ্বমহাতরী
অম্বর আকুল করি যাত্রীদের গানে,
শুভ্র কিরণের পালে দশ দিক ভরি',
বিচিত্র সৌন্দর্যে পূর্ণ অসংখ্য পরানে।
ধীরে ধীরে চলে যাবে দূর হতে দূরে
অখিল ক্রন্দন-হাসি আঁধার-আলোক,
বহে যাবে শূন্যপথে সকরুণ সুরে
অনন্ত-জগৎ-ভরা যত দুঃখশোক।
বিশ্ব যদি চলে যায় কাঁদিতে কাঁদিতে
আমি একা বসে রব মুক্তি-সমাধিতে?
আরো দেখুন
7
Verses
জীবন পবিত্র জানি,
অভাব্য স্বরূপ তার
অজ্ঞেয় রহস্য-উৎস হতে
পেয়েছে প্রকাশ
কোন্‌ অলক্ষিত পথ দিয়ে,
সন্ধান মেলে না তার।
প্রত্যহ নূতন নির্মলতা
দিল তারে সূর্যোদয়
লক্ষ ক্রোশ হতে
স্বর্ণঘটে পূর্ণ করি আলোকের অভিষেকধারা।
সে জীবন বাণী দিল দিবসরাত্রিরে,
রচিল অরণ্যফুলে অদৃশ্যের পূজা-আয়োজন,
আরতির দীপ দিল জ্বালি
নিঃশব্দ প্রহরে।
চিত্ত তারে নিবেদিল
জন্মের প্রথম ভালোবাসা।
প্রত্যহের সব ভালোবাসা
তারি আদি সোনার কাঠিতে
উঠেছে জাগিয়া;
প্রিয়ারে বেসেছি ভালো,
বেসেছি ফুলের মঞ্জরিকে;
করেছে সে অন্তরতম
পরশ করেছে যারে।
জন্মের প্রথম গ্রন্থে নিয়ে আসে অলিখিত পাতা,
দিনে দিনে পূর্ণ হয় বাণীতে বাণীতে।
আপনার পরিচয় গাঁথা হয়ে চলে,
দিনশেষে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে ছবি,
নিজেরে চিনিতে পারে
রূপকার নিজের স্বাক্ষরে,
তার পরে মুছে ফেলে বর্ণ তার রেখা তার
উদাসীন চিত্রকর কালো কালি দিয়ে;
কিছু বা যায় না মোছা সুবর্ণের লিপি,
ধ্রুবতারকার পাশে জাগে তার জ্যোতিষ্কের লীলা।
আরো দেখুন
40
Verses
                        মন্ত্রেসে যে পূত
                        রাখীররাঙা সুতো
                     বাঁধন  দিয়েছিনু হাতে,
                     আজ কিআছে সেটি সাথে।
                বিদায়বেলা এল    মেঘের মতো ব্যেপে,
                গ্রন্থি বেঁধে দিতে  দু হাত গেল কেঁপে,
                সেদিন থেকে থেকে        চক্ষুদুটি ছেপে
                     ভরে যে এল  জলধারা।
                আজকে বসে আছি          পথের এক পাশে,
                আমের ঘন বোলে           বিভোল মধুমাসে
                তুচ্ছ কথাটুকু       কেবল মনে আসে
                     ভ্রমর যেন পথহারা--
                সেই-যে বাম হাতে         একটি সরু রাখী--
                     আধেক রাঙা, সোনা আধা,
                     আজো কি আছে সেটি বাঁধা।
                          পথ যে কতখানি
                          কিছুই নাহি জানি,
                     মাঠের গেছে কোন্‌ শেষে
                     চৈত্র-ফসলের দেশে।
                যখন গেলে চলে   তোমার গ্রীবামূলে
                দীর্ঘ বেণী তব      এলিয়ে ছিল খুলে,
                মাল্যখানি গাঁথা    সাঁজের কোন্‌ ফুলে
                     লুটিয়ে পড়েছিল পায়ে।
                একটুখানি তুমি    দাঁড়িয়ে যদি যেতে!
                নতুন ফুলে দেখো  কানন ওঠে মেতে,
                দিতেম ত্বরা করে   নবীন মালা গেঁথে
                     কনকচাঁপা-বনছায়ে।
                মাঠের পথে যেতে  তোমার মালাখানি
                     প'ল কি বেণী হতে খসে
                     আজকে ভাবি তাই বসে।
                          নূপুর ছিল ঘরে
                          গিয়েছ পায়ে প'রে--
                     নিয়েছ হেথা হতে তাই,
                     অঙ্গে আর কিছু নাই।
                আকুল কলতানে   শতেক রসনায়
                চরণ ঘেরি তব    কাঁদিছে করুণায়,
                তাহারা হেথাকার     বিরহবেদনায়
                     মুখর করে তব পথ।
                জানি না কী এত যে         তোমার ছিল ত্বরা,
                কিছুতে হল না যে           মাথার ভূষা পরা,
                দিতেম খুঁজে এনে            সিঁথিটি মনোহরা--
                     রহিল মনে মনোরথ।
                হেলায়-বাঁধা সেই  নূপুর-দুটি পায়ে
                     আছে কি পথে গেছে খুলে
                     সে কথা ভাবি তরুমূলে।
                          অনেক গীতগান
                          করেছি অবসান
                     অনেক সকালে ও সাঁজে
                     অনেক অবসরে কাজে।
                তাহারি শেষ গান           আধেক লয়ে কানে
                দীর্ঘ পথ দিয়ে      গেছ সুদূর-পানে,
                আধেক-জানা সুরে       আধেক-ভোলা তানে
                     গেয়েছ গুন্‌ গুন্‌ স্বরে।
                কেন না গেলে শুনি          একটি গান আরো--
                সে গান শুধু তব,         সে নহে আর কারো--
                তুমিও গেলে চলে            সময় হল তারো,
                     ফুটল তব পূজাতরে।
                মাঠের কোন্‌খানে  হারালো শেষ সুর
                     যে গান নিয়ে গেল শেষে,
                     ভাবি যে তাই অনিমেষে।
আরো দেখুন