হরিণী (horini)

হে হরিণী,

                  আকাশ লইবে জিনি

                      কেন তব এ অধ্যবসায়?

         সুদূরের অভ্রপটে অগম্যেরে দেখা যায়,

          কালো চোখে পড়ে তার স্বপ্নরূপ লিখা;

                      একি মরীচিকা,

                  পিপাসার স্বরচিত মোহ,

          একি আপনার সাথে আপন বিদ্রোহ?

                  নিজের দুঃসহ সঙ্গ হতে

          ছুটে যেতে চাও কোনো নূতন আলোতে--

                নিকটের সংকীর্ণতা করি ছেদ,

          দিগন্তের নব নব যবনিকা করি দিয়া ভেদ।

                   আছ বিচ্ছেদের পারে;

          যারে তুমি জানো নাই, রক্তে তুমি চিনিয়াছ যারে,

          সে যে ডাক দিয়ে গেছে যুগে যুগে যত হরিণীরে

                বনে মাঠে গিরিতটে নদীতীরে--

                   জানায়েছে অপূর্ব বারতা

                কত শত বসন্তের আত্মবিহ্বলতা।

            তারই লাগি বিশ্বভোলা মহা-অভিসার

                   হয়েছে দুর্বার,

                অদৃশ্যেরে সন্ধানের তরে

                   দাঁড়ায়েছ স্পর্ধাভরে,

                একান্ত উৎসুক তব প্রাণ

              আকাশেরে করে ঘ্রাণ--

                কর্ণ করিয়াছে খাড়া,

          বাতাসে বাতাসে আজি অশ্রুত বাণীর পায় সাড়া।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

বিশ্বশোক
Verses
দুঃখের দিনে লেখনীকে বলি--
           লজ্জা দিয়ো না।
    সকলের নয় যে আঘাত
           ধোরো না সবার চোখে।
    ঢেকো না মুখ অন্ধকারে,
        রেখো না দ্বারে আগল দিয়ে।
    জ্বালো সকল রঙের উজ্জ্বল বাতি,
               কৃপণ হোয়ো না।
অতি বৃহৎ বিশ্ব,
    অম্লান তার মহিমা,
        অক্ষুব্ধ তার প্রকৃতি।
    মাথা তুলেছে দুর্দর্শ সূর্যলোকে,
        অবিচলিত অকরুণ দৃষ্টি তার অনিমেষ,
           অকম্পিত বক্ষ প্রসারিত
               গিরি নদী প্রান্তরে।
        আমার সে নয়,
               সে অসংখ্যের।
    বাজে তার ভেরী সকল দিকে,
           জ্বলে অনিভৃত আলো,
        দোলে পতাকা মহাকাশে।
তার সমুখে লজ্জা দিয়ো না--
    আমার ক্ষতি আমার ব্যথা
        তার সমুখে কণার কণা।
এই ব্যথাকে আমার বলে ভুলব যখনি
    তখনি সে প্রকাশ পাবে বিশ্বরূপে।
দেখতে পাব বেদনার বন্যা নামে কালের বুকে
               শাখাপ্রশাখায়;
           ধায় হৃদয়ের মহানদী
সব মানুষের জীবনস্রোতে ঘরে ঘরে।
        অশ্রুধারার ব্রহ্মপুত্র
           উঠছে ফুলে ফুলে
               তরঙ্গে তরঙ্গে;
সংসারের কূলে কূলে
        চলে তার বিপুল ভাঙাগড়া
           দেশে দেশান্তরে।
        চিরকালের সেই বিরহতাপ,
    চিরকালের সেই মানুষের শোক,
নামল হঠাৎ আমার বুকে;
    এক প্লাবনে থর্‌থরিয়ে কাঁপিয়ে দিল
               পাঁজরগুলো--
    সব ধরণীর কান্নার গর্জনে
        মিলে গিয়ে চলে গেল অনন্তে,
           কী উদ্দেশে কে তা জানে।
আজকে আমি ডেকে বলি লেখনীকে,
           লজ্জা দিয়ো না।
কূল ছাপিয়ে উঠুক তোমার দান।
           দাক্ষিণ্যে তোমার
        ঢাকা পড়ুক অন্তরালে
           আমার আপন ব্যথা।
    ক্রন্দন তার হাজার তানে মিলিয়ে দিয়ো
               বিশাল বিশ্বসুরে।
আরো দেখুন
বিয়াল্লিশ
Verses
শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র দত্ত প্রিয়বরেষু
তুমি গল্প জমাতে পার।
বসো তোমার কেদারায়,
ধীরে ধীরে টান দাও গুড়গুড়িতে,
উছলে ওঠে আলাপ
তোমার ভিতর থেকে
হালকা ভাষায়,
যেন নিরাসক্ত ঔৎসুক্যে,
তোমার কৌতুকে-ফেনিল মনের
কৌতূহলের উৎস থেকে।
ঘুরেছ নানা জায়গায়, নানা কাজে,
আপন দেশে, অন্য দেশে।
মনটা মেলে রেখেছিলে চারদিকে,
চোখটা ছিলে খুলে।
মানুষের যে-পরিচয়
তার আপন সহজভাবে,
যেমন-তেমন অখ্যাত ব্যাপারের ধারায়
দিনে দিনে যা গাঁথা হয়ে ওঠে,
সামান্য হলেও যাতে আছে
সত্যের ছাপ,
অকিঞ্চিৎকর হলেও যার আছে বিশেষত্ব,
সেটা এড়ায়নি তোমার দৃষ্টি।
সেইটে দেখাই সহজ নয়,
পণ্ডিতের দেখা সহজ।
শুনেছি তোমার পাঠ ছিল সায়ান্সে,
শুনেছি শাস্ত্রও পড়েছ সংস্কৃত ভাষায়;
পার্সি জবানিও জানা আছে।
গিয়েছ সমুদ্রপারে,
ভারতে রাজসরকারের
ইম্পীরিয়ল রথযাত্রার লম্বা দড়িতে
"হেঁইয়ো' ব'লে দিতে হয়েছে টান।
অর্থনীতি রাষ্ট্রনীতি
মগজে বোঝাই হয়েছে কম নয়,
পুঁথির থেকেও কিছু,
মানুষের প্রাণযাত্রা থেকেও বিস্তর।
তবু সব-কিছু নিয়ে
তোমার যে পরিচয় মুখ্য
সে তোমার আলাপ-পরিচয়ে।
তুমি গল্প জমাতে পার।
তাই যখন-তখন দেখি,
তোমার ঘরে মানুষ লেগেই আছে,
কেউ তোমার চেয়ে বয়সে ছোটো
কেউ বয়সে বেশি।
গল্প করতে গিয়ে মাস্টারি কর না,
এই তোমার বাহাদুরি।
তুমি মানুষকে জান, মানুষকে জানাও,
জীবলীলার মানুষকে।
একে নাম দিতে পারি সাহিত্য,--
সব-কিছুর কাছে-থাকা।
তুমি জমা করেছ তোমার মনে
নানা লোকের সঙ্গ,
সেইটে দিতে পার সবাইকে
অনায়াসে,--
সেইটেকে জ্ঞানবিজ্ঞানের তকমা পরিয়ে
পণ্ডিত-পেয়াদা সাজাও না
থমকিয়ে দিতে ভালোমানুষকে।
তোমার জ্ঞানবিজ্ঞানের ভাণ্ডারটা
পূর্ণ আছে যথাস্থানেই।
সেটা বৈঠকখানাকে কোণ-ঠেসা করে রাখেনি।
যেখানে আসন পাত'
গল্পের ভোজে
সেখানে ক্ষুধিতের পাতের থেকে ঠেকিয়ে রাখ
লাইব্রেরি ল্যাবরেটরিকে।
একটিমাত্র কারণ,--
মানুষের 'পরে আছে তোমার দরদ,--
যে-মানুষ চলতে চলতে হাঁপিয়ে ওঠে
সুখদুঃখের দুর্গম পথে,
বাঁধা পড়ে নানা বন্ধনে
ইচ্ছায় অনিচ্ছায়,--
যে-মানুষ বাঁচে,
যে-মানুষ মরে
অদৃষ্টের গোলকধাঁদার পাকে।
সে-মানুষ রাজাই হোক ভিখিরিই হোক
তার কথা শুনতে মানুষের অসীম আগ্রহ।
তার কথা যে-লোক পারে বলতে সহজেই
সে-ই পারে,
অন্যে পারে না।
বিশেষ এই হাল-আমলে।
আজ মানুষের জানাশোনা
তার দেখাশোনাকে
দিয়েছে আপাদমস্তক ঢেকে।
একটু ধাক্কা পেলে
তার মুখে নানা কথা অনর্গল ছিটকে পড়ে--
নানা সমস্যা, নানা তর্ক,
একান্ত মানুষের আসল কথাটা
যায় খাটো হয়ে।
আজ বিপুল হল সমস্যা,
বিচিত্র হল তর্ক,
দুর্ভেদ্য হল সংশয়,--
আজকের দিনে
সেইজন্যেই এত করে বন্ধুকে খুঁজি,
মানুষের সহজ বন্ধুকে
যে গল্প জমাতে পারে।
এ দুর্দিনে
মাস্টারমশায়কেও অত্যন্ত দরকার।
তাঁর জন্যে ক্লাস আছে
পাড়ায় পাড়ায়--
প্রায়মারি, সেকেণ্ডারি।
গল্পের মজলিস জোটে দৈবাৎ।
সমুদ্রের ওপারে
একদিন ওরা গল্পের আসর খুলেছিল,
তখন ছিল অবকাশ;
ওরা ছেলেদের কাছে শুনিয়েছিল,
রবিন্‌সন্‌ ক্রুসো,
সকল বয়সের মানুষের কাছে
ডন্‌ কুইক্‌সোট্‌।
দুরূহ ভাবনার আঁধি লাগল
দিকে দিকে;
লেক্‌চারের বান ডেকে এল,
জলে স্থলে কাদায় পাঁকে
গেল ঘুলিয়ে।
অগত্যা
অধ্যাপকেরা জানিয়ে দিলে
একেই বলে গল্প।
বন্ধু,
দুঃখ জানাতে এলুম
তোমার বৈঠকে।
আজকাল-এর ছাত্রেরা দেয়
আজকাল-এর দোহাই।
আজকাল-এর মুখরতায়
তাদের অটুট বিশ্বাস।
হায় রে আজকাল
কত ডুবে গেল কালের মহাপ্লাবনে
মোটাদামের মার্কা-মারা
পসরা নিয়ে।
যা চিরকাল-এর
তা আজ যদি বা ঢাকা পড়ে
কাল উঠবে জেগে।
তখন মানুষ আবার বলবে খুশি হয়ে,--
গল্প বলো।
আরো দেখুন
নিমন্ত্রণ
Verses
মনে পড়ে, যেন এককালে লিখিতাম
          চিঠিতে তোমারে প্রেয়সী অথবা প্রিয়ে।
একালের দিনে শুধু বুঝি লেখে নাম--
          থাক্‌ সে কথায়, লিখি বিনা নাম দিয়ে।
তুমি দাবি কর কবিতা আমার কাছে
          মিল মিলাইয়া দুরূহ ছন্দে লেখা,
আমার কাব্য তোমার দুয়ারে যাচে
          নম্র চোখের কম্প্র কাজলরেখা।
সহজ ভাষায় কথাটা বলাই শ্রেয়--
          যে-কোনো ছুতায় চলে এসো মোর ডাকে,
সময় ফুরালে আবার ফিরিয়া যেয়ো,
          বোসো মুখোমুখি যদি অবসর থাকে।
গৌরবরন তোমার চরণমূলে
          ফল্‌সাবরন শাড়িটি ঘেরিবে ভালো;
বসনপ্রান্ত সীমন্তে রেখো তুলে,
          কপোলপ্রান্তে সরু পাড় ঘন কালো।
          
একগুছি চুল বায়ু-উচ্ছ্বাসে কাঁপা
          ললাটের ধারে থাকে যেন অশাসনে।
ডাহিন অলকে একটি দোলনচাঁপা
          দুলিয়া উঠুক গ্রীবাভঙ্গির সনে।
বৈকালে গাঁথা যূথীমুকুলের মালা
          কণ্ঠের তাপে ফুটিয়া উঠিবে সাঁঝে;
দূরে থাকিতেই গোপনগন্ধে-ঢালা
          সুখসংবাদ মেলিবে হৃদয়মাঝে।
এই সুযোগেতে একটুকু দিই খোঁটা--
          আমারই দেওয়া সেই ছোট্ট চুনির দুল,
রক্তে জমানো যেন সে অশ্রুর ফোঁটা,
          কতদিন সেটা পরিতে করেছ ভুল।
আরেকটা কথা বলে রাখি এইখানে,
          কাব্যে সে কথা হবে না মানানসই,
সুর দিয়ে সেটা গাহিব না কোনো গানে--
          তুচ্ছ শোনাবে, তবু সে তুচ্ছ কই।
একালে চলে না সোনার প্রদীপ আনা,
সোনার বীণাও নহে আয়ত্তগত।
          বেতের ডালায় রেশমি-রুমাল-টানা
                   অরুণবরন আম এনো গোটাকত।
গদ্য জাতীয় ভোজ্যও কিছু দিয়ো,
          পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।
তা হোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়;
          জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।
ওই দেখো, ওটা আধুনিকতার ভূত
          মুখেতে জোগায় স্থূলতার জয়ভাষা;
জানি, অমরার পথহারা কোনো দূত
          জঠরগুহায় নাহি করে যাওয়া-আসা।
          তথাপি পষ্ট বলিতে নাহি তো দোষ
                   যে কথা কবির গভীর মনের কথা--
উদরবিভাগে দৈহিক পরিতোষ
          সঙ্গী জোটায় মানসিক মধুরতা।
শোভন হাতের সন্দেশ, পানতোয়া,
          মাছমাংসের পোলাও ইত্যাদিও
যবে দেখা দেয় শোভামাধুর্যে-ছোঁওয়া
          তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়!
বুঝি অনুমানে, চোখে কৌতুক ঝলে;
          ভাবিছ বসিয়া সহাস ওষ্ঠাধরা,
এ সমস্তই কবিতার কৌশলে
          মৃদুসংকেতে মোটা ফরমাশ করা।
আচ্ছা, নাহয় ইঙ্গিত শুনে হেসো;
          বরদানে, দেবী, নাহয় হইবে বাম;
খালি হাতে যদি আস তবে তাই এসো,
          সে দুটি হাতেরও কিছু কম নহে দাম!
সেই কথা ভালো, তুমি চলে এসো একা,
          বাতাসে তোমার আভাস যেন গো থাকে;
স্তব্ধ প্রহরে দুজনে বিজনে দেখা,
          সন্ধ্যাতারাটি শিরীষডালের ফাঁকে।
তার পরে যদি ফিরে যাও ধীরে ধীরে
          ভুলে ফেলে যেও তোমার যূথীর মালা;
ইমন বাজিবে বক্ষের শিরে শিরে,
          তার পরে হবে কাব্য লেখার পালা।
যত লিখে যাই ততই ভাবনা আসে,
          লেফাফার 'পরে কার নাম দিতে হবে;
মনে মনে ভাবি গভীর দীর্ঘশ্বাসে,
          কোন্‌ দূর যুগে তারিখ ইহার কবে।
          মনে ছবি আসে-- ঝিকিমিকি বেলা হল,
                   বাগানের ঘাটে গা ধুয়েছ তাড়াতাড়ি;
কচি মুখখানি, বয়স তখন ষোলো;
          তনু দেহখানি ঘেরিয়াছে ডুরে শাড়ি।
কুঙ্কুমফোঁটা ভুরুসংগমে কিবা,
          শ্বেতকরবীর গুচ্ছ কর্ণমূলে;
পিছন হইতে দেখিনু কোমল গ্রীবা
          লোভন হয়েছে রেশমচিকন চুলে।
তাম্রথালায় গোড়ে মালাখানি গেঁথে
          সিক্ত রুমালে যত্নে রেখেছ ঢাকি;
ছায়া-হেলা ছাদে মাদুর দিয়েছ পেতে--
          কার কথা ভেবে বসে আছ জানি না কি!
আজি এই চিঠি লিখিছে তো সেই কবি;
          গোধূলির ছায়া ঘনায় বিজন ঘরে,
দেয়ালে ঝুলিছে সেদিনের ছায়াছবি--
শব্দটি নেই, ঘড়ি টিক্‌টিক্‌ করে।
ওই তো তোমার হিসাবের ছেঁড়া পাতা,
          দেরাজের কোণে পড়ে আছে আধুলিটি।
কতদিন হল গিয়েছ, ভাবিব না তা,
          শুধু রচি বসে নিমন্ত্রণের চিঠি।
মনে আসে, তুমি পুব-জানালার ধারে
          পশমের গুটি কোলে নিয়ে আছ বসে;
উৎসুক চোখে বুঝি আশা কর কারে,
          আলগা আঁচল মাটিতে পড়েছে খসে।
অর্ধেক ছাদে রৌদ্র নেমেছে বেঁকে,
          বাকি অর্ধেক ছায়াখানি দিয়ে ছাওয়া;
পাঁচিলের গায়ে চীনের টবের থেকে
          চামেলি ফুলের গন্ধ আনিছে হাওয়া।
এ চিঠির নেই জবাব দেবার দায়,
          আপাতত এটি দেরাজে দিলেম রেখে।
পার যদি এসো শব্দবিহীন পায়,
          চোখ টিপে ধোরো হঠাৎ পিছন থেকে।
আকাশে চুলের গন্ধটি দিয়ো পাতি,
          এনো সচকিত কাঁকনের রিনিরিন,
আনিয়ো মধুর স্বপ্নসঘন রাতি,
          আনিয়ো গভীর আলস্যঘন দিন।
তোমাতে আমাতে মিলিত নিবিড় একা--
          স্থির আনন্দ, মৌন মাধুরীধারা,
মুগ্ধ প্রহর ভরিয়া তোমারে দেখা,
          তব করতল মোর করতলে হারা।
আরো দেখুন