আশীর্বাদ (ashirbad)

পঞ্চাশ বছরের কিশোর গুণী নন্দলাল বসুর প্রতি

সত্তর বছরের প্রবীণ যুবা রবীন্দ্রনাথের আশীর্ভাষণ

 

    নন্দনের কুঞ্জতলে রঞ্জনার ধারা,

    জন্ম-আগে তাহার জলে তোমার স্নান সারা।

            অঞ্জন সে কী মধুরাতে

            লাগালো কে যে নয়নপাতে,

    সৃষ্টি-করা দৃষ্টি তাই পেয়েছে আঁখিতারা।

 

    এনেছে তব জন্মডালা অজর ফুলরাজি,

    রূপের-লীলালিখন-ভরা পারিজাতের সাজি।

            অপ্সরীর নৃত্যগুলি

            তুলির মুখে এনেছ তুলি,

    রেখার বাঁশি লেখার তব উঠিল সুরে বাজি।

 

    যে মায়াবিনী আলিম্পনা সবুজে নীলে লালে

    কখনো আঁকে কখনো মোছে অসীম দেশে কালে,

            মলিন মেঘে সন্ধ্যাকাশে

            রঙিন উপহাসি যে হাসে

    রঙজাগানো সোনার কাঠি সেই ছোঁয়ালো ভালে।

 

    বিশ্ব সদা তোমার কাছে ইশারা করে কত,

    তুমিও তারে ইশারা দাও আপন মনোমত।

            বিধির সাথে কেমন ছলে

            নীরবে তব আলাপ চলে,

    সৃষ্টি বুঝি এমনিতরো ইশারা অবিরত।

 

    ছবির 'পরে পেয়েছ তুমি রবির বরাভয়,

    ধূপছায়ার চপল মায়া করেছ তুমি জয়।

            তব আঁকন-পটের 'পরে

            জানি গো চিরদিনের তরে

    নটরাজের জটার রেখা জড়িত হয়ে রয়।

 

    চিরবালক ভুবনছবি আঁকিয়া খেলা করে,

    তাহারি তুমি সমবয়সী মাটির খেলাঘরে।

            তোমার সেই তরুণতাকে

            বয়স দিয়ে কভু কি ঢাকে,

    অসীম-পানে ভাসাও প্রাণ খেলার ভেলা-'পরে।

 

    তোমারি খেলা খেলিতে আজি উঠেছে কবি মেতে,

    নববালক জন্ম নেবে নূতন আলোকেতে।

            ভাবনা তার ভাষায় ডোবা--

            মুক্ত চোখে বিশ্বশোভা

    দেখাও তারে, ছুটেছে মন তোমার পথে যেতে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

12
Verses
তব জন্মদিবসের দানের উৎসবে
বিচিত্র সজ্জিত আজি এই
প্রভাতের উদয়প্রাঙ্গণ।
নবীনের দানসত্র কুসুমে পল্লবে
অজস্র প্রচুর।
প্রকৃতি পরীক্ষা করি দেখে
ক্ষণে ক্ষণে আপন ভাণ্ডার,
তোমারে সম্মুখে রাখি পেল সে সুযোগ।
দাতা আর গ্রহীতার যে সংগম লাগি
বিধাতার নিত্যই আগ্রহ
আজি তা সার্থক হল,
বিশ্বকবি তাহারি বিস্ময়ে
তোমারে করেন আশীর্বাদ--
তাঁর কবিত্বের তুমি সাক্ষীরূপে দিয়েছ দর্শন
বৃষ্টিধৌত শ্রাবণের
নির্মল আকাশে।
আরো দেখুন
31
Verses
ক্ষণে ক্ষণে মনে হয় যাত্রার সময় বুঝি এল,
বিদায়দিনের-পরে আবরণ ফেলো
অপ্রগল্‌ভ সূর্যাস্ত-আভার;
সময় যাবার
শান্ত হোক, স্তব্ধ হোক, স্মরণসভার সমারোহ
না রচুক শোকের সম্মোহ।
বনশ্রেণী প্রস্থানের দ্বারে
ধরণীর শান্তিমন্ত্র দিক মৌন পল্লবসম্ভারে।
নামিয়া আসুক ধীরে রাত্রির নিঃশব্দ আশীর্বাদ,
সপ্তর্ষির জ্যোতির প্রসাদ।
আরো দেখুন
শিশুর জীবন
Verses
ছোটো ছেলে হওয়ার সাহস
          আছে কি এক ফোঁটা,
                   তাই তো এমন বুড়ো হয়েই মরি।
তিলে তিলে জমাই কেবল
          জমাই এটা ওটা,
                   পলে পলে বাক্স বোঝাই করি।
কালকে-দিনের ভাবনা এসে
আজ-দিনেরে মারলে ঠেসে
                   কাল তুলি ফের পরদিনের বোঝা।
সাধের জিনিস ঘরে এনেই
দেখি, এনে ফল কিছু নেই
          খোঁজের পরে আবার চলে খোঁজা।
ভবিষ্যতের ভয়ে ভীত
দেখতে না পাই পথ,
          তাকিয়ে থাকি পরশু দিনের পানে,
ভবিষ্যৎ তো চিরকালই
          থাকবে ভবিষ্যৎ।
                   ছুটি তবে মিলবে বা কোন্‌খানে?
বুদ্ধি-দীপের আলো জ্বালি'
হাওয়ায় শিখা কাঁপছে খালি,--
                   হিসেব করে পা টিপে পথ হাঁটি।
মন্ত্রণা দেয় কতজনা,
সূক্ষ্ম বিচার-বিবেচনা,
                   পদে-পদে হাজার খুঁটিনাটি।
শিশু হবার ভরসা আবার
          জাগুক আমার প্রাণে,
                   লাগুক হাওয়া নির্ভাবনার পালে,
ভবিষ্যতের মুখোশখানা
          খসাব একটানে,
                   দেখব তারেই বর্তমানের কালে।
ছাদের কোণে পুকুরপারে
জানব নিত্য-অজানারে
                   মিশিয়ে রবে অচেনা আর চেনা;
জমিয়ে ধুলো সাজিয়ে ঢেলা
তৈরি হবে আমার খেলা,
                   সুখ রবে মোর বিনামূল্যেই কেনা।
বড়ো হবার দায় নিয়ে, এই
          বড়োর হাটে এসে
                   নিত্য চলে ঠেলাঠেলির পালা।
যাবার বেলায় বিশ্ব আমার
          বিকিয়ে দিয়ে শেষে
                   শুধুই নেব ফাঁকা কথার ডালা!
কোন্‌টা সস্তা, কোন্‌টা দামি
ওজন করতে গিয়ে, আমি
                   বেলা আমার বইয়ে দেব দ্রুত,
সন্ধ্যা যখন আঁধার হবে
হঠাৎ মনে লাগবে তবে
                   কোনোটাই না হল মনঃপুত।
বাল্য দিয়ে যে-জীবনের
          আরম্ভ হয় দিন
                   বাল্যে আবার হ'ক না তাহা সারা।
জলে স্থলে সঙ্গ আবার
          পাক না বাঁধন-হীন,
                   ধুলায় ফিরে আসুক না পথহারা।
সম্ভাবনার ডাঙা হতে
অসম্ভবের উতল স্রোতে
                   দিই না পাড়ি স্বপন-তরী নিয়ে।
আবার মনে বুঝি না এই,
বস্তু বলে কিছুই তো নেই
                   বিশ্ব গড়া যা খুশি তাই দিয়ে।
প্রথম যেদিন এসেছিলেম
          নবীন পৃথ্বীতলে
                   রবির আলোয় জীবন মেলে দিয়ে,
সে যেন কোন্‌ জগৎ-জোড়া
          ছেলেখেলার ছলে,
                   কোথাত্থেকে কেই বা জানে কী এ!
শিশির যেমন রাতে রাতে,
কে যে তারে লুকিয়ে গাঁথে,
                   ঝিল্লি বাজায় গোপন ঝিনিঝিনি।
ভোরবেলা যেই চেয়ে দেখি,
আলোর সঙ্গে আলোর এ কী
                   ইশারাতে চলছে চেনাচিনি।
সেদিন মনে জেনেছিলেম
          নীল আকাশের পথে
                   ছুটির হাওয়ায় ঘুর লাগাল বুঝি!
যা-কিছু সব চলেছে ঐ
          ছেলেখেলার রথে
                   যে-যার আপন দোসর খুঁজি খুঁজি।
গাছে খেলা ফুল-ভরানো
ফুলে খেলা ফল-ধরানো,
                   ফলের খেলা অঙ্কুরে অঙ্কুরে।
স্থলের খেলা জলের কোলে,
জলের খেলা হাওয়ার দোলে,
                   হাওয়ার খেলা আপন বাঁশির সুরে।
ছেলের সঙ্গে আছ তুমি
          নিত্য ছেলেমানুষ,
                   নিয়ে তোমার মালমসলার ঝুলি।
আকাশেতে ওড়াও তোমার
          কতরকম ফানুস
                   মেঘে বোলাও রংবেরঙের তুলি।
সেদিন আমি আপন মনে
ফিরেছিলেম তোমার সনে,
                   খেলেছিলেম হাত মিলিয়ে হাতে।
ভাসিয়েছিলেম রাশি রাশি
কথায় গাঁথা কান্নাহাসি
                   তোমারি সব ভাসান-খেলার সাথে।
ঋতুর তরী বোঝাই কর
          রঙিন ফুলে ফুলে,
                   কালের স্রোতে যায় তারা সব ভেসে
আবার তারা ঘাটে লাগে
          হাওয়ায় দুলে দুলে
                   এই ধরণীর কূলে কূলে এসে।
মিলিয়েছিলেম বিশ্ব-ডালায়
তোমার ফুলে আমার মালায়,
                   সাজিয়েছিলেম ঋতুর তরণীতে,
আশা আমার আছে মনে
বকুল কেয়া শিউলি সনে
                   ফিরে ফিরে আসবে ধরণীতে।
সেদিন যখন গান গেয়েছি
          আপন মনে নিজে,
                   বিনা কাজে দিন গিয়েছে চলে,
তখন আমি চোখে তোমার
          হাসি দেখেছি যে,
                   চিনেছিলে আমায় সাথে বলে।
তোমার ধুলো তোমার আলো
আমার মনে লাগত ভালো,
                   শুনেছিলেম উদাস-করা বাঁশি।
বুঝেছিলে সে-ফাল্গুনে
আমার সে-গান শুনে শুনে
                   তোমারো গান আমি ভালোবাসি।
দিন গেল ঐ মাঠে বাটে,
          আঁধার নেমে প'ল;
                   এপার থেকে বিদায় মেলে যদি
তবে তোমার সন্ধ্যাবেলার
          খেয়াতে পাল তোলো,
                   পার হব এই হাতের ঘাটের নদী।
আবার, ওগো শিশুর সাথি,
শিশুর ভুবন দাও তো পাতি
                   করব খেলা তোমায় আমায় একা।
চেয়ে তোমার মুখের দিকে
তোমায়, তোমার জগৎটিকে
                   সহজ চোখে দেখব সহজ দেখা।
আরো দেখুন