১২ (tumi debe tumi more debe)

         তুমি দেবে, তুমি মোরে দেবে,

     গেল দিন এই কথা নিত্য ভেবে ভেবে।

                            সুখে দুঃখে উঠে নেবে

                            বাড়ায়েছি হাত

                                   দিনরাত;

                   কেবল ভেবেছি, দেবে, দেবে,

                                   আরো কিছু দেবে।

 

     দিলে, তুমি দিলে, শুধু দিলে;

              কভু পলে পলে তিলে তিলে,

             কভু অকস্মাৎ বিপুল প্লাবনে

              দানের শ্রাবণে।

নিয়েছি, ফেলেছি কত, দিয়েছি ছড়ায়ে,

          হাতে পায়ে রেখেছি জড়ায়ে

              জালের মতন;

              দানের রতন

          লাগিয়েছি ধুলার খেলায়

               অযত্নে হেলায়,

                   আলস্যের ভরে

              ফেলে গেছি ভাঙা খেলাঘরে।

          তবু তুমি দিলে, শুধু দিলে, শুধু দিলে,

     তোমার দানের পাত্র নিত্য ভরে উঠিছে নিখিলে।

 

                    অজস্র তোমার

               সে নিত্য দানের ভার

                     আজি আর

              পারি না বহিতে।

                   পারি না সহিতে

              এ ভিক্ষুক হৃদয়ের অক্ষয় প্রত্যাশা,

                    দ্বারে তব নিত্য যাওয়া-আসা।

              যত পাই তত পেয়ে পেয়ে

                    তত চেয়ে চেয়ে

          পাওয়া মোর চাওয়া মোর শুধু বেড়ে যায়;

                     অনন্ত সে দায়

                     সহিতে না পারি হায়

          জীবনে প্রভাত-সন্ধ্যা ভরিতে ভিক্ষায়।

     লবে তুমি, মোরে তুমি লবে, তুমি লবে,

              এ প্রার্থনা পুরাইবে কবে।

     শূন্য পিপাসায় গড়া এ পেয়ালাখানি

              ধুলায় ফেলিয়া টানি,

     সারা রাত্রি পথ-চাওয়া কম্পিত আলোর

                            প্রতীক্ষার দীপ মোর

                         নিমেষে নিবায়ে

                  নিশীথের বায়ে,

     আমার কণ্ঠের মালা তোমার গলায় প'রে

                          লবে মোরে লবে মোরে

                            তোমার দানের স্তূপ হতে

                   তব রিক্ত আকাশের অন্তহীন নির্মল আলোতে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সুপ্তোত্থিতা
Verses
        ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম,
             উঠিল কলস্বর।
        গাছের শাখে জাগিল পাখি
             কুসুমে মধুকর।
        অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া,
            হস্তিশালে হাতি।
        মল্লশালে মল্ল জাগি
            ফুলায় পুন ছাতি।
        জাগিল পথে প্রহরিদল,
            দুয়ারে জাগে দ্বারী।
        আকাশে চেয়ে নিরখে বেলা
             জাগিয়া নরনারী।
        উঠিল জাগি রাজাধিরাজ,
            জাগিল রানীমাতা।
        কচালি আঁখি কুমার-সাথে
            জাগিল রাজভ্রাতা।
        নিভৃত ঘরে ধূপের বাস,
            রতন-দীপ জ্বালা,
        জাগিয়া উঠি শয্যাতলে
           শুধাল রাজবালা--
                কে পরালে মালা!
        খসিয়া-পড়া আঁচলখানি
            বক্ষে তুলি দিল।
        আপন-পানে নেহারি চেয়ে
            শরমে শিহরিল।
        ত্রস্ত হয়ে চকিত চোখে
            চাহিল চারিদিকে,
        বিজন গৃহ, রতন-দীপ
            জ্বলিছে অনিমিখে।
        গলার মালা খুলিয়া লয়ে
            ধরিয়া দুটি করে
        সোনার সুতে যতনে গাঁথা
            লিখনখানি পড়ে।
        পড়িল নাম, পড়িল ধাম,
            পড়িল লিপি তার,
        কোলের 'পরে বিছায়ে দিয়ে
            পড়িল শতবার।
        শয়নশেষে রহিল বসে,
            ভাবিল রাজবালা--
        আপন ঘরে ঘুমায়েছিনু
            নিতান্ত নিরালা--
                  কে পরালে মালা!
        নূতন-জাগা কুঞ্জবনে
            কুহরি উঠে পিক,
        বসন্তের চুম্বনেতে
            বিবশ দশ দিক।
       বাতাস ঘরে প্রবেশ করে
            ব্যাকুল উচ্ছ্বাসে,
        নবীন ফুলমঞ্জরির
            গন্ধ লয়ে আসে।
        জাগিয়া উঠি বৈতালিক
            গাহিছে জয়গান,
        প্রাসাদদ্বারে ললিত স্বরে
            বাঁশিতে উঠে তান।
        শীতলছায়া নদীর পথে
            কলসে লয়ে বারি--
        কাঁকন বাজে, নূপুর বাজে--
            চলিছে পুরনারী।
        কাননপথে মর্মরিয়া
            কাঁপিছে গাছপালা,
        আধেক মুদি নয়ন দুটি
             ভাবিছে রাজবালা--
                 কে পরালে মালা!
        বারেক মালা গলায় পরে,
             বারেক লহে খুলি,
        দুইটি করে চাপিয়া ধরে
             বুকের কাছে তুলি।
        শয়ন'পরে মেলায়ে দিয়ে
             তৃষিত চেয়ে রয়,
        এমনি করে পাইবে যেন
             অধিক পরিচয়।
        জগতে আজ কত-না ধ্বনি
             উঠিছে কত ছলে--
        একটি আছে গোপন কথা,
              সে কেহ নাহি বলে।
        বাতাস শুধু কানের কাছে
               বহিয়া যায় হূহু,
        কোকিল শুধু অবিশ্রাম
               ডাকিছে কুহু কুহু।
        নিভৃত ঘরে পরান-মন
               একান্ত উতালা,
        শয়নশেষে নীরবে বসে
               ভাবিছে রাজবালা--
                    কে পরালে মালা!
        কেমন বীর-মুরতি তার
             মাধুরী দিয়ে মিশা।
        দীপ্তিভরা নয়নমাঝে
             তৃপ্তিহীন তৃষা।
        স্বপ্নে তারে দেখেছে যেন
            এমনি মনে লয়--
        ভুলিয়া গেছে, রয়েছে শুধু
             অসীম বিস্ময়।
        পারশে যেন বসিয়াছিল,
             ধরিয়াছিল কর,
        এখনো তার পরশে যেন
             সরস কলেবর।
        চমকি মুখ দু-হাতে ঢাকে,
             শরমে টুটে মন,
        লজ্জাহীন প্রদীপ কেন
             নিভে নি সেই ক্ষণ।
        কণ্ঠ হতে ফেলিল হার
              যেন বিজুলিজ্বালা,
        শয়ন'পরে লুটায়ে পড়ে
              ভাবিল রাজবালা--
                  কে পরালে মালা!
        এমনি ধীরে একটি করে
           কাটিছে দিন রাতি।
        বসন্ত সে বিদায় নিল
            লইয়া যূথী-জাতি।
        সঘন মেঘে বরষা আসে,
             বরষে ঝরঝর্‌।
        কাননে ফুটে নবমালতী
             কদম্বকেশর।
        স্বচ্ছ হাসি শরৎ আসে
             পূর্ণিমামালিকা।
        সকল বন আকুল করে
             শুভ্র শেফালিকা।
        আসিল শীত সঙ্গে লয়ে
             দীর্ঘ দুখনিশা।
        শিশির-ঝরা কুন্দফুলে
             হাসিয়া কাঁদে দিশা।
        ফাগুন মাস আবার এল
            বহিয়া ফুলডালা।
        জানালা-পাশে একেলা বসে
             ভাবিছে রাজবালা--
                  কে পরালে মালা!
আরো দেখুন
84
Verses
আপনাকে এই জানা আমার
                     ফুরাবে না।
এই জানারি সঙ্গে সঙ্গে
                     তোমায় চেনা।
     কত জনম-মরণেতে
     তোমার ওই চরণেতে
     আপনাকে যে দেব, তবু
                     বাড়বে দেনা।
আমারে যে নামতে হবে
                     ঘাটে ঘাটে,
বারে বারে এই ভুবনের
                     প্রাণের হাটে।
     ব্যবসা মোর তোমার সাথে
     চলবে বেড়ে দিনে রাতে,
     আপনা নিয়ে করব যতই
                     বেচা-কেনা।
আরো দেখুন
চার
Verses
একদিন আষাঢ়ে নামল
          বাঁশবনের মর্মর-ঝরা ডালে
        জলভারে অভিভূত নীলমেঘের নিবিড় ছায়া।
     শুরু হল ফসল-খেতের জীবনীরচনা
                 মাঠে মাঠে কচি ধানের চিকন অঙ্কুরে।
     এমন সে প্রচুর, এমন পরিপূর্ণ, এমন প্রোৎফুল্ল,
            দ্যুলোকে ভূলোকে বাতাসে আলোকে
               তার পরিচয় এমন উদার-প্রসারিত--
মনে হয় না সময়ের ছোটো বেড়ার মধ্যে তাকে কুলাতে পারে
            তার অপরিমেয় শ্যামলতায়
               আছে যেন অসীমের চির-উৎসাহ,
                 যেমন আছে তরঙ্গ-উল্লোল সমুদ্রে।
মাস যায়।
         শ্রাবণের স্নেহ নামে আঘাতের ছল ক'রে,
           সবুজ মঞ্জরি এগিয়ে চলে দিনে দিনে
              শিষগুলি কাঁধে তুলে নিয়ে
                  অন্তহীন স্পর্ধিত জয়যাত্রায়।
         তার আত্মাভিমানী যৌবনের প্রগল্‌ভতার 'পরে
            সূর্যের আলো বিস্তার করে হাস্যোজ্জ্বল কৌতুক,
               নিশীথের তারা নিবিষ্ট করে নিস্তব্ধ বিস্ময়।
মাস যায়।
বাতাসে থেমে গেল মত্ততার আন্দোলন,
    শরতের শান্তনির্মল আকাশ থেকে
       অমন্দ্র শঙ্খধ্বনিতে বাণী এল--
                 প্রস্তুত হও।
     সারা হল শিশিরজলে স্নানব্রত।
মাস যায়।
              নির্মম শীতের হাওয়া এসে পৌঁছল হিমাচল থেকে,
     সবুজের গায়ে গায়ে এঁকে দিল হল্‌দের ইশারা,
     পৃথিবীর দেওয়া রঙ বদল হল আলোর দেওয়া রঙে।
     উড়ে এল হাঁসের পাঁতি নদীর চরে,
               কাশের গুচ্ছ ঝরে পড়ল তটের পথে পথে।
মাস যায়।
      বিকালবেলার রৌদ্রকে যেমন উজাড় করে দিনান্ত
            শেষ-গোধূলির ধূসরতায়
        তেমনি সোনার ফসল চলে গেল
                     অন্ধকারের অবরোধে।
তার পরে শূন্যমাঠে অতীতের চিহ্নগুলো
         কিছুদিন রইল মৃত শিকড় আঁকড়ে ধরে--
শেষে কালো হয়ে ছাই হল আগুনের লেহনে।
মাস গেল।
     তার পরে মাঠের পথ দিয়ে
            গোরু নিয়ে চলে রাখাল--
     কোনো ব্যথা নেই তাতে, কোনো ক্ষতি নেই কারো।
     প্রান্তরে আপন ছায়ায় মগ্ন একলা অশথ গাছ,
              সূর্য-মন্ত্র-জপ-করা ঋষির মতো।
     তারই তলায় দুপুরবেলায় ছেলেটা বাজায় বাঁশি
                আদিকালের গ্রামের সুরে।
              সেই সুরে তাম্রবরন তপ্ত আকাশে
                  বাতাস হূহু করে ওঠে,
     সে যে বিদায়ের নিত্যভাঁটায় ভেসে-চলা
           মহাকালের দীর্ঘনিশ্বাস,
যে কাল, যে পথিক, পিছনের পান্থশালাগুলির দিকে
              আর ফেরার পথ পায় না
                      এক দিনেরও জন্যে।
আরো দেখুন