কামিনী ফুল (kamini phul)

        ছি ছি সখা কি করিলে,    কোন্‌ প্রাণে পরশিলে

              কামিনীকুসুম ছিল বন আলো করিয়া--

        মানুষপরশ-ভরে            শিহরিয়া সকাতরে

              ওই যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া।

        জান ত কামিনী সতী,       কোমল কুসুম অতি

              দূর হ'তে দেখিবারে, ছুঁইবারে নহে সে--

        দূর হ'তে মৃদু বায়,          গন্ধ তার দিয়ে যায়,

              কাছে গেলে মানুষের শ্বাস নাহি  সহে সে।

        মধুপের পদক্ষেপে          পড়িতেছে কেঁপে কেঁপে,

              কাতর হতেছে কত প্রভাতের সমীরে!

        পরশিতে রবিকর           শুকায়েছে কলেবর,

              শিশিরের ভরটুকু সহিছে না শরীরে।

        হেন কোমলতাময়          ফুল কি না-ছুঁলে নয়!

              হায় রে কেমন বন ছিল আলো করিয়া!

        মানুষপরশ-ভরে            শিহরিয়া সকাতরে,

              ওই যে শতধা হয়ে পড়িল গো ঝরিয়া!

 

 

  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

ধরা কথা
Others
সমস্ত জীবনের যে তত্ত্বগুলিকে জানিয়া আসিতেছি,মাঝে মাঝে তাহাদের এক একবার আবিষ্কার করিয়া ফেলি । তাড়াতাড়ি পাশের লোককে ডাকিয়া বলি,ওহে, আমি এই তত্ত্বটি জানিয়াছি । সে বিরক্ত হইয়া বলে, আঃ,ও ত জানা কথা ! কিন্তু ঠিক জানা কথা নয় । তুমি উহা জান বটে , তবু ও জান না।  একটা তুলনা দিলে স্পষ্ট হইবে । বাতাস সর্ব্বত্রই বিদ্যমান । তথাপি এক জন যদি বলিয়া উঠে "ওহে এইখানে বাতাস আছে ' তবে তাহাকে হাসিয়া উড়াইয়া দিতে পারি না, তেমনি আমরা যে সকল সাধারণ তত্ত্বের মধ্যে বাস করিয়া থাকি সেই তত্ত্বগুলি অবস্থাবিশেষে এক এক জনের গায়ে লাগে, অমনি সে বলে অমুকতত্ত্বটি পাইতেছি । এক জন বন্ধু বলিতেছিলেন যে,আজকাল সার্ব্বজনীন-উদারতা (humanity) প্রভৃতি কতকগুলি প্রশস্ত কথা উঠিয়াছে, সহসা মনে হয়,কত কি মূল্যবান তত্ত্ব উপার্জন করিতেছি,কিন্তু সে সকল তত্ত্ব বাতাসের মত । বাতাস অত্যন্ত উপকারী পদার্থ বটে, কিন্তু এত সাধারণ যে তাহার কোন মূল্য নাই । তেমনি উপরি-উক্ত তত্ত্বগুলি বড় বড় তত্ত্ব বটে, কিন্তু এত সাধারণ যে তাহার কোন মূল্য নাই ; অথচ আজকাল তাহাদের এমনি বিশেষরূপে উত্থাপিত করা হইতেছে যে, যেন তাহার কতই অসাধারণ ! তাঁহার কথাটা ঠিক মানি না। মহাত্মাদিগের "বসুধৈব কুটুম্বকং" এ কথাটি সকলেই জানেন । অথচ সকলের গায়ে লাগে না । এ তত্ত্বটি মাঝে মাঝে এক এক জনের গায়ে প্রবাহিত হয় অমনি সে বসুধৈব কুটুম্বকং প্রচার করিয়া বেড়ায় । পুরানো-কথা ধরা-কথা পারতপক্ষে কেহ বলিতে চাহে না;অতএব পুরানো কথা যখন কাহারো মুখে শুনা যায়,তখন বিবেচনা করা উচিত -- সে তাহা জানিত বটে কিন্তু আজ নূতন পাইয়াছে, আমাদের ভাগ্যে এখনো তাহা ঘটে নাই । অনেক "উড়ো-কথা"র অপেক্ষা ধরা-কথাকে আমরা কম জানি । আমরা নিজের চোক দেখিতে পাই না, দর্পন পাইলেই দেখিতে পাই;ধরা-কথা ধরিতে পারি না, সিশেষ অভিজ্ঞতা পাইলে ধরি । অতএব যাহারা  জানা-কথা জানে,তাহারা সাধারণের চেয়ে অধিক জানে ।
আরো দেখুন
অনাবশ্যক
Others
আমরা বর্ত্তমানের জীব। কোন জিনিষ বর্ত্তমানের পরপারে প্রত্যক্ষের বাহিরে গেলেই আমাদের হাতছাড়া হইবার যো হয়। যাহা পাইতেছি তাহা প্রত্যহই হারাইতেছি। আজ যে ফুলের আঘ্রাণ লইয়াছি, কাল সকালে তাহা আর রহিল না, কাল বিকালে তাহার স্মৃতিও চলিয়া গেল। এমন কত ফুলের ঘ্রাণ লইয়াছি, কত পাখীর গান শুনিয়াছি, কত মুখ দেখিয়াছি, কত কথা কহিয়াছি, কত সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছি, তাহারা নাই, এবং তাহারা এক কালে ছিল বলিয়া মনেও নাই। যদি বা মনে থাকে সে কি আর প্রত্যক্ষের মত আছে? তাহা একটি নিরাকার অথবা কেবলমাত্র ছায়ার মত জ্ঞানে পর্য্যবসিত হইয়াছে। অমুক ঘটনা ঘটিয়াছে এইরূপ একটা জ্ঞান আছে মাত্র, অমুককে জানিতাম এইরূপ একটা সত্য অবগত আছি বটে! কেবল মাত্র জ্ঞানে যাহাকে জানি তাহাকে কি আর জানা বলে, তাহাকে মানিয়া লওয়া বলে। অনেক সময়ে আমাদের কানে শব্দ আসে, কিন্তু তাহাকে শোনা বলি না; কারণ সে শব্দটা আমাদের কান আছে বলিয়াই শুনিতেছি, আমাদের মন আছে বলিয়া শুনিতেছি না। কান বেচারার না শুনিয়া থাকিবার যো নাই, কিন্তু মনটা তখন ছুটি লইয়া গিয়াছিল। তেমনি আমরা যাহা জ্ঞানে জানি তাহা না জানিয়া থাকিবার যো নাই বলিয়াই জানি; সাক্ষী আনিয়া প্রমাণ করিয়া দিলেই জ্ঞানকে জানিতেই হইবে--সে যত বড় লোকটাই হউক না কেন, এ আইনের কাছে তাহার নিষ্কৃতি নাই। কিন্তু উহার উর্দ্ধে আর জোর খাটে না। তেমনি আমরা অনেক অপ্রত্যক্ষ অতীত ঘটনা ঘটিয়াছিল বলিয়া জানি, কিন্তু আর তাহা অনুভব করিতে পারি না। মাঝে মাঝে অনুভব করিতে চেষ্টা করি, ভান করি, কিন্তু বৃথা!
কিন্তু মাঝে মাঝে এমন হয় না কি, যখন অতীত ঘটনার নামে বহুবিধ ওয়ারেণ্ট জারি করিয়াও কিছুতেই মনের সম্মুখে তাহাকে আনিতে পারা গেল না, এমন-কি যখন তাহার অস্তিত্বের বিষয়েই সন্দেহ উপস্থিত হইল, তখন হয়ত সেদিনকার একটি চিঠির একটুখানি ছেঁড়া টুক্‌রা অথবা দেয়ালের উপর বহুদিনকার পুরান একটি পেন্সিলের দাগ দেখিবামাত্র সে যেন তৎক্ষণাৎ সশরীরে বিদ্যুতের মত আমার সমুখে আসিয়া উপস্থিত হয! ঐ কাগজের টুক্‌রাটি, পেন্সিলের দাগটি তাহাকে যেন যাদু করিয়া রাখিয়াছিল; তোমার চারি দিকে আরও ত কত শত জিনিষ আছে, কিন্তু সেই অতীত ঘটনার পক্ষে ঐ ছেঁড়া কাগজটুকু ও সেই পেন্সিলের দাগটুকু ছাড়া আর সকলগুলিই non-conductor। অর্থাৎ আমরা এমনি ভয়ানক প্রত্যক্ষবাদী, যে, বর্ত্তমানের গায়ের উপর অতীতের একটা স্পষ্ট চিহ্ন থাকা চাই, তবেই তাহার সহিত আমাদের ভালরূপ আদান প্রদান চলিতে পারে। যাহার অতীতজীবন বহুবিধ কার্য্যভার বহন করিয়া ধনবান বণিকের মত সময়ের পথ দিয়া চলিয়া গিয়াছিল, সে নিশ্চয়ই পথ চলিতে চলিতে একটা-না-একটা টুক্‌রা ফেলিতে ফেলিতে গিয়াছিল, সেইগুলি ধরিয়া ধরিয়া অনায়াসেই সে তাহার অতীতের পথ খুঁজিয়া লইতে পারে। আর আমাদের মত যাহার অলস অতীত রিক্তহস্তে পথ চলিতেছিল, সে আর কি চিহ্ন রাখিয়া যাইবে! সুতরাং তাহাকে আর খুঁজিয়া পাইবার সম্ভাবনা নাই, সে একেবারে হারাইয়া গেল!
আরো দেখুন
আত্মসংসর্গ
Others
দুঃখের সুর একঘেয়ে কেন? বলা বাহুল্য, মন যেখানে বৈচিত্র্য দেখে না সেখানে সে নিজের অন্তঃপুরের মধ্যে নিজে বসিয়া থাকে, কৌতূহল উদ্রেক না হইলে সে বাহির হইবার কোন আবশ্যক দেখে না। যাহা কিছু একঘেয়ে, তাহাই আমাদিগকে আমাদের নিজের কাছে প্রেরণ করে। এই জন্যই একঘেয়ে সুরের মধ্যে একটি করুণ ভাব আছে।
যখনি আমরা আমাদের নিজের কাছে থাকি, তখনই আমাদের দুঃখ। আমরা নিজের কাছ হইতে পলাইয়া থাকিতে পারিলেই সুখে থাকি। যখন বাহ্য জগৎ সুন্দর আকার ধারণ করে, তখন আমরা কেন সুখে থাকি? কারণ, তখন আমাদের মন তাহার নিজের হাত এড়াইয়া বাহিরে সঞ্চরণ করিতে পারে; আর যখন আমাদের চারি দিকে বাহ্য জগৎ কদর্য্য মূর্ত্তি ধারণ করে, তখন আমাদের মনকে দায়ে পড়িয়া নিজের কাছেই ফিরিয়া আসিতে হয় ও আমরা অসুখী হই। এই জন্যই, আমাদের অন্তর ও বাহির, আমাদের মন ও জগৎ, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পদার্থ হইলেও জগতের উপর আমাদের মনের সুখ এতটা নির্ভর করে যে,  জগৎ বেঁকিয়া দাঁড়াইলেই আমাদের মন কাঁদিয়া উঠে। সে নিজের কাছে কোন মতেই থাকিতে চায় না। সে একটি অভাব মাত্র। সে এই বিশাল জগৎসংসারের মহাক্ষেত্রে প্রতি শব্দ, প্রতি দৃশ্য, প্রতি গন্ধ, প্রতি স্বাদকে শীকার করিয়া বেড়াইতেছে; যতক্ষণ শীকার করে ততক্ষণ থাকে ভাল, অবশেষে যখন রিক্তহস্তে শ্রান্তদেহে গৃহে ফিরিয়া আসে তখনি তাহার দুঃখ। আমরা ভালবাসিতে চাই, কেননা আমরা আপনাকে চাই না, আর এক জনকে চাই; আমরা একটা কিছু কার্য করিতে চাই, কেননা আমরা নিজের  কাছে থাকিতে চাই না; আমরা উপার্জ্জন করিতে চাই, কেননা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তিই অভাব। আমাদের মনের অর্থ-- ভিক্ষার অঞ্জলি, জগতের অর্থ -- ভিক্ষামুষ্টি। ভস্মলোচনকে যেমন নিজের মুখ দেখাইয়া বধ করা হইয়ছিল। তেমনি সমস্ত জগৎ যদি একটি বিশাল দর্পণ হইত চারি দিকে কেবল আমাদের নিজের মুখ দেখিতে পাইতাম, তাহা হইলে আমরা মরিয়া যাইতাম। তাহা হইলে আমরা কি দেখিতাম? একটা ক্ষুধা, একটা দুর্ভিক্ষ, একটা প্রার্থনা, একটা রোদন। আমাদের মন গোটাকতক ক্ষুধার সমষ্টি মাত্র। জ্ঞানের ক্ষুধা, আসঙ্গের ক্ষুধা, সৌন্দর্যের ক্ষুধা। আমাদের দিকে অনন্ত জ্ঞানের পিপাসা, আর জগতের দিকে অনন্ত রহস্য। আমরা প্রাণের সহচর চাই, কিন্তু "লাখে না মিলল একে"। আমরা সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে চাই, অথচ সৌন্দর্য্যকে দুই হাতে স্পর্শ করিলেই সে মলিন হইয়া যায়। আমরা কৃষ্ণবর্ণ; সূর্য্যরশ্মির সমস্ত বর্ণধারা পান করিয়া থাকি, তথাপি আমরা কালো। সূর্য্যরশ্মি পান করিবার আমাদের অনন্ত পিপাসা। এইরূপে অনন্ত জ্ঞানের ক্ষুধা লইয়া যে রহস্যে দন্তস্ফুট করিতে পারিব না তাহাকেই অনবরত আক্রমণ করা, অনন্ত আসঙ্গের ক্ষুধা লইয়া যে সহচর মিলিবে না তাহাকেই অবিরত অন্বেষণ করা, অনন্ত সৌন্দর্যের ক্ষুধা লইয়া যে সৌন্দর্য ধরিয়া রাখিতে পারিব না তাহাকেই চির উপভোগ করিতে চেষ্টা করা, এক কথায়, অনন্ত মন অর্থাৎ সমষ্টিবদ্ধ কতকগুলি অনন্ত ক্ষুধা লইয়া জগতের পশ্চাতে অনন্ত ধাবমান হওয়াই মনুষ্যজীবন। এই নিমিত্তই মন নিজের কাছে থাকিতে চায় না, জগতের কাছে যাইতে চায়; ক্ষুধা নিজের কাছে থাকিতে চায় না, খাদ্যের কাছে থাকিতে চায়। আমরা মানুষেরা কতকগুলা কালো কালো অসন্তোষের বিন্দু, ক্ষুধার্ত্ত পিপীলিকার মত জগৎকে চারি দিক হইতে ছাঁকিয়া ধরিয়াছি; উষাকে, জ্যোৎস্নাকে, গানের শব্দকে দংশন করিতেছি, একটুখানি খাদ্য পাইবার জন্য। হায় রে, খাদ্য কোথায়! হে সূর্য্য, উদয় হও! চন্দ্র, হাস! ফুল, ফুটিয়া ওঠ! আমাকে আমার হাত হইতে রক্ষা কর; আমাকে যেন আমার পাশে বসিয়া না থাকিতে হয়; অনিচ্ছারচিত বাসরশয্যায় শুইয়া আমাকে যেন আমার আলিঙ্গনে পড়িয়া কাঁদিতে না হয়!
আরো দেখুন