আত্মসংসর্গ (atmo songsorgo)

দুঃখের সুর একঘেয়ে কেন? বলা বাহুল্য, মন যেখানে বৈচিত্র্য দেখে না সেখানে সে নিজের অন্তঃপুরের মধ্যে নিজে বসিয়া থাকে, কৌতূহল উদ্রেক না হইলে সে বাহির হইবার কোন আবশ্যক দেখে না। যাহা কিছু একঘেয়ে, তাহাই আমাদিগকে আমাদের নিজের কাছে প্রেরণ করে। এই জন্যই একঘেয়ে সুরের মধ্যে একটি করুণ ভাব আছে।

 

যখনি আমরা আমাদের নিজের কাছে থাকি, তখনই আমাদের দুঃখ। আমরা নিজের কাছ হইতে পলাইয়া থাকিতে পারিলেই সুখে থাকি। যখন বাহ্য জগৎ সুন্দর আকার ধারণ করে, তখন আমরা কেন সুখে থাকি? কারণ, তখন আমাদের মন তাহার নিজের হাত এড়াইয়া বাহিরে সঞ্চরণ করিতে পারে; আর যখন আমাদের চারি দিকে বাহ্য জগৎ কদর্য্য মূর্ত্তি ধারণ করে, তখন আমাদের মনকে দায়ে পড়িয়া নিজের কাছেই ফিরিয়া আসিতে হয় ও আমরা অসুখী হই। এই জন্যই, আমাদের অন্তর ও বাহির, আমাদের মন ও জগৎ, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পদার্থ হইলেও জগতের উপর আমাদের মনের সুখ এতটা নির্ভর করে যে,  জগৎ বেঁকিয়া দাঁড়াইলেই আমাদের মন কাঁদিয়া উঠে। সে নিজের কাছে কোন মতেই থাকিতে চায় না। সে একটি অভাব মাত্র। সে এই বিশাল জগৎসংসারের মহাক্ষেত্রে প্রতি শব্দ, প্রতি দৃশ্য, প্রতি গন্ধ, প্রতি স্বাদকে শীকার করিয়া বেড়াইতেছে; যতক্ষণ শীকার করে ততক্ষণ থাকে ভাল, অবশেষে যখন রিক্তহস্তে শ্রান্তদেহে গৃহে ফিরিয়া আসে তখনি তাহার দুঃখ। আমরা ভালবাসিতে চাই, কেননা আমরা আপনাকে চাই না, আর এক জনকে চাই; আমরা একটা কিছু কার্য করিতে চাই, কেননা আমরা নিজের  কাছে থাকিতে চাই না; আমরা উপার্জ্জন করিতে চাই, কেননা আমাদের পৈতৃক সম্পত্তিই অভাব। আমাদের মনের অর্থ-- ভিক্ষার অঞ্জলি, জগতের অর্থ -- ভিক্ষামুষ্টি। ভস্মলোচনকে যেমন নিজের মুখ দেখাইয়া বধ করা হইয়ছিল। তেমনি সমস্ত জগৎ যদি একটি বিশাল দর্পণ হইত চারি দিকে কেবল আমাদের নিজের মুখ দেখিতে পাইতাম, তাহা হইলে আমরা মরিয়া যাইতাম। তাহা হইলে আমরা কি দেখিতাম? একটা ক্ষুধা, একটা দুর্ভিক্ষ, একটা প্রার্থনা, একটা রোদন। আমাদের মন গোটাকতক ক্ষুধার সমষ্টি মাত্র। জ্ঞানের ক্ষুধা, আসঙ্গের ক্ষুধা, সৌন্দর্যের ক্ষুধা। আমাদের দিকে অনন্ত জ্ঞানের পিপাসা, আর জগতের দিকে অনন্ত রহস্য। আমরা প্রাণের সহচর চাই, কিন্তু "লাখে না মিলল একে"। আমরা সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে চাই, অথচ সৌন্দর্য্যকে দুই হাতে স্পর্শ করিলেই সে মলিন হইয়া যায়। আমরা কৃষ্ণবর্ণ; সূর্য্যরশ্মির সমস্ত বর্ণধারা পান করিয়া থাকি, তথাপি আমরা কালো। সূর্য্যরশ্মি পান করিবার আমাদের অনন্ত পিপাসা। এইরূপে অনন্ত জ্ঞানের ক্ষুধা লইয়া যে রহস্যে দন্তস্ফুট করিতে পারিব না তাহাকেই অনবরত আক্রমণ করা, অনন্ত আসঙ্গের ক্ষুধা লইয়া যে সহচর মিলিবে না তাহাকেই অবিরত অন্বেষণ করা, অনন্ত সৌন্দর্যের ক্ষুধা লইয়া যে সৌন্দর্য ধরিয়া রাখিতে পারিব না তাহাকেই চির উপভোগ করিতে চেষ্টা করা, এক কথায়, অনন্ত মন অর্থাৎ সমষ্টিবদ্ধ কতকগুলি অনন্ত ক্ষুধা লইয়া জগতের পশ্চাতে অনন্ত ধাবমান হওয়াই মনুষ্যজীবন। এই নিমিত্তই মন নিজের কাছে থাকিতে চায় না, জগতের কাছে যাইতে চায়; ক্ষুধা নিজের কাছে থাকিতে চায় না, খাদ্যের কাছে থাকিতে চায়। আমরা মানুষেরা কতকগুলা কালো কালো অসন্তোষের বিন্দু, ক্ষুধার্ত্ত পিপীলিকার মত জগৎকে চারি দিক হইতে ছাঁকিয়া ধরিয়াছি; উষাকে, জ্যোৎস্নাকে, গানের শব্দকে দংশন করিতেছি, একটুখানি খাদ্য পাইবার জন্য। হায় রে, খাদ্য কোথায়! হে সূর্য্য, উদয় হও! চন্দ্র, হাস! ফুল, ফুটিয়া ওঠ! আমাকে আমার হাত হইতে রক্ষা কর; আমাকে যেন আমার পাশে বসিয়া না থাকিতে হয়; অনিচ্ছারচিত বাসরশয্যায় শুইয়া আমাকে যেন আমার আলিঙ্গনে পড়িয়া কাঁদিতে না হয়!

 

  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

তার্কিক
Others
কেহ কেহ বলেন,যাঁহাদের সঙ্গে মতের মিল নাই, প্রতি কথায় যুক্তির লাঠালাঠি চলে, তর্কবিতর্ক না করিয়া যাঁহারা এক পা অগ্রসর হইতে দেন না, তাঁহাদের সহবাসে উপকার আছে। তাঁহাদের উৎপাতে কাঁচা কথা বলিবার যো থাকে না, দুর্ব্বল মত ত্রাহি ত্রাহি করিতে থাকে, খুব খাঁটি মত না হইলে টিঁকিতে পারে না। বুদ্ধিরাজ্যে Survival of the Fittest নিয়ম খুব ভালরূপে বজায় থাকে। এ কথাটা আমার ত ঠিক মনে হয় না।
আমাদের কোন ভাব অহিরাবণের মত একেবারে জন্মিয়াই কিছু  যুদ্ধ আরম্ভ করিতে পারে না। কিছু দিন ধরিয়া প্রশংসা, বন্ধুদিগের মমতা ও অনুকূল যুক্তির লঘুপাক ও পুষ্টিকর খাদ্য তাহাকে রীতিমত সেবন করান আবশ্যক। যখন সে পায়ের উপর দাঁড়াইতে পারিবে, তখন বরঞ্চ, মাঝে মাঝে হুঁচট খাওয়া, মাথা ঠোকা, পড়িয়া যাওয়া মন্দ নহে। কিন্তু যেমনি আমার ভাবটি জন্মগ্রহণ করিল, অমনি যদি আমার নৈয়ায়িক কুস্তিওয়ালা খ্যাঁক্‌ করিয়া তাহার গলা চাপিয়া ধরেন তবে ত তাহার আর বাঁচিবার সম্ভাবনা থাকে না।
আরো দেখুন
সমস্যা
Others
আজকাল প্রায় এমন দেখা যায় অনেক বিষয়ে অনেক রকম মত উঠিয়াছে, কিন্তু কাজের সঙ্গে তাহার মিল হয় না। এমনও দেখা যায় অল্প বয়সে যাঁহারা পরমোৎসাহে সম্পূর্ণ নূতন করিয়া সমাজের পরিবর্ত্তন-সাধনে উদ্যোগী হইয়াছিলেন কিঞ্চিৎ অধিক বয়সে তাঁহারাই পুরাতন প্রথা অবলম্বন করিয়া শান্তভাবে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেছেন। অনেকে ইহার কারণ এমন বলেন যে, বাঙ্গালীদের কোন মতের বা কাজের উপর যথার্থ অকৃত্রিম সুগভীর অনুরাগ নাই-- মতগুলি কার্য্যে পরিণত করিবার জন্য হৃদয়ের যতটা বলের আবশ্যক তাহা নাই। এ কথা যে সম্পূর্ণ অমূলক তাহা নহে, কিন্তু ইহা ছাড়া আরও কতকগুলি কারণ জুটিয়াছে।
সমাজ যখন সমস্যা হইয়া দাঁড়ায় তখন মানুষ সবলে কাজ করিতে পারে না, যখন ডান পা একটি গর্ত্তের মধ্যে নিবিষ্ট করিয়া বাঁ পা কোথায় রাখিব ভাবিয়া পাওয়া যায় না, তখন দ্রুতবেগে চলা অসম্ভব। কিম্বা যখন মাথা টলমল করিতেছে কিন্তু পা শক্ত আছে, অথবা মাথার ঠিক আছে কিন্তু পায়ের ঠিকানা নাই-- তখন যদি চলিবার বিশেষ ব্যাঘাত হয় তবে জমির দোষ দেওয়া যায় না। আমরা বঙ্গসমাজ-নামক যে মকড়ষার জালে মাছির ন্যায় বাস করিতেছি, এখানে মতামত-নামক আস্‌মানগামী ডানা দুটো খোলসা আছে বটে কিন্তু ছটা পা জড়াইয়া গেছে। ডানা আস্ফালন যথেষ্ট হইতেছে কিন্তু উড়িবার কোন সুবিধা হইতেছে না। এখানে ডানা-দুটো কেবল কষ্টেরই কারণ হইয়াছে।
আরো দেখুন
পরিশিষ্ট (খ)
Others
শব্দগুলি বোর্ডের উপর লিখিতে থাকিবে। এই শব্দযোগে ছোট ছোট বাক্য রচনা করিতে হইবে। শিক্ষক মহাশয় দেখিবেন যে বাক্যগুলির মধ্যে একটি সংলগ্ন চিন্তার ধারা রক্ষিত হয়
                  ওরে         তোরা কি জানিস্‌ কেউ
                  লেজ         কেন ওঠে এত ঢেউ!
                  ওরা          দিবস রজনী নাচে ।
                  তাহা         শিখেছে কাহার কাছে ?
                  ওরা          কারে ডাকে বাহু তুলে ,
                  ওরা          কার কোলে ব'সে দুলে ?
                  আমি         ব'সে ব'সে তাই ভাবি –
                  নদী          কোথা হতে এল নাবি ?
                  কোথায়      পাহাড়-সে কোন্‌খানে ,
                  তাহার        নাম কি কেহই জানে ?
                  কেহ          যেতে পারে তার কাছে ?
                  সেথায়        মানুষ কি কেউ আছে ?
                  সেথা          নাহি তরু নাহি ঘাস ,
                  নাহি          পশু-পাখীদের বাস ।
                  সেথা          রাশি রাশি মেঘ যত
                  থাকে          ঘরের ছেলের ( children of the house ) মতো ।
                  সেথায়         বাস করে শিং-তোলা ( upraised horns )
                  যত             বুনো ছাগ দাড়িঝোলা ( with hanging beard ) ।
                  সেথায়         মানুষ নূতনতরো –
                  তাদের         শরীর ( limbs ) কঠিন বড়ো ,
                  তাদের         চোখ দুটো নয় সোজা ,
                  তাদের         কথা নাহি যায় বোঝা ,
                  তারা           পাহাড়ের ছেলেমেয়ে
                  সদাই          কাজ করে গান গেয়ে ,
                  তারা           সারা দিনমান খেটে
                  আনে          বোঝাভরা কাঠ কেটে ,
                  তারা           চড়িয়া শিখর ( mountaintop )- 'পরে
                  বনের          ( wild ) হরিণ শিকার করে ।
                  শেষে         পাহাড় ছাড়িয়া এসে
                  নদী          পড়ে বাহিরের দেশে ।
                  কোথাও      চাষীরা করিতে চাষ ( till ) ,
                  কোথাও     গরুতে খেতেছে ঘাস ।
                  কোথাও     বৃহৎ অশথ গাছে
                  পাখি        শিস দিয়ে দিয়ে নাচে ।
                  কোথাও     রাখাল ছেলের দলে
                  খেলা        করিছে গাছের তলে ।
                  সেথা        মহিষের দল থাকে
                  তারা        লুটায় (wallow ) নদীর পাঁকে ।
                  যত          বুনো বরা সেথা ফেরে ,
                  তারা         দাঁত ( tusk ) দিয়ে মাটি চেরে ।
                  সেথা         শেয়াল লুকায়ে থাকে
                  রাতে        হুয়া হুয়া ক'রে ডাকে ।
                  যেদিন       পূরণিমা রাত আসে
                  চাঁদ          আকাশ জুড়িয়া হাসে –
                  সবাই        ঘুমায় কুটীরতলে ,
                  তরী         একটিও নাহি চলে ,
                  গাছে         পাতাটিও নাহি নড়ে
                  জলে         নাহি ঢেউ ওঠে পড়ে ।
                  হোথায়      গহন গভীর বন
                  তাহে        নাহি লোক নাহি জন ,
                  শুধু         কুমীর নদীর ধারে
                  সুখে         রোদ পোহাইছে পাড়ে ।
                  বাঘ          ফিরিতেছে ঝোপে ঝাপে ,
                  ঘাড়ে        পড়ে আসি এক লাফে ।
                  কোথায়      দেখা যায় চিতা বাঘ ,
                  তাহার      গায়ে চাকা চাকা দাগ ।
আরো দেখুন