বন্ধুত্ব ও ভালবাসা (andhutwo o bhalobasa)

বন্ধুত্ব ও ভালবাসায় অনেক তফাৎ আছে, কিন্তু ঝট্‌ করিয়া সে তফাৎ ধরা যায় না।

 

বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালবাসা পোষাকী। বন্ধুত্বের আটপৌরে কাপড়ের দুই-এক জায়গায় ছেঁড়া থাকিলেও চলে, ঈষৎ ময়লা হইলেও হানি নাই, হাঁটুর নীচে না পৌঁছিলেও পরিতে বারণ নাই। গায়ে দিয়া আরাম পাইলেই হইল। কিন্তু ভালবাসার পোষাক একটু ছেঁড়া থাকিবে না, ময়লা হইবে না, পরিপাটি হইবে। বন্ধুত্ব নাড়াচাড়া টানাছেঁড়া তোলাপাড়া সয়, কিন্তু ভালবাসা তাহা সয় না। আমাদের ভালবাসার পাত্র হীন প্রমোদে লিপ্ত হইলে আমাদের প্রাণে বাজে, কিন্তু বন্ধুর সম্বন্ধে তাহা খাটে না; এমন-কি, আমরা যখন বিলাসপ্রমোদে মত্ত হইয়াছি তখন আমরা চাই যে, আমাদের বন্ধুও তাহাতে যোগ দিক! প্রেমের পাত্র আমাদের সৌন্দর্যের আদর্শ হইয়া থাক্‌ এই আমাদের ইচ্ছা-- আর, বন্ধু আমাদেরই মত দোষে গুণে জড়িত মর্ত্ত্যের মানুষ হইয়া থাক্‌ এই আমাদের আবশ্যক। আমাদের ডান হাতে বাম হাতে বন্ধুত্ব। আমরা বন্ধুর নিকট হইতে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সাহায্য চাই ও সেই জন্যই বন্ধুকে চাই। কিন্তু ভালবাসার স্থলে আমরা সর্ব্বপ্রথমে ভালবাসার পাত্রকেই চাই ও তাহাকে সর্ব্বতোভাবে পাইতে চাই বলিয়াই তাহার নিকট হইতে মমতা চাই, সমবেদনা চাই, সঙ্গ চাই। কিছুই না পাই যদি, তবুও তাহাকে ভালবাসি। ভালবাসায় তাহাকেই আমি চাই, বন্ধুত্বে তাহার কিয়দংশ চাই। বন্ধুত্ব বলিতে তিনটি পদার্থ বুঝায়। দুই জন ব্যক্তি ও একটি জগৎ। অর্থাৎ দুই জনে সহযোগী হইয়া জগতের কাজ সম্পন্ন করা। আর, প্রেম বলিলে দুই জন ব্যক্তি মাত্র বুঝায়, আর জগৎ নাই। দুই জনেই দুই জনের জগৎ। অতএব বন্ধুত্ব অর্থে দুই এবং তিন, প্রেম অর্থে এক এবং দুই।

 

অনেকে বলিয়া থাকেন বন্ধুত্ব ক্রমশঃ পরিবর্ত্তিত হইয়া ভালবাসায় উপনীত হইতে পারে, কিন্তু ভালবাসা নামিয়া অবশেষে বন্ধুত্বে আসিয়া ঠেকিতে পারে না। একবার যাহাকে ভালবাসিয়াছি , হয় তাহাকে ভালবাসিব নয় ভালবাসিব না; কিন্তু একবার যাহার সঙ্গে বন্ধুত্ব হইয়াছে, ক্রমে তাহার সঙ্গে ভালবাসার সম্পর্ক স্থাপিত হইতে আটক নাই। অর্থাৎ বন্ধুত্বের উঠিবার নামিবার স্থান আছে। কারণ, সে সমস্ত স্থান আটক করিয়া থাকে না। কিন্তু ভালবাসার উন্নতি অবনতির স্থান নাই। যখন সে থাকে তখন সে সমস্ত স্থান জুড়িয়া থাকে, নয় সে থাকে না। যখন সে দেখে তাহার অধিকার হ্রাস হইয়া আসিতেছে তখন সে বন্ধুত্বের ক্ষুদ্র স্থানটুকু অধিকার করিয়া থাকিতে চায় না। যে রাজা ছিল সে ফকির হইতে রাজি আছে, কিন্তু করদ জায়গীরদার হইয়া থাকিবে কিরূপে? হয় রাজত্ব নয় ফকিরী, ইহার মধ্যে তাহার দাঁড়াইবার স্থান নাই। ইহা ছাড়া আর একটা কথা আছে-- প্রেম মন্দির ও বন্ধুত্ব বাসস্থান। মন্দির হইতে যখন দেবতা চলিয়া যায় তখন সে আর বাসস্থানের কাজে লাগিতে পারে না, কিন্তু বাসস্থানে দেবতা প্রতিষ্ঠা করা যায়।

 

  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সমস্যা
Others
আজকাল প্রায় এমন দেখা যায় অনেক বিষয়ে অনেক রকম মত উঠিয়াছে, কিন্তু কাজের সঙ্গে তাহার মিল হয় না। এমনও দেখা যায় অল্প বয়সে যাঁহারা পরমোৎসাহে সম্পূর্ণ নূতন করিয়া সমাজের পরিবর্ত্তন-সাধনে উদ্যোগী হইয়াছিলেন কিঞ্চিৎ অধিক বয়সে তাঁহারাই পুরাতন প্রথা অবলম্বন করিয়া শান্তভাবে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেছেন। অনেকে ইহার কারণ এমন বলেন যে, বাঙ্গালীদের কোন মতের বা কাজের উপর যথার্থ অকৃত্রিম সুগভীর অনুরাগ নাই-- মতগুলি কার্য্যে পরিণত করিবার জন্য হৃদয়ের যতটা বলের আবশ্যক তাহা নাই। এ কথা যে সম্পূর্ণ অমূলক তাহা নহে, কিন্তু ইহা ছাড়া আরও কতকগুলি কারণ জুটিয়াছে।
সমাজ যখন সমস্যা হইয়া দাঁড়ায় তখন মানুষ সবলে কাজ করিতে পারে না, যখন ডান পা একটি গর্ত্তের মধ্যে নিবিষ্ট করিয়া বাঁ পা কোথায় রাখিব ভাবিয়া পাওয়া যায় না, তখন দ্রুতবেগে চলা অসম্ভব। কিম্বা যখন মাথা টলমল করিতেছে কিন্তু পা শক্ত আছে, অথবা মাথার ঠিক আছে কিন্তু পায়ের ঠিকানা নাই-- তখন যদি চলিবার বিশেষ ব্যাঘাত হয় তবে জমির দোষ দেওয়া যায় না। আমরা বঙ্গসমাজ-নামক যে মকড়ষার জালে মাছির ন্যায় বাস করিতেছি, এখানে মতামত-নামক আস্‌মানগামী ডানা দুটো খোলসা আছে বটে কিন্তু ছটা পা জড়াইয়া গেছে। ডানা আস্ফালন যথেষ্ট হইতেছে কিন্তু উড়িবার কোন সুবিধা হইতেছে না। এখানে ডানা-দুটো কেবল কষ্টেরই কারণ হইয়াছে।
আরো দেখুন
বধিরতার সুখ
Others
অদ্বিতীয় রমণী ও অসাধারণ পুরুষ জর্জ এলিয়ট তাঁহার একটি উপন্যাসে লিখিয়াছেন যে, আমরা জীবনে অনেক ছোট ছোট দুঃখঘটনা দেখিতে পাই, কিন্তু তাহা এত সাধারণ ও সামান্যকারণজাত যে, তাহাতে আর আমাদের করুণা উদ্রেক করিতে পারে না, তাহা যদি পারিত তবে জীবন কি কষ্টেরই হইত! যদি আমরা কাঠবিড়ালীর হৃদয়স্পন্দন শুনিতে পাইতাম, যখন একটি ঘাস মৃত্তিকা ভেদ করিয়া গজাইতেছে  তখন তাহার শব্দটুকুও শুনিতে পাইতাম, তবে আমাদের কানের পক্ষে কি দুর্দ্দশাই হইত! আমরা যেমন দিগন্ত পর্য্যন্ত সমুদ্র প্রসারিত দেখিতে পাই, কিন্তু সমুদ্রের সীমা সেইখানেই নয়, তাহা অতিক্রম করিয়াও সমুদ্র আছে-- তেমনি আমরা যাহাকে স্তব্ধতার দিগন্ত পর্য্যন্ত বলি তাহার পরপারেও শব্দের সমুদ্র আছে, তাহা আমাদের শ্রবণের অতীত। পিপীলিকা যখন চলে তখন তাহারো পদশব্দ হয়, ফুল হইতে শিশির যখন পড়ে তখন সেও নীরব অশ্রুজল নহে সেও বিলাপ করিয়া ঝরিয়া পড়ে।
জর্জ এলিয়ট অন্যের সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন আমরা নিজের সম্বন্ধেও তাহাই প্রয়োগ করিয়া দেখিব। মনে কর, আমাদের নিজের হৃদয়ের মধ্যে যাহা চলে তাহা সমস্তই আমরা যদি দেখিতে পাইতাম, শুনিতে পাইতাম, তাহা হইলে আমাদের কি দুর্দ্দশাই হইত! জর্জ এলিয়ট দৃষ্টান্তস্বরূপে কাঠবিড়ালীর হৃদয়স্পন্দন ও তৃণউদ্ভেদের শব্দ উল্লেখ করিয়াছেন, কিন্তু আমরা যদি নিজের দেহের ক্ষীণতম হৃদয়স্পন্দন, নিঃশ্বাস প্রশ্বাস-পতন, রক্তচলাচলের শব্দ, নখ ও কেশ -বৃদ্ধি, এবং বয়োবৃদ্ধি সহকারে দেহায়তনবৃদ্ধির শব্দটুকুও অনবরত শুনিতে পাইতাম, তবে আমাদের কি দশাই হইত! যখন আমরা প্রাণ খুলিয়া হাসিতেছি তখনো আমাদের হৃদয়ের মর্ম্মস্থলে অতিপ্রচ্ছন্নভাবে বসিয়া যে একটি বিষাদ, একটি অভাব নিঃশ্বাস ফেলিতেছে, তাহা যদি শুনিতে পাইতাম তবে কি আর হাসি বাহির হইত? যখন আমরা দান করিতেছি ও সেই সঙ্গে "নিঃস্বার্থ পরোপকার করিতেছি" মনে করিয়া মনে মনে অতুল আনন্দ উপভোগ করিতেছি, তখন যদি আমরা আমাদের সেই পরোপচিকীর্ষার অতি প্রচ্ছন্ন অন্তর্দেশে যশোলিপ্সা বা আর একটা কোন ক্ষুদ্র স্বার্থপরতার বক্রমূর্ত্তি দেখিতে পাই, তবে কি আর আমরা সেরূপ বিমলানন্দ উপভোগ করিতে পারি? আবার আর এক দিকে দেখ। যেমন, এমন শব্দ আছে যাহা আমাদের কাছে নিস্তব্ধতা, তেমনি এমন স্মৃতি আছে যাহা আমাদের কাছে বিস্মৃতি। আমরা যাহা একবার দেখিয়াছি, যাহা একবার শুনিয়াছি, তাহা আমাদের হৃদয়ে চিরকালের মত চিহ্ন দিয়া গিয়াছে। কোনটা বা স্পষ্ট, কোনোটা বা অস্পষ্ট, কোনটা বা এত অস্পষ্ট যে আমাদের দর্শন শ্রবণের অতীত। কিন্তু আছে। আমাদর স্মৃতিতে যত জিনিষ আছে তাহা ভাবিয়া দেখিলে অবাক্‌ হইয়া যাইতে হয়। আমরা রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া যে শত সহস্র অচেনা লোককে চলিয়া যাইতে দেখিলাম তাহারা প্রত্যেকেই আমাদের মনের মধ্যে রহিয়া গেল। উপরি উপরি যদি অনেক বার তাহাদের দেখিতাম, তবে তাহারা আমাদের স্মৃতিতে স্পষ্টতর ছাপ দিতে পারিত এই মাত্র। এইরূপে বাল্যকাল হইতে যাহা কিছু দেখিয়াছি, যাহা কিছু শুনিয়াছি, যাহা কিছু পড়িয়াছি, সমস্তই আমার হৃদয়ে আছে, তিলার্দ্ধও এড়াইতে পারে নাই। ছেলেবেলা হইতে কত গ্রন্থের কত হাজার হাজার পাতা পড়িয়াছি, যদিও তাহা আওড়াইতে পারি না কিন্তু আমাদের হৃদয়ের মুদ্রাকর তাহার প্রত্যেক অক্ষর আমাদের স্মৃতির পটে মুদ্রিত করিয়া রাখিয়াছে। ইহা মনে করিলে একেবারে হতজ্ঞান হইয়া পড়িতে হয়। যদি আমরা আমাদের এই অতিবিশাল স্মৃতির স্পষ্ট ও অস্পষ্ট সমস্ত কণ্ঠস্বর একেবারেই শুনিতে পাইতাম, কিছুতেই নিবারণ করিতে পারিতাম না, তাহা হইলে আমরা কি একেবারে পাগল হইয়া যাইতাম না? ভাগ্যে আমাদের স্মৃতি তাহার সহস্র মুখে একেবারে কথা কহিতে আরম্ভ করে না, তাহার সহস্র চিত্র একেবারে উদ্‌ঘাটন করিয়া দেয় না, তাই আমরা বাঁচিয়া আছি। আমরা আমাদের হৃদয়ের সমস্ত কার্য্য দেখিতে পাই না বলিয়াই রক্ষা। আমাদের হৃদয়রাজ্যের অনেক বিস্তৃত প্রদেশ আমাদের নিজের কাছেই যদি অনাবিষ্কৃত না থাকিত, কখন্‌ আমাদের অনুরাগের প্রথম সূত্রপাত হইল, কখন্‌ আমাদের অনুরাগের প্রথম অবসানের দিকে গতি হইল, কখন্‌ আমাদের বিরাগের প্রথম আরম্ভ হইল, কখন্‌ আমাদের বিষাদের প্রথম অঙ্কুর উঠিল, তাহা সমস্ত যদি আমরা স্পষ্ট দেখিতাম তাহা হইলে আমাদের মায়া মোহ অনেকটা ছুটিয়া যাইত বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সুখশান্তিও অবসান হইত।
আরো দেখুন
ঘর ও বাসাবাড়ি
Others
দশের চোখের উপরে যে দিনরাত্রি বাস করিতে চাহে,পরের চোখের উপরেই যাহার বাড়ি ঘর,তাহার আর নিজের ঘর বাড়ি নাই । সেই জন্যই সে রঙচঙ দিয়া পরের চোখ কিনিতে চায়,সেখান হইতে ভ্রষ্ট হইলেই সে ব্যক্তি একেবারে নিরাশ্রয় হইয়া পড়ে । ইহারা বাসাড়ে লোক,খামখেয়ালী ঘরওয়ালা উচ্ছেদ করিয়া  দিলে ইহাদের আর দাঁড়াইবার জায়গা থাকে না। কিন্তু ভাবুক লোকদিগের নিজের একটা ঘরবাড়ি আছে,পরের চোখ হইতে বিদায় হইয়া তাহার সেই নিজের ঘরের মধ্যে আসিলেই সে যেন বাঁচে । ভাবুক লোকেরা যথার্থ গৃহস্থ লোক । আর যাহারা নিজের মনের মধ্যে আশ্রয় পায় না, তাহারা কাজেই পরের চক্ষু অবলম্বন করিয়া থাকে ও রঙচঙ মাখিয়া পরের চক্ষুর খোশামোদ করিতে থাকে । ভাবুকদিগের নিজের মনের মধ্যে কি অটল আশ্রয় আছে ! এই জন্যই দেখা যায়,ভাবুক লোকেরা বাহিরের লোকজনের সহিত বড় একটা মিশিতে পারেন না, কন্ঠাগ্র ভদ্রতার আইন  কানুনের সহিত কোন সম্পর্ক রাখেন না  । যেখানে চল্লিশ জন অলস ভাবে হাসিতেছে সেখানে তিনি একচল্লিশ হইয়া তাহাদের সহিত একত্রে দন্ত বিকাশ করিতে পারেন না । দশ ব্যক্তির মধ্যে একাদশ হইবার ঐকান্তিক বাসনা তাঁহার নাই ।
আরো দেখুন