৩১ (ajike gohon kalima legechhe)

আজিকে গহন কালিমা লেগেছে গগনে, ওগো,

              দিক্‌-দিগন্ত ঢাকি।

আজিকে আমরা কাঁদিয়া শুধাই সঘনে, ওগো,

              আমরা খাঁচার পাখি--

              হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,

      আজি কি আসিল প্রলয়রাত্রি ঘোর।

      চিরদিবসের আলোক গেল কি মুছিয়া।

      চিরদিবসের আশ্বাস গেল ঘুচিয়া?

দেবতার কৃপা আকাশের তলে কোথা কিছু নাহি বাকি?--

তোমাপানে চাই, কাঁদিয়া শুধাই আমরা খাঁচার পাখি।

 

ফাল্গুন এলে সহসা দখিনপবন হতে

              মাঝে মাঝে রহি রহি

আসিত সুবাস সুদূরকুঞ্জভবন হতে

              অপূর্ব আশা বহি।

              হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,

      মাঝে মাঝে যবে রজনী হইত ভোর,

      কী মায়ামন্ত্রে বন্ধনদুখ নাশিয়া

      খাঁচার কোণেতে প্রভাত পশিত হাসিয়া

ঘনমসী-আঁকা লোহার শলাকা সোনার সুধায় মাখি।--

নিখিল বিশ্ব পাইতাম প্রাণে আমরা খাঁচার পাখি।

 

আজি দেখো ওই পূর্ব-অচলে চাহিয়া, হোথা

              কিছুই না যায় দেখা--

আজি কোনো দিকে তিমিরপ্রান্ত দাহিয়া, হোথা

           পড়ে নি সোনার রেখা।

           হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,

      আজি শৃঙ্খল বাজে অতি সুকঠোর।

      আজি পিঞ্জর ভুলাবারে কিছু নাহি রে--

      কার সন্ধান করি অন্তরে বাহিরে।

মরীচিকা লয়ে জুড়াব নয়ন আপনারে দিব ফাঁকি

সে আলোটুকুও হারায়েছি আজি আমরা খাঁচার পাখি।

 

ওগো আমাদের এই ভয়াতুর বেদনা যেন

           তোমারে না দেয় ব্যথা।

পিঞ্জরদ্বারে বসিয়া তুমিও কেঁদো না যেন

           লয়ে বৃথা আকুলতা।

           হৃদয়বন্ধু, শুন গো বন্ধু মোর,

      তোমার চরণে নাহি তো লৌহডোর।

      সকল মেঘের ঊর্ধ্বে যাও গো উড়িয়া,

      সেথা ঢালো তান বিমল শূন্য জুড়িয়া--

"নেবে নি, নেবে নি প্রভাতের রবি' কহো আমাদের ডাকি,

মুদিয়া নয়ান শুনি সেই গান আমরা খাঁচার পাখি।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

পরিচয়
Verses
একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে,
         বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে।
      তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি
         পরিচয় কোনো আছে নাকি,
                   যাবে কোন্‌খানে।
         আমি শুধু বলেছি, কে জানে।
নদীতে লাগিল দোলা, বাঁধনে পড়িল টান,
         একা বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।
                   সেই গান শুনি
         কুসুমিত তরুতলে তরুণতরুণী
                   তুলিল অশোক,
মোর হাতে দিয়ে তারা কহিল, "এ আমাদেরই লোক।'
                   আর কিছু নয়,
         সে মোর প্রথম পরিচয়।
          
         তার পরে জোয়ারের বেলা
সাঙ্গ হল, সাঙ্গ হল তরঙ্গের খেলা;
         কোকিলের ক্লান্ত গানে
বিস্মৃত দিনের কথা অকস্মাৎ যেন মনে আনে;
         কনকচাঁপার দল পড়ে ঝুরে,
                   ভেসে যায় দূরে--
         ফাল্গুনের উৎসবরাতির
                   নিমন্ত্রণলিখন-পাঁতির
                            ছিন্ন অংশ তারা
                                  অর্থহারা।
         ভাঁটার গভীর টানে
তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে।
         নূতন কালের নব যাত্রী ছেলেমেয়ে
                   শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,
         "সন্ধ্যার তারার দিকে
                   বহিয়া চলেছে তরণী কে।'
         সেতারেতে বাঁধিলাম তার,
                   গাহিলাম আরবার--
         মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
                   আমি তোমাদেরই লোক
                            আর কিছু নয়,
                        এই হোক শেষ পরিচয়।
আরো দেখুন
4
Verses
স্থির নয়নে তাকিয়ে আছি
      মনের মধ্যে অনেক দূরে।
      ঘোরাফেরা যায় যে ঘুরে।
গভীরধারা জলের ধারে,
আঁধার-করা বনের পারে,
সন্ধ্যামেঘে সোনার চূড়া
     উঠেছে ওই বিজন পুরে
     মনের মাঝে অনেক দূরে।
দিনের শেষে মলিন আলোয়
     কোন্‌ নিরালা নীড়ের টানে
বিদেশবাসী হাঁসের সারি
     উড়েছে সেই পারের পানে।
ঘাটের পাশে ধীর বাতাসে
উদাস ধ্বনি উধাও আসে,
বনের ঘাসে ঘুম-পাড়ানে
     তান তুলেছে কোন্‌ নূপুরে
     মনের মাঝে অনেক দূরে।
নিচল জলে নীল নিকষে
     সন্ধ্যাতারার পড়ল রেখা,
পারাপারের সময় গেল
     খেয়াতরীর নাইকো দেখা।
পশ্চিমের ওই সৌধছাদে
স্বপ্ন লাগে ভগ্ন চাঁদে,
একলা কে যে বাজায় বাঁশি
     বেদনভরা বেহাগ সুরে
     মনের মাঝে অনেক দূরে।
সারাটা দিন দিনের কাজে
     হয় নি কিছুই দেখাশুনা,
কেবল মাথার বোঝা ব'হে
     হাটের মাঝে আনাগোনা।
এখন আমায় কে দেয় আনি
কাজ-ছাড়ানো পত্রখানি;
সন্ধ্যাদীপের আলোয় ব'সে
     ওগো আমার নয়ন ঝুরে
     মনের মাঝে অনেক দূরে।
আরো দেখুন
বৃদ্ধ কবি
Verses
মন হতে প্রেম যেতেছে শুকায়ে
          জীবন হতেছে শেষ,
শিথিল কপোল মলিন নয়ন
          তুষার-ধবল কেশ!
পাশেতে আমার নীরবে পড়িয়া
          অযতনে বীণাখানি,
বাজাবার বল নাইকো এ হাতে
          জড়িমা জড়িত বাণী!
গীতিময়ী মোর সহচরী বীণা!
          হইল বিদায় নিতে;
আর কি পারিবি ঢালিবারে তুই
          অমৃত আমার চিতে?
তবু একবার আর-একবার
          ত্যজিবার আগে প্রাণ,
মরিতে মরিতে গাহিয়া লইব
          সাধের সে-সব গান!
দুলিবে আমার সমাধি-উপরে
          তরুগণ শাখা তুলি,
বনদেবতারা গাইবে তখন
          মরণের গানগুলি!
আরো দেখুন