২ (onishesh pran)

অনিঃশেষ প্রাণ

অনিঃশেষ মরণের স্রোতে ভাসমান,

পদে পদে সংকটে সংকটে

নামহীন সমুদ্রের উদ্দেশবিহীন কোন্‌ তটে

পৌঁছিবারে অবিশ্রাম বাহিতেছে খেয়া,

কোন্‌ সে অলক্ষ্য পাড়ি-দেয়া

মর্মে বসি দিতেছে আদেশ,

নাহি তার শেষ।

চলিতেছে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি প্রাণী,

এই শুধু জানি।

চলিতে চলিতে থামে, পণ্য তার দিয়ে যায় কাকে,

পশ্চাতে যে রহে নিতে ক্ষণপরে সেও নাহি থাকে।

মৃত্যুর কবলে লুপ্ত নিরন্তর ফাঁকি--

তবু সে ফাঁকির নয়, ফুরাতে ফুরাতে রহে বাকি;

পদে পদে আপনারে শেষ করি দিয়া

পদে পদে তবু রহে জিয়া।

অস্তিত্বের মহৈর্শ্বয শতছিদ্র ঘটতলে ভরা--

অফুরান লাভ তার অফুরান ক্ষতিপথে ঝরা;

অবিশ্রাম অপচয়ে সঞ্চয়ের আলস্য ঘুচায়,

শক্তি তাহে পায়।

চলমান রূপহীন যে বিরাট, সেই

মহাক্ষণে আছে তবু ক্ষণে ক্ষণে নেই।

স্বরূপ যাহার থাকা আর নাই থাকা,

খোলা আর ঢাকা,

কী নামে ডাকিব তারে অস্তিত্বপ্রবাহে--

মোর নাম দেখা দিয়ে মিলে যাবে যাহে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

271
Verses
THROUGH THE sadness of all things I hear the crooning of the Eternal Mother.
আরো দেখুন
পনেরো
Verses
শ্রীমতী রানী দেবী কল্যাণীয়াসু
       ১
আমি বদল করেছি আমার বাসা।
দুটিমাত্র ছোটো ঘর আমার আশ্রয়।
ছোটো ঘরই আমার মনের মতো।
তার কারণ বলি তোমাকে।
বড়ো ঘর বড়োর ভান করে মাত্র,
আসল বড়োকে বাইরে ঠেকিয়ে রাখে অবজ্ঞায়।
আমার ছোটো ঘর বড়োর ভান করে না।
অসীমের প্রতিযোগিতার স্পর্ধা তার নেই
ধনী ঘরের মূঢ় ছেলের মতো।
আকাশের শখ ঘরে মেটাতে চাইনে;
তাকে পেতে চাই তার স্বস্থানে,
পেতে চাই বাইরে পূর্ণভাবে।
বেশ লাগছে।
দূর আমার কাছেই এসেছে।
জানলার পাশেই বসে বসে ভাবি--
দূর ব'লে যে পদার্থ সে সুন্দর।
মনে ভাবি সুন্দরের মধ্যেই দূর।
পরিচয়ের সীমার মধ্যে থেকেও
সুন্দর যায় সব সীমাকে এড়িয়ে।
প্রয়োজনের সঙ্গে লেগে থেকেও থাকে আলগা,
প্রতিদিনের মাঝখানে থেকেও সে চিরদিনের।
মনে পড়ে এক দিন মাঠ বেয়ে চলেছিলেম
পালকিতে অপরাহ্নে;
কাহার ছিল আটজন।
তার মধ্যে একজনকে দেখলেম
যেন কালো পাথরে কাটা দেবতার মূর্তি;
আপন কর্মের অপমানকে প্রতিপদে সে চলছিল পেরিয়ে
ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে পাখি যেমন যায় উড়ে।
দেবতা তার সৌন্দর্যে তাকে দিয়েছেন সুদূরতার সম্মান।
এই দূর আকাশ সকল মানুষেরই অন্তরতম;
জানলা বন্ধ, দেখতে পাইনে।
বিষয়ীর সংসার, আসক্তি তার প্রাচীর,
যাকে চায় তাকে রুদ্ধ করে কাছের বন্ধনে।
ভুলে যায় আসক্তি নষ্ট করে প্রেমকে,
আগাছা যেমন ফসলকে মারে চেপে।
আমি লিখি কবিতা, আঁকি ছবি।
দূরকে নিয়ে সেই আমার খেলা;
দূরকে সাজাই নানা সাজে,
আকাশের কবি যেমন দিগন্তকে সাজায়
সকালে সন্ধ্যায়।
কিছু কাজ করি তাতে লাভ নেই, তাতে লোভ নেই,
তাতে আমি নেই।
যে কাজে আছে দূরের ব্যাপ্তি
তাতে প্রতিমুহূর্তে আছে আমার মহাকাশ।
এই সঙ্গে দেখি মৃত্যুর মধুর রূপ, স্তব্ধ নিঃশব্দ সুদূর,
জীবনের চারদিকে নিস্তরঙ্গ মহাসমুদ্র;
সকল সুন্দরের মধ্যে আছে তার আসন, তার মুক্তি।
     ২
অন্য কথা পরে হবে।
গোড়াতেই বলে রাখি তুমি চা পাঠিয়েছ, পেয়েছি।
এতদিন খবর দিইনি সেটা আমার স্বভাবের বিশেষত্ব।
যেমন আমার ছবি আঁকা, চিঠি লেখাও তেমনি।
ঘটনার ডাকপিওনগিরি করে না সে।
নিজেরই সংবাদ সে নিজে।
জগতে রূপের আনাগোনা চলছে,
সেই সঙ্গে আমার ছবিও এক-একটি রূপ,
অজানা থেকে বেরিয়ে আসছে জানার দ্বারে।
সে প্রতিরূপ নয়।
মনের মধ্যে ভাঙাগড়া কত, কতই জোড়াতাড়া;
কিছু বা তার ঘনিয়ে ওঠে ভাবে,
কিছু বা তার ফুটে ওঠে চিত্রে;
এতদিন এই সব আকাশবিহারীদের ধরেছি কথার ফাঁদে।
মন তখন বাতাসে ছিল কান পেতে,
যে ভাব ধ্বনি খোঁজে তারি খোঁজে।
আজকাল আছে সে চোখ মেলে।
রেখার বিশ্বে খোলা রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে, দেখবে ব'লে।
সে তাকায়, আর বলে, দেখলেম।
সংসারটা আকারের মহাযাত্রা।
কোন্‌ চির-জাগরূকের সামনে দিয়ে চলেছে,
তিনিও নীরবে বলছেন, দেখলেম।
আদি যুগে রঙ্গমঞ্চের সম্মুখে সংকেত এল,
"খোলো আবরণ।"
বাষ্পের যবনিকা গেল উঠে,
রূপের নটীরা এল বাহির হয়ে;
ইন্দ্রের সহস্র চক্ষু, তিনি দেখলেন।
তাঁর দেখা আর তাঁর সৃষ্টি একই।
চিত্রকর তিনি।
তাঁর দেখার মহোৎসব দেশে দেশে কালে কালে।
  ৩
অসীম আকাশে কালের তরী চলেছে
রেখার যাত্রী নিয়ে,
অন্ধকারের ভূমিকায় তাদের কেবল
আকারের নৃত্য;
নির্বাক অসীমের বাণী
বাক্যহীন সীমার ভাষায়, অন্তহীন ইঙ্গিতে।--
অমিতার আনন্দসম্পদ
ডালিতে সাজিয়ে নিয়ে চলেছে সুমিতা,
সে ভাব নয়, সে চিন্তা নয়, বাক্য নয়,
শুধু রূপ, আলো দিয়ে গড়া।
আজ আদিসৃষ্টির প্রথম মুহূর্তের ধ্বনি
পৌঁছল আমার চিত্তে,--
যে ধ্বনি অনাদি রাত্রির যবনিকা সরিয়ে দিয়ে
বলেছিল, "দেখো।"
এতকাল নিভৃতে
আপনি যা বলেছি আপনি তাই শুনেছি,
সেখান থেকে এলেম আর-এক নিভৃতে,
এখানে আপনি যা আঁকছি, দেখছি তাই আপনি।
সমস্ত বিশ্ব জুড়ে দেবতার দেখবার আসন,
আমিও বসেছি তাঁরই পাদপীঠে,
রচনা করছি দেখা।
আরো দেখুন
কবি
Verses
আমি যে বেশ সুখে আছি
            অন্তত নই দুঃখে কৃশ,
সে কথাটা পদ্যে লিখতে
            লাগে একটু বিসদৃশ।
সেই কারণে গভীর ভাবে
            খুঁজে খুঁজে গভীর চিতে
বেরিয়ে পড়ে গভীর ব্যথা
            স্মৃতি কিম্বা বিস্মৃতিতে।
কিন্তু সেটা এত সুদূর
            এতই সেটা অধিক গভীর
আছে কি না আছে তাহার
            প্রমাণ দিতে হয় না কবির।
মুখের হাসি থাকে মুখে,
            দেহের পুষ্টি পোষে দেহ,
প্রাণের ব্যথা কোথায় থাকে
             জানে না সেই খবর কেহ।
                        কাব্য প'ড়ে যেমন ভাব
                                    কবি তেমন নয় গো।
                        আঁধার ক'রে রাখে নি মুখ,
                        দিবারাত্র ভাঙছে না বুক,
                        গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব
                                    হাস্যমুখেই বয় গো।
ভালোবাসে ভদ্রসভায়
            ভদ্র পোশাক পরতে অঙ্গে,
ভালোবাসে ফুল্ল মুখে
            কইতে কথা লোকের সঙ্গে।
বন্ধু যখন ঠাট্টা করে
            মরে না সে অর্থ খুঁজে,
ঠিক যে কোথায় হাসতে হবে
            একেক সময় দিব্যি বুঝে।
সামনে যখন অন্ন থাকে
            থাকে না সে অন্যমনে,
সন্গীদলের সাড়া পেলে
            রয় না বসে ঘরের কোণে।
বন্ধুরা কয় "লোকটা রসিক',
            কয় কি তারা মিথ্যামিথ্যি?
শত্রুরা কয় "লোকটা হাল্কা',
            কিছু কি তার নাইকো ভিত্তি?
                        কাব্য দেখে যেমন ভাব
                               কবি তেমন নয় গো।
                        চাঁদের পানে চক্ষু তুলে
                        রয় না পড়ে নদীর কূলে,
                          গভীর দুঃখ ইত্যাদি সব
                                   মনের সুখেই বয় গো।
সুখে আছি লিখতে গেলে
            লোকে বলে,"প্রাণটা ক্ষুদ্র!
আশাটা এর নয়কো বিরাট,
            পিপাসা এর নয়কো রুদ্র।'
পাঠকদলে তুচ্ছ করে,
            অনেক কথা বলে কঠোর--
বলে,"একটু হেসে-খেলেই
            ভরে যায় এর মনের জঠর।'
কবিরে তাই ছন্দে বন্ধে
            বানাতে হয় দুখের দলিল।
মিথ্যা যদি হয় সে তবু
            ফেলো পাঠক চোখের সলিল।
তাহার পরে আশিস কোরো
            রুদ্ধকণ্ঠে ক্ষুব্ধবুকে,
কবি যেন আজন্মকাল
           দুখের কাব্য লেখেন সুখে।
                    কাব্য যেমন কবি যেন
                           তেমন নাহি হয় গো।
                    বুদ্ধি যেন একটু থাকে,
                    স্নানাহারের নিয়ম রাখে,
                    সহজ লোকের মতোই যেন
                             সরল গদ্য কয় গো।
আরো দেখুন