দান (dan)

কাঁকনজোড়া এনে দিলেম যবে

       ভেবেছিলেম হয়তো খুশি হবে।

তুলে তুমি নিলে হাতের 'পরে,

ঘুরিয়ে তুমি দেখলে ক্ষণেক-তরে,

পরেছিলে হয়তো গিয়ে ঘরে,

       হয়তো বা তা রেখেছিলে খুলে।

     এলে যেদিন বিদায় নেবার রাতে

     কাঁকন-দুটি দেখি নাই তো হাতে,

                   হয়তো এলে ভুলে।

 

       দেয় যে জনা কী দশা পায় তাকে।

       দেওয়ার কথা কেনই মনে রাখে।

পাকা যে ফল পড়ল মাটির টানে

শাখা আবার চায় কি তাহার পানে।

বাতাসেতে উড়িয়ে-দেওয়া গানে

       তারে কি আর স্মরণ করে পাখি।

     দিতে যারা জানে এ সংসারে

     এমন করেই তারা দিতে পারে

                   কিছু না রয় বাকি।

 

     নিতে যারা জানে তারাই জানে,

     বোঝে তারা মূল্যটি কোন্‌খানে।

তারাই জানে বুকের রত্নহারে

সেই মণিটি কজন দিতে পারে

হৃদয় দিয়ে দেখিতে হয় যারে --

            যে পায় তারে পায় সে অবহেলে।

     পাওয়ার মতন পাওয়া যারে কহে

     সহজ বলেই সহজ তাহা নহে,

                 দৈবে তারে মেলে।

 

     ভাবি যখন ভেবে না পাই তবে

     দেবার মতো কী আছে এই ভবে।

কোন্‌ খনিতে কোন্‌ ধনভাণ্ডারে

সাগরতলে কিম্বা সাগরপারে

যক্ষরাজের লক্ষমণির হারে

           যা আছে তা কিছুই তো নয় প্রিয়ে!

     তাই তো বলি যা কিছু মোর দান

     গ্রহণ করেই করবে মূল্যবান

                 আপন হৃদয় দিয়ে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

53
Verses
জীবন-স্রোতে ঢেউয়ের 'পরে
            কোন্‌-আলো ওই বেড়ায় দুলে?
ক্ষণে ক্ষণে দেখি যে তাই
            বসে বসে বিজন কূলে।
ভাসে তবু যায় না ভেসে,
হাসে আমার কাছে এসে,
দু-হাত বাড়াই ঝাঁপ দিতে চাই
            মনে করি আনব তুলে।
শান্ত হ রে শান্ত হ মন,
            ধরতে গেলে দেয় না ধরা--
নয় সে মণি নয় সে মানিক
            নয় সে কুসুম ঝরে-পড়া।
দূরে কাছে আগে পাছে,
মিলিয়ে আছে ছেয়ে আছে,
জীবন হতে ছানিয়ে তারে
            তুলতে গেলে মরবি ভুলে।
আরো দেখুন
নিষ্ফল উপহার
Verses
নিম্নে আবর্তিয়া ছুটে যমুনার জল--
দুই তীরে গিরিতট, উচ্চ শিলাতল।
সংকীর্ণ গুহার পথে মূর্ছি জলধার
উন্মত্ত প্রলাপে ওঠে গর্জি অনিবার।
এলায়ে জটিল বক্র নির্ঝরের বেণী
নীলাভ দিগন্তে ধায় নীল গিরিশ্রেণী।
স্থির তাহা, নিশিদিন তবু যেন চলে--
চলা যেন বাঁধা আছে অচল শিকলে।
মাঝে মাঝে শাল তাল রয়েছে দাঁড়ায়ে,
মেঘেরে ডাকিছে গিরি ইঙ্গিত বাড়ায়ে।
তৃণহীন সুকঠিন শতদীর্ণ ধরা,
রৌদ্রবন বনফুলে কাঁটাগাছ ভরা।
দিবসের তাপ ভূমি দিতেছে ফিরায়ে--
দাঁড়ায়ে রয়েছে গিরি আপনার ছায়ে
পথশূন্য, জনশূন্য, সাড়া-শব্দ-হীন।
ডুবে রবি, যেমন সে ডুবে প্রতিদিন।
রঘুনাথ হেথা আসি যবে উত্তরিলা
শিখগুরু পড়িছেন ভগবৎ লীলা।
রঘু কহিলেন নমি চরণে তাঁহার,
"দীন আনিয়াছে, প্রভু, হীন উপহার।'
বাহু বাড়াইয়া গুরু শুধায়ে কুশল
আশিসিলা মাথায় পরশি করতল।
কনকে মাণিক্যে গাঁথা বলয়-দুখানি
গুরুপদে দিলা রঘু জুড়ি দুই পাণি।
ভূমিতল হইতে বালা লইলেন তুলে,
দেখিতে লাগিলা প্রভু ঘুরায়ে অঙ্গুলে।
হীরকের সূচীমুখ শতবার ঘুরি
হানিতে লাগিল শত আলোকের ছুরি।
ঈষৎ হাসিয়া গুরু পাশে দিলা রাখি,
আবার সে পুঁথি-'পরে নিবেশিলা আঁখি।
সহসা একটি বালা শিলাতল হতে
গড়ায়ে পড়িয়া গেল যমুনার স্রোতে।
"আহা আহা" চীৎকার করি রঘুনাথ
ঝাঁপায়ে পড়িল জলে বাড়ায়ে দু হাত।
আগ্রহে সমস্ত তার প্রাণমনকায়
একখানি বাহু হয়ে ধরিবারে যায়।
বারেকের তরে গুরু না তুলিলা মুখ,
নিভৃত অন্তরে তাঁর জাগে পাঠসুখ।
কালো জল কটাক্ষিয়া চলে ঘুরি ঘুরি,
যেন সে ছলনাভরা সুগভীর চুরি।
দিবালোক চলে গেল দিবসের পিছু
যমুনা উতলা করি না মিলিল কিছু।
সিক্তবস্ত্রে রিক্তহাতে শ্রান্তনতশিরে
রঘুনাথ গুরু-কাছে আসিলেন ফিরে।
"এখনো উঠাতে পারি' করজোড়ে যাচে,
"যদি দেখাইয়া দাও কোন্‌খানে আছে।'
দ্বিতীয় কঙ্কণখানি ছুঁড়ি দিয়া জলে
গুরু কহিলেন, "আছে ওই নদীতলে।'
আরো দেখুন
ঘরছাড়া
Verses
এল সে জর্মনির থেকে
        এই অচেনার মাঝখানে,
    ঝড়ের মুখে নৌকো নোঙর-ছেঁড়া
               ঠেকল এসে দেশান্তরে।
পকেটে নেই টাকা,
        উদ্‌বেগ নেই মনে,
    দিন চলে যায় দিনের কাজে
        অল্পস্বল্প নিয়ে।
যেমন-তেমন থাকে
        অন্য দেশের সহজ চালে।
নেই ন্যূনতা, গুমর কিছুই নেই--
           মাথা-উঁচু
        দ্রুত পায়ের চাল।
একটুও নেই অকিঞ্চনের অবসাদ।
        দিনের প্রতি মুহূর্তকে
    জয় করে সে আপন জোরে,
পথের মধ্যে ফেলে দিয়ে যায় সে চলে,
        চায় না পিছন ফিরে--
    রাখে না তার এক কণাও বাকি।
খেলাধুলা হাসিগল্প যা হয় যেখানে
        তারি মধ্যে জায়গা সে নেয়
           সহজ মানুষ।
    কোথাও কিছু ঠেকে না তার
        একটুকুও অনভ্যাসের বাধা।
    একলা বটে, তবুও তো
        একলা সে নয়।
    প্রবাসে তার দিনগুলো সব
        হূহু করে কাটিয়ে দিচ্ছে হালকা মনে।
    ওকে দেখে অবাক হয়ে থাকি,
        সব মানুষের মধ্যে মানুষ
           অভয় অসংকোচ--
    তার বাড়া ওর নেই তো পরিচয়।
দেশের মানুষ এসেছে তার আরেক জনা।
        ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে
    যা-খুশি তাই ছবি এঁকে এঁকে
           যেখানে তার খুশি।
    সে ছবি কেউ দেখে কিম্বা না'ই দেখে
        ভালো বলে না'ই বলে--
           খেয়াল কিছুই নেই।
    দুইজনেতে পাশাপাশি
        কাঁকর-ঢালা পথ দিয়ে ওই
           যাচ্ছে চলে
    দুই টুকরো শরৎকালের মেঘ।
নয় ওরা তো শিকড়-বাঁধা গাছের মতো,
    ওরা মানুষ--
        ছুটি ওদের সকল দেশে সকল কালে,
           কর্ম ওদের সবখানে,
        নিবাস ওদের সব মানুষের মাঝে।
    মন যে ওদের স্রোতের মতো
        সব-কিছুরেই ভাসিয়ে চলে--
    কোনোখানেই আটকা পড়ে না সে।
        সব মানুষের ভিতর দিয়ে
    আনাগোনার বড়ো রাস্তা তৈরি হবে,
        এরাই আছে সেই রাস্তার কাজে
               এই যত-সব ঘরছাড়াদের দল।
আরো দেখুন