সহযাত্রী (sohojatri)

সুশ্রী নয় এমন লোকের অভাব নেই জগতে--

           এ মানুষটি তার চেয়েও বেশি, এ অদ্ভুত।

    খাপছাড়া টাক সামনের মাথায়,

        ফুর্‌ফুরে চুল কোথাও সাদা কোথাও কালো।

ছোটো ছোটো দুই চোখে নেই রোঁওয়া,

        ভ্রূ কুঁচকিয়ে কী দেখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে,

           তার দেখাটা যেন চোখের উঞ্ছবৃত্তি।

        যেমন উঁচু তেমনি চওড়া নাকটা,

    সমস্ত মুখের সে বারো-আনি অংশীদার।

               কপালটা মস্ত--

    তার উত্তর দিগন্তে নেই চুল, দক্ষিণ দিগন্তে নেই ভুরু।

দাড়ি-গোঁফ-কামানো মুখে

    অনাবৃত হয়েছে বিধাতার শিল্পরচনার অবহেলা।

 

কোথায় অলক্ষ্যে পড়ে আছে আল্‌পিন টেবিলের কোণে,

        তুলে নিয়ে সে বিঁধিয়ে রাখে জামায়--

তাই দেখে মুখ ফিরিয়ে মুচকে হাসে জাহাজের মেয়েরা;

        পার্সেল-বাঁধা টুকরো ফিতেটা সংগ্রহ করে মেঝের থেকে,

           গুটিয়ে গুটিয়ে তাতে লাগায় গ্রন্থি;

ফেলে-দেওয়া খবরের কাগজ ভাঁজ করে রাখে টেবিলে।

        আহারে অত্যন্ত সাবধান--

           পকেটে থাকে হজমি গুঁড়ো,

খেতে বসেই সেটা খায় জলে মিশিয়ে,

        খাওয়ার শেষে খায় হজমি বড়ি।

 

স্বল্পভাষী, কথা যায় বেধে--

        যা বলে মনে হয় বোকার মতো।

               ওর সঙ্গে যখন কেউ পলিটিক্‌স্‌ বলে

        বুঝিয়ে বলে অনেক ক'রে--

ও থাকে চুপচাপ, কিছু বুঝল কি না বোঝা যায় না।

 

    চলেছি একসঙ্গে সাত দিন এক জাহাজে।

        অকারণে সকলে বিরক্ত ওর 'পরে,

           ওকে ব্যঙ্গ করে আঁকে ছবি,

               হাসে তাই নিয়ে পরস্পর।

    ওর নামে অত্যুক্তি বেড়ে চলেছে কেবলই,

ওকে দিনে দিনে মুখে মুখে রচনা করে তুলছে সবাই।

           বিধির রচনায় ফাঁক থাকে,

    থাকে কোথাও কোথাও অস্ফুটতা।

এরা ভরিয়ে তোলে এদের রচনা দৈনিক রাবিশ দিয়ে,

               খাঁটি সত্যের মতো চেহারা হয়,

                   নিজেরা বিশ্বাস করে।

        সবাই ঠিক করে রেখেছে ও দালাল,

    কেউ বা বলে রবারের কুঠির মেজো ম্যানেজার;

               বাজি রাখা চলছে আন্দাজ নিয়ে।

সবাই ওকে পাশ কাটিয়ে চলে,

           সেটা ওর সয়ে গেছে আগে থাকতেই।

চুরোট খাওয়ার ঘরে জুয়ো খেলে যাত্রীরা,

    ও তাদের এড়িয়ে চলে যায়,

        তারা ওকে গাল দেয় মনে মনে--

           বলে কৃপণ, বলে ছোটোলোক।

 

ও মেশে চাটগাঁয়ের খালাসিদের সঙ্গে।

           তারা কয় তাদের ভাষায়,

    ও বলে কী ভাষা কে জানে--

           বোধ করি ওলন্দাজি।

        সকালে রবারের নল নিয়ে তারা ডেক ধোয়,

           ও তাদের মধ্যে গিয়ে লাফালাফি করে,

                   তারা হাসে।

ওদের মধ্যে ছিল এক অল্প বয়সের ছেলে--

        শামলা রঙ, কালো চোখ, ঝাঁকড়া চুল,

               ছিপ্‌ছিপে গড়ন--

ও তাকে এনে দেয় আপেল কমলালেবু,

           তাকে দেখায় ছবির বই।

        যাত্রীরা রাগ করে য়ুরোপের অসম্মানে।

 

           জাহাজ এল শিঙাপুরে।

    খালাসিদের ডেকে ও তাদের দিল সিগারেট,

                   আর দশটা করে টাকার নোট।

    ছেলেটাকে দিলে একটা সোনা-বাঁধানো ছড়ি।

        কাপ্তেনের কাছে বিদায় নিয়ে

                   তড়্‌বড়্‌ করে নেমে গেল ঘাটে।

 

তখন তার আসল নাম হয়ে গেল জানাজানি;

        যারা চুরোট ফোঁকার ঘরে তাস খেলত

               "হায় হায়' করে উঠল তাদের মন।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

4
Verses
তোমারি রাগিনী জীবনকুঞ্জে
       বাজে যেন সদা বাজে গো।
তোমারি আসন হৃদয়পদ্মে
       রাজে যেন সদা রাজে গো।
              তব নন্দনগন্ধমোদিত
                      ফিরি সুন্দর ভুবনে
              তব পদরেণু মাখি লয়ে তনু
                      সাজে যেন সদা সাজে গো।
তোমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে
       বাজে যেন সদা বাজে গো।
              সব বিদ্বেষ দূরে যায় যেন
                      তব মঙ্গলমন্ত্রে,
              বিকাশে মাধুরী হৃদয়ে বাহিরে
                      তব সংগীতছন্দে।
তব নির্মল নীরব হাস্য
       হেরি অম্বর ব্যাপিয়া
তব গৌরবে সকল গর্ব
       লাজে যেন সদা লাজে গো।
              তোমারি রাগিণী জীবনকুঞ্জে
                      বাজে যেন সদা বাজে গো।
আরো দেখুন
দান
Verses
           ভেবেছিলাম চেয়ে নেব,
                চাই নি সাহস করে--
           সন্ধেবেলায় যে মালাটি
                গলায় ছিলে পরে--
    আমি      চাই নি সাহস করে।
           ভেবেছিলাম সকাল হলে
           যখন পারে যাবে চলে
           ছিন্ন মালা শয্যাতলে
                রইবে বুঝি পড়ে।
           তাই আমি কাঙালের মতো
                এসেছিলেম ভোরে--
    তবু       চাই নি সাহস করে।
           এ তো মালা নয় গো, এ যে
                তোমার তরবারি।
           জ্বলে ওঠে আগুন যেন,
                বজ্র-হেন ভারী--
    এ যে      তোমার তরবারি।
তরুণ আলো জানলা বেয়ে
           পড়ল তোমার শয়ন ছেয়ে,
           ভোরের পাখি শুধায় গেয়ে
                "কী পেলি তুই নারী'।
           নয় এ মালা, নয় এ থালা,
                গন্ধজলের ঝারি,
    এ যে      ভীষণ তরবারি।
           তাই তো আমি ভাবি বসে
                এ কী তোমার দান।
           কোথায় এরে লুকিয়ে রাখি
                নাই যে হেন স্থান।
    ওগো,      এ কী তোমার দান।
           শক্তিহীনা মরি লাজে,
           এ ভূষণ কি আমায় সাজে।
           রাখতে গেলে বুকের মাঝে
                ব্যথা যে পায় প্রাণ।
           তবু আমি বইব বুকে
                এই বেদনার মান--
    নিয়ে        তোমারি এই দান।
           আজকে হতে জগৎমাঝে
               ছাড়ব আমি ভয়,
           আজ হতে মোর সকল কাজে
               তোমার হবে জয়--
    আমি       ছাড়ব সকল ভয়।
           মরণকে মোর দোসর করে
           রেখে গেছ আমার ঘরে,
           আমি তারে বরণ ক'রে
                 রাখব পরান-ময়।
   তোমার তরবারি আমার
      করবে বাঁধন ক্ষয়।
    আমি      ছাড়ব সকল ভয়।
          তোমার লাগি অঙ্গ ভরি
                করব না আর সাজ।
          নাই-বা তুমি ফিরে এলে
                ওগো হৃদয়রাজ।
    আমি      করব না আর সাজ।
          ধুলায় বসে তোমার তরে
          কাঁদব না আর একলা ঘরে,
          তোমার লাগি ঘরে-পরে
                মানব না আর লাজ।
          তোমার তরবারি আমায়
                সাজিয়ে দিল আজ,
    আমি      করব না আর সাজ।
আরো দেখুন
অভিমান
Verses
কারে দিব দোষ বন্ধু, কারে দিব দোষ!
বৃথা কর আস্ফালন, বৃথা কর রোষ।
যারা শুধু মরে কিন্তু নাহি দেয় প্রাণ,
কেহ কভু তাহাদের করে নি সম্মান।
যতই কাগজে কাঁদি, যত দিই গালি,
কালামুখে পড়ে তত কলঙ্কের কালি।
যে তোমারে অপমান করে অহর্নিশ
তারি কাছে তারি 'পরে তোমার নালিশ!
নিজের বিচার যদি নাই নিজহাতে,
পদাঘাত খেয়ে যদি না পার ফিরাতে--
তবে ঘরে নতশিরে চুপ করে থাক্‌,
সাপ্তাহিকে দিগ্‌বিদিকে বাজাস নে ঢাক।
একদিকে অসি আর অবজ্ঞা অটল,
অন্য দিকে মসী আর শুধু অশ্রুজল।
আরো দেখুন