নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ (nirjharer swapnabhanga)

আজি এ প্রভাতে   প্রভাতবিহগ

কী গান গাইল রে!

অতি দূর দূর        আকাশ হইতে

ভাসিয়া আইল রে!

না জানি কেমনে    পশিল হেথায়

পথহারা তার একটি তান,

আঁধার গুহায় ভ্রমিয়া ভ্রমিয়া

গভীর গুহায় নামিয়া নামিয়া

আকুল হইয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া

ছুঁয়েছে আমার প্রাণ।

আজি এ প্রভাতে   সহসা কেন রে

পথহারা রবিকর

আলয় না পেয়ে     পড়েছে আসিয়ে

আমার প্রাণের 'পর!

বহুদিন পরে         একটি কিরণ

গুহায় দিয়েছে দেখা,

পড়েছে আমার      আঁধার সলিলে

একটি কনকরেখা।

প্রাণের আবেগ রাখিতে নারি

থর থর করি কাঁপিছে বারি,

টলমল জল করে থল থল,

কল কল করি ধরেছে তান।

আজি এ প্রভাতে   কী জানি কেন রে

জাগিয়া উঠেছে প্রাণ।

জাগিয়া দেখিনু, চারিদিকে মোর

পাষাণে রচিত কারাগার ঘোর,

বুকের উপরে       আঁধার বসিয়া

করিছে নিজের ধ্যান।

না জানি কেন রে   এতদিন পরে

জাগিয়া উঠেছে প্রাণ।

 

জাগিয়া দেখিনু আমি আঁধারে রয়েছি আঁধা,

আপনারি মাঝে আমি আপনি রয়েছি বাঁধা।

রয়েছি মগন হয়ে আপনারি কলস্বরে,

ফিরে আসে প্রতিধ্বনি নিজেরি শ্রবণ-'পরে।

দূর দূর দূর হতে ভেদিয়া আঁধার কারা

মাঝে মাঝে দেখা দেয় একটি সন্ধ্যার তারা।

তারি মুখ দেখে দেখে       আঁধার হাঁসিতে শেখে,

তারি মুখ চেয়ে চেয়ে করে নিশি অবসান।

শিহরি উঠে রে বারি,দোলে রে দোলে রে প্রাণ,

প্রাণের মাঝারে ভাসি        দোলে রে দোলে রে হাসি,

দোলে রে প্রাণের 'পরে আশার স্বপন মম,

দোলে রে তারার ছায়া সুখের আভাস-সম।

 

মাঝে মাঝে একদিন আকাশেতে নাই আলো,

পড়িয়া মেঘের ছায়া কালো জল হয় কালো।

আঁধার   সলিল 'পরে     ঝর ঝর বারি ঝরে

ঝর ঝর ঝর ঝর,দিবানিশি অবিরল--

বরষার দুখ-কথা,বরষার আঁখিজল।

শুয়ে শুয়ে আনমনে দিবানিশি তাই শুনি

একটি একটি ক'রে দিবানিশি তাই গুনি,

তারি সাথে মিলাইয়া কল কল গান গাই--

ঝর ঝর কল কল--দিন নাই, রাত নাই।

এমনি নিজেরে লয়ে রয়েছি নিজের কাছে,

আঁধার সলিল 'পরে আঁধার জাগিয়া আছে।

এমনি নিজের কাছে খুলেছি নিজের প্রাণ,

এমনি পরের কাছে শুনেছি নিজের গান।

 

আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের 'পর,

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে

প্রভাত-পাখির গান।

না জানি কেন রে         এতদিন পরে

জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,

ওরে        উথলি উঠেছে বারি,

ওরে       প্রাণের বাসনা  প্রাণের আবেগ

রুধিয়া রাখিতে নারি।

থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,

শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,

ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল

গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।

হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়

ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায়,

বাহিরিতে চায়,         দেখিতে না পায়

   কোথায় কারার দ্বার।

প্রভাতেরে যেন লইতে কাড়িয়া

আকাশেরে যেন ফেলিতে ছিঁড়িয়া

উঠে শূন্যপানে--পড়ে আছাড়িয়া

করে শেষে হাহাকার।

প্রাণের উল্লাসে ছুটিতে চায়

ভূধরের হিয়া টুটিতে চায়,

আলিঙ্গন তরে ঊর্ধ্বে বাহু তুলি

আকাশের পানে উঠিতে চায়।

 

প্রভাতকিরণে পাগল হইয়া

জগৎ-মাঝারে লুটিতে চায়।

কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,

চারিদিকে তার বাঁধন কেন?

ভাঙ্‌ রে হৃদয় ভাঙ্‌ রে বাঁধন,

সাধ্‌ রে আজিকে প্রাণের সাধন,

লহরীর পরে লহরী তুলিয়া

আঘাতের পর আঘাত কর্‌।

মাতিয়া যখন উঠিছে পরান,

কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!

উথলি যখন উঠিছে বাসনা,

জগতে তখন কিসের ডর!

 

সহসা আজি এ জগতের মুখ

নূতন করিয়া দেখিনু কেন?

একটি পাখির আধখানি তান

জগতের গান গাহিল যেন!

জগৎ দেখিতে হইব বাহির,

আজিকে করেছি মনে,

দেখিব না আর নিজেরি স্বপন

বসিয়া গুহার কোণে।

আমি       ঢালিব করুণাধারা,

আমি       ভাঙিব পাষাণকারা,

আমি       জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া

আকুল পাগল-পারা;

কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,

রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,

রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া,

দিব রে পরান ঢালি।

শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,

ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব

হেসে খলখল গেয়ে কলকল

তালে  তালে দিব তালি।

তটিনী হইয়া যাইব বহিয়া--

যাইব বহিয়া--যাইব বহিয়া--

হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া

গাহিয়া গাহিয়া গান,

যত দেব প্রাণ       বহে যাবে প্রাণ

ফুরাবে না আর প্রাণ।

এত কথা আছে     এত গান আছে

এত প্রাণ আছে মোর,

এত সুখ আছে      এত সাধ আছে

প্রাণ হয়ে আছে ভোর।

 

এত সুখ কোথা     এত রূপ কোথা

এত খেলা কোথা আছে!

যৌবনের বেগে      বহিয়া যাইব

কে জানে কাহার কাছে!

অগাধ বাসনা        অসীম আশা

জগৎ দেখিতে চাই!

জাগিয়াছে সাধ      চরাচরময়

প্লাবিয়া বহিয়া যাই।

যত প্রাণ আছে ঢালিতে পারি,

যত কাল আছে বহিতে পারি,

যত দেশ আছে ডুবাতে পারি,

তবে আর কিবা চাই!    

পরানের সাধ তাই।

 

কী জানি কী হল আজি জাগিয়া উঠিল প্রাণ,

দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান--

"পাষাণ-বাঁধন টুটি, ভিজায়ে কঠিন ধরা,

বনেরে শ্যামল করি, ফুলেরে ফুটায়ে ত্বরা

সারাপ্রাণ ঢালি দিয়া,

জুড়ায়ে জগৎ-হিয়া--

আমার প্রাণের মাঝে কে আসিবি আয় তোরা!'

 

আমি যাব, আমি যাব, কোথায় সে, কোন্‌ দেশ--

জগতে ঢালিব প্রাণ,

গাহিব করুণাগান,

উদ্‌বেগ-অধীর হিয়া

সুদূর সমুদ্রে গিয়া

সে প্রাণ মিশাব আর সে গান করিব শেষ।

 

ওরে, চারিদিকে মোর

এ কী কারাগার ঘোর!

ভাঙ্‌ ভাঙ্‌ ভাঙ্‌ কারা, আঘাতে আঘাত কর্‌!

  ওরে,আজ কী গান গেয়েছে পাখি,

এয়েছে রবির কর!

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

প্রবীণ
Verses
বিশ্বজগৎ যখন করে কাজ
স্পর্ধা ক'রে পরে ছুটির সাজ।
আকাশে তার আলোর ঘোড়া চলে,
কৃতিত্বেরে লুকিয়ে রাখে পরিহাসের ছলে।
বনের তলে গাছে গাছে শ্যামল রূপের মেলা,
ফুলে ফলে নানান্‌ রঙে নিত্য নতুন খেলা।
বাহির হতে কে জানতে পায়, শান্ত আকাশতলে
প্রাণ বাঁচাবার কঠিন কর্মে নিত্য লড়াই চলে।
চেষ্টা যখন নগ্ন হয়ে শাখায় পড়ে ধরা,
তখন খেলার রূপ চলে যায়, তখন আসে জরা।
বিলাসী নয় মেঘগুলো তো জলের ভারে ভরা,
চেহারা তার বিলাসিতার রঙের ভূষণ পরা।
বাইরে ওরা বুড়োমিকে দেয় না তো প্রশ্রয়--
অন্তরে তাই চিরন্তনের বজ্রমন্দ্র রয়।
জল-ঝরানো ছেলেখেলা যেমনি বন্ধ করে
ফ্যাকাশে হয় চেহারা তার, বয়স তাকে ধরে।
দেহের মাঝে হাজার কাজে বহে প্রাণের বায়ু--
পালের তরীর মতন যেন ছুটিয়ে চলে আয়ু,
বুকের মধ্যে জাগায় নাচন, কণ্ঠে লাগায় সুর,
সকল অঙ্গ অকারণে উৎসাহে ভরপুর।
রক্তে যখন ফুরোবে ওর খেলার নেশা খোঁজা
তখনি কাজ অচল হবে, বয়স হবে বোঝা।
ওগো তুমি কী করছ, ভাই, স্তব্ধ সারাক্ষণ--
বুদ্ধি তোমার আড়ষ্ট যে, ঝিমিয়ে-পড়া মন।
নবীন বয়স যেই পেরোল খেলাঘরের দ্বারে
মরচে-পড়া লাগল তালা, বন্ধ একেবারে।
ভালোমন্দ বিচারগুলো খোঁটায় যেন পোঁতা।
আপন মনের তলায় তুমি তলিয়ে গেলে কোথা।
চলার পথে আগল দিয়ে বসে আছ স্থির--
বাইরে এসো, বাইরে এসো, পরমগম্ভীর।
কেবলই কি প্রবীণ তুমি, নবীন নও কি তাও।
দিনে দিনে ছি ছি কেবল বুড়ো হয়েই যাও।
আশি বছর বয়স হবে ওই যে পিপুলগাছ,
এ আশ্বিনের রোদ্‌দুরে ওর দেখলে বিপুল নাচ?
পাতায় পাতায় আবোল-তাবোল, শাখায় দোলাদুলি,
পান্থ হাওয়ার সঙ্গে ও চায় করতে কোলাকুলি।
ওগো প্রবীণ, চলো এবার সকল কাজের শেষে
নবীন হাসি মুখে নিয়ে চরম খেলার বেশে।
আরো দেখুন
অনন্ত মরণ
Verses
কোটি কোটি  ছোটো ছোটো মরণেরে লয়ে
        বসুন্ধরা ছুটিছে আকাশে,
        হাসে খেলে মৃত্যু চারিপাশে।
        এ ধরণী মরণের পথ,
        এ জগৎ মৃত্যুর জগৎ।
যতটুকু বর্তমান, তারেই কি বল' প্রাণ?
         সে তো শুধু, পলক, নিমেষ।
অতীতের মৃত ভার পৃষ্ঠেতে রয়েছে তার,
        না জানি কোথায় তার শেষ।
যত বর্ষ বেঁচে আছি তত বর্ষ মরে গেছি,
        মরিতেছি প্রতি পলে পলে,
জীবন্ত মরণ মোরা মরণের ঘরে থাকি
        জানি নে মরণ কারে বলে।
একমুঠা মরণেরে জীবন বলে কি তবে,
        মরণের সমষ্টি কেবল?
একটি নিমেষ তুচ্ছ শত মরণের গুচ্ছ,
       নাম নিয়ে এত কোলাহল।
মরণ বাড়িবে যত জীবন বাড়িবে তত,
      পলে পলে উঠিব আকাশে
      নক্ষত্রের কিরণনিবাসে।
মরণ বাড়িবে যত   কোথায় কোথায় যাব,
       বাড়িবে প্রাণের অধিকার--
বিশাল প্রাণের মাঝে  কত গ্রহ কত তারা
       হেথা হোথা করিবে বিহার ।
উঠিবে জীবন মোর কত-না আকাশ ছেয়ে,
        ঢাকিয়া ফেলিবে রবি শশী--
যুগ-যুগান্তর যাবে, নব নব রাজ্য পাবে
        নব নব তারায় প্রবেশি।
কবে রে আসিবে সেই দিন
উঠিব সে আকাশের পথে,
আমার মরণ-ডোর দিয়ে
বেঁধে দেব জগতে জগতে।
আমাদের মরণের জালে
জগৎ ফেলিব আবরিয়া,
এ অনন্ত  আকাশসাগরে
দশ দিক রহিব ঘেরিয়া।
জয় হোক জয় হোক মরণের জয় হোক--
          আমাদের অনন্ত মরণ,
          মরণের হবে না মরণ।
এ ধরায় মোরা সবে শতাব্দীর ক্ষুদ্র শিশু
           লইলাম তোমার শরণ,
এসো তুমি এসো কাছে, স্নেহ-কোলে লও তুমি,
          পিয়াও তোমার মাতৃস্তন,
          আমাদের করো হে পালন।
আনন্দে পুরেছে প্রাণ, হেরিতেছি এ জগতে
          মরণের অনন্ত উৎসব।
কার নিমন্ত্রণে মোরা মহাযজ্ঞে এসেছি রে,
          উঠেছে বিপুল কলরব।
যে ডাকিছে ভালোবেসে, তারে চিনিস নে শিশু?
          তার কাছে কেন তোর ডর?
জীবন যাহারে বলে মরণ তাহারি নাম,
       মরণ তো নহে তোর পর।
       আয়, তারে অলিঙ্গন কর্‌--
       আয় তার হাতখানি ধর্‌।
আরো দেখুন
সংযোজন - উৼসর্গ
Verses
বিজ্ঞানাচার্য শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু
                                           করকমলেষু
বন্ধু, এ যে আমার লজ্জাবতী লতা
      কী পেয়েছে আকাশ হতে
      কী এসেছে বায়ুর স্রোতে
      পাতার ভাঁজে লুকিয়ে আছে
             সে যে প্রাণের কথা।
      যত্নভরে খুঁজে খুঁজে
      তোমায় নিতে হবে বুঝে,
      ভেঙে দিতে হবে যে তার
             নীরব ব্যাকুলতা।
      আমার       লজ্জাবতী লতা।
বন্ধু, সন্ধ্যা এল, স্বপনভরা
             পবন এরে চুমে।
      ডালগুলি সব পাতা নিয়ে
             জড়িয়ে এল ঘুমে।
      ফুলগুলি সব নীল নয়ানে
      চুপিচুপি আকাশপানে
      তারার দিকে চেয়ে চেয়ে
             কোন্‌ ধেয়ানে রতা।
      আমার       লজ্জাবতী লতা।
বন্ধু, আনো তোমার তড়িৎ-পরশ,
             হরষ দিয়ে দাও,
      করুণ চক্ষু মেলে ইহার
             মর্মপানে চাও।
      সারা দিনের গন্ধগীতি
      সারা দিনের আলোর স্মৃতি
      নিয়ে এ যে হৃদয়ভারে
             ধরায় অবনতা--
      আমার       লজ্জাবতী লতা।
বন্ধু,  তুমি জান ক্ষুদ্র যাহা
             ক্ষুদ্র তাহা নয়,
      সত্য যেথা কিছু আছে
      বিশ্ব সেথা রয়
      এই-যে মুদে আছে লাজে
      পড়বে তুমি এরি মাঝে--
      জীবনমৃত্যু রৌদ্রছায়া
             ঝটিকার বারতা।
      আমার       লজ্জাবতী লতা।
আরো দেখুন