পাঁচ (sondhya elo chul eliye)

সন্ধ্যা এল চুল এলিয়ে

              অস্তসমুদ্রে সদ্য স্নান করে।

     মনে হল, স্বপ্নের ধূপ উঠছে

                      নক্ষত্রলোকের দিকে।

     মায়াবিষ্ট নিবিড় সেই স্তব্ধ ক্ষণে--

                  তার নাম করব না--

সবে সে চুল বেঁধেছে, পরেছে আসমানি রঙের শাড়ি,

                    খোলা ছাদে গান গাইছে একা।

               আমি দাঁড়িয়ে ছিলেম পিছনে

               ও হয়তো জানে না, কিম্বা হয়তো জানে।

 

ওর গানে বলছে সিন্ধু কাফির সুরে--

          চলে যাবি এই যদি তোর মনে থাকে

               ডাকব না ফিরে ডাকব না,

                        ডাকি নে তো সকালবেলার শুকতারাকে।

 

শুনতে শুনতে সরে গেল সংসারের ব্যবহারিক আচ্ছাদনটা,

       যেন কুঁড়ি থেকে পূর্ণ হয়ে ফুটে বেরোল

            অগোচরের অপরূপ প্রকাশ;

                 তার লঘু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল আকাশে;

                         অপ্রাপণীয়ের সে দীর্ঘনিশ্বাস,

                 দুরূহ দুরাশার সে অনুচ্চারিত ভাষা।

 

একদা মৃত্যুশোকের বেদমন্ত্র

     তুলে ধরেছে বিশ্বের আবরণ, বলছে--

             পৃথিবীর ধূলি মধুময়।

             সেই সুরে আমার মন বললে--

                   সংগীতময় ধরার ধূলি।

 

আমার মন বললে--

     মৃত্যু, ওগো মধুময় মৃত্যু,

     তুমি আমায় নিয়ে চলেছ লোকান্তরে

                   গানের পাখায়।

 

আমি ওকে দেখলেম,

   যেন নিকষবরন ঘাটে সন্ধ্যার কালো জলে

      অরণবরন পা-দুখানি ডুবিয়ে বসে আছে অপ্সরী,

      অকূল সরোবরে সুরের ঢেউ উঠেছে মৃদুমৃদু,

          আমার বুকের কাঁপনে কাঁপন-লাগা হাওয়া

            ওকে স্পর্শ করছে ঘিরে ঘিরে।

 

আমি ওকে দেখলেম,

   যেন আলো-নেবা বাসরঘরে নববধূ,

       আসন্ন প্রত্যাশার নিবিড়তায়

              দেহের সমস্ত শিরা স্পন্দিত।

     আকাশে ধ্রুবতারার অনিমেষ দৃষ্টি,

             বাতাসে সাহানা রাগিণীর করুণা।

 

আমি ওকে দেখলেম,

   ও যেন ফিরে গিয়েছে পূর্বজন্মে

        চেনা-অচেনার অস্পষ্টতায়।

          সে যুগের পালনো বাণী ধরবে বলে

                 ঘুরিয়ে ফেলছে গানের জাল,

       সুরের ছোঁওয়া দিয়ে খুঁজে খুঁজে ফিরছে

                     হারানো পরিচয়কে।

 

সমুখে ছাদ ছাড়িয়ে উঠেছে বাদামগাছের মাথা,

         উপরে উঠল কৃষ্ণচতুর্থীর চাঁদ।

                 ডাকলেম নাম ধরে।

         তীক্ষ্ণবেগে উঠে দাঁড়ালো সে,

ভ্রূকুটি করে বললে, আমার দিকে ফিরে--

            "এ কী অন্যায়, কেন এলে লুকিয়ে।"

            কোনো উত্তর করলেম না।

বললেম না, প্রয়োজন ছিল না এই তুচ্ছ ছলনার।

   বললেম না, আজ সহজে বলতে পারতে "এসো',

        বলতে পারতে "খুশি হয়েছি'।

     মধুময়ের উপর পড়ল ধুলার আবরণ।

 

পরদিন ছিল হাটবার

  জানলায় বসে দেখছি চেয়ে।

       রৌদ্র ধূ ধূ করছে পাশের সেই খোলা ছাদে।

তার স্পষ্ট আলোয় বিগত বসন্তরাত্রের বিহ্বলতা

                          সে দিয়েছে ঘুচিয়ে।

         নির্বিশেষে ছড়িয়ে পড়ল আলো মাঠে বাটে,

                    মহাজনের টিনের ছাদে,

              শাক-সবজির ঝুড়ি-চুপড়িতে,

                             আঁটিবাঁধা খড়ে,

                 হাঁড়ি-মালসার স্তূপে,

                      নতুন গুড়ের কলসীর গায়ে।

                 সোনার কাঠি ছুঁইয়ে দিল

                     মহানিম গাছের ফুলের মঞ্জরিতে।

  পথের ধারে তালের গুঁড়ি আঁকড়ে উঠেছে অশথ,

        অন্ধ বৈরাগী তারই ছায়ায় গান গাইছে হাঁড়ি বাজিয়ে--

                 কাল আসব বলে চলে গেল,

        আমি যে সেই কালের দিকে তাকিয়ে আছি।

 

কেনাবেচার বিচিত্র গোলমালের জমিনে

       ওই সুরের শিল্পে বুনে উঠছে

যেন সমস্ত বিশ্বের একটা উৎকন্ঠার মন্ত্র-- "তাকিয়ে আছি।'

 

একজোড়া মোষ উদাস চোখ মেলে

         বয়ে চলেছে বোঝাই গাড়ি,

             গলায় বাজছে ঘণ্টা,

  চাকার পাকে পাকে টেনে তুলছে কাতর ধ্বনি।

আকাশের আলোয় আজ যেন মেঠো বাঁশির সুর মেলে দেওয়া।

                সব জড়িয়ে মন ভুলেছে।

 

বেদমন্ত্রের ছন্দে আবার মন বললে--

            মধুময় এই পার্থিব ধূলি।

 

কেরোসিনের দোকানের সামনে

       চোখে পড়ল একজন একেলে বাউল।

    তালিদেওয়া আলখাল্লার উপরে

               কোমরে-বাঁধা একটা বাঁয়া।

               লোক জমেছে চারি দিকে।

হাসলেম, দেখলেম অদ্ভুতেরও সংগতি আছে এইখানে,

                   এও এসেছে হাটের ছবি ভর্তি করতে।

         ওকে ডেকে নিলেম জানলার কাছে,

                    ও গাইতে লাগল--

         হাট করতে এলেম আমি অধরার সন্ধানে,

                সবাই ধরে টানে আমায়, এই যে গো এইখানে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

নামকরণ
Verses
বাদলবেলায় গৃহকোণে
রেশমে পশমে জামা বোনে,
নীরবে আমার লেখা শোনে,
      তাই সে আমার শোনামণি।
প্রচলিত ডাক নয় এ যে
দরদীর মুখে ওঠে বেজে,
পন্ডিতে দেয় নাই মেজে--
      প্রাণের ভাষাই এর খনি।
সেও জানে আর জানি আমি
এ মোর নেহাত পাগলামি--
ডাক শুনে কাজ যায় থামি,
     কঙ্কণ ওঠে কনকনি।
সে হাসে, আমিও তাই হাসি--
      জবাবে ঘটে না কোনো বাধা।
অভিধান-বর্জিত ব'লে
      মানে আমাদের কাছে সাদা।
      কেহ নাহি জানে কোন্‌ খনে
                পশমের শিল্পের সাথে
সুকুমার হাতের নাচনে
      নূতন নামের ধ্বনি গাঁথে
                শোনামণি, ওগো সুনয়নী।
আরো দেখুন
১২৯
Verses
১২৯
ওই শুন বনে বনে কুঁড়ি বলে তপনেরে ডাকি --
         "খুলে দাও আঁখি'  ॥      
আরো দেখুন
জ্যোৎস্নারাত্রে
Verses
শান্ত করো, শান্ত করো এ ক্ষুব্ধ হৃদয়
হে নিস্তব্ধ পূর্ণিমাযামিনী। অতিশয়
উদ্‌ভ্রান্ত বাসনা বক্ষে করিছে আঘাত
বারম্বার, তুমি এসো স্নিগ্ধ অশ্রুপাত
দগ্ধ বেদনার 'পরে। শুভ্র সুকোমল
মোহভরা নিদ্রাভরা করপদ্মদল,
আমার সর্বাঙ্গে মনে দাও বুলাইয়া
বিভাবরী, সর্ব ব্যথা দাও ভুলাইয়া।
বহু দিন পরে আজি দক্ষিণ বাতাস
প্রথম বহিছে। মুগ্ধ হৃদয় দুরাশ
তোমার চরণপ্রান্তে রাখি তপ্ত শির
নিঃশব্দে ফেলিতে চাহে রুদ্ধ অশ্রুনীর
হে মৌনরজনী! পাণ্ডুর অম্বর হতে
ধীরে ধীরে এসো নামি লঘু জ্যোৎস্নাস্রোতে,
মৃদুহাস্যে নতনেত্রে দাঁড়াও আসিয়া
নির্জন শিয়রতলে। বেড়াক ভাসিয়া
রজনীগন্ধার গন্ধ মদির লহরী
সমীরহিল্লোলে; স্বপ্নে বাজুক বাঁশরি
চন্দ্রলোকপ্রান্ত হতে; তোমার অঞ্চল
বায়ুভরে উড়ে এসে পুলকচঞ্চল
করুক আমার তনু; অধীর মর্মরে
শিহরি উঠুক বন; মাথার উপরে
চকোর ডাকিয়া যাক দূরশ্রুত তান;
সম্মুখে পড়িয়া থাক্‌ তটান্তশয়ান,
সুপ্ত নটিনীর মতো, নিস্তব্ধ তটিনী
স্বপ্নালসা।
      হেরো আজি নিদ্রিতা মেদিনী,
ঘরে ঘরে রুদ্ধ বাতায়ন। আমি একা
আছি জেগে, তুমি একাকিনী দেহো দেখা
এই বিশ্বসুপ্তিমাঝে, অসীম সুন্দর,
ত্রিলোকনন্দনমূর্তি। আমি যে কাতর
অনন্ত তৃষায়, আমি নিত্য নিদ্রাহীন,
সদা উৎকণ্ঠিত, আমি চিররাত্রিদিন
আনিতেছি অর্ঘ্যভার অন্তরমন্দিরে
অজ্ঞাত দেবতা লাগি-- বাসনার তীরে
একা বসে গড়িতেছি কত যে প্রতিমা
আপন হৃদয় ভেঙে, নাহি তার সীমা।
আজি মোরে করো দয়া, এসো তুমি, অয়ি,
অপার রহস্য তব, হে রহস্যময়ী,
খুলে ফেলো-- আজি ছিন্ন করে ফেলো ওই
চিরস্থির আচ্ছাদন অনন্ত অম্বর।
মৌনশান্ত অসীমতা নিশ্চল সাগর,
তারি মাঝখান হতে উঠে এসো ধীরে
তরুণী লক্ষ্মীর মতো হৃদয়ের তীরে
আঁখির সম্মুখে। সমস্ত প্রহরগুলি
ছিন্ন পুষ্পদলসম পড়ে যাক খুলি
তব চারি দিকে-- বিদীর্ণ নিশীথখানি
খসে যাক নীচে। বক্ষ হতে লহো টানি
অঞ্চল তোমার, দাও অবারিত করি
শুভ্র ভাল, আঁখি হতে লহো অপসরি
উন্মুক্ত অলক। কোনো মর্ত দেখে নাই
যে দিব্য মুরতি আমারে দেখাও তাই
এ বিশ্রব্ধ রজনীতে নিস্তব্ধ বিরলে।
উৎসুক উন্মুখ চিত্ত চরণের তলে
চকিতে পরশ করো; একটি চুম্বন
ললাটে রাখিয়া যাও, একান্ত নির্জন
সন্ধ্যার তারার মতো; আলিঙ্গনস্মৃতি
অঙ্গে তরঙ্গিয়া দাও, অনন্তের গীতি
বাজায়ে শিরার তন্ত্রে। ফাটুক হৃদয়
ভূমানন্দে-- ব্যাপ্ত হয়ে যাক শূন্যময়
গানের তানের মতো। একরাত্রি-তরে
হে অমরী, অমর করিয়া দাও মোরে।
তোমাদের বাসরকুঞ্জের বহির্‌দ্বারে
বসে আছি-- কানে আসিতেছে বারে বারে
মৃদুমন্দ কথা, বাজিতেছে সুমধুর
রিনিঝিনি রুনুঝুনু সোনার নূপুর--
কার কেশপাশ হতে খসি পুষ্পদল
পড়িছে আমার বক্ষে, করিছে চঞ্চল
চেতনাপ্রবাহ। কোথায় গাহিছ গান।
তোমরা কাহারা মিলি করিতেছ পান
কিরণকনকপাত্রে সুগন্ধি অমৃত,
মাথায় জড়ায়ে মালা পূর্ণবিকশিত
পারিজাত-- গন্ধ তারি আসিছে ভাসিয়া
মন্দ সমীরণে-- উন্মাদ করিছে হিয়া
অপূর্ব বিরহে। খোলো দ্বার, খোলো দ্বার।
তোমাদের মাঝে মোরে লহো একবার
সৌন্দর্যসভায়। নন্দনবনের মাঝে
নির্জন মন্দিরখানি-- সেথায় বিরাজে
একটি কুসুমশয্যা, রত্নদীপালোকে
একাকিনী বসি আছে নিদ্রাহীন চোখে
বিশ্বসোহাগিনী লক্ষ্মী, জ্যোতির্ময়ী বালা--
আমি কবি তারি তরে আনিয়াছি মালা।
আরো দেখুন