সিন্ধুতরঙ্গ (sindhutorongo)

        পুরী-তীর্থযাত্রী তরণীর নিমজ্জন উপলক্ষে

 

    দোলে রে প্রলয় দোলে           অকূল সমুদ্র-কোলে,

                      উৎসব ভীষণ।

    শত পক্ষ ঝাপটিয়া                বেড়াইছে দাপটিয়া

                      দুর্দম পবন।

    আকাশ সমুদ্র-সাথে              প্রচণ্ড মিলনে মাতে,

         অখিলের আঁখিপাতে আবরি তিমির।

    বিদ্যুৎ চমকে ত্রাসি,           হা হা করে ফেনরাশি,

         তীক্ষ্ণ শ্বেত রুদ্র হাসি জড়-প্রকৃতির।

    চক্ষুহীন কর্ণহীন                    গেহহীন স্নেহহীন

                      মত্ত দৈত্যগণ

         মরিতে ছুটেছে কোথা, ছিঁড়েছে বন্ধন।

    হারাইয়া চারি ধার                  নীলাম্বুধি অন্ধকার

                      কল্লোলে, ক্রন্দনে,

    রোষে, ত্রাসে, ঊর্ধ্বশ্বাসে,         অট্টরোলে, অট্টহাসে,

                      উন্মাদ গর্জনে,

    ফাটিয়া ফুটিয়া উঠে,             চূর্ণ হয়ে যায় টুটে,

         খুঁজিয়া মরিছে ছুটে আপনার কূল--

    যেন রে পৃথিবী ফেলি         বাসুকী করিছে কেলি

         সহস্রৈক ফণা মেলি, আছাড়ি লাঙ্গুল।

    যেন রে তরল নিশি                 টলমলি দশ দিশি

                      উঠিছে নড়িয়া,

         আপন নিদ্রার জাল ফেলিছে ছিঁড়িয়া।

    নাই সুর, নাই ছন্দ,               অর্থহীন, নিরানন্দ

                      জড়ের নর্তন।

    সহস্র জীবনে বেঁচে               ওই কি উঠিছে নেচে

                      প্রকাণ্ড মরণ?

    জল বাষ্প বজ্র বায়ু               লভিয়াছে অন্ধ আয়ু,

         নূতন জীবনস্নায়ু টানিছে হতাশে,

    দিগ্বিদিক নাহি জানে,            বাধাবিঘ্ন নাহি মানে

         ছুটেছে প্রলয়-পানে আপনারি ত্রাসে;

    হেরো, মাঝখানে তারি            আট শত নরনারী

                      বাহু বাঁধি বুকে,

         প্রাণে আঁকড়িয়া প্রাণ, চাহিয়া সম্মুখে।

    তরণী ধরিয়া ঝাঁকে--         রাক্ষসী ঝটিকা হাঁকে,

                      "দাও, দাও, দাও!"

    সিন্ধু ফেনোচ্ছল ছলে           কোটি ঊর্ধ্বকরে বলে,

                      "দাও, দাও, দাও!"

    বিলম্ব দেখিয়া রোষে           ফেনায়ে ফেনায়ে ফোঁষে,

         নীল মৃত্যু মহাক্রোশে শ্বেত হয়ে উঠে।

    ক্ষুদ্র তরী গুরুভার           সহিতে পারে না আর,

         লৌহবক্ষ ওই তার যায় বুঝি টুটে।

    অধ ঊর্ধ্ব এক হয়ে                  ক্ষুদ্র এ খেলনা লয়ে

                      খেলিবারে চায়।

             দাঁড়াইয়া কর্ণধার তরীর মাথায়।

    নরনারী কম্পমাপ                ডাকিতেছে, ভগবান!

                      হায় ভগবান!

    দয়া করো, দয়া করো!              উঠিছে কাতর স্বর,

                      রাখো রাখো প্রাণ!

    কোথা সেই পুরাতন                  রবি শশী তারাগণ

             কোথা আপনার ধন ধরণীর কোল!

    আজন্মের স্নেহসার             কোথা সেই ঘরদ্বার,

         পিশাচী এ বিমাতার হিংস্র উতরোল!

    যে দিকে ফিরিয়া চাই              পরিচিত কিছু নাই,

                      নাই আপনার--

             সহস্র করাল মুখ সহস্র-আকার।

    ফেটেছে তরণীতল,              সবেগে উঠিছে জল,

                      সিন্ধু মেলে গ্রাস।

    নাই তুমি, ভগবান,             নাই দয়া, নাই প্রাণ--

                      জড়ের বিলাস।

    ভয় দেখে ভয় পায়,             শিশু কাঁদে উভরায়--

             নিদারুণ হায়-হায় থামিল চকিতে।

    নিমেষেই ফুরাইল,                   কখন জীবন ছিল

             কখন জীবন গেল নারিল লখিতে।

    যেন রে একই ঝড়ে                নিবে গেল একত্তরে

                    শত দীপ আলো,

             চকিতে সহস্র গৃহে আনন্দ ফুরালো।

    প্রাণহীন এ মত্ততা              না জানে পরের ব্যাথা,

                    না জানে আপন।

    এর মাঝে কেন রয়                ব্যথাভরা স্নেহময়

                    মানবের মন।

    মা কেন রে এইখানে,           শিশুচায় তার পানে,

          ভাই সে ভায়ের টানে কেন পড়ে বুকে।

    মধুর রবির করে                  কত ভালোবাসা-ভরে

          কতদিন খেলা করে কত সুখে দুখে।

    কেন করে টলমল               দুটি ছোটো অশ্রুজল,

                    সকরুণ আশা।

          দীপশিখাসম কাঁপে ভীত ভালোবাসা।

    এমন জড়ের কোলে           কেমনে নির্ভয়ে দোলে

                    নিখিল মানব।

    সব সুখ সব আশ              কেন নাহি করে গ্রাস

                    মরণ দানব।

    ওই-যে জন্মের তরে              জননী ঝাঁপায়ে পড়ে

          কেন বাঁধে বক্ষ-'পরে সন্তান আপন।

    মরণের মুখে ধায়,        সেথাও দিবে না তায়--

          কাড়িয়া রাখিতে চায় হৃদয়ের ধন।

    আকাশেতে পারাবারে           দাঁড়ায়েছে এক ধারে

                    এক ধারে নারী,

        দুর্বল শিশুটি তার কে লইবে কাড়ি?

    এ বল কোথায় পেলে,          আপন কোলের ছেলে

                    এত ক'রে টানে।

    এ নিষ্ঠুর জহস্রোতে            প্রেম এল কোথা হতে

                    মানবের প্রাণে।

    নৈরাশ্য কভু না জানে,           বিপত্তি কিছু না মানে,

               অপূর্ব অমৃতপাটে অনন্ত নবীন--

    এমন মায়ের প্রাণ                  যে বিশ্বের কোনোখান

             তিলেক পেয়েছে স্থান সে কি মাতৃহীন?

    এ প্রলয়-মাঝখানে                  অবলা জননী-প্রাণে

                    স্নেহ মৃত্যুজয়ী--

         এ স্নেহ জাগায়ে রাখে কোন্‌ স্নেহময়ী?

    পাশাপাশি এক ঠাঁই           দয়া আছে, দয়া নাই--

                    বিষম সংশয়।

    মহাশঙ্কা মহা-আশা                একত্র বেঁধেছে বাসা,

                    এক-সাথে রয়।

    কে বা সত্য, কে বা মিছে,     নিশিদিন আকুলিছে,

         কভু ঊর্ধ্বে কভু নীচে টানিছে হৃদয়।

    জড় দৈত্য শক্তি হানে,       মিনতি নাহিক মানে--

         প্রেম এসে কোলে টানে, দূর করে ভয়।

    এ কি দুই দেবতার                দ্যূতখেলা অনিবার

                    ভাঙাগড়াময়?

          চিরদিন অন্তহীন জয়পরাজয়?

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

19
Verses
ঝড়ে          যায় উড়ে যায় গো
আমার        মুখের আঁচলখানি।
ঢাকা          থাকে না হায় গো,
তারে         রাখতে নারি টানি।
আমার        রইল না লাজলজ্জা,
আমার        ঘুচল গো সাজসজ্জা
তুমি          দেখলে আমারে
এমন          প্রলয়মাঝে আনি,
আমায়        এমন মরণ হানি।
                হঠাৎ         আকাশ উজলি'
                কারে        খুঁজে কে ওই চলে।
                চমক         লাগায় বিজলি
                আমার       আঁধার ঘরের তলে।
                তবে         নিশীথ-গগন জুড়ে
                আমার       যাক সকলি উড়ে,
                এই           দারুণ কল্লোলে
                বাজুক        আমার প্রাণের বাণী
                কোনো       বাঁধন নাহি মানি।
আরো দেখুন
নূতন
Verses
হেথাও তো পশে সূর্যকর।
ঘোর ঝটিকার রাতে              দারুণ অশনিপাতে
          বিদীরিল যে গিরিশিখর--
বিশাল পর্বত কেটে,               পাষাণ-হৃদয় ফেটে,
          প্রকাশিল যে ঘোর গহ্বর--
প্রভাতে পুলকে ভাসি,   বহিয়া নবীন হাসি,
          হেথাও তো পশে সূর্যকর!
দুয়ারেতে উঁকি মেরে              ফিরে তো যায় না সে রে,
          শিহরি উঠে না আশঙ্কায়,
ভাঙা পাষাণের বুকে               খেলা করে কোন্‌ সুখে,
          হেসে আসে, হেসে চলে যায়।
হেরো হেরো, হায় হায়,             যত প্রতিদিন যায়--    
কে গাঁথিয়া দেয় তৃণজাল।
লতাগুলি লতাইয়া,                বাহুগুলি বিথাইয়া
          ঢেকে ফেলে বিদীর্ণ কঙ্কাল।
বজ্রদগ্ধ অতীতের,                 নিরাশার অতিথের
          ঘোর স্তব্ধ সমাধি-আবাস,
ফুল এসে, পাতা এসে            কেড়ে নেয় হেসে হেসে,
          অন্ধকারে করে পরিহাস।
এরা সব কোথা ছিল,             কেই বা সংবাদ দিল,
          গৃহহারা আনন্দের দল--
বিশ্বে তিল শূন্য হলে,             অনাহূত আসে চলে,
          বাসা বাঁধে করি কোলাহল।
আনে হাসি, আনে গান,           আনে রে নূতন প্রাণ,
          সঙ্গে করে আনে রবিকর--
অশোক শিশুর প্রায়                এত হাসে এত গায়
          কাঁদিতে দেয় না অবসর।
বিষাদ বিশালকায়া                ফেলেছে আঁধার ছায়া
          তারে এরা করে না তো ভয়--
চারি দিক হতে তারে              ছোটো ছোটো হাসি মারে,
          অবশেষে করে পরাজয়।
এই যে রে মরুস্থল,              দাবদগ্ধ ধরাতল,
          এইখানে ছিল "পুরাতন'--
একদিন ছিল তার                 শ্যামল যৌবনভার,
          ছিল তার দক্ষিণ-পবন।
যদি রে সে চলে গেল,            সঙ্গে যদি নিয়ে গেল
          গীত গান হাসি ফুল ফল,
শুষ্ক স্মৃতি কেন মিছে             রেখে তবে গেল পিছে,
          শুষ্ক শাখা শুষ্ক ফুলদল।
সে কি চায় শুষ্ক বনে              গাহিবে বিহঙ্গগণে
          আগে তারা গাহিত যেমন?
আগেকার মতো করে             স্নেহে তার নাম ধরে
          উচ্ছ্বসিবে বসন্তপবন?
নহে নহে, সে কি হয়!            সংসার জীবনময়
          নাহি হেথা মরণের স্থান।
আয় রে, নূতন, আয়,             সঙ্গে করে নিয়ে আয়,
          তোর সুখ, তোর হাসি গান।
ফোটা নব ফুলচয়,                 ওঠা নব কিশলয়,
          নবীন বসন্ত আয় নিয়ে।
যে যায় সে চলে যাক,            সব তার নিয়ে যাক,
          নাম তার যাক মুছে দিয়ে।
এ কি ঢেউ-খেলা হায়,  এক আসে, আর যায়,
          কাঁদিতে কাঁদিতে আসে হাসি,
বিলাপের শেষ তান               না হইতে অবসান
          কোথা হতে বেজে ওঠে বাঁশি।
আয় রে কাঁদিয়া লই               শুকাবে দু-দিন বই
          এ পবিত্র অশ্রুবারিধারা।
সংসারে ফিরিব ভুলি,             ছোটো ছোটো সুখগুলি
          রচি দিবে আনন্দের কারা।
না রে, করিব না শোক,           এসেছে নূতন লোক,
তারে কে করিবে অবহেলা।
সেও চলে যাবে কবে              গীত গান সাঙ্গ হবে,
          ফুরাইবে দুদিনের খেলা।
আরো দেখুন
বুড়ী
Verses
এক যে ছিল চাঁদের কোণায়
          চরকা-কাটা বুড়ী
পুরাণে তার বয়স লেখে
          সাত-শ হাজার কুড়ি।
সাদা সুতোয় জাল বোনে সে
          হয় না বুনন সারা
পণ ছিল তার ধরবে জালে
          লক্ষ কোটি তারা।
হেনকালে কখন আঁখি
          পড়ল ঘুমে ঢুলে,
স্বপনে তার বয়সখানা
          বেবাক গেল ভুলে।
ঘুমের পথে পথ হারিয়ে,
          মায়ের কোলে এসে
পূর্ণ চাঁদের হাসিখানি
          ছড়িয়ে দিল হেসে।
সন্ধ্যেবেলায় আকাশ চেয়ে
          কী পড়ে তার মনে।
চাঁদকে করে ডাকাডাকি,
          চাঁদ হাসে আর শোনে।
যে-পথ দিয়ে এসেছিল
          স্বপন-সাগর তীরে
দু-হাত তুলে সে-পথ দিয়ে
          চায় সে যেতে ফিরে।
হেনকালে মায়ের মুখে
          যেমনি আঁখি তোলে
চাঁদে ফেরার পথখানি যে
          তক্‌খনি সে ভোলে।
কেউ জানে না কোথায় বাসা,
          এল কী পথ বেয়ে,
কেউ জানে না এই মেয়ে সেই
          আদ্যিকালের মেয়ে।
বয়সখানার খ্যাতি তবু
          রইল জগৎ জুড়ি--
পাড়ার লোকে যে দেখে সেই
          ডাকে, "বুড়ী বুড়ী"।
সব-চেয়ে যে পুরানো সে,
          কোন্‌ মন্ত্রের বলে
সব-চেয়ে আজ নতুন হয়ে
          নামল ধরাতলে।
আরো দেখুন