পুরুষের উক্তি (purusher ukti)

যেদিন সে প্রথম দেখিনু

           সে তখন প্রথম যৌবন।

প্রথম জীবনপথে               বাহিরিয়া এ জগতে

      কেমনে বাঁধিয়া গেল নয়নে নয়ন।

      তখন উষার আধো আলো

           পড়েছিল মুখে দুজনার।

তখন কে জানে কারে,         কে জানিত আপনারে,

      কে জানিত সংসারের বিচিত্র ব্যাপার।

      কে জানিত শ্রান্তি তৃপ্তি ভয়,

            কে জানিত নৈরাশ্যযাতনা!

কে জানিত শুধু ছায়া               যৌবনের মোহমায়া,

      আপনার হৃদয়ের সহস্র ছলনা।

      আঁখি মেলি যারে ভালো লাগে

            তাহারেই ভালো বলে জানি।

সব প্রেম প্রেম নয়               ছিল না তো সে সংশয়,

      যে আমারে কাছে টানে তারে কাছে টানি।

অনন্ত বাসরসুখ যেন

           নিত্যহাসি প্রকৃতিবধূর--

পুষ্প যেন চিরপ্রাণ,              পাখির অশ্রান্ত গান,

      বিশ্ব করেছিল ভান অনন্ত মধুর!

      সেই গানে, সেই ফুল্ল ফুলে,

           সেই প্রাতে প্রথম যৌবনে,

ভেবেছিনু এ হৃদয়                    অনন্ত অমৃতময়,

      প্রেম চিরদিন রয় এ চিরজীবনে।

      তাই সেই আশার উল্লাসে

           মুখ তুলে চেয়েছিনু মুখে।

সুধাপাত্র লয়ে হাতে                 কিরণকিরীট মাথে

      তরুণ দেবতাসম দাঁড়ানু সম্মুখে।

      পত্রপুষ্প-গ্রহতারা-ভরা

            নীলাম্বরে মগ্ন চরাচর,

তুমি তারি মাঝখানে          কী মূর্তি আঁকিলে প্রাণে--

      কী ললাট, কী নয়ন, কী শান্ত অধর!

      সুগভীর কলধ্বনিময়

            এ বিশ্বের রহস্য অকূল,

মাঝে তুমি শতদল              ফুটেছিলে ঢলঢল--

      তীরে আমি দাঁড়াইয়া সৌরভে আকুল।

      পরিপূর্ণ পূর্ণিমার মাঝে

            ঊর্ধ্বমুখে চকোর যেমন

আকাশের ধারে যায়,              ছিঁড়িয়া দেখিতে চায়

      অগাধ-স্বপন ছাওয়া জ্যোৎস্না-আবরণ--

তেমনি সভয়ে প্রাণ মোর

           তুলিতে যাইত কত বার

একান্ত নিকটে গিয়ে             সমস্ত হৃদয় দিয়ে

      মধুর রহস্যময় সৌন্দর্য তোমার।

      হৃদয়ের কাছাকাছি সেই

            প্রেমের প্রথম আনাগোনা,

সেই হাতে হাতে ঠেকা,    সেই আধো চোখে দেখা,

      চুপিচুপি প্রাণের প্রথম জানাশোনা!

      অজানিত সকলি নূতন,

           অবশ চরণ টলমল!

কোথা পথ কোথা নাই,        কোথা যেতে কোথা যাই,

      কোথা হতে উঠে হাসি কোথা অশ্রুজল!

      অতৃপ্ত বাসনা প্রাণে লয়ে

            অবারিত প্রেমের ভবনে

যাহা পাই তাই তুলি,       খেলাই আপনা ভুলি--

      কী যে রাখি কী যে ফেলি বুঝিতে পারি নে।

      ক্রমে আসে আনন্দ-আলস

            কুসুমিত ছায়াতরুতলে--

জাগাই সরসীজল,                     ছিঁড়ি বসে ফুলদল,

      ধূলি সেও ভালো লাগে খেলাবার ছলে।

      অবশেষে সন্ধ্যা হয়ে আসে,

            শ্রান্তি আসে হৃদয় ব্যাপিয়া--

থেকে থেকে সন্ধ্যাবায়          করে ওঠে হায়-হায়,

      অরণ্য মর্মরি ওঠে কাঁপিয়া কাঁপিয়া।

মনে হয় একি সব ফাঁকি!

            এই বুঝি, আর কিছু নাই!

অথবা যে রত্ন-তরে             এসেছিনু আশা ক'রে

      অনেক লইতে গিয়ে হারাইনু তাই।

      সুখের কাননতলে বসি

            হৃদয়ের মাঝারে বেদনা--

নিরখি কোলের কাছে          মৃৎপিণ্ড পড়িয়া আছে,

      দেবতারে ভেঙে ভেঙে করেছি খেলনা।

      এরি মাঝে ক্লান্তি কেন আসে,

           উঠিবারে করি প্রাণপণ!

হাসিতে আসে না হাসি,    বাজাতে বাজে না বাঁশি,

      শরমে তুলিতে নারি নয়নে নয়ন।

      কেন তুমি মূর্তি হয়ে এলে,

           রহিলে না ধ্যান-ধারণার।

সেই মায়া-উপবন           কোথা হল অদর্শন,

      কেন হায় ঝাঁপ দিতে শুকালো পাথার।

      স্বপ্নরাজ্য ছিল ও হৃদয়--

            প্রবেশিয়া দেখিনু সেখানে

এই দিবা এই নিশা           এই ক্ষুধা এই তৃষা,

      প্রাণপাখি কাঁদে এই বাসনার টানে।

      আমি চাই তোমারে যেমন

           তুমি চাও তেমনি আমারে--

কৃতার্থ হইব আশে       গেলেম তোমার পাশে,

      তুমি এসে বসে আছ আমার দুয়ারে।

সৌন্দর্যসম্পদ-মাঝে বসি

            কে জানিত কাঁদিছে বাসনা।

ভিক্ষা ভিক্ষা সব ঠাঁই--     তবে আর কোথা যাই

      ভিখারিনী হল যদি কমল-আসনা।

      তাই আর পারি না সঁপিতে

          সমস্ত এ বাহির অন্তর।

এ জগতে তোমা ছাড়া      ছিল না তোমার বাড়া,

      তোমারে ছেড়েও আজ আছে চরাচর।

      কখনো বা চাঁদের আলোতে

           কখনো বসন্তসমীরণে

সেই ত্রিভুবনজয়ী             অপাররহস্যময়ী

      আনন্দ-মুরতিখানি জেগে ওঠে মনে।

      কাছে যাই তেমনি হাসিয়া

         নবীন যৌবনময় প্রাণে--

কেন হেরি অশ্রুজল         হৃদয়ের হলাহল,

      রূপ কেন রাহুগ্রস্ত মানে অভিমানে।

      প্রাণ দিয়ে সেই দেবীপূজা

          চেয়ো না চেয়ো না তবে আর।

এস থাকি দুই জনে      সুখে দুঃখে গৃহকোণে,

      দেবতার তরে থাক্‌ পুষ্প অর্ঘ্যভার।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

ময়ূরের দৃষ্টি
Verses
দক্ষিণায়নের সূর্যোদয় আড়াল ক'রে
                                  সকালে বসি চাতালে।
                          অনুকূল অবকাশ;
                     তখনো নিরেট হয়ে ওঠে নি কাজের দাবি,
                          ঝুঁকে পড়ে নি লোকের ভিড়
                                  পায়ে পায়ে সময় দলিত করে দিয়ে।
                                        লিখতে বসি,
                                  কাটা খেজুরের গুঁড়ির মতো
               ছুটির সকাল কলমের ডগায় চুঁইয়ে দেয় কিছু রস।
                     আমাদের ময়ূর এসে পুচ্ছ নামিয়ে বসে
                                  পাশের রেলিংটির উপর।
                     আমার এই আশ্রয় তার কাছে নিরাপদ,
         এখানে আসে না তার বেদরদী শাসনকর্তা বাঁধন হাতে।
               বাইরে ডালে ডালে কাঁচা আম পড়েছে ঝুলে,
                     নেবু ধরেছে নেবুর গাছে,
                          একটা একলা কুড়চিগাছ
               আপনি আশ্চর্য আপন ফুলের বাড়াবাড়িতে।
                                  প্রাণের নিরর্থক চাঞ্চল্যে
                          ময়ূরটি ঘাড় বাঁকায় এদিকে ওদিকে।
                                  তার উদাসীন দৃষ্টি
               কিছুমাত্র খেয়াল করে না আমার খাতা-লেখায়;
         করত, যদি অক্ষরগুলো হত পোকা;
               তা হলে নগণ্য মনে করত না কবিকে।
         হাসি পেল ওর ওই গম্ভীর উপেক্ষায়,
               ওরই দৃষ্টি দিয়ে দেখলুম আমার এই রচনা।
                     দেখলুম, ময়ূরের চোখের ঔদাসীন্য
                                  সমস্ত নীল আকাশে,
               কাঁচা-আম-ঝোলা গাছের পাতায় পাতায়,
                          তেঁতুলগাছের গুঞ্জনমুখর মৌচাকে।
               ভাবলুম, মাহেন্দজারোতে
                     এইরকম চৈত্রশেষের অকেজো সকালে
                          কবি লিখেছিল কবিতা,
                     বিশ্বপ্রকৃতি তার কোনোই হিসাব রাখে নি।
               কিন্তু, ময়ূর আজও আছে প্রাণের দেনাপাওনায়,
                     কাঁচা আম ঝুলে পড়েছে ডালে।
               নীল আকাশ থেকে শুরু করে সবুজ পৃথিবী পর্যন্ত
                     কোথাও ওদের দাম যাবে না কমে।
               আর, মাহেন্দজারোর কবিকে গ্রাহ্যই করলে না।
                     পথের ধারের তৃণ, আঁধার রাত্রের জোনাকি।
                     নিরবধি কাল আর বিপুলা পৃথিবীতে
                          মেলে দিলাম চেতনাকে,
               টেনে নিলেম প্রকৃতির ধ্যান থেকে বৃহৎ বৈরাগ্য
                                  আপন মনে;
                     খাতার অক্ষরগুলোকে দেখলুম
                                        মহাকালের দেয়ালিতে
                          পোকার ঝাঁকের মতো।
                     ভাবলুম, আজ যদি ছিঁড়ে ফেলি পাতাগুলো
               তা হলে পর্শুদিনের অস্ত্যসৎকার এগিয়ে রাখব মাত্র।
         এমন সময় আওয়াজ এল কানে,
               "দাদামশায়, কিছু লিখেছ না কি।"
                     ওই এসেছে--ময়ূর না,
                          ঘরে যার নাম সুনয়নী,
                     আমি যাকে ডাকি শুনায়নী ব'লে।
               ওকে আমার কবিতা শোনাবার দাবি সকলের আগে।
               আমি বললেম, "সুরসিকে, খুশি হবে না,
                          এ গদ্যকাব্য।"
               কপালে ভ্রূকুঞ্চনের ঢেউ খেলিয়ে
                          বললে, "আচ্ছা, তাই সই।"
                     সঙ্গে একটু স্তুতিবাক্য দিলে মিলিয়ে;
                          বললে, "তোমার কণ্ঠস্বরে,
                                  গদ্যে রঙ ধরে পদ্যের।"
                     ব'লে গলা ধরলে জড়িয়ে।
         আমি বললেম, "কবিত্বের রঙ লাগিয়ে নিচ্ছ
                     কবিকণ্ঠ থেকে তোমার বাহুতে?"
         সে বললে, "অকবির মতো হল তোমার কথাটা;
               কবিত্বের স্পর্শ লাগিয়ে দিলেম তোমারই কণ্ঠে,
                     হয়তো জাগিয়ে দিলেম গান।"
               শুনলুম নীরবে, খুশি হলুম নিরুত্তরে।
         মনে-মনে বললুম, প্রকৃতির ঔদাসীন্য অচল রয়েছে
               অসংখ্য বর্ষকালের চূড়ায়,
         তারই উপরে একবারমাত্র পা ফেলে চলে যাবে
                          আমার শুনায়নী,
                     ভোরবেলার শুকতারা।
         সেই ক্ষণিকের কাছে হার মানবে বিরাটকালের বৈরাগ্য।
               মাহেন্দজারোর কবি, তোমার সন্ধ্যাতারা
                          অস্তাচল পেরিয়ে
                     আজ উঠেছে আমার জীবনের
                          উদয়াচলশিখরে।
আরো দেখুন
87
Verses
I.71. gagan ghata ghaharani, sadho
CLOUDS THICKEN in the sky! O, listen to the deep voice of their roaring;
The rain comes from the east with its monotonous murmur.
Take care of the fences and boundaries of your fields, lest the rains overflow them;
Prepare the soil of deliverance, and let the creepers of love and renunciation be soaked in this shower.
It is the prudent farmer who will bring his harvest home; he shall fill both his vessels, and feed both the wise men and the saints.
আরো দেখুন
Sleep-Stealer
Verses
WHO STOLE sleep from baby's eyes? I must know.
Clasping her pitcher to her waist mother went to fetch water from
the village near by.
It was noon. The children's playtime was over; the ducks in the pond were silent.
The shepherd boy lay asleep under the shadow of the banyan tree.
The crane stood grave and still in the swamp near the mango grove.
In the meanwhile the Sleepstealer came and, snatching sleep from
baby's eyes, flew away.
When mother came back she found baby travelling the room over on all fours.
Who stole sleep from our baby's eyes? I must know. I must find her and chain her up.
I must look into that dark cave, where, through boulders and scowling stones, trickles a tiny stream.
I must search in the drowsy shade of the bakula grove, where pigeons coo in their corner, and fairies' anklets tinkle in the stillness of starry nights.
In the evening I will peep into the whispering silence of the bamboo forest, where fireflies squander their light, and will ask every creature I meet, 'Can anybody tell me where the Sleep-stealer lives?'
Who stole sleep from baby's eyes? I must know.
Shouldn't I give her a good lesson if I could only catch her!
I would raid her nest and see where she hoards all her stolen sleep.
I would plunder it all, and carry it home.
I would bind her two wings securely, set her on the bank of the river, and then let her play at fishing with a reed among the rushes and water-lilies.
When the marketing is over in the evening, and the village children sit in their mothers' laps, then the night birds will mockingly din her ears with:
'Whose sleep will you steal now?'
আরো দেখুন