কবির প্রতি নিবেদন (kobir proti nibedan)

হেথা কেন দাঁড়ায়েছ, কবি,

                যেন কাষ্ঠপুত্তলছবি?

    চারি দিকে লোকজন                 চলিতেছে সারাখন,

               আকাশে উঠিছে খর রবি।

               কোথা তব বিজন ভবন,

               কোথা তব মানসভুবন?

    তোমারে ঘেরিয়া ফেলি          কোথা সেই করে কেলি

               কল্পনা, মুক্ত পবন?

               নিখিলে আনন্দধাম

               কোথা সেই গভীর বিরাম?

    জগতের গীতধার                 কেমনে শুনিবে আর?

               শুনিতেছ আপনারি নাম।

               আকাশের পাখি তুমি ছিলে,

               ধরণীতে কেন ধরা দিলে?

    বলে সবে বাহা-বাহা,                  সকলে পড়ায় যাহা

               তুমি তাই পড়িতে শিখিলে!

               প্রভাতের আলোকের সনে

               অনাবৃত প্রভাতগগনে

    বহিয়া নূতন প্রাণ                  ঝরিয়া পড়ে না গান

               ঊর্ধ্বনয়ন এ ভুবনে।

               পথ হতে শত কলরবে

               "গাও গাও' বলিতেছে সবে।

    ভাবিতে সময় নাই--              গান চাই, গান চাই,

              থামিতে চাহিছে প্রাণ যবে।

            থামিলে চলিয়া যাবে সবে,

            দেখিতে কেমনতর হবে!

উচ্চ আসনে লীন                      প্রাণহীন গানহীন

            পুতলির মতো বসে রবে।

            শ্রান্তি লুকাতে চাও ত্রাসে,

            কন্ঠ শুষ্ক হয়ে আসে।

শুনে যারা যায় চলে                 দু-চারিটা কথা ব'লে

            তারা কি তোমায় ভালোবাসে?

            কত মতো পরিয়া মুখোশ

            মাগিছ সবার পরিতোষ।

মিছে হাসি আনো দাঁতে,        মিছে জল আঁখিপাতে,

            তবু তারা ধরে কত দোষ।

            মন্দ কহিছে কেহ ব'সে,

            কেহ বা নিন্দা তব ঘোষে।

তাই নিয়ে অবিরত                তর্ক করিছ কত,

            জ্বলিয়া মরিছ মিছে রোষে।

            মূর্খ, দম্ভ-ভরা দেহ,

            তোমারে করিয়া যায় স্নেহ।

হাত বুলাইয়া পিঠে               কথা বলে মিঠে মিঠে,

            "শাবাশ' "শাবাশ' বলে কেহ।

            হায় কবি, এত দেশ ঘুরে

            আসিয়া পড়েছ কোন্‌ দূরে!

এ যে কোলাহলমরু--        নাই ছায়া, নাই তরু,

            যশের কিরণে মরো পুড়ে।

দেখো, হোথা নদী-পর্বত,

            অবারিত অসীমের পথ।

প্রকৃতি শান্ত মুখে                    ছুটায় গগনবুকে

            গ্রহতারাময় তার রথ।

            সবাই আপন কাজে ধায়,

            পাশে কেহ ফিরিয়া না চায়।

ফুটে চিররূপরাশি                  চিরমধুময় হাসি,

            আপনারে দেখিতে না পায়।

            হোথা দেখো একেলা আপনি

            আকাশের তারা গণি গণি

ঘোর নিশীথের মাঝে        কে জাগে আপন কাজে,

            সেথায় পশে না কলধ্বনি।

            দেখো হোথা নূতন জগৎ--

            ওই কারা আত্মহারাবৎ

যশ-অপযশ-বাণী              কোনো কিছু নাহি মানি

            রচিছে সুদূর ভবিষ্যৎ।

            ওই দেখো না পুরিতে আশ

            মরণ করিল কারে গ্রাস।

নিশি না হইতে সারা             খসিয়া পড়িল তারা,

            রাখিয়া গেল না ইতিহাস।

            ওই কারা গিরির মতন

            আপনাতে আপনি বিজন--

হৃদয়ের স্রোত উঠি            গোপন আলয় টুটি

            দূর দূর করিছে মগন।

ওই কারা বসে আছে দূরে

            কল্পনা-উদয়াচল-পুরে--

অরুণপ্রকাশ-প্রায়               আকাশ ভরিয়া যায়

            প্রতিদিন নব নব সুরে।

            হোথা উঠে নবীন তপন,

            হোথা হতে বহিছে পবন।

হোথা চির ভালোবাসা--      নব গান, নব আশা--

            অসীম বিরামনিকেতন।

হোথা মানবের জয়                উঠিছে জগৎময়,

            ওইখানে মিলিয়াছে নরনারায়ণ।

            হেথা, কবি, তোমারে কি সাজে

            ধূলি আর কলরোল -মাঝে?

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সুপ্তোত্থিতা
Verses
        ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম,
             উঠিল কলস্বর।
        গাছের শাখে জাগিল পাখি
             কুসুমে মধুকর।
        অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া,
            হস্তিশালে হাতি।
        মল্লশালে মল্ল জাগি
            ফুলায় পুন ছাতি।
        জাগিল পথে প্রহরিদল,
            দুয়ারে জাগে দ্বারী।
        আকাশে চেয়ে নিরখে বেলা
             জাগিয়া নরনারী।
        উঠিল জাগি রাজাধিরাজ,
            জাগিল রানীমাতা।
        কচালি আঁখি কুমার-সাথে
            জাগিল রাজভ্রাতা।
        নিভৃত ঘরে ধূপের বাস,
            রতন-দীপ জ্বালা,
        জাগিয়া উঠি শয্যাতলে
           শুধাল রাজবালা--
                কে পরালে মালা!
        খসিয়া-পড়া আঁচলখানি
            বক্ষে তুলি দিল।
        আপন-পানে নেহারি চেয়ে
            শরমে শিহরিল।
        ত্রস্ত হয়ে চকিত চোখে
            চাহিল চারিদিকে,
        বিজন গৃহ, রতন-দীপ
            জ্বলিছে অনিমিখে।
        গলার মালা খুলিয়া লয়ে
            ধরিয়া দুটি করে
        সোনার সুতে যতনে গাঁথা
            লিখনখানি পড়ে।
        পড়িল নাম, পড়িল ধাম,
            পড়িল লিপি তার,
        কোলের 'পরে বিছায়ে দিয়ে
            পড়িল শতবার।
        শয়নশেষে রহিল বসে,
            ভাবিল রাজবালা--
        আপন ঘরে ঘুমায়েছিনু
            নিতান্ত নিরালা--
                  কে পরালে মালা!
        নূতন-জাগা কুঞ্জবনে
            কুহরি উঠে পিক,
        বসন্তের চুম্বনেতে
            বিবশ দশ দিক।
       বাতাস ঘরে প্রবেশ করে
            ব্যাকুল উচ্ছ্বাসে,
        নবীন ফুলমঞ্জরির
            গন্ধ লয়ে আসে।
        জাগিয়া উঠি বৈতালিক
            গাহিছে জয়গান,
        প্রাসাদদ্বারে ললিত স্বরে
            বাঁশিতে উঠে তান।
        শীতলছায়া নদীর পথে
            কলসে লয়ে বারি--
        কাঁকন বাজে, নূপুর বাজে--
            চলিছে পুরনারী।
        কাননপথে মর্মরিয়া
            কাঁপিছে গাছপালা,
        আধেক মুদি নয়ন দুটি
             ভাবিছে রাজবালা--
                 কে পরালে মালা!
        বারেক মালা গলায় পরে,
             বারেক লহে খুলি,
        দুইটি করে চাপিয়া ধরে
             বুকের কাছে তুলি।
        শয়ন'পরে মেলায়ে দিয়ে
             তৃষিত চেয়ে রয়,
        এমনি করে পাইবে যেন
             অধিক পরিচয়।
        জগতে আজ কত-না ধ্বনি
             উঠিছে কত ছলে--
        একটি আছে গোপন কথা,
              সে কেহ নাহি বলে।
        বাতাস শুধু কানের কাছে
               বহিয়া যায় হূহু,
        কোকিল শুধু অবিশ্রাম
               ডাকিছে কুহু কুহু।
        নিভৃত ঘরে পরান-মন
               একান্ত উতালা,
        শয়নশেষে নীরবে বসে
               ভাবিছে রাজবালা--
                    কে পরালে মালা!
        কেমন বীর-মুরতি তার
             মাধুরী দিয়ে মিশা।
        দীপ্তিভরা নয়নমাঝে
             তৃপ্তিহীন তৃষা।
        স্বপ্নে তারে দেখেছে যেন
            এমনি মনে লয়--
        ভুলিয়া গেছে, রয়েছে শুধু
             অসীম বিস্ময়।
        পারশে যেন বসিয়াছিল,
             ধরিয়াছিল কর,
        এখনো তার পরশে যেন
             সরস কলেবর।
        চমকি মুখ দু-হাতে ঢাকে,
             শরমে টুটে মন,
        লজ্জাহীন প্রদীপ কেন
             নিভে নি সেই ক্ষণ।
        কণ্ঠ হতে ফেলিল হার
              যেন বিজুলিজ্বালা,
        শয়ন'পরে লুটায়ে পড়ে
              ভাবিল রাজবালা--
                  কে পরালে মালা!
        এমনি ধীরে একটি করে
           কাটিছে দিন রাতি।
        বসন্ত সে বিদায় নিল
            লইয়া যূথী-জাতি।
        সঘন মেঘে বরষা আসে,
             বরষে ঝরঝর্‌।
        কাননে ফুটে নবমালতী
             কদম্বকেশর।
        স্বচ্ছ হাসি শরৎ আসে
             পূর্ণিমামালিকা।
        সকল বন আকুল করে
             শুভ্র শেফালিকা।
        আসিল শীত সঙ্গে লয়ে
             দীর্ঘ দুখনিশা।
        শিশির-ঝরা কুন্দফুলে
             হাসিয়া কাঁদে দিশা।
        ফাগুন মাস আবার এল
            বহিয়া ফুলডালা।
        জানালা-পাশে একেলা বসে
             ভাবিছে রাজবালা--
                  কে পরালে মালা!
আরো দেখুন
চলন্ত কলিকাতা
Verses
ইঁটের টোপর মাথায় পরা
           শহর কলিকাতা
অটল হয়ে ব'সে আছে,
           ইঁটের আসন পাতা।
ফাল্গুনে বয় বসন্তবায়,
           না দেয় তারে নাড়া।
বৈশাখেতে ঝড়ের দিনে
           ভিত রহে তার খাড়া।
শীতের হাওয়ায় থামগুলোতে
           একটু না দেয় কাঁপন।
শীত বসন্তে সমান ভাবে
           করে ঋতুযাপন।
           অনেক দিনের কথা হ'ল
                     স্বপ্নে দেখেছিনু
           হঠাৎ যেন চেঁচিয়ে উঠে
                     বললে আমায় বিনু
           "চেয়ে দেখো', ছুটে দেখি
                     চৌকিখানা ছেড়ে--
           কোল্‌কাতাটা চ'লে বেড়ায়
                     ইঁটের শরীর নেড়ে।
           উঁচু ছাদে নিচু ছাদে
                     পাঁচিল-দেওয়া ছাদে
           আকাশ যেন সওয়ার হ'য়ে
                     চড়েছে তার কাঁধে।
           রাস্তা গলি যাচ্ছে চলি
                     অজগরের দল,
           ট্র৻াম-গাড়ি তার পিঠে চেপে
                     করছে টলোমল।
           দোকান বাজার ওঠে নামে
                     যেন ঝড়ের তরী,
           চউরঙ্গীর মাঠখানা ওই
                     যাচ্ছে সরি সরি।
           মনুমেণ্টে লেগেছে দোল,
                     উল্‌টিয়ে বা ফেলে--
           খ্যাপা হাতির শুঁড়ের মতো
                     ডাইনে বাঁয়ে হেলে।
ইস্কুলেতে ছেলেরা সব
           করতেছে হৈ হৈ,
অঙ্কের বই নৃত্য করে
           ব্যাকরণের বই।
মেঝের 'পরে গড়িয়ে বেড়ায়
           ইংরেজি বইখানা,
ম্যাপগুলো সব পাখির মতো
           ঝাপট মারে ডানা।
ঘণ্টাখানা দুলে দুলে
           ঢঙ্‌ ঢঙা ঢঙ্‌ বাজে--
দিন চ'লে যায়, কিছুতে সে
           থামতে পারে না যে।
রান্নাঘরে কেঁদে বলে
           রান্নাঘরের ঝি,
"লাউ কুম্‌ড়ো দৌড়ে বেড়ায়,
           আমি করব কী!'
           হাজার হাজার মানুষ চেঁচায়
                     "আরে, থামো থামো--
           কোথা যেতে কোথায় যাবে,
                     কেমন এ পাগ্‌লামো!'
"আরে আরে, চলল কোথায়'
          হাব্‌ড়ার ব্রিজ বলে,
"এইটুকু আর নড়লে আমি
          পড়ব খ'সে জলে।'
বড়োবাজার মেছোবাজার
          চিনেবাজার থেকে--
"স্থির হয়ে রও' "স্থির হয়ে রও'
          বলে সবাই হেঁকে।
আমি ভাবছি যাক্‌-না কেন,
          ভাব্‌না কিছুই নাই--
কোল্‌কাতা নয় দিল্লি যাবে
           কিম্বা সে বোম্বাই।
           হঠাৎ কিসের আওয়াজ হ'ল,
                     তন্দ্রা ভেঙে যায়--
           তাকিয়ে দেখি কোল্‌কাতা সেই
                     আছে কোল্‌কাতায়।
আরো দেখুন
21
Verses
THE DUMB earth looks into my face and spreads her arms about me.
At night the fingers of the stars touch my dreams. They know my former name.
Their whispers remind me of the music of a long silent lullaby. They bring to my mind the smile of a face seen in the
gleam of the first daybreak.
There is love in each speck of earth and joy in the spread-of the sky.
I care not if I become dust, for the dust is touched by his feet.
I care not if I become a flower, for the flower he takes up in his hand.
He is in the sea, on the shore; he is with the ship that carries all.
Whatever I am I am blessed and blessed is this earth of dear dust.
আরো দেখুন