গুপ্ত প্রেম (gupto prem)

         তবে  পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে

                রূপ না দিলে যদি বিধি হে!

         পূজার তরে হিয়া            উঠে যে ব্যাকুলিয়া,

                পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে!

       মনে    গোপনে থাকে প্রেম, যায় না দেখা,

                কুসুম দেয় তাই দেবতায়।

         দাঁড়ায়ে থাকি দ্বারে,         চাহিয়া দেখি তারে,

                কী ব'লে আপনারে দিব তায়?

       ভালো  বাসিলে ভালো যারে দেখিতে হয়

                সে যেন পারে ভালো বাসিতে।

         মধুর হাসি তার             দিক সে উপহার

                মাধুরী ফুটে যার হাসিতে।

       যার   নবনীসুকুমার কপোলতল

                কী শোভা পায় প্রেমলাজে গো!

         যাহার ঢলঢল                 নয়নশতদল

                তারেই আঁখিজল সাজে গো।

       তাই    লুকায়ে থাকি সদা পাছে সে দেখে,

                ভালোবাসিতে মরি শরমে।

         রুধিয়া মনোদ্বার          প্রেমের কারাগার

                রচেছি আপনার মরমে।

       আহা    এ তনু-আবরণ শ্রীহীন ম্লান

                ঝরিয়া পড়ে যদি শুকায়ে,

         হৃদয়মাঝে মম           দেবতা মনোরম

                মাধুরী নিরুপম লুকায়ে।

যত   গোপনে ভালোবাসি পরান ভরি

                পরান ভরি উঠে শোভাতে--

         যেমন কালো মেঘে         অরুণ-আলো লেগে

                মাধুরী উঠে জেগে প্রভাতে।

       আমি    সে শোভা কাহারে তো দেখাতে নারি,

                এ পোড়া দেহ সবে দেখে যায়--

         প্রেম যে চুপে চুপে           ফুটিতে চাহে রূপে,

                মনেরই অন্ধকূপে থেকে যায়।

       দেখো  বনের ভালোবাসা আঁধারে বসি

                কুসুমে আপনারে বিকাশে,

         তারকা নিজ হিয়া           তুলিছে উজলিয়া

                আপন আলো দিয়া লিখা সে।

       ভবে    প্রেমের আঁখি প্রেম কাড়িতে চাহে,

                মোহন রূপ তাই ধরিছে।

         আমি  যে আপনায়          ফুটাতে পারি নাই,

                পরান কেঁদে তাই মরিছে।

       আমি    আপন মধুরতা আপনি জানি

                পরানে আছে যাহা জাগিয়া,

         তাহারে লয়ে সেথা        দেখাতে পারিলে তা

                যেত এ ব্যাকুলতা ভাগিয়া।

       আমি    রূপসী নহি, তবু আমারো মনে

                প্রেমের রূপ সে তো সুমধুর।

         ধন সে যতনের                 শয়ন-স্বপনের,

                করে সে জীবনের তমোদূর।

আমি    আমার অপমান সহিতে পারি

                প্রেমের সহে না তো অপমান।

         অমরাবতী ত্যেজে          হৃদয়ে এসেছে যে,

                তাহারো চেয়ে সে যে মহীয়ান।

       পাছে    কুরূপ কভু তারে দেখিতে হয়

                কুরূপ দেহ-মাঝে উদিয়া,

         প্রাণের এক ধারে             দেহের পরপারে

                তাই তো রাখি তারে রুধিয়া।

       তাই    আঁখিতে প্রকাশিতে চাহি নে তারে,

                নীরবে থাকে তাই রসনা।

         মুখে সে চাহে যত             নয়ন করি নত,

                গোপনে মরে কত বাসনা।

       তাই    যদি সে কাছে আসে পালাই দূরে,

                আপন মনো-আশা দলে যাই,

         পাছে সে মোরে দেখে         থমকি বলে "এ কে!"

                দু-হাতে মুখ ঢেকে চলে যাই।

       পাছে    নয়নে বচনে সে বুঝিতে পারে

                আমার জীবনের কাহিনী--

         পাছে সে মনে ভানে,        "এও কি প্রেম জানে!

                আমি তো এর পানে চাহি নি!"

       তবে    পরানে ভালোবাসা কেন গো দিলে

                রূপ না দিলে যদি বিধি হে!

         পূজার তরে হিয়া          উঠে যে ব্যাকুলিয়া,

                পূজিব তারে গিয়া কী দিয়ে!

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

প্রতিধ্বনি
Verses
অয়ি প্রতিধ্বনি,
      বুঝি আমি তোরে ভালোবাসি,
      বুঝি আর কারেও বাসি না।
আমারে করিলি তুই আকুল ব্যাকুল,
      তোর লাগি কাঁদে মোর বীণা।
তোর মুখে পাখিদের শুনিয়া সংগীত,
      নির্ঝরের শুনিয়া ঝর্ঝর,
গভীর রহস্যময় অরণ্যের গান,
      বালকের মধুমাখা স্বর,
তোর মুখে জগতের সংগীত শুনিয়া,
      তোরে আমি ভালোবাসিয়াছি;
তবু কেন তোরে আমি দেখিতে না পাই,
      বিশ্বময় তোরে খুঁজিয়াছি।
চিরকাল-চিরকাল-তুই কি রে চিরকাল
           সেই দূরে রবি,
আধো সুরে গাবি শুধু গীতের আভাস,
           তুই চিরকবি।
দেখা তুই দিবি না কি?  নাহয় না দিলি
      একটি কি পুরাবি না আশ?
কাছে হতে একবার শুনিবারে চাই
      তোর গীতোচ্ছ্বাস।
অরণ্যের পর্বতের সমুদ্রের গান,
      ঝটিকার বজ্রগীতস্বর,
দিবসের প্রদোষের রজনীর গীত,
     চেতনার নিদ্রার মর্মর,
বসন্তের বরষার শরতের গান,
     জীবনের মরণের স্বর,
আলোকের পদধ্বনি মহা অন্ধকারে
     ব্যাপ্ত করি বিশ্বচরাচর,
পৃথিবীর চন্দ্রমার গ্রহ-তপনের,
    কোটি কোটি তারার সংগীত,
তোর কাছে জগতের কোন্‌ মাঝখানে
     না জানি রে হতেছে মিলিত।
সেইখানে একবার বসাইবি মোরে
      সেই মহা-আঁধার নিশায়,
শুনিব রে আঁখি মুদি বিশ্বের সংগীত
      তোর মুখে কেমন শুনায়।
জোছনায় ফুলবনে একাকী বসিয়া থাকি,
       আঁখি দিয়া অশ্রুবারি ঝরে--
বল্‌ মোরে বল্‌ অয়ি মোহিনী ছলনা,
       সে কি তোরি তরে?
বিরামের গান গেয়ে সায়াহ্নের বায়
        কোথা বহে যায়--
তারি সাথে কেন মোর প্রাণ হু হু করে,
        সে কি তোরি তরে?
বাতাসে সৌরভ ভাসে, আঁধারে কত-না তারা,
        আকাশে অসীম নীরবতা--
তখন প্রাণের মাঝে কত কথা ভেসে যায়,
       সে কি তোরি কথা?
ফুলের সৌরভগুলি আকাশে খেলাতে এসে
       বাতাসেতে হয় পথহারা,
       চারিদিকে ঘুরে হয় সারা,
       মার কোলে ফিরে যেতে চায়,
       ফুলে ফুলে খুঁজিয়া বেড়ায়,
তেমনি প্রাণের মাঝে অশরীরী আশাগুলি
       ভ্রমে কেন হেথায় হোথায়--
       সেকি কি তোরে চায়?
আঁখি যেন কার তরে পথ-পানে চেয়ে আছে
         দিন গনি গনি,
মাঝে মাঝে কারো মুখে সহসা দেখে সে যেন
         অতুল রূপের প্রতিধ্বনি,
         কাছে গেলে মিলাইয়া যায়
         নিরাশের হাসিটির প্রায়--
সৌন্দর্যে মরীচিকা এ কাহার মায়া,
        এ কি তোরি ছায়া!
জগতের গানগুলি দূর-দূরান্তর হতে
       দলে দলে তোর কাছে যায়,
যেন তারা বহ্নি হেরি পতঙ্গের মতো
       পদতলে মরিবারে চায়!
জগতের মৃত গানগুলি
       তোর কাছে পেয়ে নব প্রাণ,
সংগীতের পরলোক হতে
       গান যেন দেহমুক্ত গান।
তাই তার নব কণ্ঠধ্বনি
       প্রভাতের স্বপনের প্রায়,
কুসুমের সৌরভের সাথে
       এমন সহজে মিশে যায়।
আমি ভাবিতেছি বসে        গানগুলি তোরে
       না জানি কেমনে খুঁজে পায়--
       না জানি কোথায় খুঁজে পায়।
       না জানি কী গুহার মাঝারে
       অস্ফুট মেঘের উপবনে,
       স্মৃতি ও আশায় বিজড়িত
       আলোক-ছায়ার সিংহাসনে,
ছায়াময়ী মূর্তিখানি     আপনে আপনি মিশি
       আপনি বিস্মিত আপনায়,
       কার পানে শূন্যপানে চায়!
সায়াহ্নে প্রশান্ত রবি          স্বর্ণময় মেঘমাঝে
          পশ্চিমের সমুদ্রসীমায়
প্রভাতের জন্মভূমি          শৈশব পুরব-পানে
          যেমন আকুল নেত্রে চায়
পুরবের শূন্যপটে,  প্রভাতের স্মৃতিগুলি
          এখনো দেখিতে যেন পায়,
তেমনি সে ছায়াময়ী          কোথা যেন চেয়ে আছে
         কোথা হতে আসিতেছে গান--
এলানো কুন্তলজালে         সন্ধ্যার তারকাণ্ডলি
          গান শুনে মুদিছে নয়ান।
          বিচিত্র সৌন্দর্য জগতের
          হেথা আসি হইতেছে লয়।
সংগীত, সৌরভ, শোভা      জগতে যা-কিছু আছে
          সবি হেথা প্রতিধ্বনিময় ।
          প্রতিধ্বনি, তব নিকেতন,
         তোমার সে সৌন্দর্য অতুল,
          প্রাণে জাগে ছায়ার মতন--
          ভাষা হয় আকুল ব্যাকুল।
আমরণ চিরদিন     কেবলি খুঁজিব তোরে
          কখনো কি পাব না সন্ধান?
কেবলি কি রবি দূরে,        অতি দূর হতে
         শুনিব রে ওই আধো গান?
এই বিশ্বজগতের    মাঝখানে দাঁড়াইয়া
          বাজাইবি সৌন্দর্যের বাঁশি,
অনন্ত জীবনপথে    খুঁজিয়া চলিব তোরে,
          প্রাণমন হইবে উদাসী।
তপনেরে ঘিরি ঘিরি         যেমন ঘুরিছে ধরা,
          ঘুরিব কি তোর চারি দিকে?
অনন্ত প্রাণের পথে           বরষিবি গীতধারা,
          চেয়ে আমি রব অনিমিখে।
তোরি মোহময় গান          শুনিতেছি অবিরত,
          তোরি রূপ কল্পনায় লিখা--
করিস নে প্রবঞ্চনা সত্য করে বল্‌ দেখি
          তুই তো নহিস মরীচিকা?
কত বার আর্ত স্বরে শুধায়েছি প্রাণপণে,
         অয়ি তুমি কোথায়-কোথায়--
অমনি সুদূর হতে   কেন তুমি বলিয়াছ
         "কে জানে কোথায়'?
আশাময়ী, ও কী কথা       তুমি কি আপনহারা--
          আপনি জান না আপনায়?
আরো দেখুন
63
Verses
I.39. are man, dhiraj kahe na dharai
WHY SO impatient, my heart?
He who watches over birds, beasts, and insects,
He who cared for you whilst you were yet in your mother's womb,
Shall He not care for you now that you are come forth?
Oh my heart, how could you turn from the smile of your Lord and wander so far from Him?
You have left your Beloved and are thinking of others: and this is why all your work is in vain.
আরো দেখুন
74
Verses
এ নদীর কলধ্বনি যেথায় বাজে না
মাতৃকলকণ্ঠসম, যেথায় সাজে না
কোমলা উর্বরা ভূমি নবনবোৎসবে
নবীন-বরন বস্ত্রে যৌবনগৌরবে
বসন্তে শরতে বরষায়, রুদ্ধাকাশ
দিবস-রাত্রিরে যেথা করে না প্রকাশ
পূর্ণপ্রস্ফুটিতরূপে, যেথা মাতৃভাষা
চিত্ত-অন্তঃপুরে নাহি করে যাওয়া-আসা
কল্যাণী হৃদয়লক্ষ্মী, যেথা নিশিদিন
কল্পনা ফিরিয়া আসে পরিচয়হীন
পরগৃহদ্বার হতে পথের মাঝারে--
সেখানেও যাই যদি, মন যেন পারে
সহজে টানিয়া নিতে অন্তহীন স্রোতে
তব সদানন্দধারা সর্ব ঠাঁই হতে।
আরো দেখুন