ভৈরবী গান (bhoirobi gan)

ওগো,   কে তুমি বসিয়া উদাসমুরতি

                 বিষাদশান্ত শোভাতে!

ওই       ভৈরবী আর গেয়ো নাকো এই

                 প্রভাতে--

মোর     গৃহছাড়া এই পথিক-পরান

                 তরুণ হৃদয় লোভাতে।

ওই       মন-উদাসীন ওই আশাহীন

                 ওই ভাষাহীন কাকলি

দেয়      ব্যাকুল পরশে সকল জীবন

                 বিকলি।

দেয়      চরণে বাঁধিয়া প্রেমবাহু-ঘেরা

                 অশ্রুকোমল শিকলি।

হায়,     মিছে মনে হয় জীবনের ব্রত

                 মিছে মনে হয় সকলি।

যারে     ফেলিয়া এসেছি, মনে করি, তারে

                 ফিরে দেখে আসি শেষ বার।

ওই       কাঁদিছে সে যেন এলায়ে আকুল

                 কেশভার।

যারা      গৃহছায়ে বসি সজলনয়ন

                 মুখ মনে পড়ে সে সবার।

এই       সংকটময় কর্মজীবন

                 মনে হয় মরু সাহারা,

দূরে      মায়াময় পুরে দিতেছে দৈত্য

                 পাহারা।

তবে     ফিরে যাওয়া ভালো তাহাদের পাশে

                 পথ চেয়ে আছে যাহারা।

সেই      ছায়াতে বসিয়া সারা দিনমান

                 তরুমর্মর পবনে,

সেই      মুকুল-আকুল বকুলকুঞ্জ-

                 ভবনে,

সেই      কুহুকুহরিত বিরহরোদন

                 থেকে থেকে পশে শ্রবণে।

সেই      চিরকলতান উদার গঙ্গা

                 বহিছে আঁধারে আলোকে,

সেই      তীরে চিরদিন খেলিছে বালিকা-

                 বালকে।

ধীরে     সারা দেহ যেন মুদিয়া আসিছে

                 স্বপ্নপাখির পালকে।

হায়,     অতৃপ্ত যত মহৎ বাসনা

                 গোপনমর্মদাহিনী,

এই       আপনা মাঝারে শুষ্ক জীবন-

                 বাহিনী!

ওই       ভৈরবী দিয়া গাঁথিয়া গাঁথিয়া

                 চব নিরাশাকাহিনী

সদা       করুণ কন্ঠ কাঁদিয়া  গাহিবে,--

                 "হল না, কিছুই হবে না।

এই       মায়াময় ভবে চিরদিন কিছু

                 রবে না।

কেহ     জীবনের যত গুরুভার ব্রত

                 ধুলি হতে তুলি লবে না।

"এই     সংশয়মাঝে কোন্‌ পথে যাই,

                 কার তরে মরি খাটিয়া?

আমি     কার মিছে দুখে মরিতেছি বুক

                 ফাটিয়া?

ভবে      সত্য মিথ্যা কে করেছে ভাগ,

                 কে রেখেছে মত আঁটিয়া?

"যদি     কাজ নিতে হয়, কত কাজ আছে,

                 একা কি পারিব করিতে!

কাঁদে     শিশিরবিন্দু জগতের তৃষা

                 হরিতে!

কেন     অকূল সাগরে জীবন সঁপিব

                 একেলা জীর্ণ তরীতে!

"শেষে   দেখিব, পড়িল সুখযৌবন

                 ফুলের মতন খসিয়া,

হায়      বসন্তবায়ু মিছে চলে গেল

                 শ্বসিয়া,

সেই      যেখানে জগৎ ছিল এক কালে

                 সেইখানে আছে বসিয়া!

"শুধু    আমারি জীবন মরিল ঝুরিয়া

                 চিরজীবনের তিয়াষে।

এই       দগ্ধ হৃদয় এত দিন আছে

                 কী আশে!

সেই      ডাগর নয়ন, সরস অধর

                 গেল চলি কোথা দিয়া সে!"

ওগো,   থামো, যারে তুমি বিদায় দিয়েছ

                 তারে আর ফিরে চেয়ো না।

ওই       অশ্রুসজল ভৈরবী আর

                 গেয়ো না।

আজি    প্রথম প্রভাতে চলিবার পথ

                 নয়নবাষ্পে ছেয়ো না।

ওই       কুহকরাগিণী এখনি কেন গো

                 পথিকের প্রাণ বিবশে!

পথে     এখনো উঠিবে প্রখর তপন

                 দিবসে

পথে     রাক্ষসী সেই তিমিররজনী

                 না জানি কোথায় নিবসে!

থামো,   শুধু এক বার ডাকি নাম তাঁর

                 নবীন জীবন ভরিয়া--

যাব       যাঁর বল পেয়ে সংসারপথ

                 তরিয়া,

যত      মানবের গুরু মহৎজনের

                 চরণচিহ্ন ধরিয়া।

যাও      তাহাদের কাছে ঘরে যারা আছে

                 পাষাণে পরান বাঁধিয়া,

গাও      তাদের জীবনে তাদের বেদনে

                 কাঁদিয়া।

তারা     প'ড়ে ভূমিতলে ভাসে আঁখিজলে

                 নিজ সাধে বাদ সাধিয়া।

হায়,     উঠিতে চাহিছে পরান, তবুও

                 পারে না তাহারা উঠিতে।

তারা     পারে না ললিতলতার বাঁধন

                 টুটিতে।

তারা     পথ জানিয়াছে, দিবানিশি তবু

                 পথপাশে রহে লুটিতে!

তারা     অলস বেদন করিবে যাপন

                 অলস রাগিণী গাহিয়া,

রবে      দূর আলো-পানে আবিষ্ট তারা

                 দিবসরজনী বাহিয়া।

সেই      আপনার গানে আপনি গলিয়া

                 আপনারে তারা ভুলাবে,

স্নেহে   আপনার দেহে সকরুণ কর

                 বুলাবে।

সুখ       কোমল শয়নে রাখিয়া জীবন

                 ঘুমের দোলায় দোলাবে।

ওগো,   এর চেয়ে ভালো প্রখর দহন,

                 নিঠুর আঘাত চরণে।

যাব       আজীবন কাল পাষাণকঠিন

                 সরণে।

যদি       মৃত্যুর মাঝে নিয়ে যায় পথ,

                 সুখ আছে সেই মরণে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

42
Verses
     তোমারে কি বারবার করেছিনু অপমান।
          এসেছিলে গেয়ে গান
              ভোরবেলা;
    ঘুম ভাঙাইলে ব'লে মেরেছিনু ঢেলা
              বাতায়ন হতে,
    পরক্ষণে কোথা তুমি লুকাইলে জনতার স্রোতে।
              ক্ষুধিত দরিদ্রসম
          মধ্যাহ্নে, এসেছে দ্বারে মম।
          ভেবেছিনু, এ কী দায়,
কাজের ব্যাঘাত এ-যে।' দূর হতে করেছি বিদায়।
     সন্ধ্যাবেলা এসেছিলে যেন মৃত্যুদূত
          জ্বালায়ে মশাল-আলো, অস্পষ্ট অদ্ভুত
              দুঃস্বপ্নের মতো।
     দস্যু ব'লে শত্রু ব'লে ঘরে দ্বার যত
          দিনু রোধ করি।
     গেলে চলি, অন্ধকার উঠিল শিহরি।
এরি লাগি এসেছিলে, হে বন্ধু অজানা--
          তোমারে করিব মানা,
    তোমারে ফিরায়ে দিব, তোমারে মারিব,
       তোমা-কাছে যত ধার সকলি ধারিব,
              না করিয়া শোধ
              দুয়ার করিব রোধ।
              তার পরে অর্ধরাতে
          দীপ-নেবা অন্ধকারে বসিয়া ধুলাতে
              মনে হবে আমি বড়ো একা
          যাহারে ফিরায়ে দিনু বিনা তারি দেখা।
              এ দীর্ঘ জীবন ধরি
          বহুমানে যাহাদের নিয়েছিনু বরি
              একাগ্র উৎসুক,
          আঁধারে মিলায়ে যাবে তাহাদের মুখ।
              যে আসিল ছিনু অন্যমনে,
          যাহারে দেখি নি চেয়ে নয়নের কোণে,
              যারে নাহি চিনি,
          যার ভাষা বুঝিতে পারি নি,
অর্ধরাতে দেখা দিবে বারেবারে তারি মুখ নিদ্রাহীন চোখে
          রজনীগন্ধার গন্ধে তারার আলোকে।
     বারেবারে ফিরে-যাওয়া অন্ধকারে বাজিবে হৃদয়ে
          বারেবারে-ফিরে-আসা হয়ে।
আরো দেখুন
আহ্বানগীত
Verses
পৃথিবী জুড়িয়া বেজেছে বিষাণ,
    শুনিতে পেয়েছি ওই--
সবাই এসেছে লইয়া নিশান,
    কই রে বাঙালি কই।
সুগভীর স্বর কাঁদিয়া বেড়ায়
    বঙ্গসাগরের তীরে,
"বাঙালির ঘরে কে আছিস আয়"
    ডাকিতেছে ফিরে ফিরে।
ঘরে ঘরে কেন দুয়ার ভেজানো,
    পথে কেন নাই লোক,
সারা দেশ ব্যাপি মরেছে কে যেন--
    বেঁচে আছে শুধু শোক।
গঙ্গা বহে শুধু আপনার মনে,
    চেয়ে থাকে হিমগিরি,
রবি শশী উঠে অনন্ত গগনে
    আসে যায় ফিরি ফিরি।
কত-না সংকট, কত-না সন্তাপ
    মানবশিশুর তরে,
কত-না বিবাদ কত-না বিলাপ
    মানবশিশুর ঘরে।
কত ভায়ে ভায়ে নাহি যে বিশ্বাস,
    কেহ কারে নাহি মানে,
ঈর্ষা নিশাচরী ফেলিছে নিশ্বাস
    হৃদয়ের মাঝখানে।
হৃদয়ে লুকানো হৃদয়বেদনা,
    সংশয়-আঁধারে যুঝে,
কে কাহারে আজি দিবে গো সান্ত্বনা--
    কে দিবে আলয় খুঁজে।
মিটাতে হইবে শোক তাপ ত্রাস,
    করিতে হইবে রণ,
পৃথিবী হইতে উঠেছে উচ্ছ্বাস--
    শোনো শোনো সৈন্যগণ।
পৃথিবী ডাকিছে আপন সন্তানে,
    বাতাস ছুটেছে তাই--
গৃহ তেয়াগিয়া ভায়ের সন্ধানে
    চলিয়াছে কত ভাই।
বঙ্গের কুটিরে এসেছে বারতা,
    শুনেছে কি তাহা সবে।
জেগেছে কি কবি শুনাতে সে কথা
    জালদগম্ভীর রবে।
হৃদয় কি কারো উঠেছে উথলি।
    আঁখি খুলেছে কি কেহ।
ভেঙেছে কি কেহ সাধের পুতলি।
    ছেড়েছে খেলার গেহ?
কেন কানাকানি, কেন রে সংশয়।
    কেন মরো ভয়ে লাজে।
খুলে ফেলো দ্বার, ভেঙে ফেলো ভয়,
    চলো পৃথিবীর মাঝে।
ধরাপ্রান্তভাগে ধুলিতে লুটায়ে,
    জড়িমাজড়িত তনু,
আপনার মাঝে আপনি গুটায়ে
    ঘুমায় কীটের অণু।
চারি দিকে তার আপন উল্লাসে
    জগৎ ধাইছে কাজে,
চারি দিকে তার অনন্ত আকাশে
    স্বরগসংগীত বাজে।
চারি দিকে তার মানবমহিমা
    উঠিছে গগনপানে,
খুঁজিছে মানব আপনার সীমা
    অসীমের মাঝখানে।
সে কিছুই তার করে না বিশ্বাস,
    আপনারে জানে বড়ো--
আপনি গণিছে আপন নিশ্বাস,
    ধুলা করিতেছে জড়ো।
সুখ দুঃখ লয়ে অনন্ত সংগ্রাম,
    জগতের রঙ্গভূমি--
হেথায় কে চায় ভীরুর বিশ্রাম,
    কেন গো ঘুমাও তুমি।
ডুবিছ ভাসিছ অশ্রুর হিল্লোলে,
    শুনিতেছ হাহাকার--
তীর কোথা আছে দেখো মুখ তুলে,
    এ সমুদ্র করো পার।
মহা কলরবে সেতু বাঁধে সবে,
    তুমি এসো, দাও যোগ--
বাধার মতন জড়াও চরণ
    এ কী রে করম-ভোগ।
তা যদি না পারো সরো তবে সরো
    ছড়ে দাও তবে স্থান,
ধুলায় পড়িয়া মরো তবে মরো--
    কেন এ বিলাপগান!
ওরে চেয়ে দেখ্‌ মুখ আপনার,
    ভেবে দেখ্‌ তোরা কারা,
মানবের মতো ধরিয়া আকার,
    কেন রে কীটের পারা,
আছে ইতিহাস, আছে কুলমান,
    আছে মহত্ত্বের খনি--
পিতৃপিতামহ গেয়েছে যে গান
    শোন্‌ তার প্রতিধ্বনি।
খুঁজেছেন তাঁরা চাহিয়া আকাশে
    গ্রহতারকার পথ,
জগৎ ছাড়ায়ে অসীমের আশে
    উড়াতেন মনোরথ।
চাতকের মতো সত্যের লাগিয়া
    তৃষিত আকুল প্রাণে
দিবস রজনী ছিলেন জাগিয়া
    চাহিয়া বিশ্বের পানে।
তবে কেন সবে বধির হেথায়,
    কেন অচেতন প্রাণ,
বিফল উচ্ছ্বাসে কেন ফিরে যায়
    বিশ্বের আহ্বানগান!
মহত্ত্বের গাথা পশিতেছে কানে,
    কেন রে বুঝি নে ভাষা।
তীর্থযাত্রী যত পথিকের গানে
    কেন রে জাগে না আশা।
উন্নতির ধ্বজা উড়িছে বাতাসে,
    কেন রে নাচে না প্রাণ।
নবীন কিরণ ফুটেছে আকাশে
    কেন রে জাগে না গান।
কেন আছি শুয়ে, কেন আছি চেয়ে,
    পড়ে আছি মুখোমুখি--
মানবের স্রোত চলে গান গেয়ে,
    জগতের সুখে সুখী।
চলো দিবালোকে, চলো লোকালয়ে,
    চলো জনকোলাহলে--
মিশাব হৃদয় মানবহৃদয়ে
    অসীম আকাশতলে।
তরঙ্গ তুলিব তরঙ্গের 'পরে,
    নৃত্য গীত নব নব--
বিশ্বের কাহিনী কোটি কণ্ঠস্বরে
    এক-কণ্ঠ হয়ে কব।
মানবের সুখ মানবের আশা
    বাজিবে আমার প্রাণে,
শত লক্ষ কোটি মানবের ভাষা
    ফুটিবে আমার গানে।
মানবের কাজে মানবের মাঝে
    আমরা পাইব ঠাঁই,
বঙ্গের দুয়ারে তাই শিঙা বাজে--
    শুনিতে পেয়েছি ভাই।
মুছে ফেলো ধুলা, মুছ অশ্রুজল,
    ফেলো ভিখারির চীর--
পরো নব সাজ, ধরো নব বল,
    তোলো তোলো নত শির।
তোমাদের কাছে আজি আসিয়াছে
    জগতের নিমন্ত্রণ--
দীনহীন বেশ ফেলে যেয়ো পাছে,
    দাসত্বের আভরণ।
সভার মাঝারে দাঁড়াবে যখন,
    হাসিয়া চাহিবে ধীরে,
পুরব রবির হিরণ কিরণ
    পড়িবে তোমার শিরে।
বাঁধন টুটিয়া উঠিবে ফুটিয়া
    হৃদয়ের শতদল,
জগৎ-মাঝারে যাইবে লুটিয়া
    প্রভাতের পরিমল।
উঠ বঙ্গকবি, মায়ের ভাষায়
    মুমূর্ষুরে দাও প্রাণ,
জগতের লোক সুধার আশায়
    সে ভাষা করিবে পান।
চাহিবে মোদের মায়ের বদনে,
    ভাসিবে নয়নজলে--
বাঁধিবে জগৎ গানের বাঁধনে
    মায়ের চরণতলে।
বিশ্বের মাঝারে ঠাঁই নাই বলে
    কঁদিতেছে বঙ্গভূমি,
গান গেয়ে কবি জগতের তলে
    স্থান কিনে দাও তুমি।
এক বার কবি মায়ের ভাষায়
    গাও জগতের গান--
সকল জগৎ ভাই হয়ে যায়,
    ঘুচে যায় অপমান।
আরো দেখুন
রেশ
Verses
বাঁশরি আনে আকাশ-বাণী-
       ধরণী আনমনে
কিছু বা ভোলে কিছু বা আধো
             শোনে।
       নামিবে রবি অস্তপথে,
             গানের হবে শেষ--
তখন ফিরে ঘিরিবে তারে
             সুরের কিছু রেশ।
অলস খনে কাঁপায় হাওয়া
আধেকখানি-হারিয়ে-যাওয়া
             গুঞ্জরিত কথা,
মিলিয়া প্রজাপতির সাথে
রাঙিয়ে তোলে আলোছায়াতে
       দুইপহরে-রোদ-পোহানো
             গভীর নীরবতা।
হল্‌দেরঙা-পাতায়-দোলা
নাম-ভোলা ও বেদনা-ভোলা
             বিষাদ ছায়ারূপী
ঘোমটা-পরা স্বপনময়
দূরদিনের কী ভাষা কয়
             জানি না চুপিচুপি।
জীবনে যারা স্মরণ-হারা
তবু মরণ জানে না তারা,
       উদাসী তারা মর্মবাসী
             পড়ে না কভু চোখে--
প্রতিদিনের সুখ-দুখেরে
অজানা হয়ে তারাই ঘেরে,
       বাষ্পছবি আঁকিয়া ফেরে
             প্রাণের মেঘলোকে।
আরো দেখুন