বরযাত্রা (borjatra)

পবন দিগন্তের দুয়ার নাড়ে

চকিত অরণ্যের সুপ্তি কাড়ে।

     যেন কোন্‌ দুর্দম

     বিপুল বিহঙ্গম

গগনে মুহুর্‌মুহু পক্ষ ছাড়ে।

পথপাশে মল্লিকা দাঁড়ালো আসি,

বাতাসে সুগন্ধের বাজালো বাঁশি।

     ধরার স্বয়ম্বরে

     উদার আড়ম্বরে

আসে বর অম্বরে ছড়ায়ে হাসি।

অশোক রোমাঞ্চিত মঞ্জরিয়া

দিল তার সঞ্চয় অঞ্জলিয়া।

     মধুকরগুঞ্জিত

     কিশলয়পুঞ্জিত

উঠিল বনাঞ্চল চঞ্চলিয়া।

কিংশুককুঙ্কুমে বসিল সেজে,

ধরণীর কিঙ্কিণী উঠিল বেজে।

     ইঙ্গিতে সংগীতে

     নৃত্যের ভঙ্গিতে

নিখিল তরঙ্গিত উৎসবে যে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

বাসা
Verses
ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে
         আমার পোষা হরিণে বাছুরে যেমন ভাব
             তেমনি ভাব শালবনে আর মহুয়ায়।
         ওদের পাতা ঝরছে গাছের তলায়,
             উড়ে পড়ছে আমার জানলাতে।
         তালগাছটা খাড়া দাঁড়িয়ে পুবের দিকে,
             সকালবেলাকার বাঁকা রোদ্‌দুর
তারি চোরাই ছায়া ফেলে আমার দেয়ালে।
      নদীর ধারে ধারে পায়ে-চলা পথ
             রাঙা মাটির উপর দিয়ে,
         কুড়চির ফুল ঝরে তার ধুলোয়;
      বাতাবি-লেবু-ফুলের গন্ধ
         ঘনিয়ে ধরে বাতাসকে;
      জারুল পলাশ মাদারে চলেছে রেষারেষি;
         শজনে ফুলের ঝুরি দুলছে হাওয়ায়;
      চামেলি লতিয়ে গেছে বেড়ার গায়ে গায়ে
             ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।
      নদীতে নেমেছে ছোটো একটি ঘাট
             লাল পাথরে বাঁধানো।
      তারি এক পাশে অনেক কালের চাঁপাগাছ,
             মোটা তার গুঁড়ি।
      নদীর উপরে বেঁধেছি একটি সাঁকো,
         তার দুই পাশে কাঁচের টবে
             জুঁই বেল রজনীগন্ধা শ্বেতকরবী।
                 গভীর জল মাঝে মাঝে,
             নীচে দেখা যায় নুড়িগুলি।
         সেইখানে ভাসে রাজহংস
             আর ঢালুতটে চরে বেড়ায়
আমার পাটল রঙের গাই গোরুটি
      আর মিশোল রঙের বাছুর
             ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।
ঘরের মেঝেতে ফিকে নীল রঙের জাজিম পাতা
             খয়েরিরঙের-ফুল-কাটা।
      দেয়াল বাসন্তী রঙের,
             তাতে ঘন কালো রেখার পাড়।
      একটুখানি বারান্দা পুবের দিকে,
             সেইখানে বসি সূর্যোদয়ের আগেই।
      একটি মানুষ পেয়েছি
তার গলায় সুর ওঠে ঝলক দিয়ে,
         নটীর কঙ্কণে আলোর মতো।
             পাশের কুটিরে সে থাকে,
তার চালে উঠেছে ঝুম্‌কোলতা।
        আপন মনে সে গায় যখন
           তখনি পাই শুনতে--
               গাইতে বলি নে তাকে।
স্বামীটি তার লোক ভালো--
           আমার লেখা ভালোবাসে, ঠাট্টা করলে
        যথাস্থানে যথোচিত হাসতে জানে,
খুব সাধারণ কথা সহজেই পারে কইতে,
    আবার হঠাৎ কোনো-একদিন আলাপ করে
        --লোকে যাকে চোখ টিপে বলে কবিত্ব--
           রাত্রি এগারোটার সময় শালবনে
               ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।
বাড়ির পিছন দিকটাতে
         শাক-সবজির খেত।
বিঘে-দুয়েক জমিতে হয় ধান।
      আর আছে আম-কাঁঠালের বাগিচা
         আস্‌শেওড়ার-বেড়া-দেওয়া।
      সকালবেলায় আমার প্রতিবেশিনী
         গুন্‌ গুন্‌ গাইতে গাইতে মাখন তোলে দই থেকে,
      তার স্বামী যায় দেখতে খেতের কাজ
             লাল টাট্টু ঘোড়ায় চ'ড়ে।
      নদীর ও পারে রাস্তা,
             রাস্তা ছাড়িয়ে ঘন বন--
সে দিক থেকে শোনা যায় সাঁওতালের বাঁশি
      আর শীতকালে সেখানে বেদেরা করে বাসা
             ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।
      এই পর্যন্ত।
এ বাসা আমার হয় নি বাঁধা, হবেও না।
         ময়ূরাক্ষী নদী দেখিও নি কোনো দিন।
             ওর নামটা শুনি নে কান দিয়ে,
                 নামটা দেখি চোখের উপরে--
             মনে হয় যেন ঘননীল মায়ার অঞ্জন
                     লাগে চোখের পাতায়।
আর মনে হয়
      আমার মন বসবে না আর কোথাও,
         সব কিছু থেকে ছুটি নিয়ে
             চলে যেতে চায় উদাস প্রাণ
                 ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে।
আরো দেখুন
পরশ-পাথর
Verses
        খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর।
   মাথায় বৃহৎ জটা                 ধূলায় কাদায় কটা,
        মলিন ছায়ার মতো ক্ষীণ কলেবর।
   ওষ্ঠে অধরেতে চাপি            অন্তরের দ্বার ঝাঁপি
        রাত্রিদিন তীব্র জ্বালা জ্বেলে রাখে চোখে।
   দুটো নেত্র সদা যেন             নিশার খদ্যোত-হেন
        উড়ে উড়ে খোঁজে কারে নিজের আলোকে।
   নাহি যার চালচুলা            গায়ে মাখে ছাইধুলা
        কটিতে জড়ানো শুধু ধূসর কৌপীন,
   ডেকে কথা কয় তারে        কেহ নাই এ সংসারে
        পথের ভিখারি হতে আরো দীনহীন,
   তার এত অভিমান,            সোনারুপা তুচ্ছজ্ঞান,
        রাজসম্পদের লাগি নহে সে কাতর,
   দশা দেখে হাসি পায়          আর কিছু নাহি চায়
        একেবারে পেতে চায় পরশপাথর!
        সম্মুখে গরজে সিন্ধু অগাধ অপার।
   তরঙ্গে তরঙ্গ উঠি                 হেসে হল কুটিকুটি
        সৃষ্টিছাড়া পাগলের দেখিয়া ব্যাপার।
আকাশ রয়েছে চাহি,           নয়নে নিমেষ নাহি,
        হু হু করে সমীরণ ছুটেছে অবাধ।
সূর্য ওঠে প্রাতঃকালে           পূর্ব গগনের ভালে,
        সন্ধ্যাবেলা ধীরে ধীরে উঠে আসে চাঁদ।
জলরাশি অবিরল                 করিতেছে কলকল,
        অতল রহস্য যেন চাহে বলিবারে।
কাম্য ধন আছে কোথা        জানে যেন সব কথা,
        সে-ভাষা যে বোঝে সেই খুঁজে নিতে পারে।
কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নাহি,        মহা গাথা গান গাহি
        সমুদ্র আপনি শুনে আপনার স্বর।
কেহ যায়, কেহ আসে,        কেহ কাঁদে, কেহ হাসে,
        খ্যাপা তীরে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর।
        একদিন, বহুপূর্বে, আছে ইতিহাস--
নিকষে সোনার রেখা            সবে যেন দিল দেখা--
        আকাশে প্রথম সৃষ্টি পাইল প্রকাশ।
মিলি যত সুরাসুর                  কৌতূহলে ভরপুর
        এসেছিল পা টিপিয়া এই সিন্ধুতীরে।
অতলের পানে চাহি                নয়নে নিমেষ নাহি
        নীরবে দাঁড়ায়ে ছিল স্থির নতশিরে।
বহুকাল স্তব্ধ থাকি               শুনেছিল মুদে আঁখি
        এই মহাসমুদ্রের গীতি চিরন্তন;
তার পরে কৌতূহলে           ঝাঁপায়ে অগাধ জলে
        করেছিল এ অনন্ত রহস্য মন্থন।
বহুকাল দুঃখ সেবি                নিরখিল, লক্ষ্মীদেবী
        উদিলা জগৎ-মাঝে অতুল সুন্দর।
সেই সমুদ্রের তীরে                  শীর্ণ দেহে জীর্ণ চীরে
        খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর।
        এতদিনে বুঝি তার ঘুচে গেছে আশ।
খুঁজে খুঁজে ফিরে তবু          বিশ্রাম না জানে কভু,
        আশা গেছে, যায় নাই খোঁজার অভ্যাস।
বিরহী বিহঙ্গ ডাকে               সারা নিশি তরুশাখে,
        যারে ডাকে তার দেখা পায় না অভাগা।
তবু ডাকে সারাদিন              আশাহীন শ্রান্তিহীন,
        একমাত্র কাজ তার ডেকে ডেকে জাগা।
আর-সব কাজ ভুলি            আকাশে তরঙ্গ তুলি
        সমুদ্র না জানি কারে চাহে অবিরত।
যত করে হায় হায়           কোনোকালে নাহি পায়,
        তবু শূন্যে তোলে বাহু, ওই তার ব্রত।
কারে চাহি ব্যোমতলে           গ্রহতারা লয়ে চলে,
        অনন্ত সাধনা করে বিশ্বচরাচর।
সেইমতো সিন্ধুতটে                ধূলিমাথা দীর্ঘজটে
        খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর।
        একদা শুধাল তারে গ্রামবাসী ছেলে,
"সন্ন্যাসীঠাকুর, এ কী,         কাঁকালে ও কী ও দেখি,
        সোনার শিকল তুমি কোথা হতে পেলে।'
সন্ন্যাসী চমকি ওঠে               শিকল সোনার বটে,
        লোহা সে হয়েছে সোনা জানে না কখন।
একি কাণ্ড চমৎকার,            তুলে দেখে বার বার,
        আঁখি কচালিয়া দেখে এ নহে স্বপন।
কপালে হানিয়া কর               বসে পড়ে ভূমি-'পর,
        নিজেরে করিতে চাহে নির্দয় লাঞ্ছনা;
পাগলের মতো চায়--           কোথা গেল, হায় হায়,
        ধরা দিয়ে পলাইল সফল বাঞ্ছনা।
কেবল অভ্যাসমত                  নুড়ি কুড়াইত কত,
        ঠন্‌ ক'রে ঠেকাইত শিকলের 'পর,
চেয়ে দেখিত না, নুড়ি          দূরে ফেলে দিত ছুঁড়ি,
        কখন ফেলেছে ছুঁড়ে পরশ-পাথর।
        তখন যেতেছে অস্তে মলিন তপন।
আকাশ সোনার বর্ণ,              সমুদ্র  গলিত স্বর্ণ,
        পশ্চিম দিগ্বধূ দেখে সোনার স্বপন।
সন্ন্যাসী আবার ধীরে               পূর্বপথে যায় ফিরে
        খুঁজিতে নূতন ক'রে হারানো রতন।
সে শকতি নাহি আর                 নুয়ে পড়ে দেহভার
        অন্তর লুটায় ছিন্ন তরুর মতন।
পুরাতন দীর্ঘ পথ                 পড়ে আছে মৃতবৎ
        হেথা হতে কত দূর নাহি তার শেষ।
দিক হতে দিগন্তরে               মরুবালি ধূ ধূ করে,
        আসন্ন রজনী-ছায়ে ম্লান সর্বদেশ।
অর্ধেক জীবন খুঁজি              কোন্‌ ক্ষণে চক্ষু বুজি
        স্পর্শ লভেছিল যার এক পল ভর,
বাকি অর্ধ ভগ্ন প্রাণ              আবার করিছে দান
        ফিরিয়া খুঁজিতে সেই পরশ-পাথর।
আরো দেখুন
আগন্তুক
Verses
এসেছি সুদূর কাল থেকে।
                 তোমাদের কালে
                     পৌঁছলেম যে সময়ে
                       তখন আমার সঙ্গী নেই।
            ঘাটে ঘাটে কে কোথায় নেবে গেছে।
               ছোটো ছোটো চেনা সুখ যত,
                   প্রাণের উপকরণ,
                       দিনের রাতের মুষ্টিদান
                   এসেছি নিঃশেষ করে বহুদূর পারে।
              এ জীবনে পা দিয়েছি প্রথম যে কালে
                 সে কালের 'পরে অধিকার
                     দৃঢ় হয়েছিল দিনে দিনে
                       ভাবে ও ভাষায়
                            কাজে ও ইঙ্গিতে,
                 প্রণয়ের প্রাত্যহিক দেনাপাওনায়।
হেসে খেলে কোনোমতে সকলের সঙ্গে বেঁচে থাকা,
                 লোকযাত্রারথে
      কিছু কিছু গতিবেগ দেওয়া,
শুধু উপস্থিত থেকে প্রাণের আসরে
      ভিড় জমা করা,
           এই তো যথেষ্ট ছিল।
      আজ তোমাদের কালে
           প্রবাসী অপরিচিত আমি।
                 আমাদের ভাষার ইশারা
      নিয়েছে নূতন অর্থ তোমাদের মুখে।
           ঋতুর বদল হয়ে গেছে, --
      বাতাসের উলটো-পালটা ঘ'টে
           প্রকৃতির হল বর্ণভেদ।
      ছোটো ছোটো বৈষম্যের দল
                 দেয় ঠেলা,
           করে হাসাহাসি।
           রুচি আশা অভিলাষ
                 যা মিশিয়ে জীবনের স্বাদ,
           তার হল রসবিপর্যয়।
      আমাদের সেকালকে যে সঙ্গ দিয়েছি
           যতই সামান্য হোক মূল্য তার
      তবু সেই সঙ্গসূত্রে গাঁথা হয়ে মানুষে মানুষে
                 রচেছিল যুগের স্বরূপ, --
           আমার সে সঙ্গ আজ
      মেলে না যে তোমাদের প্রত্যহের মাপে।
      কালের নৈবেদ্যে লাগে যে-সকল আধুনিক ফুল
           আমার বাগানে ফোটে না সে।
      তোমাদের যে বাসার কোণে থাকি
           তার খাজনার কড়ি হাতে নেই।
      তাই তো আমাকে দিতে হবে
           বড়ো কিছু দান
                দানের একান্ত দুঃসাহসে।
      উপস্থিত কালের যা দাবি
           মিটাবার জন্যে সে তো নয়,
      তাই যদি সেই দান তোমাদের রুচিতে না লাগে,
           তবে তার বিচার সে পরে হবে।
      তবু যা সম্বল আছে তাই দিয়ে
      একালের ঋণ শোধ করে অবশেষে
           ঋণী তারে রেখে যাই যেন।
      যা আমার লাভক্ষতি হতে বড়ো,
           যা আমার সুখদুঃখ হতে বেশি--
      তাই যেন শেষ করে দিয়ে চলে যাই
           স্তুতি নিন্দা হিসাবের অপেক্ষা না রেখে।
আরো দেখুন