আমার মনে একটুও নেই বৈকুন্ঠের আশা।-- ওইখানে মোর বাসা যে মাটিতে শিউরে ওঠে ঘাস, যার 'পরে ওই মন্ত্র পড়ে দক্ষিনে বাতাস। চিরদিনের আলোক-জ্বালা নীল আকাশের নীচে যাত্রা আমার নৃত্যপাগল নটরাজের পিছে। ফুল ফোটাবার যে রাগিণী বকুল শাখায় সাধা, নিষ্কারণে ওড়ার আবেগ চিলের পাখায় বাঁধা, সেই দিয়েছে রক্তে আমার ঢেউয়ের দোলাদুলি; স্বপ্নলোকে সেই উড়েছে সুরের পাখনা তুলি। দায়-ভোলা মোর মন মন্দে-ভালোয় সাদায়-কালোয় অঙ্কিত প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে গেছে দূর দিগন্ত-পানে আপন বাঁশির পথ-ভোলানো তানে। দেখা দিল দেহের অতীত কোন্ দেহ এই মোর ছিন্ন করি বস্তুবাঁধন-ডোর। শুধু কেবল বিপুল অনুভূতি, গভীর হতে বিচ্ছুরিত আনন্দময় দ্যুতি, শুধু কেবল গানেই ভাষা যার, পুষ্পিত ফাল্গুনের ছন্দে গন্ধে একাকার; নিমেষহারা চেয়ে-থাকার দূর অপারের মাঝে ইঙ্গিত যার বাজে। যে দেহেতে মিলিয়ে আছে অনেক ভোরের আলো, নাম-না-জানা অপূর্বেরে যার লেগেছে ভালো, যে দেহেতে রূপ নিয়েছে অনির্বচনীয় সকল প্রিয়ের মাঝখানে যে প্রিয়, পেরিয়ে মরণ সে মোর সঙ্গে যাবে-- কেবল রসে, কেবল সুরে, কেবল অনুভাবে।
শেষের মধ্যে অশেষ আছে, এই কথাটি মনে আজকে আমার গানের শেষে জাগছে ক্ষণে ক্ষণে। সুর গিয়েছে থেমে তবু থামতে যেন চায় না কভু, নীরবতায় বাজছে বীণা বিনা প্রয়োজনে। তারে যখন আঘাত লাগে, বাজে যখন সুরে-- সবার চেয়ে বড়ো যে গান সে রয় বহুদূরে। সকল আলাপ গেলে থেমে শান্ত বীণায় আসে নেমে, সন্ধ্যা যেমন দিনের শেষে বাজে গভীর স্বনে।
ওগো, তোরা বল্ তো এরে ঘরে বলি কোন্ মতে। এরে কে বেঁধেছে হাটের মাঝে আনাগোনার পথে। আসতে যেতে বাঁধে তরী আমারি এই ঘাটে, যে খুশি সেই আসে--আমার এই ভাবে দিন কাটে। ফিরিয়ে দিতে পারি না যে হায় রে-- কী কাজ নিয়ে আছি, আমার বেলা বহে যায় যে, আমার বেলা বহে যায় রে। পায়ের শব্দ বাজে তাদের, রজনীদিন বাজে। ওগো, মিথ্যে তাদের ডেকে বলি, "তোদের চিনি না যে!' কাউকে চেনে পরশ আমার, কাউকে চেনে ঘ্রাণ, কাউকে চেনে বুকের রক্ত, কাউকে চেনে প্রাণ। ফিরিয়ে দিতে পারি না যে হায় রে-- ডেকে বলি, "আমার ঘরে যার খুশি সেই আয় রে, তোরা যার খুশি সেই আয় রে।' সকালবেলায় শঙ্খ বাজে পুবের দেবালয়ে-- ওগো, স্নানের পরে আসে তারা ফুলের সাজি লয়ে। মুখে তাদের আলো পড়ে তরুণ আলোখানি; অরুণ পায়ের ধুলোটুকু বাতাস লহে টানি। ফিরিয়ে দিতে পারি না যে হায় রে-- ডেকে বলি, "আমার বনে তুলিবি ফুল আয় রে তোরা, তুলিবি ফুল আয় রে।' দুপুরবেলা ঘণ্টা বাজে রাজার সিংহদ্বারে। ওগো, কী কাজ ফেলে আসে তারা এই বেড়াটির ধারে। মলিনবরন মালাখানি শিথিল কেশে সাজে, ক্লিষ্টকরুণ রাগে তাদের ক্লান্ত বাঁশি বাজে। ফিরিয়ে দিতে পারি না যে হায় রে-- ডেকে বলি, "এই ছায়াতে কাটাবি দিন আয় রে তোরা, কাটাবি দিন আয় রে।' রাতের বেলা ঝিল্লি ডাকে গহন বনমাঝে। ওগো, ধীরে ধীরে দুয়ারে মোর কার সে আঘাত বাজে। যায় না চেনা মুখখানি তার, কয় না কোনো কথা, ঢাকে তারে আকাশ-ভরা উদাস নীরবতা। ফিরিয়ে দিতে পারি না যে হায় রে-- চেয়ে থাকি সে মুখ-পানে-- রাত্রি বহে যায়, নীরবে রাত্রি বহে যায় রে।