অতিবাদ (otibad)

আজ বসন্তে বিশ্বখাতায়

হিসেব নেইকো পুষ্পে পাতায়,

জগৎ যেন ঝোঁকের মাথায়

     সকল কথাই বাড়িয়ে বলে।

ভুলিয়ে দিয়ে সত্যি মিথ্যে,

ঘুলিয়ে দিয়ে নিত্যানিত্যে,

দু ধারে সব উদারচিত্তে

     বিধিবিধান ছাড়িয়ে চলে।

                  আমারো দ্বার মুক্ত পেয়ে

                       সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                  আজকে আমি কোনোমতেই

                       বলব নাকো সত্য কথা।

 

প্রিয়ার পুণ্যে হলেম রে আজ

একটা রাতের রাজ্যাধিরাজ,

ভাণ্ডারে আজ করছে বিরাজ

     সকল প্রকার অজস্রত্ব।

কেন রাখব কথার ওজন?

কৃপণতায় কোন্‌ প্রয়োজন?

ছুটুক বাণী যোজন যোজন

     উড়িয়ে দিয়ে ষত্ব ণত্ব।

                  চিত্তদুয়ার মুক্ত ক'রে

                        সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                 আজকে আমি কোনোমতেই

                        বলব নাকো সত্য কথা।

 

হে প্রেয়সী স্বর্গদূতী,

আমার যত কাব্যপুঁথি

তোমার পায়ে পড়ে স্তুতি,

তোমারি নাম বেড়ায় রটি;

থাকো হৃদয়-পদ্মটিতে

এক দেবতা আমার চিতে--

চাই নে তোমায় খবর দিতে

     আরো আছেন তিরিশ কোটি।

                 চিত্তদুয়ার মুক্ত ক'রে

                      সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                 আজকে আমি কোনোমতেই

                       বলব নাকো সত্য কথা।

 

ত্রিভুবনে সবার বাড়া

একলা তুমি সুধার ধারা,

উষার ভালে একটি তারা,

     এ জীবনে একটি আলো--

সন্ধ্যাতারা ছিলেন কে কে

সে-সব কথা যাব ঢেকে,

সময় বুঝে মানুষ দেখে

     তুচ্ছ কথা ভোলাই ভালো।

                চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে

                     সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                আজকে আমি কোনোমতেই

                    বলব নাকো সত্য কথা।

 

সত্য থাকুন ধরিত্রীতে

শুষ্ক রুক্ষ ঋষির চিতে,

জ্যামিতি আর বীজগণিতে,

     কারো ইথে আপত্তি নেই--

কিন্তু আমার প্রিয়ার কানে

এবং আমার কবির গানে

পঞ্চশরের পুষ্পবাণে

     মিথ্যে থাকুন রাত্রিদিনেই।

                চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে

                     সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                আজকে আমি কোনোমতেই

                    বলব নাকো সত্য কথা।

 

ওগো সত্য বেঁটেখাটো,

বীণার তন্ত্রী যতই ছাঁটো,

কণ্ঠ আমার যতই আঁটো,

     বলব তবু উচ্চ সুরে--

আমার প্রিয়ার মুগ্ধ দৃষ্টি

করছে ভুবন নূতন সৃষ্টি,

মুচকি হাসির সুধার বৃষ্টি

     চলছে আজি জগৎ জুড়ে।

                 চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে

                      সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                 আজকে আমি কোনোমতেই

                     বলব নাকো সত্য কথা।

 

যদি বল "আর বছরে

এই কথাটাই এমনি করে

বলেছিলি, কিন্তু ওরে

     শুনেছিলেন আরেক জনে'--

জেনো তবে মূঢ়মত্ত,

আর বসন্তে সেটাই সত্য,

এবারো সেই প্রাচীন তত্ত্ব

ফুটল নূতন চোখের কোণে।

                  চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে    

                       সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                  আজকে আমি কোনোমতেই

                       বলব নাকো সত্য কথা।

 

আজ বসন্তে বকুল ফুলে

যে গান বায়ু বেড়ায় বুলে

কাল সকালে যাবে ভুলে--

      কোথায় বাতাস, কোথায় সে ফুল!

হে সুন্দরী, তেমনি কবে

এ-সব কথা ভুলব যবে

মনে রেখো আমায় তবে--

     ক্ষমা কোরো আমার সে ভুল।

                  চিত্তদুয়ার মুক্ত রেখে

                       সাধুবুদ্ধি বহির্গতা,

                  আজকে আমি কোনোমতেই

                       বলব নাকো সত্য কথা।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সংযোজন
Verses
সখিরে-- পীরিত বুঝবে কে?
অঁধার হৃদয়ক দুঃখ কাহিনী
          বোলব, শুনবে কে?
রাধিকার অতি অন্তর বেদন
          কে বুঝবে অয়ি সজনী
কে বুঝবে সখি রোয়ত রাধা
          কোন দুখে দিন রজনী?
কলঙ্ক রটায়ব জনি সখি রটাও
         কলঙ্ক নাহিক মানি,
সকল তয়াগব লভিতে শ্যামক
          একঠো আদর বাণী।
মিনতি করিলো সখি শত শত বার, তু
          শ্যামক না দিহ গারি,
শীল মান কুল, অপনি সজনি হম
          চরণে দেয়নু ডারি।
সখিলো--
বৃন্দাবনকো দুরুজন মানুখ
          পিরীত নাহিক জানে,
বৃথাই নিন্দা কাহ রটায়ত
          হমার শ্যামক নামে?
কলঙ্কিনী হম রাধা, সখিলো
          ঘৃণা করহ জনি মনমে
ন আসিও তব্‌ কবহু সজনিলো
          হমার অঁধা ভবনমে।
কহে ভানু অব-- বুঝবে না সখি
          কোহি মরমকো বাত,
বিরলে শ্যামক কহিও বেদন
          বৃক্ষে রাখয়ি মাথ।
আরো দেখুন
গুরু গোবিন্দ
Verses
"বন্ধু, তোমরা ফিরে যাও ঘরে
          এখনো সময় নয়'--
নিশি অবসান, যমুনার তীর,
ছোটো গিরিমালা, বন সুগভীর,
গুরু গোবিন্দ কহিলা ডাকিয়া
          অনুচর গুটি ছয়।
"যাও রামদাস, যাও গো লেহারি,
          সাহু, ফিরে যাও তুমি।
দেখায়ো না লোভ, ডাকিয়ো না মোরে
ঝাঁপায়ে পড়িত কর্মসাগরে--
এখনো পড়িয়া থাক্‌ বহু দূরে
          জীবনরঙ্গভূমি।
"ফিরায়েছি মুখ, রুধিয়াছি কান,
          লুকায়েছি বনমাঝে।
সুদূরে মানবসাগর অগাধ
চিরক্রন্দিত-ঊর্মি-নিনাদ,
হেথায় বিজনে রয়েছি মগন
          আপন গোপন কাজে।
"মানবের প্রাণ ডাকে যেন মোরে
          সেই লোকালয় হতে।
সুপ্ত নিশীথে জেগে উঠে তাই
চমকিয়া উঠে বলি "যাই যাই',
প্রাণ মন দেহ ফেলে দিতে চাই
          প্রবল মানবস্রোতে।
তোমাদের হেরি চিত চঞ্চল,
          উদ্দাম ধায় মন।
রক্ত-অনল শত শিখা মেলি
সর্পসমান করি উঠে কেলি,
গঞ্জনা দেয় তরবারি যেন
          কোষমাঝে ঝন্‌ ঝন্‌।
"হায়, সেকি সুখ, এ গহন ত্যজি
          হাতে লয়ে জয়তুরী
জনতার মাঝে ছুটিয়া পড়িতে,
রাজ্য ও রাজা ভাঙিতে গড়িতে,
অত্যাচারের বক্ষে পড়িয়া
          হানিতে তীক্ষ্ন ছুরি!
"তুরঙ্গসম অন্ধ নিয়তি,
          বন্ধন করি তায়
রশ্মি পাকড়ি আপনার করে
বিঘ্ন বিপদ লঙ্ঘন ক'রে
আপনার পথে ছুটাই তাহারে
          প্রতিকূল ঘটনায়।
"সমুখে যে আসে সরে যায় কেহ,
          পড়ে যায় কেহ ভূমে।
দ্বিধা হয়ে বাধা হতেছে ভিন্ন,
পিছে পড়ে থাকে চরণচিহ্ন,
আকাশের আঁখি করিছে খিন্ন
          প্রলয়বহ্নিধূমে।
"শত বার করে মৃত্যু ডিঙায়ে
          পড়ি জীবনের পাড়ে।
প্রান্তগগনে তারা অনিমিখ
নিশীথতিমিরে দেখাইছে দিক,
লোকের প্রবাহ ফেনায়ে ফেনায়ে
          গরজিছে দুই ধারে।
"কভু অমানিশা নীরব নিবিড়,
          কভু বা প্রখর দিন।
কভু বা আকাশে চারি-দিক-ময়
বজ্র লুকায়ে মেঘ জড়ো হয়,
কভু বা ঝটিকা মাথার উপরে
          ভেঙে পড়ে দয়াহীন।
"আয় আয় আয়' ডাকিতেছি সবে,
          আসিতেছে সবে ছুটে।
বেগে খুলে যায় সব গৃহদ্বার,
ভেঙে বাহিরায় সব পরিবার,
সুখ সম্পদ মায়া মমতার
          বন্ধন যায় টুটে।
"সিন্ধুমাঝারে মিশিছে যেমন
পঞ্চ নদীর জল,
আহ্বান শুনে কে কারে থামায়,
ভক্তহৃদয় মিলিছে আমায়,
পঞ্জাব জুড়ি উঠিছে জাগিয়া
          উন্মাদ কোলাহল।
"কোথা যাবি ভীরু, গহন গোপনে
          পশিছে কণ্ঠ মোর।
প্রভাতে শুনিয়া "আয় আয় আয়'
কাজের লোকেরা কাজ ভুলে যায়,
নিশীথে শুনিয়া "আয় তোরা আয়'
          ভেঙে যায় ঘুমঘোর।
"যত আগে চলি বেড়ে যায় লোক,
          ভরে যায় ঘাট বাট।
ভুলে যায় সবে জাত-অভিমান,
অবহেলে দেয় আপনার প্রাণ,
এক হয়ে যায় মান অপমান
          ব্রাহ্মণ আর জাঠ।
"থাক্‌ ভাই, থাক্‌, কেন এ স্বপন--
          এখনো সময় নয়।
এখনো একাকী দীর্ঘ রজনী
জাগিতে হইবে পল গণি গণি
অনিমেষ চোখে পূর্ব গগনে
          দেখিতে অরুণোদয়।
"এখনো বিহার কল্পজগতে,
          অরণ্য রাজধানী--
এখনো কেবল নীরব ভাবনা,
কর্মবিহীন বিজন সাধনা,
দিবানিশি শুধু বসে বসে শোনা
          আপন মর্মবাণী।
"একা ফিরি তাই যমুনার তীরে
          দুর্গমগিরিমাঝে।
মানুষ হতেছি পাষাণের কোলে,
মিশাতেছি গান নদীকলরোলে,
গড়িতেছি মন আপনার মনে,
          যোগ্য হতেছি কাজে।
"এমনি কেটেছে দ্বাদশ বরষ,
         আরো কতদিন হবে!
চারি দিক হতে অমর জীবন
বিন্দু বিন্দু করি আহরণ
আপনার মাঝে আপনারে আমি
          পূর্ণ দেখিব কবে!
"কবে প্রাণ খুলে বলিতে পারিব--
          "পেয়েছি আমার শেষ!
তোমরা সকলে এসো মোর পিছে,
গুরু তোমাদের সবারে ডাকিছে,
আমার জীবনে লভিয়া জীবন
          জাগো রে সকল দেশ!
"নাহি আর ভয়, নাহি সংশয়,
          নাহি আর আগু-পিছু।
পেয়েছি সত্য, লভিয়াছি পথ,
সরিয়া দাঁড়ায় সকল জগৎ--
নাই তার কাছে জীবন মরণ,
          নাই নাই আর কিছু।'
"হৃদয়ের মাঝে পেতেছি শুনিতে
          দৈববাণীর মতো--
"উঠিয়া দাঁড়াও আপন আলোতে,
ওই চেয়ে দেখো কতদূর হতে
তোমার কাছেতে ধরা দিবে ব'লে
          আসে লোক কত শত।
"ওই শোনো শোনো কল্লোলধ্বনি,
          ছুটে হৃদয়ের ধারা।
স্থির থাকো তুমি, থাকো তুমি জাগি
প্রদীপের মতো আলস তেয়াগি,
এ নিশীথমাঝে তুমি ঘুমাইলে
           ফিরিয়া যাইবে তারা।'
"ওই চেয়ে দেখো দিগন্ত-পানে
          ঘনঘোর ঘটা অতি।
আসিতেছে ঝড় মরণেরে লয়ে--
তাই বসে বসে হৃদয়-আলয়ে
জ্বালাতেছি আলো, নিবিবে না ঝড়ে,
          দিবে অনন্ত জ্যোতি।
"যাও তবে সাহু, যাও রামদাস,
          ফিরে যাও সখাগণ।
এসো দেখি সবে যাবার সময়
বলো দেখি সবে "গুরুজির জয়',
দুই হাত তুলি বলো "জয় জয়
          অলখ নিরঞ্জন' ।'
বলিতে বলিতে প্রভাততপন
          উঠিল আকাশ-'পরে।
গিরির শিখারে গুরুর মূরতি
কিরণছটায় প্রোজ্জ্বল অতি--
বিদায় মাগিল অনুচরগণ,
          নমিল ভক্তিভরে।
আরো দেখুন
93
Verses
GOD'S WORLD is ever renewed by death,
a Titan's ever crushed by its own existence.
আরো দেখুন