দিল্লি দরবার (dilli dorbar)

দেখিছ না অয়ি ভারত-সাগর,অয়ি গো হিমাদ্রি দেখিছ চেয়ে,

প্রলয়-কালের নিবিড় আঁধার, ভারতের ভাল ফেলেছে ছেয়ে।

অনন্ত সমুদ্র তোমারই বুকে, সমুচ্চ হিমাদ্রি তোমারি সম্মুখে,

নিবিড় আঁধারে, এ ঘোর দুর্দিনে, ভারত কাঁপিছে হরষ-রবে!

শুনিতেছি নাকি শত কোটি দাস, মুছি অশ্রুজল, নিবারিয়া শ্বাস,

সোনার শৃঙ্খল পরিতে গলায় হরষে মাতিয়া উঠেছে সবে?

শুধাই তোমারে হিমালয়-গিরি, ভারতে আজি কি সুখের দিন?

তুমি শুনিয়াছ হে গিরি-অমর, অর্জুনের ঘোর কোদণ্ডের স্বর,

তুমি দেখিয়াছ সুবর্ণ আসনে, যুধিষ্ঠির-রাজা ভারত শাসনে,

তুমি শুনিয়াছ সরস্বতী-কূলে, আর্য-কবি গায় মন প্রাণ খুলে,

তোমারে শুধাই হিমালয়-গিরি, ভারতে আজি কি সুখের দিন?

তুমি শুনিতেছ ওগো হিমালয়, ভারত গাইছে ব্রিটিশের জয়,

বিষণ্ণ নয়নে দেখিতেছ তুমি - কোথাকার এক শূন্যে মরুভূমি -

সেথা হতে আসি ভারত-আসন লয়েছে কাড়িয়া, করিছে শাসন,

তোমারে শুধাই হিমালয়-গিরি,ভারতে আজি কি সুখের দিন?

তবে এই-সব দাসের দাসেরা, কিসের হরষে গাইছে গান?

পৃথিবী কাঁপায়ে অযুত উচ্ছ্বাসে কিসের তরে গো উঠায় তান?

কিসের তরে গো ভারতের আজি, সহস্র হৃদয় উঠেছে বাজি?

যত দিন বিষ করিয়াছে পান,কিছুতে জাগে নি এ মহাশ্মশান,

          বন্ধন শৃঙ্খলে করিতে সম্মান

          ভারত জাগিয়া উঠেছে আজি?

          কুমারিকা হতে হিমালয়-গিরি

          এক তারে কভু ছিল না গাঁথা,

আজিকে একটি চরণ-আঘাতে, সমস্ত ভারত তুলেছে মাথা!

এসেছিল যবে মহম্মদ ঘোরি, স্বর্গ রসাতল জয়নাদে ভরি

          রোপিতে ভারতে বিজয়ধ্বজা,

তখনো একত্রে ভারত জাগে নি, তখনো একত্রে ভারত মেলে নি,

          আজ জাগিয়াছে, আজ মিলিয়াছে--

          বন্ধনশৃঙ্খলে করিতে পূজা!

          ব্রিটিশ-রাজের মহিমা গাহিয়া

          ভূপগণ ওই আসিছে ধাইয়া

রতনে রতনে মুকুট ছাইয়া ব্রিটিশ-চরণে লোটাতে শির--

ওই আসিতেছে জয়পুররাজ, ওই যোধপুর আসিতেছে আজ

ছাড়ি অভিমান তেয়াগিয়া লাজ, আসিছে ছুটিয়া অযুত বীর!

          হা রে হতভাগ্য ভারতভূমি,

          কন্ঠে এই ঘোর কলঙ্কের হার

          পরিবারে আজি করি অলংকার

          গৌরবে মাতিয়া উঠেছে সবে?

          তাই কাঁপিতেছে তোর বক্ষ আজি

          ব্রিটিশ-রাজের বিজয়রবে?

ব্রিটিশ-বিজয় করিয়া ঘোষণা, যে গায় গাক্‌ আমরা গাব না

          আমরা গাব না হরষ গান,

এসো গো আমরা যে ক'জন আছি, আমরা ধরিব আরেক তান।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

নিমন্ত্রণ
Verses
প্রজাপতি যাঁদের সাথে
      পাতিয়ে আছেন সখ্য,
আর যাঁরা সব প্রজাপতির
      ভবিষ্যতের লক্ষ্য,
উদরায়ণ উদার ক্ষেত্রে
      মিলুন উভয় পক্ষ,
রসনাতে রসিয়ে উঠুক
      নানারসের ভক্ষ্য।
সত্যযুগে দেবদেবীদের
      ডেকেছিলেন দক্ষ
অনাহূত পড়ল এসে
      মেলাই যক্ষ রক্ষ,
আমরা সে ভুল করব না তো,
      মোদের অন্নকক্ষ
দুই পক্ষেই অপক্ষপাত
      দেবে ক্ষুধার মোক্ষ।
আজো যাঁরা বাঁধন-ছাড়া
      ফুলিয়ে বেড়ান বক্ষ
বিদায়কালে দেব তাঁদের
      আশিস লক্ষ লক্ষ--
"তাদের ভাগ্যে অবিলম্বে
      জুটুন কারাধ্যক্ষ।"
এর পরে আর মিল মেলে না
      য র ল ব হ ক্ষ।
আরো দেখুন
11
Verses
              হে মোর সুন্দর,
                    যেতে যেতে
              পথের প্রমোদে মেতে
              যখন তোমার গায়
                     কারা সবে ধুলা দিয়ে যায়,
                            আমার অন্তর
                                   করে হায় হয়।
              কেঁদে বলি, হে মোর সুন্দর,
                    আজ তুমি হও দণ্ডধর,
                           করহ বিচার।
                    তার পরে দেখি,
                            এ কী,
                  খোলা তব বিচারঘরের দ্বার,
                       নিত্য চলে তোমার বিচার।
                       নীরবে প্রভাত-আলো পড়ে
                   তাদের কলুষরক্ত নয়নের 'পরে;
                       শুভ্র বনমল্লিকার বাস
                   স্পর্শ করে লালসার উদ্দীপ্ত নিশ্বাস;
              সন্ধ্যাতাপসীর হাতে জ্বালা
                    সপ্তর্ষির পূজাদীপমালা
              তাদের মত্ততাপানে সারারাত্রি চায়--
                            হে সুন্দর, তব গায়
                                   ধুলা দিয়ে যারা চলে যায়।
                            হে সুন্দর,
                       তোমার বিচারঘর
                            পুষ্পবনে,
                            পুণ্যসমীরণে,
                       তৃণপুঞ্জে পতঙ্গগুঞ্জনে,
              বসন্তের বিহঙ্গকূজনে,
          তরঙ্গচুম্বিত তীরে মর্মরিত পল্লববীজনে।
                              প্রেমিক আমার,
          তারা যে নির্দয় ঘোর, তাদের যে আবেগ দুর্বার।
              লুকায়ে ফেরে যে তারা করিতে হরণ
                            তব আভরণ,
                            সাজাবারে
                        আপনার নগ্ন বাসনারে।
     তাদের আঘাত যবে প্রেমের সর্বাঙ্গে বাজে,
          সহিতে সে পারি না যে;
              অশ্রু-আঁখি
          তোমারে কাঁদিয়া ডাকি--
              খড়গ ধরো, প্রেমিক আমার,
                     করো গো বিচার।
                            তার পরে দেখি
                                  এ কী,
                            কোথা তব বিচার-আগার।
                           জননীর স্নেহ-অশ্রু ঝরে
                                   তাদের উগ্রতা-'পরে;
                            প্রণয়ীর অসীম বিশ্বাস
     তাদের বিদ্রোহশেল ক্ষতবক্ষে করি লয় গ্রাস।
                            প্রেমিক আমার,
          তোমার সে বিচার-আগার
         বিনিদ্র স্নেহের স্তব্ধ নিঃশব্দ বেদনামাঝে,
                            সতীর পবিত্র লাজে,
              সখার হৃদয়রক্তপাতে,
          পথ-চাওয়া  প্রণয়ের বিচ্ছেদের রাতে,
     অশ্রুপ্লুত করুণার পরিপূর্ণ ক্ষমার প্রভাতে।
                            হে রুদ্র আমার,
          লুব্ধ তারা, মুগ্ধ তারা, হয়ে পার
                            তব সিংহদ্বার,
                            সংগোপনে
                          বিনা নিমন্ত্রণে
          সিঁধ কেটে চুরি করে তোমার ভাণ্ডার।
              চোরা ধন দুর্বহ সে ভার
                  পলে পলে
              তাহাদের র্মম দলে,
                   সাধ্য নাহি রহে নামাবার।
     তোমারে কাঁদিয়া তবে কহি বারম্বার--
     এদের মার্জনা করো, হে রুদ্র আমার।
              চেয়ে দেখি মার্জনা যে নামে এসে
                     প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার বেশে;
                            সেই ঝড়ে
                     ধুলায় তাহারা পড়ে;
              চুরির প্রকাণ্ড বোঝা খণ্ড খণ্ড হয়ে
                         সে-বাতাসে কোথা যায় বয়ে।
                            হে রুদ্র আমার,
                            মার্জনা তোমার
                          গর্জমান বজ্রাগ্নিশিখায়,
                          সুর্যাস্তের প্রলয়লিখায়,
                            রক্তের বর্ষণে,
                    অকস্মাৎ সংঘাতের ঘর্ষণে ঘর্ষণে।
আরো দেখুন
শেষ মধু
Verses
বসন্তবায় সন্ন্যাসী হায়
                   চৈৎ-ফসলের শূন্য খেতে,
          মৌমাছিদের ডাক দিয়ে যায়
                   বিদায় নিয়ে যেতে যেতে--
                   আয় রে ওরে মৌমাছি, আয়,
                                      চৈত্র যে যায় পত্রঝরা,
                   গাছের তলায় আঁচল বিছায়
                                      ক্লান্তি-অলস বসুন্ধরা।
          সজনে ঝুলায় ফুলের বেণী,
          আমের মুকুল সব ঝরে নি,
          কুঞ্জবনের প্রান্ত-ধারে
                             আকন্দ রয় আসন পেতে।
                             আয় রে তোরা মৌমাছি, আয়,
                                                আসবে কখন শুকনো খরা,
                             প্রেতের নাচন নাচবে তখন
                                                রিক্ত নিশায় শীর্ণ জরা।
শুনি যেন কাননশাখায়
                   বেলাশেষের বাজায় বেণু;
          মাখিয়ে নে আজ পাখায় পাখায়
                   স্মরণভরা গন্ধরেণু।
          কাল যে কুসুম পড়বে ঝরে
          তাদের কাছে নিস গো ভরে
          ওই বছরের শেষের মধু
                   এই বছরের মৌচাকেতে।
                   নূতন দিনের মৌমাছি, আয়,
                               নাই রে দেরি, করিস ত্বরা,
                   শেষের দানে ওই রে সাজায়
                               বিদায়দিনের দানের ভরা।
                   চৈত্রমাসের হাওয়ায় কাঁপা
                               দোলনচাঁপার কুঁড়িখানি
                   প্রলয়দাহের রৌদ্রতাপে
                               বৈশাখে আজ ফুটবে জানি।
                   যা কিছু তার আছে দেবার
                   শেষ করে সব নিবি এবার,
                   যাবার বেলায় যাক চলে যাক
                               বিলিয়ে দেবার নেশায় মেতে।
                               আয় রে ওরে মৌমাছি, আয়,
                                                আয় রে গোপন-মধু-হরা,
                               চরম দেওয়া সঁপিতে চায়
                                                ওই মরণের স্বয়ম্বরা।
আরো দেখুন