৯ (namhara ei nodir pare)

নামহারা এই নদীর পারে

ছিলে তুমি বনের ধারে

     বলে নি কেউ আমাকে।

শুধু কেবল ফুলের বাসে

মনে হ'ত খবর আসে

     উঠত হিয়া চমকে।

শুধু যেদিন দখিন হাওয়ায়

বিরহ-গান মনকে গাওয়ায়

     পরান-উন্‌মাদনি,

পাতায় পাতায় কাঁপন ধরে,

দিগন্তরে ছড়িয়ে পড়ে

     বনান্তরের কাঁদনি,

সেদিন আমার লাগে মনে

আছ যেন কাছের কোণে

     একটুখানি আড়ালে,

জানি যেন সকল জানি,

ছুঁতে পারি বসনখানি

     একটুকু হাত বাড়ালে।

এ কী গভীর, এ কী মধুর,

এ কী হাসি পরান-বঁধুর

     এ কী নীরব চাহনি,

এ কী ঘন গহন মায়া,

এ কী স্নিগ্ধ শ্যামল ছায়া,

    নয়ন-অবগাহনি।

লক্ষ তারের বিশ্ববীণা

এই নীরবে হয়ে লীনা

     নিতেছে সুর কুড়ায়ে,

সপ্তলোকের আলোকধারা

এই ছায়াতে হল হারা

     গেল গো তাপ জুড়ায়ে।

সকল রাজার রতন-সজ্জা

লুকিয়ে গেল পেয়ে লজ্জা

     বিনা-সাজের কী বেশে।

আমার চির-জীবনেরে

লও গো তুমি লও গো কেড়ে

     একটি নিবিড় নিমেষে।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

হোরিখেলা
Verses
রাজস্থান
পত্র দিল পাঠান কেসর খাঁ'রে
          কেতুন হতে ভূনাগ রাজার রানী--
"লড়াই করি আশ মিটেছে মিঞা?
বসন্ত যায় চোখের উপর দিয়া,
এসো তোমার পাঠান সৈন্য নিয়া--
          হোরি খেলব আমরা রাজপুতানী।'
যুদ্ধে হারি কোটা শহর ছাড়ি
          কেতুন হতে পত্র দিল রানী।
পত্র পড়ি কেসর উঠে হাসি,
          মনের সুখে গোঁফে দিল চাড়া।
রঙিন দেখে পাগড়ি পরে মাথে,
সুর্মা আঁকি দিল আঁখির পাতে,
গন্ধভরা রুমাল নিল হাতে--
          সহস্রবার দাড়ি দিল ঝাড়া।
পাঠান সাথে হোরি খেলবে রানী,
          কেসর হাসি গোঁফে দিল চাড়া।
ফাগুন মাসে দখিন হতে হাওয়া
          বকুলবনে মাতাল হয়ে এল।
বোল ধরেছে আমের বনে বনে,
ভ্রমরগুলো কে কার কথা শোনে,
গুন্‌গুনিয়ে আপন-মনে-মনে
          ঘুরেঘুরে বেড়ায় এলোমেলো।
কেতুন পুরে দলে দলে আজি
          পাঠান-সেনা হোরি খেলতে এল।
কেতুনপুরে রাজার উপবনে
          তখন সবে ঝিকিমিকিবেলা।
পাঠানেরা দাঁড়ায় বনে আসি,
মুলতানেতে তান ধরেছে বাঁশি--
এল তখন একশো রানীর দাসী
          রাজপুতানী করতে হোরিখেলা।
রবি তখন রক্তরাগে রাঙা,
                   সবে তখন ঝিকিমিকি বেলা।
পায়ে পায়ে ঘাগরা উঠে দুলে,
          ওড়না ওড়ে দক্ষিনে বাতাসে।
ডাহিন হাতে বহে ফাগের থারি,
নীবিবন্ধে ঝুলিছে পিচকারি,
বামহস্তে গুলাব-ভরা ঝারি--
          সারি সারি রাজপুতানী আসে।
পায়ে পায়ে ঘাগরা উঠে দুলে,
          ওড়না ওড়ে দক্ষিনে বাতাসে।
আঁখির ঠারে চতুর হাসি হেসে
          কেসর তবে কহে কাছে আসি,
"বেঁচে এলেম অনেক যুদ্ধ করি,
আজকে বুঝি জানে-প্রাণে মরি!'
শুনে রানীর শতেক সহচরী
          হঠাৎ সবে উঠল অট্টহাসি।
রাঙা পাগড়ি হেলিয়ে কেসর খাঁ
          রঙ্গভরে সেলাম করে আসি।
শুরু হল হোরির মাতামাতি,
          উড়তেছে ফাগ রাঙা সন্ধ্যাকাশে।
নব বরন ধরল বকুল ফুলে,
রক্তরেণু ঝরল তরুমূলে--
ভয়ে পাখি কূজন গেল ভুলে
          রাজপুতানীর উচ্চ উপহাসে।
কোথা হতে রাঙা কুজ্ঝটিকা
          লাগল যেন রাঙা সন্ধ্যাকাশে।
চোখে কেন লাগছে নাকো নেশা
          মনে মনে ভাবছে কেসর খাঁ।
বক্ষ কেন উঠছে নাকো দুলি,
নারীর পায়ে বাঁকা নূপুরগুলি
কেমন যেন বলছে বেসুর বুলি,
          তেমন ক'রে কাঁকন বাজছে না!
চোখে কেন লাগছে নাকো নেশা
          মনে মনে ভাগছে কেসর খাঁ।
পাঠান কহে, "রাজপুতানীর দেহে
          কোথাও কিছু নাই কি কোমলতা!
বাহুযুগল নয় মৃণালের মতো,
কণ্ঠস্বরে বজ্র লজ্জাহত--
বড়ো কঠিন শুষ্ক স্বাধীন যত
          মঞ্জরীহীন মরুভূমির লতা।'
পাঠান ভাবে দেহে কিম্বা মনে
          রাজপুতানীর নাইকো কোমলতা।
তান ধরিয়া ইমন-ভূপালীতে
          বাঁশি বেজে উঠল দ্রুত তালে।
কুণ্ডলেতে দোলে মুক্তামালা,
কঠিন হাতে মোটা সোনার বালা,
দাসীর হাতে দিয়ে ফাগের থালা
          রানী বনে এলেন হেনকালে।
তান ধরিয়া ইমন-ভূপালীতে
          বাঁশি তখন বাজছে দ্রুত তালে।
কেসর কহে, "তোমারি পথ চেয়ে
          দুটি চক্ষু করেছি প্রায় কানা!'
রানী কহে, "আমারো সেই দশা।'
একশো সখী হাসিয়া বিবশা--
পাঠান-পতির ললাটে সহসা
          মারেন রানী কাঁসার থালাখানা।
রক্তধারা গড়িয়ে পড়ে বেগে
        পাঠান-পতির চক্ষু হল কানা।
বিনা মেঘে বজ্ররবের মতো
          উঠল বেজে কাড়া-নাকাড়া।
জ্যোৎস্নাকাশে চমকে ওঠে শশী,
ঝন্‌ঝনিয়ে ঝিকিয়ে ওঠে অসি,
সানাই তখন দ্বারের কাছে বসি
          গভীর সুরে ধরল কানাড়া।
কুঞ্জবনের তরু-তলে-তলে
          উঠল বেজে কাড়া-নাকাড়া।
বাতাস বেয়ে ওড়না গেল উড়ে,
          পড়ল খসে ঘাগরা ছিল যত।
মন্ত্রে যেন কোথা হতে কে রে
বাহির হল নারী-সজ্জা ছেড়ে,
এক শত বীর ঘিরল পাঠানেরে
          পুষ্প হতে একশো সাপের মতো।
স্বপ্নসম ওড়না গেল উড়ে,
          পড়ল খসে ঘাগরা ছিল যত।
যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল
          সে পথ দিয়ে ফিরল নাকো তারা।
ফাগুন-রাতে কুঞ্জবিতানে
মত্ত কোকিল বিরাম না জানে,
কেতুনপুরে বকুল-বাগানে
           কেসর খাঁয়ের খেলা হল সারা।
যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল
          সে পথ দিয়ে ফিরল নাকো তারা।
আরো দেখুন
বৃন্ত হতে ছিন্ন করি শুভ্র কমলগুলি
Verses
বৃন্ত হতে ছিন্ন করি শুভ্র কমলগুলি
             কে এনেছে তুলি।
তবু ওরা চায় যে মুখে নাই তাহে ভর্ৎসনা,
শেষ-নিমেষের পেয়ালা-ভরা অম্লান সান্ত্বনা--
মরণের মন্দিরে এসে মাধুরী-সংগীত
             বাজায় ক্লান্তি ভুলি
             শুভ্র কমলগুলি।
এরা তোমার ক্ষণকালের নিবিড়নন্দন
          নীরব চুম্বন,
মুগ্ধ নয়ন-পল্লবেতে মিলায় মরি মরি
তোমারি সুগন্ধ-শ্বাসে সকল চিত্ত ভরি--
হে কল্যাণলক্ষ্মী, এরা আমার মর্মে তব
          করুণ অঙ্গুলি
          শুভ্র কমলগুলি।
আরো দেখুন
ছেঁড়া কাগজের ঝুড়ি
Verses
বাবা এসে শুধালেন,
           "কী করছিস সুনি,
কাপড় কেন তুলিস বাক্সে, যাবি কোথায়?'
    সুনৃতার ঘর তিনতলায়।
        দক্ষিণ দিকে দুই জানলা,
           সামনে পালঙ্ক,
        বিছানা লক্ষ্ণৌ-ছিটে ঢাকা।
    অন্য দেয়ালে লেখবার টেবিল,
           তার কোণে মায়ের ফোটোগ্রাফ--
        তিনি গেছেন মারা।
    বাবার ছবি দেয়ালে,
        ফ্রেমে জড়ানো ফুলের মালা।
মেঝেতে লাল শতরঞ্চে
    শাড়ি শেমিজ ব্লাউজ
        মোজা রুমাল ছড়াছড়ি।
কুকুরটা কাছ ঘেঁষে লেজ নাড়ছে,
    ঠেলা দিচ্ছে কোলে থাবা তুলে--
        ভেবে পাচ্ছে না কিসের আয়োজন,
ভয় হচ্ছে পাছে ওকে ফেলে রেখে আবার যায় কোথাও।
    ছোটো বোন শমিতা বসে আছে হাঁটু উঁচু করে,
           বাইরের দিকে মুখ ফিরিয়ে।
    চুল বাঁধা হয় নি,
           চোখ দুটি রাঙা কান্নার অবসানে।
        চুপ করে রইল সুনৃতা,
মুখ নিচু করে সে কাপড় গোছায়--
        হাত কাঁপে।
    বাবা আবার বললেন,
        "সুনি, কোথাও যাবি নাকি।'
সুনৃতা শক্ত করে বললে, "তুমি তো বলেইছ
        এ বাড়িতে হতে পারবে না আমার বিয়ে,
           আমি যাব অনুদের বাসায়।'
শমিতা বললে, "ছি ছি, দিদি, কী বলছ।'
    বাবা বললেন, "ওরা যে মানে না আমাদের মত।'
    "তবু ওদের মতই যে আমাকে মানতে হবে চিরদিন--'
এই বলে সুনি সেফটিপিন ভরে রাখলে লেফাফায়।
           দৃঢ় ওর কণ্ঠস্বর, কঠিন ওর মুখের ভাব,
                   সংকল্প অবিচলিত।
    বাবা বললেন, "অনিলের বাপ জাত মানে,
           সে কি রাজি হবে।'
    সগর্বে বলে উঠল সুনৃতা,
           "চেন না তুমি অনিলবাবুকে,
    তাঁর জোর আছে পৌরুষের, তাঁর মত তাঁর নিজের।'
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বাবা চলে গেলেন ঘর থেকে,
        শমিতা উঠে তাঁকে জড়িয়ে ধরলে--
               বেরিয়ে গেল তাঁর সঙ্গে।
        বাজল দুপুরের ঘণ্টা।
সকাল থেকে খাওয়া নেই সুনৃতার।
শমিতা একবার এসেছিল ডাকতে--
    ও বললে, খাবে বন্ধুর বাড়ি গিয়ে।
        মা-মরা মেয়ে, বাপের আদুরে,
           মিনতি করতে আসছিলেন তিনি;
শমিতা পথ আগলিয়ে বললে,
    "কক্‌খনো যেতে পারবে না বাবা,
           ও না খায় তো নেই খেল।'
জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে
    দেখলে সুনৃতা রাস্তার দিকে,
           এসেছে অনুদের গাড়ি।
তাড়াতাড়ি চুলটা আঁচড়িয়ে
        ব্রোচটা লাগাচ্ছে যখন কাঁধে,
শমি এসে বললে, "এই নাও তাদের চিঠি।'
        ব'লে ফেলে দিলে ছুঁড়ে ওর কোলে।
সুনৃতা পড়লে চিঠিখানা,
        মুখ হয়ে গেল ফ্যাকাশে,
           বসে পড়ল তোরঙ্গের উপর।
চিঠিতে আছে--
    "বাবার মত করতে পারব নিশ্চিত ছিল মনে,
           হল না কিছুতেই,
                   কাজেই--'
    বাজল একটা।
সুনি চুপ করে ব'সে, চোখে জল নেই।
        রামচরিত বললে এসে,
               "মোটর দাঁড়িয়ে অনেক ক্ষণ।'
        সুনি বললে, "যেতে বলে দে।'
কুকুরটা কাছে এসে বসে রইল চুপ করে।
    বাবা বুঝলেন,
           প্রশ্ন করলেন না--
    বললেন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে,
"চল্‌ সুনি, হোসেঙ্গাবাদে তোর মামার ওখানে।'
           কাল বিয়ের দিন।
অনিল জিদ করেছিল হবে না বিয়ে।
        মা ব্যথিত হয়ে বলেছিল, "থাক্‌-না।'
           বাপ বললে, "পাগল নাকি।'
ইলেক্‌ট্রিক বাতির মালা খাটানো হচ্ছে বাড়িতে,
        সমস্ত দিন বাজছে সানাই।
               হূহু করে উঠছে অনিলের মনটা।
তখন সন্ধ্যা সাতটা।
    সুনিদের বউবাজারের বাড়ির এক তলায়।
        ডাবাহুঁকো বাঁ হাতে ধরে তামাক খাচ্ছে
               কৈলেস সরকার,
আর তালপাতার পাখায় বাতাস চলছে ডান হাতে;
        বেহারাকে ডেকেছে পা টিপে দেবে।
কালিমাখা ময়লা জাজিমে কাগজপত্র রাশ করা;
        জ্বলছে একটা কেরোসিন লণ্ঠন।
হঠাৎ অনিল এসে উপস্থিত।
    কৈলেস শশব্যস্ত উঠে দাঁড়ালো
           শিথিল কাছাকোঁচা সামলিয়ে।
    অনিল বললে,
        "পার্বণীটা ভুলেছিলেম গোলেমালে,
               তাই এসেছি দিতে।'
        তার পরে বাধো-বাধো গলায় বললে,
"অমনি দেখে যাব তোমাদের সুনিদিদির ঘরটা।'
গেল ঘরে।
    খাটের উপর রইল বসে মাথায় হাত দিয়ে।
        কিসের একটা অস্পষ্ট গন্ধ,
           মূর্ছিতের নিশ্বাসের মতো।
    সে গন্ধ চুলের না শুকনো ফুলের
           না শূন্য ঘরে সঞ্চিত বিজড়িত স্মৃতির--
        বিছানায়, চৌকিতে, পর্দায়।
    সিগারেট ধরিয়ে টানল কিছুক্ষণ,
        ছুঁড়ে ফেলে দিল জানলার বাইরে।
    টেবিলের নীচে থেকে ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িটা
           নিল কোলে তুলে।
               ধক্‌ করে উঠল বুকের মধ্যে;
দেখলে ঝুড়ি-ভরা রাশি রাশি ছেঁড়া চিঠি,
        ফিকে নীল রঙের কাগজে
           অনিলেরই হাতে লেখা।
        তার সঙ্গে টুকরো টুকরো ছেঁড়া একটা ফোটোগ্রাফ।
    আর ছিল বছর চার আগেকার
        দুটি ফুল, লাল ফিতেয় বাঁধা
           মেডেন-হেয়ার পাতার সঙ্গে
        শুকনো প্যান্‌সি আর ভায়োলেট।
আরো দেখুন