সুধিয়া (sudhiya)

গয়লা ছিল শিউনন্দন, বিখ্যাত তার নাম,

গোয়ালবাড়ি ছিল যেন একটা গোটা গ্রাম।

গোরু-চরার প্রকাণ্ড খেত, নদীর ওপার চরে,

কলাই শুধু ছিটিয়ে দিত পলি জমির 'পরে।

জেগে উঠত চারা তারই, গজিয়ে উঠত ঘাস,

ধেনুদলের ভোজ চলত মাসের পরে মাস।

মাঠটা জুড়ে বাঁধা হত বিশ-পঞ্চাশ চালা,

জমত রাখাল ছেলেগুলোর মহোৎসবের পালা।

গোপাষ্টমীর পর্বদিনে প্রচুর হত দান,

গুরুঠাকুর গা ডুবিয়ে দুধে করত স্নান।

তার থেকে সর ক্ষীর নবনী তৈরি হত কত,

প্রসাদ পেত গাঁয়ে গাঁয়ে গয়লা ছিল যত।

 

বছর তিনেক অনাবৃষ্টি, এল মন্বন্তর;

শ্রাবণ মাসে শোণনদীতে বান এল তারপর।

ঘুলিয়ে ঘুলিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে গর্জি ছুটল ধারা,

ধরণী চায় শূন্য-পানে সীমার চিহ্নহারা।

ভেসে চলল গোরু বাছুর, টান লাগল গাছে;

মানুষে আর সাপে মিলে শাখা আঁকড়ে আছে।

বন্যা যখন নেমে গেল বৃষ্টি গেল থামি,

আকাশজুড়ে দৈত্যে-দেবের ঘুচল সে পাগলামি।

শিউনন্দন দাঁড়ালো তার শূন্য ভিটেয় এসে--

তিনটে শিশুর ঠিকানা নেই, স্ত্রী গেছে তার ভেসে।

চুপ করে সে রইল বসে, বুদ্ধি পায় না খুঁজি;

মনে হল, সব কথা তার হারিয়ে গেল বুঝি।

ছেলেটা তার ভীষণ জোয়ান, সামরু বলে তাকে;

  এক-গলা এই জলে-ডোবা সকল পাড়াটাকে

  মথন করে ফিরে ফিরে তিনটে গোরু নিয়ে

  ঘরে এসে দেখলে, দু হাত চোখে ঢাকা দিয়ে

  ইষ্টদেবকে স্মরণ ক'রে নড়ছে বাপের মুখ;

  তাই দেখে ওর একেবারে জ্বলে উঠল বুক--

  বলে উঠল, "দেবতাকে তোর কেন মরিস ডাকি।

  তার দয়াটা বাঁচিয়ে যেটুক আজও রইল বাকি

  ভার নেব তার নিজের 'পরেই, ঘটুক-নাকো যাই আর,

  এর বাড়া তো সর্বনাশের সম্ভাবনা নাই আর।"

  এই বলে সে বাড়ি ছেড়ে পাঁকের পথে ঘুরে

  চিহ্ন-দেওয়া নিজের গোরু অনেক দূরে দূরে

  গোটা পাঁচেক খোঁজ পেয়ে তার আনলে তাদের কেড়ে,

  মাথা ভাঙবে ভয় দেখাতেই সবাই দিল ছেড়ে।

  ব্যাবসাটা ফের শুরু করল নেহাত গরিব চালে,

  আশা রইল উঠবে জেগে আবার কোনোকালে।

 

  এদিকেতে প্রকাণ্ড এক দেনার অজগরে

  একে একে গ্রাস করছে যা আছে তার ঘরে।

  একটু যদি এগোয় আবার পিছন দিকে ঠেলে,

  দেনা পাওনা দিনরাত্রি জোয়ার-ভাঁটা খেলে।

  মাল তদন্ত করতে এল দুনিয়াচাঁদ বেনে,

  দশবছরের ছেলেটাকে সঙ্গে করে এনে।

  ছেলেটা ওর জেদ ধরেছে-- ঐ সুধিয়া গাই

  পুষবে ঘরে আপন ক'রে ওইটে নেহাত চাই।

সামরু বলে, "তোমার ঘরে কী ধন আছে কত

আমাদের এই সুধিয়াকে কিনে নেবার মতো

ও যে আমার মানিক, আমার সাত রাজার ঐ ধন,

আর যা আমার যায় সবই যাক, দুঃখিত নয় মন।

মৃত্যুপারের থেকে ও যে ফিরেছে মোর কাছে,

এমন বন্ধু তিন ভুবনে আর কি আমার আছে।"

বাপের কানে কী বললে সেই দুনিচাঁদের ছেলে,

জেদ বেড়ে তার গেল বুঝি যেমনি বাধা পেলে।

শেঠজি বলে মাথা নেড়ে, "দুই চারিমাস যেতেই

ঐ সুধিয়ার গতি হবে আমার গোয়ালেতেই।"

 

কালোয় সাদায় মিশোল বরন, চিকন নধর দেহ,

সর্ব অঙ্গে ব্যাপ্ত যেন রাশীকৃত স্নেহ।

আকাল এখন, সামরু নিজে দুইবেলা আধ-পেটা;

সুধিয়াকে খাওয়ানো চাই যখনি পায় যেটা।

দিনের কাজের অবসানে গোয়ালঘরে ঢুকে

ব'কে যায় সে গাভীর কানে যা আসে তার মুখে।

কারো 'পরে রাগ সে জানায়, কখনো সাবধানে

গোপন খবর থাকলে কিছু জানায় কানে কানে।

সুধিয়া সব দাঁড়িয়ে শোনে কানটা খাড়া ক'রে,

বুঝি কেবল ধ্বনির সুখে মন ওঠে তার ভরে।

সামরু যখন ছোটো ছিল পালোয়ানের পেশা

ইচ্ছা করেছিল নিতে, ঐ ছিল তার নেশা।

খবর পেল, নবাববাড়ি কুস্তিগিরের দল

পাল্লা দেবে-- সামরু শুনে অসহ্য চঞ্চল।

বাপকে ব'লে গেল ছেলে, "কথা দিচ্ছি শোনো,

এক হপ্তার বেশি দেরি হবে না কখ্‌খোনো।"

ফিরে এসে দেখতে পেলে, সুধিয়া তার গাই

শেঠ নিয়েছে ছলে বলে গোয়ালঘরে নাই।

যেমনি শোনা অমনি ছুটল, ভোজালি তার হাতে,

দুনিচাঁদের গদি যেথায় নাজির মহল্লাতে।

"কী রে সামরু, ব্যাপারটা কী" শেঠজি শুধায় তাকে।

সামরু বলে "ফিরিয়ে নিতে এলুম সুধিয়াকে।"

শেঠ বললে, "পাগল নাকি, ফিরিয়ে দেব তোরে,

পরশু ওকে নিয়ে এলুম ডিক্রিজারি করে।"

"সুধিয়া রে" "সুধিয়া রে" সামরু দিল হাঁক,

পাড়ার আকাশ পেরিয়ে গেল বজ্রমন্দ্র ডাক।

চেনা সুরের হাম্বা ধ্বনি কোথায় জেগে উঠে,

দড়ি ছিঁড়ে সুধিয়া ঐ হঠাৎ এল ছুটে।

দু চোখ বেয়ে ঝরছে বারি, অঙ্গটি তার রোগা,

অন্নপানে দেয়নি সে মুখ, অনশনে-ভোগা।

সামরু ধরল জড়িয়ে গলা, বললে, "নাই রে ভয়,

আমি থাকতে দেখব এখন কে তোরে আর লয়।--

তোমার টাকায় দুনিয়া কেনা, শেঠ দুনিচাঁদ, তবু

এই সুধিয়া একলা নিজের, আর কারো নয় কভু।

আপন ইচ্ছামতে যদি তোমার ঘরে থাকে

তবে আমি এই মুহূর্তে রেখে যাব তাকে।"

চোখ পাকিয়ে কয় দুনিচাঁদ, "পশুর আবার ইচ্ছে!

গয়লা তুমি, তোমার কাছে কে উপদেশ নিচ্ছে।

গোল কর তো ডাকব পুলিশ।" সামরু বললে, "ডেকো।

ফাঁসি আমি ভয় করিনে, এইটে মনে রেখো।

দশবছরের জেল খাটব, ফিরব তো তারপর,

সেই কথাটাই ভেবো বসে, আমি চললেম ঘর।"

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

বিদায়
Verses
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
                   তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
                             ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল--
                             তুলে নিল দ্রুতরথে
                   দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
                             তোমা হতে বহুদূরে।
                             মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
                             পার হয়ে আসিলাম
          আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,
          রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
                             আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
                             দূর হতে যদি দেখ চাহি
                                      পারিবে না চিনিতে আমায়।
                                                হে বন্ধু, বিদায়।
কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে,
                            বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
                            ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
                            তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে
                            হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি।
                            তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
                            সে আমার প্রেম।
                            তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
                            পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
                                      কালের যাত্রায়।
                                      হে বন্ধু, বিদায়।
                            তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি
                            যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
                                                হোক তব সন্ধ্যাবেলা।
                                                পূজার সে খেলা
          ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;
                   তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
                   তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
                   আজও তুমি নিজে
                   হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
                   ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
                                      হে বন্ধু, বিদায়।
                   মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
                   মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
                   সেই ধন্য করিবে আমাকে।
                   শুক্লপক্ষ হতে আনি
                   রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
                                      যে পারে সাজাতে
                   অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে,
                   যে আমারে দেখিবারে পায়
                                      অসীম ক্ষমায়
                   ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
          এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
                   তোমারে যা দিয়েছিনু, তার
                   পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
                   হেথা মোর তিলে তিলে দান,
          করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
                   হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
                                      হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
                             হে বন্ধু, বিদায়।
আরো দেখুন
শূন্যঘর
Verses
গোধূলি-অন্ধকারে
      পুরীর প্রান্তে অতিথি আসিনু দ্বারে।
           ডাকিনু, "আছ কি কেহ,
           সাড়া দেহো, সাড়া দেহো।'
      ঘরভরা এক নিরাকার শূন্যতা
          না কহিল কোনো কথা।
বাহিরে বাগানে পুষ্পিত শাখা
           গন্ধের আহ্বানে
সংকেত করে কাহারে তাহা কে জানে।
হতভাগা এক কোকিল ডাকিছে খালি,
     জনশূন্যতা নিবিড় করিয়া
           নীরবে দাঁড়ায়ে মালী।
           সিঁড়িটা নির্বিকার
      বলে, "এস আর নাই যদি এস
           সমান অর্থ তার।'
           ঘরগুলো বলে ফিলজফারের গলায়,
      "ডুব দিয়ে দেখো সত্তাসাগর-তলায়
বুঝিতে পারিবে, থাকা নাই-থাকা
           আসা আর দূরে যাওয়া
      সবই এক কথা, খেয়ালের ফাঁকা হাওয়া।'
      কেদারা এগিয়ে দিতে কারো নেই তাড়া,
           প্রবীণ ভৃত্য ছুটি নিয়ে ঘরছাড়া।
      মেয়াদ যখন ফুরোয় কপালে,
           হায় রে তখন সেবা
           কারেই বা করে কেবা।
      মনেতে লাগিল বৈরাগ্যের ছোঁওয়া,
                 সকলি দেখিনু ধোঁওয়া।
           ভাবিলাম এই ভাগ্যের তরী
                 বুঝি তার হাল নেই,
      এলোমেলো স্রোতে আজ আছে কাল নেই।
           নলিনীর দলে জলের বিন্দু
                 চপলম্‌ অতিশয়,
           এই কথা জেনে সওয়ালেই ক্ষতি সয়।
                 অতএব -- আরে অতএবখানা থাক্‌
                       আপাতত ফেরা যাক।
      ব্যর্থ আশায় ভারাতুর সেই ক্ষণে
                 ফিরালেম রথ, ফিরিবার পথ
                       দূরতর হল মনে।
           যাবার বেলায় শুষ্ক পথের
                 আকাশ-ভরানো ধূলি
                 সহজে ছিলাম ভুলি।
           ফিরিবার বেলা মুখেতে রুমাল,
                 ধোঁয়াটে চশমা চোখে,
           মনে হল যত মাইক্রোব-দল
                 নাকে মুখে সব ঢোকে।
           তাই বুঝিলাম, সহজ তো নয়
                 ফিলজফারের বুদ্ধি।
           দরকার করে বহুৎ চিত্তশুদ্ধি।
                       মোটর চলিল জোরে,
           একটু পরেই হাসিলাম হো হো করে।
      সংশয়হীন আশার সামনে
                       হঠাৎ দরজা বন্ধ,
      নেহাত এটার ঠাট্টার মতো ছন্দ।
      বোকার মতন গম্ভীর মুখটারে
                 অট্টহাস্যে সহজ করিনু,
                       ফিরিনু আপন দ্বারে।
      ঘরে কেহ আজ ছিল না যে, তাই
                 না-থাকার ফিলজাফি
                 মনটাকে ধরে চাপি।
                 থাকাটা আকস্মিক,
      না-থাকাই সে তো দেশকাল ছেয়ে
                 চেয়ে আছে অনিমিখ।
      সন্ধেবেলায় আলোটা নিবিয়ে
                 বসে বসে গৃহকোণে
      না-থাকার এক বিরাট স্বরূপ
                 আঁকিতেছি মনে-মনে।
           কালের প্রান্তে চাই,
      ওই বাড়িটার আগাগোড়া কিছু নাই।
           ফুলের বাগান, কোথাও তার উদ্দেশ,
           বসিবার সেই আরামকেদারা
                 পুরোপুরি নিঃশেষ।
      মাসমাহিনার খাতাটারে নিয়ে পিছে
      দুই দুই মালী একেবারে সব মিছে।
           ক্রেসান্থেমাম্‌ কার্নেশনের
                 কেয়ারি-সমেত তারা
                 নাই-গহ্বরে হারা।
                 চেয়ে দেখি দূর-পানে
সেই ভাবীকালে যাহা আছে যেইখানে
           উপস্থিতের ছোটো সীমানায়
              সামান্য তাহা অতি--
                 হেথায় সেথায় বুদ্‌বুদ্‌সংহতি।
যাহা নাই তাই বিরাট বিপুল মহা।
              অনাদি অতীত যুগের প্রবাহ-বহা
      অসংখ্য ধন, কণামাত্রও তার
              নাই নাই হায়, নাই সে কোথাও আর।
"দূর করো ছাই,' এই বলে শেষে
                 যেমনি জ্বালিনু আলো
ফিলজফিটার কুয়াশা কোথা মিলালো।
           স্পষ্ট বুঝিনু যা-কিছু সমুখে আছে,
                 চক্ষের 'পরে যাহা বক্ষের কাছে
                       সেই তো অন্তহীন
                       প্রতিপল প্রতিদিন
                 যা আছে তাহারি মাঝে
           যাহা নাই তাই গভীর গোপনে
                       সত্য হইয়া রাজে।
           অতীতকালের যে ছিলেম আমি
                 আজিকার আমি সেই
                 প্রত্যেক নিমেষেই।
           বাঁধিয়া রেখেছে এই মুহূর্তজাল
                 সমস্ত ভাবীকাল।
অতএব সেই কেদারাটা যেই
           জানালায় লব টানি,
বসিব আরামে, সে মুহূর্তেরে
           চিরদিবসের জানি।
অতএব জেনো সন্ন্যাসী হব নাকো,
           আরবার যদি ডাকো
আবার সে ওই মাইক্রোব-ওড়া পথে
           চলিব মোটর-রথে।
           ঘরে যদি কেহ রয়
নাই ব'লে তারে ফিলজফারের
           হবে নাকো সংশয়।
দুয়ার ঠেলিয়া চক্ষু মেলিয়া
           দেখি যদি কোনো মিত্রম্‌
কবি তবে কবে, "এই সংসার
           অতীব বটে বিচিত্রম্‌।'
আরো দেখুন
স্বর্গ হইতে বিদায়
Verses
ম্লান হয়ে এল কণ্ঠে মন্দারমালিকা,
হে মহেন্দ্র, নির্বাপিত জ্যোতির্ময় টিকা
মলিন ললাটে। পুণ্যবল হল ক্ষীণ,
আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন,
হে দেব, হে দেবীগণ। বর্ষ লক্ষশত
যাপন করেছি হর্ষে দেবতার মতো
দেবলোকে। আজি শেষ বিচ্ছেদের ক্ষণে
লেশমাত্র অশ্রুরেখা স্বর্গের নয়নে
দেখে যাব এই আশা ছিল। শোকহীন
হৃদিহীন সুখস্বর্গভূমি, উদাসীন
চেয়ে আছে। লক্ষ লক্ষ বর্ষ তার
চক্ষের পলক নহে; অশ্বত্থশাখার
প্রান্ত হতে খসি গেলে জীর্ণতম পাতা
যতটুকু বাজে তার, ততটুকু ব্যথা
স্বর্গে নাহি লাগে, যবে মোরা শত শত
গৃহচ্যুত হতজ্যোতি নক্ষত্রের মতো
মুহূর্তে খসিয়া পড়ি দেবলোক হতে
ধরিত্রীর অন্তহীন জন্মমৃত্যুস্রোতে।
সে বেদনা বাজিত যদ্যপি, বিরহের
ছায়ারেখা দিত দেখা, তবে স্বরগের
চিরজ্যোতি ম্লান হত মর্তের মতন
কোমল শিশিরবাষ্পে-- নন্দনকানন
মর্মরিয়া উঠিত নিশ্বসি, মন্দাকিনী
কূলে কূলে গেয়ে যেত করুণ কাহিনী
কলকণ্ঠে, সন্ধ্যা আসি দিবা-অবসানে
নির্জন প্রান্তর-পারে দিগন্তের পানে
চলে যেত উদাসিনী, নিস্তব্ধ নিশীথ
ঝিল্লিমন্ত্রে শুনাইত বৈরাগ্যসংগীত
নক্ষত্রসভায়। মাঝে মাঝে সুরপুরে
নৃত্যপরা মেনকার কনকনূপুরে
তালভঙ্গ হত। হেলি উর্বশীর স্তনে
স্বর্ণবীণা থেকে থেকে যেন অন্যমনে
অকস্মাৎ ঝংকারিত কঠিন পীড়নে
নিদারুণ করুণ মূর্ছনা। দিত দেখা
দেবতার অশ্রুহীন চোখে জলরেখা
নিষ্কারণে। পতিপাশে বসি একাসনে
সহসা চাহিত শচী ইন্দ্রের নয়নে
যেন খুঁজি পিপাসার বারি। ধরা হতে
মাঝে মাঝে উচ্ছ্বসি আসিত বায়ুস্রোতে
ধরণীর সুদীর্ঘ নিশ্বাস-- খসি ঝরি
পড়িত নন্দনবনে কুসুমমঞ্জরী।
থাকো স্বর্গ হাস্যমুখে, করো সুধাপান
দেবগণ। স্বর্গ তোমাদেরি সুখস্থান--
মোরা পরবাসী। মর্তভূমি স্বর্গ নহে,
সে যে মাতৃভূমি-- তাই তার চক্ষে বহে
অশ্রুজলধারা, যদি দু দিনের পরে
কেহ তারে ছেড়ে যায় দু দণ্ডের তরে।
যত ক্ষুদ্র, যত ক্ষীণ, যত অভাজন,
যত পাপীতাপী, মেলি ব্যগ্র আলিঙ্গন
সবারে কোমল বক্ষে বাঁধিবারে চায়--
ধূলিমাখা তনুস্পর্শে হৃদয় জুড়ায়
জননীর। স্বর্গে তব বহুক অমৃত,
মর্তে থাক্‌ সুখে দুঃখে অনন্তমিশ্রিত
প্রেমধারা-- অশ্রুজলে চিরশ্যাম করি
ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি।
                  হে অপ্সরী,
তোমার নয়নজ্যোতি প্রেমবেদনায়
কভু না হউক ম্লান-- লইনু বিদায়।
তুমি কারে কর না প্রার্থনা, কারো তরে
নাহি শোক। ধরাতলে দীনতম ঘরে
যদি জন্মে প্রেয়সী আমার, নদীতীরে
কোনো-এক গ্রামপ্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটিরে
অশ্বত্থছায়ায়, সে বালিকা বক্ষে তার
রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভাণ্ডার
আমারি লাগিয়া সযতনে। শিশুকালে
নদীকূলে শিবমূর্তি গড়িয়া সকালে
আমারে মাগিয়া লবে বর। সন্ধ্যা হলে
জ্বলন্ত প্রদীপখানি ভাসাইয়া জলে
শঙ্কিত কম্পিত বক্ষে চাহি একমনা
করিবে সে আপনার সৌভাগ্যগণনা
একাকী দাঁড়ায়ে ঘাটে। একদা সুক্ষণে
আসিবে আমার ঘরে সন্নত নয়নে
চন্দনচর্চিত ভালে রক্তপট্টাম্বরে,
উৎসবের বাঁশরীসংগীতে। তার পরে
সুদিনে দুর্দিনে, কল্যাণকঙ্কণ করে,
সীমন্তসীমায় মঙ্গলসিন্দূরবিন্দু,
গৃহলক্ষ্মী দুঃখে সুখে, পূর্ণিমার ইন্দু
সংসারের সমুদ্রশিয়রে। দেবগণ,
মাঝে মাঝে এই স্বর্গ হইবে স্মরণ
দূরস্বপ্নসম, যবে কোনো অর্ধরাতে
সহসা হেরিব জাগি নির্মল শয্যাতে
পড়েছে চন্দ্রের আলো, নিদ্রিতা প্রেয়সী
লুণ্ঠিত শিথিল বাহু, পড়িয়াছে খসি
গ্রন্থি শরমের-- মৃদু সোহাগচুম্বনে
সচকিতে জাগি উঠি গাঢ় আলিঙ্গনে
লতাইবে বক্ষে মোর-- দক্ষিণ অনিল
আনিবে ফুলের গন্ধ, জাগ্রত কোকিল
গাহিবে সুদূর শাখে।
                অয়ি দীনহীনা,
অশ্রু-আঁখি দুঃখাতুর জননী মলিনা,
অয়ি মর্ত্যভূমি। আজি বহুদিন পরে
কাঁদিয়া উঠেছে মোর চিত্ত তোর তরে।
যেমনি বিদায়দুঃখে শুষ্ক দুই চোখ
অশ্রুতে পুরিল, অমনি এ স্বর্গলোক
অলস কল্পনাপ্রায় কোথায় মিলালো
ছায়াচ্ছবি। তব নীলাকাশ, তব আলো,
তব জনপূর্ণ লোকালয়, সিন্ধুতীরে
সুদীর্ঘ বালুকাতট, নীল গিরিশিরে
শুভ্র হিমরেখা, তরুশ্রেণীর মাঝারে
নিঃশব্দ অরুণোদয়, শূন্য নদীপারে
অবনতমুখী সন্ধ্যা-- বিন্দু-অশ্রুজলে
যত প্রতিবিম্ব যেন দর্পণের তলে
পড়েছে অসিয়া।
              হে জননী পুত্রহারা,
শেষ বিচ্ছেদের দিনে যে শোকাশ্রুধারা
চক্ষু হতে ঝরি পড়ি তব মাতৃস্তন
করেছিল অভিষিক্ত, আজি এতক্ষণ
সে অশ্রু শুকায়ে গেছে। তবু জানি মনে
যখনি ফিরিব পুন তব নিকেতনে
তখনি দুখানি বাহু ধরিবে আমায়,
বাজিবে মঙ্গলশঙ্খ, স্নেহের ছায়ায়
দুঃখে-সুখে-ভয়ে-ভরা প্রেমের সংসারে
তব গেহে, তব পুত্রকন্যার মাঝারে
আমারে লইবে চিরপরিচিতসম--
তার পরদিন হতে শিয়রেতে মম
সারাক্ষণ জাগি রবে কম্পমান প্রাণে,
শঙ্কিত অন্তরে, ঊর্ধ্বে দেবতার পানে
মেলিয়া করুণ দৃষ্টি, চিন্তিত সদাই
যাহারে পেয়েছি তারে কখন হারাই।
আরো দেখুন