শ্যামলা (shyamla)

হে শ্যামলা, চিত্তের গহনে আছ চুপ,

          মুখে তব সুদূরের রূপ

                   পড়িয়াছে ধরা

সন্ধ্যার আকাশসম সকল-চঞ্চল চিন্তা-হরা।

          আঁকা দেখি দৃষ্টিতে তোমার

                   সমুদ্রের পরপার,

গোধূলিপ্রান্তরপ্রান্তে ঘন কালো রেখাখানি;

          অধরে তোমার বীণাপাণি

                   রেখে দিয়ে বীণা তাঁর

নিশীথের রাগিণীতে দিতেছেন নিঃশব্দ ঝংকার।

                   অগীত সে সুর

মনে এনে দেয় কোন্‌ হিমাদ্রীর শিখরে সুদূর

          হিমঘন তপস্যায় স্তব্ধলীন

             নির্ঝরের ধ্যান বাণীহীন।

                   জলভারনত মেঘে

          তমালবনের 'পরে আছে লেগে

               সকরুণ ছায়া সুগম্ভীর--

তোমার ললাট-'পরে সেই মায়া রহিয়াছে স্থির।

ক্লান্ত-অশ্রু রাধিকার বিরহের স্মৃতির গভীরে

স্বপ্নময়ী যে যমুনা বহে ধীরে

          শান্তধারা

      কলশব্দহারা

তাহারই বিষাদ কেন

          অতল গাম্ভীর্য ল'য়ে তোমার মাঝারে হেরি যেন।

শ্রাবণে অপরাজিতা, চেয়ে দেখি তারে

আঁখি ডুবে যায় একেবারে--

         ছোটো পত্রপুটে তার নীলিমা করেছে ভরপুর,

                   দিগন্তের শৈলতটে অরণ্যের সুর

              বাজে তাহে, সেই দূর আকাশের বাণী

         এনেছে আমার চিত্তে তোমার নির্বাক মুখখানি।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

পূজারিনী
Verses
    অবদানশতক
       নৃপতি বিম্বিসার
নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইলা
       পাদনখকণা তাঁর।
স্থাপিয়া নিভৃত প্রাসাদকাননে
তাহারি উপরে রচিলা যতনে
অতি অপরূপ শিলাময় স্তূপ
       শিল্পশোভার সার।
সন্ধ্যাবেলায় শুচিবাস পরি
          রাজবধূ রাজবালা
আসিতেন ফুল সাজায়ে ডালায়,
স্তূপপদমূলে সোনার থালায়
আপনার হাতে দিতেন জ্বালায়ে
          কনকপ্রদীপমালা।
অজাতশত্রু রাজা হল যবে,
          পিতার আসনে আসি
পিতার ধর্ম শোণিতের স্রোতে
মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে--
সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলোতে
          বৌদ্ধশাস্ত্ররাশি।
কহিল ডাকিয়া অজাতশত্রু
          রাজপুরনারী সবে,
"বেদ ব্রাহ্মণ রাজা ছাড়া আর
কিছু নাই ভবে পূজা করিবার
এই ক'টি কথা জেনো মনে সার--
          ভুলিলে বিপদ হবে।'
সেদিন শারদ-দিবা-অবসান--
          শ্রীমতী নামে সে দাসী
পুণ্যশীতল সলিলে নাহিয়া,
পুষ্পপ্রদীপ থালায় বাহিয়া,
রাজমহিষীর চরণে চাহিয়া
          নীরবে দাঁড়ালো আসি।
শিহরি সভয়ে মহিষী কহিলা,
          "এ কথা নাহি কি মনে,
অজাতশত্রু করেছে রটনা
স্তূপে যে করিবে অর্ঘ্যরচনা
শূলের উপরে মরিবে সে জনা
          অথবা নির্বাসনে?'
সেথা হতে ফিরি গেল চলি ধীরে
          বধূ অমিতার ঘরে।
সমুখে রাখিয়া স্বর্ণমুকুর
বাঁধিতেছিল সে দীর্ঘ চিকুর,
আঁকিতেছিল সে যত্নে সিঁদুর
          সীমন্তসীমা-'পরে।
শ্রীমতীরে হেরি বাঁকি গেল রেখা,
          কাঁপি গেল তার হাত--
কহিল, "অবোধ, কী সাহস-বলে
এনেছিস পূজা! এখনি যা চলে।
কে কোথা দেখিবে, ঘটিবে তা হলে
          বিষম বিপদপাত।'
অস্তরবির রশ্মি-আভায়
          খোলা জানালার ধারে
কুমারী শুক্লা বসি একাকিনী
পড়িতে নিরত কাব্যকাহিনী,
চমকি উঠিল শুনি কিংকিণী--
          চাহিয়া দেখিল দ্বারে।
শ্রীমতীরে হেরি পুঁথি রাখি ভূমে
          দ্রুতপদে গেল কাছে।
কহে সাবধানে তার কানে কানে,
"রাজার আদেশ আজি কে না জানে,
এমন ক'রে কি মরণের পানে
          ছুটিয়া চলিতে আছে!'
দ্বার হতে দ্বারে ফিরিল শ্রীমতী
          লইয়া অর্ঘ্যথালি।
"হে পুরবাসিনী' সবে ডাকি কয়
"হয়েছে প্রভুর পূজার সময়'--
শুনি ঘরে ঘরে কেহ পায় ভয়,
          কেহ দেয় রাতে গালি।
দিবসের শেষ আলোক মিলালো
          নগরসৌধ-'পরে।
পথ জনহীন আঁধারে বিলীন,
কলকোলাহল হয়ে এল ক্ষীণ--
আরতিঘণ্টা ধ্বনিল প্রাচীন
          রাজদেবালয়ঘরে।
শারদনিশির স্বচ্ছ তিমিরে
          তারা অগণ্য জ্বলে।
সিংহদুয়ার বাজিল বিষাণ,
বন্দীরা ধরে সন্ধ্যার তান,
"মন্ত্রণাসভা হল সমাধান'
          দ্বারী ফুকারিয়া বলে।
এমন সময়ে হেরিল চমকি
          প্রাসাদে প্রহরী যত--
রাজার বিজন কানন-মাঝারে
স্তূপপদমূলে গহন আঁধারে
জ্বলিতেছে কেন যেন সারে সারে
          প্রদীপমালার মতো!
মুক্তকৃপাণে পুররক্ষক
          তখনি ছুটিয়া আসি
শুধালো, "কে তুই ওরে দুর্মতি,
মরিবার তরে করিস আরতি!'
মধুর কণ্ঠে শুনিল, " শ্রীমতী,
          আমি বুদ্ধের দাসী।'
সেদিন শুভ্র পাষাণফলকে
          পড়িল রক্তলিখা।
সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে
প্রাসাদকাননে নীরবে নিভৃতে
স্তূপপদমূলে নিবিল চকিতে
          শেষ আরতির শিখা!
আরো দেখুন
শীতের বিদায়
Verses
বসন্ত বালক মুখ-ভরা হাসিটি,
    বাতাস ব'য়ে ওড়ে চুল--
শীত চলে যায়, মারে তার গায়
    মোটা মোটা গোটা ফুল।
আঁচল ভ'রে গেছে শত ফুলের মেলা,
গোলাপ ছুঁড়ে মারে টগর চাঁপা বেলা--
শীত বলে, "ভাই, এ কেমন খেলা,
    যাবার বেলা হল, আসি।'
বসন্ত হাসিয়ে বসন ধ'রে টানে,
পাগল ক'রে দেয় কুহু কুহু গানে,
ফুলের গন্ধ নিয়ে প্রাণের 'পরে হানে--
    হাসির 'পরে হানে হাসি।
ওড়ে ফুলের রেণু, ফুলের পরিমল,
ফুলের পাপড়ি উড়ে করে যে বিকল--
কুসুমিত শাখা, বনপথ ঢাকা,
    ফুলের 'পরে পড়ে ফুল।
দক্ষিনে বাতাসে ওড়ে শীতের বেশ,
উড়ে উড়ে পড়ে শীতের শুভ্র কেশ;
কোন্‌ পথে যাবে না পায় উদ্দেশ,
        হয়ে যায় দিক ভুল।
  বসন্ত বালক হেসেই কুটিকুটি,
  টলমল করে রাঙা চরণ দুটি,
  গান গেয়ে পিছে ধায় ছুটিছুটি --
        বনে লুটোপুটি যায়।
  নদী তালি দেয় শত হাত তুলি,
  বলাবলি করে ডালপালাগুলি,
  লতায় লতায় হেসে কোলাকুলি --
        অঙ্গুলি তুলি চায়।
  রঙ্গ দেখে হাসে মল্লিকা মালতী,
  আশেপাশে হাসে কতই জাতী যূথী,
  মুখে বসন দিয়ে হাসে লজ্জাবতী --
        বনফুলবধূগুলি।
  কত পাখি ডাকে কত পাখি গায়,
  কিচিমিচিকিচি কত উড়ে যায়,
  এ পাশে ও পাশে মাথাটি হেলায় --
        নাচে পুচ্ছখানি তুলি।
  শীত চলে যায়, ফিরে ফিরে চায়,
  মনে মনে ভাবে "এ কেমন বিদায়' --
  হাসির জ্বালায় কাঁদিয়ে পালায়,
        ফুলঘায় হার মানে।
  শুকনো পাতা তার সঙ্গে উড়ে যায়,
  উত্তরে বাতাস করে হায়-হায় --
  আপাদমস্তক ঢেকে কুয়াশায়
        শীত গেল কোন্‌খানে।
আরো দেখুন
শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা
Verses
অবদানশতক
অনাথপিণ্ডদ বুদ্ধের একজন প্রধান শিষ্য ছিলেন
"প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি,
ওগো পুরবাসী, কে রয়েছে জাগি,
অনাথপিণ্ডদ কহিলা অম্বুদ-
                   নিনাদে।
সদ্য মেলিতেছে তরুণ তপন
আলস্যে অরুণ সহাস্য লোচন
শ্রাবস্তীপুরীর গগনলগন
                   প্রাসাদে।
বৈতালিকদল সুপ্তিতে শয়ান
এখনো ধরে নি মাঙ্গলিক গান,
দ্বিধাভরে পিক মৃদু কুহুতান
                   কুহরে।
ভিক্ষু কহে ডাকি, "হে নিদ্রিত পুর,
দেহো ভিক্ষা মোরে, করো নিদ্রা দূর'--
সুপ্ত পৌরজন শুনি সেই সুর
                   শিহরে।
সাধু কহে, "শুন, মেঘ বরিষার
নিজেরে নাশিয়া দেয় বৃষ্টিধার,
সর্ব ধর্মমাঝে ত্যাগধর্ম সার
                   ভুবনে।'
কৈলাসশিখর হতে দূরাগত
ভৈরবের মহাসংগীতের মতো
সে বাণী মন্দ্রিল সুখতন্দ্রারত
                   ভবনে।
রাজা জাগি ভাবে বৃথা রাজ্য ধন,
গৃহী ভাবে মিছা তুচ্ছ আয়োজন,
অশ্রু অকারণে করে বিসর্জন
                   বালিকা।
যে ললিত সুখে হৃদয় অধীর
মনে হল তাহা গত যামিনীর
স্খলিত দলিত শুষ্ক কামিনীর
                   মালিকা।
বাতায়ন খুলে যায় ঘরে ঘরে,
ঘুমভাঙা আঁখি ফুটে থরে থরে
অন্ধকার পথ কৌতূহলভরে
                   নেহারি।
"জাগো, ভিক্ষা দাও' সবে ডাকি ডাকি
সুপ্ত সৌধে তুলি নিদ্রাহীন আঁখি
শূন্য রাজবাটে চলেছে একাকী
                   ভিখারি।
ফেলি দিল পথে বণিকধনিকা
মুঠি মুঠি তুলি রতনকণিকা--
কেহ কণ্ঠহার, মাথার মণিকা
                   কেহ গো।
ধনী স্বর্ণ আনে থালি পূরে পূরে,
সাধু নাহি চাহে, পড়ে থাকে দূরে--
ভিক্ষু কহে, "ভিক্ষা আমার প্রভুরে
                   দেহো গো।'
বসনে ভূষণে ঢাকি গেল ধূলি,
কনকে রতনে খেলিল বিজুলি,
সন্ন্যাসী ফুকারে লয়ে শূন্য ঝুলি
                   সঘনে--
"ওগো পৌরজন, করো অবধান,
ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ তিনি বুদ্ধ ভগবান,
দেহো তারে নিজ সর্বশ্রেষ্ঠ দান
                   যতনে।'
ফিরে যায় রাজা, ফিরে যায় শেঠ,
মিলে না প্রভুর যোগ্য কোনো ভেট,
বিশাল নগরী লাজে রহে হেঁট-
                   আননে।
রৌদ্র উঠে ফুটে, জেগে উঠে দেশ,
মহানগরীর পথ হল শেষ,
পুরপ্রান্তে সাধু করিলা প্রবেশ
                   কাননে।
দীন নারী এক ভূতলশয়ন
না ছিল তাহার অশন ভূষণ,
সে আসি নমিল সাধুর চরণ-
                   কমলে।
অরণ্য-আড়ালে রহি কোনোমতে
একমাত্র বাস নিল গাত্র হতে,
বাহুটি বাড়ায়ে ফেলি দিল পথে
                   ভূতলে।
ভিক্ষু ঊর্ধ্বভুজে করে জয়নাদ--
কহে, "ধন্য মাতঃ, করি আশীর্বাদ,
মহাভিক্ষুকের পুরাইলে সাধ
                   পলকে।'
চলিলা সন্ন্যাসী ত্যজিয়া নগর
ছিন্ন চীরখানি লয়ে শিরোপর
সঁপিতে বুদ্ধের চরণনখর-
                    আলোকে।
আরো দেখুন