নমস্কার (nomoskar)

প্রভু,

       সৃষ্টিতে তব আনন্দ আছে

                 মমত্ব নাই তবু,

ভাঙায় গড়ায় সমান তোমার লীলা।

          তব নির্ঝরধারা

যে বারতা বহি সাগরের পানে

          চলেছে আত্মহারা

প্রতিবাদ তারি করিছে তোমার শিলা।

          দোঁহার এ দুই বাণী,

ওগো উদাসীন, আপনার মনে

          সমান নিতেছ মানি--

সকল বিরোধ তাই তো তোমায়

          চরমে হারায় বাণী।

                  

                             বর্তমানের ছবি

দেখি যবে, দেখি, নাচে তার বুকে

          ভৈরব ভৈরবী।

তুমি কী দেখিছ তুমিই তা জানো

          নিত্যকালের কবি--

কোন্‌ কালিমায় সমুদ্রকূলে

          উদয়াচলের রবি।

          যুঝিছে মন্দ ভালো।

তোমার অসীম দৃষ্টিক্ষেত্রে

          কালো সে রয় না কালো।

অঙ্গার সে তো তোমার চক্ষে

          ছদ্মবেশের আলো।

          দুঃখ লজ্জা ভয়

ব্যাপিয়া চলেছে উগ্র যাতনা

          মানববিশ্বময়;

সেই বেদনায় লভিছে জন্ম

          বীরের বিপুল জয়।

হে কঠোর, তুমি সম্মান দাও,

          দাও না তো প্রশ্রয়।

          তপ্ত পাত্র ভরি

প্রসাদ তোমার রুদ্র জ্বালায়

          দিয়েছ অগ্রসরি--

যে আছে দীপ্ত তেজের পিপাসু

          নিক তাহা পান করি।

          নিঠুর পীড়নে যাঁর

তন্দ্রাবিহীন কঠিন দণ্ডে

          মথিছে অন্ধকার,

                   তুলিছ আলোড়ি অমৃতজ্যোতি,

                             তাঁহারে নমস্কার।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

বিয়াল্লিশ
Verses
শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র দত্ত প্রিয়বরেষু
তুমি গল্প জমাতে পার।
বসো তোমার কেদারায়,
ধীরে ধীরে টান দাও গুড়গুড়িতে,
উছলে ওঠে আলাপ
তোমার ভিতর থেকে
হালকা ভাষায়,
যেন নিরাসক্ত ঔৎসুক্যে,
তোমার কৌতুকে-ফেনিল মনের
কৌতূহলের উৎস থেকে।
ঘুরেছ নানা জায়গায়, নানা কাজে,
আপন দেশে, অন্য দেশে।
মনটা মেলে রেখেছিলে চারদিকে,
চোখটা ছিলে খুলে।
মানুষের যে-পরিচয়
তার আপন সহজভাবে,
যেমন-তেমন অখ্যাত ব্যাপারের ধারায়
দিনে দিনে যা গাঁথা হয়ে ওঠে,
সামান্য হলেও যাতে আছে
সত্যের ছাপ,
অকিঞ্চিৎকর হলেও যার আছে বিশেষত্ব,
সেটা এড়ায়নি তোমার দৃষ্টি।
সেইটে দেখাই সহজ নয়,
পণ্ডিতের দেখা সহজ।
শুনেছি তোমার পাঠ ছিল সায়ান্সে,
শুনেছি শাস্ত্রও পড়েছ সংস্কৃত ভাষায়;
পার্সি জবানিও জানা আছে।
গিয়েছ সমুদ্রপারে,
ভারতে রাজসরকারের
ইম্পীরিয়ল রথযাত্রার লম্বা দড়িতে
"হেঁইয়ো' ব'লে দিতে হয়েছে টান।
অর্থনীতি রাষ্ট্রনীতি
মগজে বোঝাই হয়েছে কম নয়,
পুঁথির থেকেও কিছু,
মানুষের প্রাণযাত্রা থেকেও বিস্তর।
তবু সব-কিছু নিয়ে
তোমার যে পরিচয় মুখ্য
সে তোমার আলাপ-পরিচয়ে।
তুমি গল্প জমাতে পার।
তাই যখন-তখন দেখি,
তোমার ঘরে মানুষ লেগেই আছে,
কেউ তোমার চেয়ে বয়সে ছোটো
কেউ বয়সে বেশি।
গল্প করতে গিয়ে মাস্টারি কর না,
এই তোমার বাহাদুরি।
তুমি মানুষকে জান, মানুষকে জানাও,
জীবলীলার মানুষকে।
একে নাম দিতে পারি সাহিত্য,--
সব-কিছুর কাছে-থাকা।
তুমি জমা করেছ তোমার মনে
নানা লোকের সঙ্গ,
সেইটে দিতে পার সবাইকে
অনায়াসে,--
সেইটেকে জ্ঞানবিজ্ঞানের তকমা পরিয়ে
পণ্ডিত-পেয়াদা সাজাও না
থমকিয়ে দিতে ভালোমানুষকে।
তোমার জ্ঞানবিজ্ঞানের ভাণ্ডারটা
পূর্ণ আছে যথাস্থানেই।
সেটা বৈঠকখানাকে কোণ-ঠেসা করে রাখেনি।
যেখানে আসন পাত'
গল্পের ভোজে
সেখানে ক্ষুধিতের পাতের থেকে ঠেকিয়ে রাখ
লাইব্রেরি ল্যাবরেটরিকে।
একটিমাত্র কারণ,--
মানুষের 'পরে আছে তোমার দরদ,--
যে-মানুষ চলতে চলতে হাঁপিয়ে ওঠে
সুখদুঃখের দুর্গম পথে,
বাঁধা পড়ে নানা বন্ধনে
ইচ্ছায় অনিচ্ছায়,--
যে-মানুষ বাঁচে,
যে-মানুষ মরে
অদৃষ্টের গোলকধাঁদার পাকে।
সে-মানুষ রাজাই হোক ভিখিরিই হোক
তার কথা শুনতে মানুষের অসীম আগ্রহ।
তার কথা যে-লোক পারে বলতে সহজেই
সে-ই পারে,
অন্যে পারে না।
বিশেষ এই হাল-আমলে।
আজ মানুষের জানাশোনা
তার দেখাশোনাকে
দিয়েছে আপাদমস্তক ঢেকে।
একটু ধাক্কা পেলে
তার মুখে নানা কথা অনর্গল ছিটকে পড়ে--
নানা সমস্যা, নানা তর্ক,
একান্ত মানুষের আসল কথাটা
যায় খাটো হয়ে।
আজ বিপুল হল সমস্যা,
বিচিত্র হল তর্ক,
দুর্ভেদ্য হল সংশয়,--
আজকের দিনে
সেইজন্যেই এত করে বন্ধুকে খুঁজি,
মানুষের সহজ বন্ধুকে
যে গল্প জমাতে পারে।
এ দুর্দিনে
মাস্টারমশায়কেও অত্যন্ত দরকার।
তাঁর জন্যে ক্লাস আছে
পাড়ায় পাড়ায়--
প্রায়মারি, সেকেণ্ডারি।
গল্পের মজলিস জোটে দৈবাৎ।
সমুদ্রের ওপারে
একদিন ওরা গল্পের আসর খুলেছিল,
তখন ছিল অবকাশ;
ওরা ছেলেদের কাছে শুনিয়েছিল,
রবিন্‌সন্‌ ক্রুসো,
সকল বয়সের মানুষের কাছে
ডন্‌ কুইক্‌সোট্‌।
দুরূহ ভাবনার আঁধি লাগল
দিকে দিকে;
লেক্‌চারের বান ডেকে এল,
জলে স্থলে কাদায় পাঁকে
গেল ঘুলিয়ে।
অগত্যা
অধ্যাপকেরা জানিয়ে দিলে
একেই বলে গল্প।
বন্ধু,
দুঃখ জানাতে এলুম
তোমার বৈঠকে।
আজকাল-এর ছাত্রেরা দেয়
আজকাল-এর দোহাই।
আজকাল-এর মুখরতায়
তাদের অটুট বিশ্বাস।
হায় রে আজকাল
কত ডুবে গেল কালের মহাপ্লাবনে
মোটাদামের মার্কা-মারা
পসরা নিয়ে।
যা চিরকাল-এর
তা আজ যদি বা ঢাকা পড়ে
কাল উঠবে জেগে।
তখন মানুষ আবার বলবে খুশি হয়ে,--
গল্প বলো।
আরো দেখুন
সমুদ্রে
Verses
সকালবেলায় ঘাটে যেদিন
           ভাসিয়ে দিলেম নৌকাখানি
কোথায় আমার যেতে হবে
           সে কথা কি কিছুই জানি।
শুধু শিকল দিলেম খুলে,
শুধু নিশান দিলেম তুলে--
টানি নি দাঁড়, ধরি নি হাল--
           ভেসে গেলেম স্রোতের মুখে।
তীরে তরুর ডালে ডালে
ডাকল পাখি প্রভাত-কালে,
তীরে তরুর ছায়ায় রাখাল
           বাজায় বাঁশি মনের সুখে।
তখন আমি ভাবি নাইকো
           সূর্য যাবে অস্তাচলে,
নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে
           পড়ব এসে সাগর-জলে--
ঘাটে ঘাটে তীরে তীরে
যে তরী ধায়  ধীরে ধীরে
বাইতে হবে নিয়ে তারে
           নীল পাথারে একলা-প্রাণে।
তারাগুলি আকাশ ছেয়ে
মুখে আমার রইল চেয়ে,
সিন্ধু-শকুন উড়ে গেল
           কূলে আপন কুলায়-পানে।
দুলুক তরী ঢেউয়ের 'পরে
           ওরে আমার জাগ্রত প্রাণ।
গাও রে আজি নিশীথ-রাতে
           অকূল-পাড়ির আনন্দগান।
যাক-না মুছে তটের রেখা,
নাই-বা কিছু গেল দেখা,
অতল বারি দিক-না সাড়া
           বাঁধন-হারা হাওয়ার ডাকে।
দোসর-ছাড়া একার দেশে
একেবারে এক নিমেষে
লও রে বুকে দু হাত মেলি
           অন্তবিহীন অজানাকে।
আরো দেখুন
2
Verses
রাহুর মতন মৃত্যু
শুধু ফেলে ছায়া,
পারে না করিতে গ্রাস জীবনের স্বর্গীয় অমৃত
জড়ের কবলে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
প্রেমের অসীম মূল্য
সম্পূর্ণ বঞ্চনা করি লবে
হেন দস্যু নাই গুপ্ত
নিখিলের গুহা-গহ্বরেতে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সবচেয়ে সত্য ক'রে পেয়েছিনু যারে
সবচেয়ে মিথ্যা ছিল তারি মাঝে ছদ্মবেশ ধরি,
অস্তিত্বের এ কলঙ্ক কভু
সহিত না বিশ্বের বিধান
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
সব-কিছু চলিয়াছে নিরন্তর পরিবর্তবেগে
সেই তো কালের ধর্ম।
মৃত্যু দেখা দেয় এসে একান্তই অপরিবর্তনে,
এ বিশ্বে তাই সে সত্য নহে
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
বিশ্বেরে যে জেনেছিল আছে ব'লে
সেই তার আমি
অস্তিত্বের সাক্ষী সেই,
পরম আমির সত্যে সত্য তার
এ কথা নিশ্চিত মনে জানি।
আরো দেখুন