শাল (shal)

প্রায় ত্রিশ বছর হল শান্তিনিকেতনের শালবীথিকায় আমার সেদিনকার এক কিশোর কবিবন্ধুকে পাশে নিয়ে অনেক দিন অনেক সায়াহ্নে পায়চারি করেছি। তাকে অন্তরের গভীর কথা বলা বড়ো সহজ ছিল। সেই আমাদের যত আলাপগুঞ্জরিত রাত্রি, আশ্রমবাসের ইতিহাসে আমার চিরন্তন স্মৃতিগুলির সঙ্গেই গ্রথিত হয়ে আছে। সে কবি আজ ইহলোকে নেই। পৃথিবীতে মানুষের প্রিয়সঙ্গের কত ধারা কত নিভৃত পথ দিয়ে চলেছে। এই স্তব্ধ তরুশ্রেণীর প্রাচীন ছায়ায় সেই ধারা তেমন করে আরো অনেক বয়ে গেছে, আরো অনেক বইবে। আমরা চলে যাব কিন্তু কালে কালে বারে বারে বন্ধুসংগমের জন্য এই ছায়াতল রয়ে গেল। যেমন অতীতের কথা ভাবছি-- তেমনি ঐ শালশ্রেণীর দিকে চেয়ে বহুদূর ভবিষ্যতের ছবিও মনে আসছে।

 

বাহিরে যখন ক্ষুব্ধ দক্ষিণের মদির পবন

অরণ্যে বিস্তারে অধীরতা; যবে কিংশুকের বন

উছৃঙ্খল রক্তরাগে স্পর্ধায় উদ্যত; দিশিদিশি

শিমুল ছড়ায় ফাগ; কোকিলের গান অহর্নিশি

জানে না সংযম, যবে বকুল অজস্র সর্বনাশে

স্খলিত দলিত বনপথে, তখন তোমার পাশে

আসি আমি হে তপস্বী শাল, যেথায় মহিমারাশি

পুঞ্জিত করেছ অভ্রভেদী, যেথা রয়েছে বিকাশি

দিগন্তে গম্ভীর শান্তি। অন্তরের নিগূঢ় গভীরে

ফুল ফুটাবার ধ্যানে নিবিষ্ট রয়েছে ঊর্দ্ধশিরে;

চৌদিকের চঞ্চলতা পশে না সেথায়। অন্ধকারে

নিঃশব্দ সৃষ্টির মন্ত্র নাড়ি বেয়ে শাখায় সঞ্চারে;

সে অমৃত মন্ত্রতেজ নিলে ধরি সূর্যলোক হতে

নিভৃত মর্মের মাঝে; স্নান করি আলোকের স্রোতে

শুনি নিলে নীল আকাশের শান্তিবাণী; তার পরে

আত্মসমাহিত তুমি, স্তব্ধ তুমি-- বৎসরে বৎসরে

বিশ্বের প্রকাশযজ্ঞে বারম্বার করিতেছ দান

নিপুণ সুন্দর তব কমণ্ডলু হতে অফুরান

পুণ্যগন্ধী প্রাণধারা; সে ধারা চলেছে ধীরে ধীরে

দিগন্তে শ্যামল ঊর্মি উচ্ছ্বাসিয়া দূর শতাব্দীরে

শুনাতে মর্মর আশীর্বাণী। রাজার সাম্রাজ্য কতশত

কালের বন্যায় ভাসে, ফেটে যায় বুদবুদের মতো,

মানুষের ইতিবৃত্ত সুদুর্গম গৌরবের পথে

কিছুদূর যায়, আর বারম্বার ভগ্নচুর্ণ রথে

কীর্ণ করে ধূলি। তারি মাঝে উদার তোমার স্থিতি;

ওগো মহা শাল, তুমি সুবিশাল কালের অতিথি;

আকাশেরে দাও সঙ্গ বর্ণরঙ্গে শাখার ভঙ্গিতে,

বাতাসেরে দাও মৈত্রী পল্লবের মর্মরসংগীতে,

মঞ্জরির গন্ধের গণ্ডুষে। যুগে যুগে কত কাল

পথিক এসেছে তব ছায়াতলে, বসেছে রাখাল,

শাখায় বেঁধেছে নীড় পাখি; যায় তারা পথ বাহি

আসন্ন বিস্মৃতি পানে, উদাসীন তুমি আছ চাহি।

নিত্যের মালার সূত্রে অনিত্যের যত অক্ষগুটি

অস্তিত্বের আবর্তনে দ্রুতবেগে চলে তারা ছুটি;

মর্তপ্রাণ তাহাদের ক্ষণেক পরশ করে যেই

পায় তারা জপনাম, তার পরে আর তারা নেই,

নেমে যায় অসংখ্যের তলে। সেই চলে-যাওয়া দল

রেখে দিয়ে গেছে যেন ক্ষণিকের কলকোলাহল

দক্ষিণহাওয়ায় কাঁপা ওই তব পত্রের কল্লোলে,

শাখার দোলায়, ওই ধ্বনি স্মরণে জাগায় তোলে

কিশোর বন্ধুরে মোর। কতদিন এই পাতাঝরা

বীথিকায়, পুষ্পগন্ধে বসন্তের আগমনী-ভরা

সায়াহ্নে দুজনে মোরা ছায়াতে অঙ্কিত চন্দ্রালোকে

ফিরেছি গুঞ্জিত আলাপনে। তার সেই মুগ্ধ চোখে

বিশ্ব দেখা দিয়েছিল নন্দনমন্দার রঙে রাঙা;

যৌবন-তুফান-লাগা সেদিনের কত নিদ্রাভাঙা

জ্যোৎস্নামুন্ধ রজনীর সৌহার্দ্যের সুধারসধারা

তোমার ছায়ার মাঝে দেখা দিল, হয়ে গেল সারা।

গভীর আনন্দক্ষণ কতদিন তব মঞ্জরিতে

একান্ত মিশিয়াছিল একখানি অখণ্ড সংগীতে

আলোকে আলাপে হাস্যে, বনের চঞ্চল আন্দোলনে,

বাতাসের উদাস নিশ্বাসে।

 

                            প্রীতিমিলনের ক্ষণে

সেদিনের প্রিয় সে কোথায়, বর্ষে বর্ষে দোলা দিত

যাহার প্রাণের বেগ উৎসব করিয়া তরঙ্গিত।

তোমার বীথিকাতলে তার যুক্ত জীবনপ্রবাহ

আনন্দচঞ্চল গতি মিলায়েছে আপন উৎসাহ

পুষ্পিত উৎসাহে তব। হায়, আজি তব পত্রদোলে

সেদিনের স্পর্শ নাই। তাই এই বসন্তকল্লোলে,

পুর্ণিমার পূর্ণতায়, দেবতার অমৃতের দানে

মর্তের বেদনা মেশে।

 

                       চাহি আজ দূর পানে

স্বপ্নচ্ছবি চোখে ভাসে--  ভাবী কোন্‌ ফাল্গুনের রাতে

দোলপূর্ণিমায়, সাজাতে আসিছে কারা পদ্মপাতে

পলাশ বকুল চাঁপা, আলিম্পনলেখা এঁকে দিতে

তব ছায়াবেদিকায়, বসন্তের আবাহন গীতে

প্রসন্ন করিতে তব পুষ্পবরিষন। সে উৎসবে

আজিকার এই দিন পথপ্রান্তে লুণ্ঠিত নীরবে।

কোলে তার পড়ে আছে এ রাত্রির উৎসবের ডালা।

আজিকার অর্ঘ্যে আছে যতগুলি সুরে-গাঁথা মালা,

কিছু তার শুকায়েছে, কিছু তার আছে অমলিন;

দুয়েকটি তুলে নিল যাত্রীদল; সে দিন এ দিন

দোঁহে দোঁহা-মুখ চেয়ে বদল করিয়া নিল মালা--

নূতনে ও পুরাতনে পূর্ণ হল বসন্তের পালা।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

30
Verses
কল্যাণীয়া শ্রীমতী উমা চন্দ
                   হে অপরিচিতা, লিখিয়া আমার নাম
                   আশীর্বাদের সেতুখানি রচিলাম।
আরো দেখুন
52
Verses
MUCH HAVE you given to me,
Yet I ask for more-
I come to you not merely for the draught of water, but for the spring;
Not for guidance to the door alone, but to the Master's hall; not only for the gift of love, but for the lover himself.
আরো দেখুন
গিয়াছে যে দিন, সে দিন হৃদয়
Verses
গিয়াছে যে দিন, সে দিন হৃদয়
          রূপের মোহনে আছিল মাতি,
প্রাণের স্বপন আছিল যখন
          প্রেম প্রেম শুধু দিবস রাতি!
শান্ত আশা এ হৃদয়ে আমার
          এখন ফুটিতে পারে,
সুবিমলতর দিবস আমার
          এখন উঠিতে পারে।
বালক কালের প্রেমের স্বপন--
মধুর যেমন উজল যেমন
          তেমন কিছুই আসিবে না,
তেমন কিছুই আসিবে না!
সে দেবীপ্রতিমা নারিব ভুলিতে
          প্রথম প্রণয় আঁকিল যাহা,
          স্মৃতি-মরু মোর উজল করিয়া
          এখনো হৃদয়ে বিরাজে তাহা!
সে প্রতিমা সেই পরিমল সম
          পলকে যা লয় পায়,
প্রভাতকালের স্বপন যেমন
          পলকে মিশায়ে যায়।
অলস প্রবাহ জীবনে আমার
সে কিরণ কভু ভাসিবে না আর
          সে কিরণ কভু ভাসিবে না,
          সে কিরণ কভু ভাসিবে না!
আরো দেখুন