৭ (e kotha janite tumi bharat ishwor sajahan)

এ কথা জানিতে তুমি, ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান,

কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধন মান।

          শুধু তব অন্তরবেদনা

চিরন্তন হয়ে থাক্‌ সম্রাটের ছিল এ সাধনা।

          রাজশক্তি বজ্র সুকঠিন

সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক লীন,

          কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস

নিত্য-উচ্ছ্বসিত হয়ে সকরুণ করুক আকাশ

          এই তব মনে ছিল আশ।

          হীরা মুক্তামানিক্যের ঘটা

যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা

          যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক,

              শুধু থাক্‌

          একবিন্দু নয়নের জল

     কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল

              এ তাজমহল।

 

     হায় ওরে মানবহৃদয়,

          বার বার

     কারো পানে ফিরে চাহিবার

          নাই যে সময়,

          নাই নাই।

জীবনের খরস্রোতে ভাসিছ সদাই

     ভুবনের ঘাটে ঘাটে--

   এক হাটে লও বোঝা, শূন্য করে দাও অন্য হাটে।

     দক্ষিণের মন্ত্রগুঞ্জরণে

              তব কুঞ্জবনে

     বসন্তের মাধবীমঞ্জরী

     যেই ক্ষণে দেয় ভরি

          মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল,

বিদায় গোধূলি আসে ধুলায় ছড়ায়ে ছিন্নদল।

          সময় যে নাই;

     আবার শিশিররাত্রে তাই

    নিকুঞ্জে ফুটায়ে তোল নব কুন্দরাজি

সাজাইতে হেমন্তের অশ্রুভরা আনন্দের সাজি।

 

              হায় রে হৃদয়,

              তোমার সঞ্চয়

দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।

     নাই নাই, নাই যে সময়।

     হে সম্রাট, তাই তব শঙ্কিত হৃদয়

     চেয়েছিল করিবারে সময়ের হৃদয় হরণ

                             সৌন্দর্যে ভুলায়ে।

                          কণ্ঠে তার কী মালা দুলায়ে

                                    করিলে বরণ

রূপহীন মরণেরে মৃত্যুহীন অপরূপ সাজে।

                             রহে না যে

                            বিলাপের অবকাশ

                             বারো মাস,

              তাই তব অশান্ত ক্রন্দনে

চিরমৌন জাল দিয়ে বেঁধে দিলে কঠিন বন্ধনে।

              জ্যোৎস্নারাতে নিভৃত মন্দিরে

                             প্রেয়সীরে

              যে-নামে ডাকিতে ধীরে ধীরে

সেই কানে-কানে ডাকা রেখে গেলে এইখানে

                             অনন্তের কানে।

                      প্রেমের করুণ কোমলতা

                             ফুটিল তা

          সৌন্দর্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে।

                            হে সম্রাট কবি,

              এই তব হৃদয়ের ছবি,

                        এই তব নব মেঘদূত,

                             অপূর্ব অদ্ভুত

                                      ছন্দে গানে

          উঠিয়াছে অলক্ষের পানে

          যেথা তব বিরহিণী  প্রিয়া

              রয়েছে মিশিয়া

          প্রভাতের অরুণ-আভাসে,

     ক্লান্তসন্ধ্যা দিগন্তের করুণ নিশ্বাসে,

     পূর্ণিমায় দেহহীন চামেলির লাবণ্যবিলাসে,

              ভাষার অতীত তীরে

কাঙাল নয়ন যেথা দ্বার হতে আসে ফিরে ফিরে।

          তোমার সৌন্দর্যদূত যুগ যুগ ধরি

               এড়াইয়া কালের প্রহরী

                     চলিয়াছে বাক্যহারা এই বার্তা নিয়া

                 "ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।"

 

              চলে গেছ তুমি আজ

                     মহারাজ;

          রাজ্য তব স্বপ্নসম গেছে ছুটে,

              সিংহাসন গেছে টুটে;

                             তব সৈন্যদল

          যাদের চরনভরে ধরণী করিত টলমল

              তাহাদের স্মৃতি আজ বায়ুভরে

              উড়ে যায় দিল্লীর পথের ধূলি-'পরে।

                     বন্দীরা গাহে না গান;

          যমুনা-কল্লোলসাথে নহবত মিলায় না তান;

              তব পুরসুন্দরীর নূপুরনিক্কণ

                    ভগ্ন প্রাসাদের কোণে

                    ম'রে গিয়ে ঝিল্লীস্বনে

                             কাঁদায় রে নিশার গগন।

                    তবুও তোমার দূত অমলিন,

                             শ্রান্তিক্লান্তিহীন,

                        তুচ্ছ করি রাজ্য-ভাঙাগড়া,

                     তুচ্ছ করি জীবনমৃত্যুর ওঠাপড়া,

                             যুগে যুগান্তরে

                             কহিতেছে একস্বরে

                           চিরবিরহীর বাণী নিয়া

                "ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।"

 

     মিথ্যা কথা-- কে বলে যে ভোল নাই।

          কে বলে রে খোল নাই

              স্মৃতির পিঞ্জরদ্বার।

             অতীতের চির অস্ত-অন্ধকার

     আজিও হৃদয় তব রেখেছে বাঁধিয়া?

          বিস্মৃতির মুক্তিপথ দিয়া

              আজিও সে হয় নি বাহির?

                      সমাধিমন্দির

              এক ঠাঁই রহে চিরস্থির;

                     ধরায় ধুলায় থাকি

     স্মরণের আবরণে মরণেরে যত্নে রাখে ঢাকি।

          জীবনেরে কে রাখিতে পারে।

     আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।

              তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে

          নব নব পূর্বাচলে  আলোকে আলোকে।

                    স্মরণের গ্রন্থি টুটে

                    সে যে যায় ছুটে

                 বিশ্বপথে বন্ধনবিহীন।

     মহারাজ, কোনো মহারাজ্য কোনোদিন

               পারে নাই তোমারে ধরিতে;

     সমুদ্রস্তনিত পৃথ্বী, হে বিরাট, তোমারে ভরিতে

                 নাহি পারে--

              তাই এ-ধরারে

জীবন-উৎসব-শেষে দুই পায়ে ঠেলে

          মৃৎপাত্রের মতো যাও ফেলে।

     তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,

          তাই তব জীবনের রথ

     পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার

          বারম্বার।

              তাই

     চিহ্ন তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।

              যে প্রেম সম্মুখপানে

          চলিতে চালাতে নাহি জানে,

     যে প্রেম পথের মধ্যে  পেতেছিল নিজ সিংহাসন,

               তার বিলাসের সম্ভাষণ

     পথের ধুলার মতো জড়ায়ে ধরেছে তব পায়ে,

                    দিয়েছ তা ধূলিরে ফিরায়ে।

                  সেই তব পশ্চাতের পদধূলি-'পরে

                     তব চিত্ত হতে বায়ুভরে

                            কখন সহসা

     উড়ে পড়েছিল বীজ জীবনের মাল্য হতে খসা।

              তুমি চলে গেছ দূরে

              সেই বীজ অমর অঙ্কুরে

                    উঠেছে অম্বরপানে,

                           কহিছে গম্ভীর গানে--

                             "যত দূর চাই

                          নাই নাই সে পথিক নাই।

     প্রিয়া তারে রাখিল না, রাজ্য তারে ছেড়ে দিল পথ

              রুধিল না সমুদ্র পর্বত।

                            আজি তার রথ

              চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে

                      নক্ষত্রের গানে

              প্রভাতের সিংহদ্বার পানে।

                           তাই

              স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি,

                     ভারমুক্ত সে এখানে নাই।'

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

বিশ
Verses
সেদিন আমাদের ছিল খোলা সভা
আকাশের নিচে
রাঙামাটির পথের ধারে।
ঘাসের 'পরে বসেছে সবাই।
দক্ষিণের দিকে শালের গাছ সারি সারি,
দীর্ঘ, ঋজু, পুরাতন,--
স্তব্ধ দাঁড়িয়ে,
শুক্লনবমীর মায়াকে উপেক্ষা ক'রে;--
দূরে কোকিলের ক্লান্ত কাকলিতে বনস্পতি উদাসীন।
ও যেন শিবের তপোবন-দ্বারের নন্দী,
দৃঢ় নির্মম ওর ইঙ্গিত।
সভার লোকেরা বললে,--
"একটা কিছু শোনাও, কবি,
রাত গভীর হয়ে এল।"
খুললেম পুঁথিখানা,
যত পড়ে দেখি
সংকোচ লাগে মনে।
এরা এত কোমল, এত স্পর্শকাতর,
এত যত্নের ধন।
এদের কণ্ঠস্বর এত মৃদু,
এত কুণ্ঠিত।
এরা সব অন্তঃপুরিকা,
রাঙা অবগুণ্ঠন মুখের 'পরে।
তার উপরে ফুলকাটা পাড়,
সোনার সুতোয়।
রাজহংসের গতি ওদের,
মাটিতে চলতে বাধা।
প্রাচীন কাব্যে এদের বলেছে ভীরু,
বলেছে, বরবর্ণিনী।
বন্দিনী ওরা বহু সম্মানে।
ওদের নূপুর ঝংকৃত হয় প্রাচীরঘেরা ঘরে,
অনেক দামের আস্তরণে।
বাধা পায় তার নৈপুণ্যের বন্ধনে।
এই পথের ধারের সভায়,
আসতে পারে তারাই
সংসারের বাঁধন যাদের খসেছে,
খুলে ফেলেছে হাতের কাঁকন
মুছে ফেলেছে সিঁদুর;
যারা ফিরবে না ঘরের মায়ায়,
যারা তীর্থযাত্রী;
যাদের অসংকোচ অক্লান্ত গতি,
ধূলিধূসর গায়ের বসন;
যারা পথ খুঁজে পায় আকাশের তারা দেখে;
কোনো দায় নেই যাদের
কারো মন জুগিয়ে চলবার;
কত রৌদ্রতপ্ত দিনে
কত অন্ধকার অর্ধরাত্রে
যাদের কণ্ঠ প্রতিধ্বনি জাগিয়েছে
অজানা শৈলগুহায়,--
জনহীন মাঠে, পথহীন অরণ্যে।
কোথা থেকে আনব তাদের
নিন্দা প্রশংসার ফাঁদে টেনে।
উঠে দাঁড়ালেম আসন ছেড়ে।
ওরা বললে, "কোথা যাও কবি?"
আমি বললেম,--
"যাব দুর্গমে, কঠোর নির্মমে,
নিয়ে আসব কঠিনচিত্ত উদাসীনের গান।"
আরো দেখুন
জাগ্রত স্বপ্ন
Verses
আজ        একেলা বসিয়া, আকাশে চাহিয়া,
         কী সাধ যেতেছে, মন!
    বেলা চলে যায়-- আছিস কোথায়?
         কোন্‌ স্বপনেতে নিমগন?
    বসন্তবাতাসে আঁখি মুদে আসে,
         মৃদু মৃদু বহে শ্বাস,
    গায়ে এসে যেন এলায়ে পড়িছে
         কুসুমের মৃদু বাস।
যেন       সুদূর নন্দনকাননবাসিনী,
    সুখঘুমঘোরে মধুরহাসিনী,
    অজানা প্রিয়ার ললিত পরশ
         ভেসে ভেসে বহে যায়,
অতি    মৃদু মৃদু লাগে গায়।
বিস্মরণমোহে আঁধারে আলোকে
            মনে পড়ে যেন তায়,
     স্মৃতি-আশা-মাখা মৃদু সুখে দুখে
            পুলকিয়া উঠে কায়।
     ভ্রমি আমি যেন সুদূর কাননে,
            সুদূর আকাশতলে,
     আনমনে যেন গাহিয়া বেড়াই
            সরযূর কলকলে।
     গহন বনের কোথা হতে শুনি
            বাঁশির স্বর-আভাস,
     বনের হৃদয় বাজাইছে যেন
            মরমের অভিলাষ।
     বিভোর হৃদয়ে বুঝিতে পারি নে
            কে গায় কিসের গান,
     অজানা ফুলের সুরভি মাখানো
            স্বরসুধা করি পান।
     যেন রে কোথায় তরুর ছায়ায়
            বসিয়া রূপসী বালা,
     কুসুমশয়নে আধেক মগনা,
     বাকল-বসনে আধেক মগনা,
     সুখদুখগান গাহিছে শুইয়া
            গাঁথিতে গাঁথিতে মালা।
     ছায়ায় আলোকে, নিঝরের ধারে,
     কোথা কোন্‌ গুপ্ত গুহার মাঝারে,
     যেন হেথা হোথা কে কোথায় আছে
            এখনি দেখিতে পাব--
     যেন রে তাদের চরণের কাছে
            বীণা লয়ে গান গাব।
     শুনে শুনে তারা আনত নয়নে
          হাসিবে মুচুকি হাসি,
     শরমের আভা অধরে কপোলে
          বেড়াইবে ভাসি ভাসি।
     মাথায় বাঁধিয়া ফুলের মালা
          বেড়াইব বনে বনে।
     উড়িতেছে কেশ, উড়িতেছে বেশ,
     উদাস পরান কোথা নিরুদ্দেশ,
     হাতে লয়ে বাঁশি মুখে লয়ে হাসি,
          ভ্রমিতেছি আনমনে।
     চারি দিকে মোর বসন্ত হসিত,
     যৌবনকুসুম প্রাণে বিকশিত,
     কুসুমের 'পরে ফেলিব চরণ
          যৌবনমাধুরীভরে।
     চারি দিকে মোর মাধবী মালতী
          সৌরভে আকুল করে।
     কেহ কি আমারে চাহিবে না?
     কাছে এসে গান গাহিবে না?
     পিপাসিত প্রাণে চাহি মুখপানে
          কবে না প্রাণের আশা?
     চাঁদের আলোতে দখিন বাতাসে
     কুসুমকাননে বাঁধি বাহুপাশে
     শরমে সোহাগে মৃদুমধুহাসে
          জানাবে না ভালোবাসা?
     আমার যৌবনকুসুমকাননে
          ললিত চরণে বেড়াবে না?
     আমার প্রাণের লতিকা-বাঁধন
          চরণে তাহার জড়াবে না?
     আমার প্রাণের কুসুম গাঁথিয়া
          কেহ পরিবে না গলে?
     তাই ভাবিতেছি আপনার মনে
          বসিয়া তরুর তলে।
আরো দেখুন
পরিচয়
Verses
তখন বর্ষণহীন অপরাহ্নমেঘে
            শঙ্কা ছিল জেগে;
       ক্ষণে ক্ষণে তীক্ষ্ন ভর্ৎসনায়
                 বায়ু হেঁকে যায়;
শূন্য যেন মেঘচ্ছিন্ন রৌদ্ররাগে পিঙ্গল জটায়
       দুর্বাসা হানিছে ক্রোধ রক্তচক্ষু কটাক্ষচ্ছটায়।
সে দুর্যোগ এনেছিনু তোমার বৈকালী,
                 কদম্বের ডালি।
            বাদলের বিষণ্ণ ছায়াতে
                        গীতহারা প্রাতে
নৈরাশ্যজয়ী সে ফুল রেখেছিল কাজল প্রহরে
রৌদ্রের স্বপনছবি রোমাঞ্চিত কেশরে কেশরে।
মন্থর মেঘেরে যবে দিগন্তে ধাওয়ায়
          পুবন হাওয়ায়,
     কাঁদে বন শ্রাবণের রাতে
          প্লাবনের ঘাতে,
তখনো নির্ভীক নীপ গন্ধ দিল পাখির কুলায়ে,
বৃন্ত ছিল ক্লান্তিহীন, তখনো সে পড়ে নি ধুলায়।
     সেই ফুলে দূঢ় প্রত্যাশার
          দিনু উপহার।
সজল সন্ধ্যায় তুমি এনেছিলে সখী,
     একটি কেতকী।
          তখনো হয় নি দীপ জ্বালা,
              ছিলাম নিরালা।
সারি-দেওয়া সুপারির আন্দোলিত সঘন সবুজে
জোনাকি ফিরিতেছিল অবিশ্রান্ত কারে খুঁজে খুঁজে।
দাঁড়াইলে দুয়ারের বাহিরে আসিয়া,
          গোপনে হাসিয়া।
     শুধালেম আমি কৌতূহলী
          "কী এনেছ' বলি।
পাতায় পাতায় বাজে ক্ষণে ক্ষণে বারিবিন্দুপাত,
গন্ধঘন প্রদোষের অন্ধকারে বাড়াইনু হাত।
ঝংকারি উঠিল মোর অঙ্গ আচম্বিতে
          কাঁটার সংগীতে।
     চমকিনু কী তীব্র হরষে
              পরুষ পরশে।
সহজ-সাধন-লব্ধ নহে সে মুগ্ধের নিবেদন,
অন্তরে ঐশ্বর্যরাশি, আচ্ছাদনে কঠোর বেদন।
     নিষেধে নিরুদ্ধ যে সম্মান
          তাই তব দান।
আরো দেখুন