৪৩ (bhabna niye moris keno khepe)

     ভাবনা নিয়ে মরিস কেন খেপে।

          দুঃখ-সুখের লীলা

     ভাবিস এ কি রইবে বক্ষে চেপে

          জগদ্দলন-শিলা।

     চলেছিস রে চলাচলের পথে

     কোন্‌ সারথির উধাও মনোরথে?

     নিমেষতরে যুগে যুগান্তরে

          দিবে না রাশ-ঢিলা।

 

     শিশু হয়ে এলি মায়ের কোলে,

          সেদিন গেল ভেসে।

     যৌবনেরি বিষম দোলার দোলে

          কাটল কেঁদে হেসে।

     রাত্রে যখন হচ্ছিল দীপ জ্বালা

     কোথায় ছিল আজকে দিনের পালা।

     আবার কবে কী সুর বাঁধা হবে

          আজকে পালার শেষে।

 

     চলতে যাদের হবে চিরকালই

          নাইকো তাদের ভার।

     কোথা তাদের রইবে থলি-থালি,

          কোথা বা সংসার।

     দেহযাত্রা মেঘের খেয়া বাওয়া,

     মন তাহাদের ঘূর্ণা-পাকের হাওয়া;

     বেঁকে বেঁকে আকার এঁকে এঁকে

          চলছে নিরাকার।

 

     ওরে পথিক, ধর্‌-না চলার গান,

          বাজা রে একতারা।

     এই খুশিতেই মেতে উঠুক প্রাণ--

          নাইকো কূল-কিনারা।

     পায়ে পায়ে পথের ধারে ধারে

     কান্না-হাসির ফুল ফুটিয়ে যা রে,

     প্রাণ-বসন্তে তুই-যে দখিন হাওয়া

          গৃহ-বাঁধন-হারা!

 

     এই জনমের এই রূপের এই খেলা

          এবার করি শেষ;

     সন্ধ্যা হল, ফুরিয়ে এল বেলা,

          বদল করি বেশ।

     যাবার কালে মুখ ফিরিয়ে পিছু

     কান্না আমার ছড়িয়ে যাব কিছু,

     সামনে সে-ও প্রেমের কাঁদন ভরা

          চির-নিরুদ্দেশ।

 

     বঁধুর চিঠি মধুর হয়ে আছে

          সেই অজানার দেশে।

     প্রাণের ঢেউ সে এমনি করেই নাচে

          এমনি ভালোবেসে।

     সেখানেতে আবার সে কোন্‌ দূরে

     আলোর বাঁশি বাজবে গো এই সুরে

     কোন্‌ মুখেতে সেই অচেনা ফুল

          ফুটবে আবার হেসে।

 

     এইখানে এক শিশির-ভরা প্রাতে

          মেলেছিলেম প্রাণ।

     এইখানে এক বীণা নিয়ে হাতে

          সেধেছিলেম তান।

     এতকালের সে মোর বীণাখানি

     এইখানেতেই ফেলে যাব জানি,

     কিন্তু ওরে হিয়ার মধ্যে ভরি

          নেব যে তার গান।

 

     সে-গান আমি শোনাব যার কাছে

          নূতন আলোর তীরে,

     চিরদিন সে সাথে সাথে আছে

          আমার ভুবন ঘিরে।

     শরতে সে শিউলি-বনের তলে

     ফুলের গন্ধে ঘোমটা টেনে চলে,

     ফাল্গুনে তার বরণমালাখানি

          পরাল মোর শিরে।

 

     পথের বাঁকে হঠাৎ দেয় সে দেখা

          শুধু নিমেষতরে।

     সন্ধ্যা-আলোয় রয় সে বসে একা

          উদাস প্রান্তরে।

     এমনি করেই তার সে আসা-যাওয়া,

     এমনি করেই বেদন-ভরা হাওয়া

     হৃদয়-বনে বইয়ে সে যায় চলে

          মর্মরে মর্মরে।

 

     জোয়ার-ভাঁটার নিত্য চলাচলে

          তার এই আনাগোনা।

     আধেক হাসি আধেক চোখের জলে

          মোদের চেনাশোনা।

     তারে নিয়ে হল না ঘর বাঁধা,

     পথে পথেই নিত্য তারে সাধা

     এমনি করেই আসা-যাওয়ার ডোরে

          প্রেমেরি জাল-বোনা।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

7
Verses
এ কী অকৃতজ্ঞতার বৈরাগ্যপ্রলাপ ক্ষণে ক্ষণে
বিকারের রোগীসম অকস্মাৎ ছুটে যেতে চাওয়া
আপনার আবেষ্টন হতে।
                      ধন্য এ জীবন মোর--
এই বাণী গাব আমি, প্রভাতে প্রথম-জাগা পাখি
যে সুরে ঘোষণা করে আপনাতে আনন্দ আপন।
দুঃখ দেখা দিয়েছিল, খেলায়েছি দুঃখনাগিনীরে
ব্যথার বাঁশির সুরে। নানা রন্ধ্রে প্রাণের ফোয়ারা
করিয়াছি উৎসারিত অন্তরের নানা বেদনায়।
এঁকেছি বুকের রক্তে মানসীর ছবি বারবার
ক্ষণিকের পটে, মুছে গেছে রাত্রির শিশিরজলে,
মুছে গেছে আপনার আগ্রহস্পর্শনে--তবু আজো
আছে তারা সূক্ষ্মরেখা স্বপনের চিত্রশালা জুড়ে,
আছে তারা অতীতের শুষ্কমাল্যগন্ধে বিজড়িত।
কালের অঞ্জলি হতে ভ্রষ্ট কত অব্যক্ত মাধুরী
রসে পূর্ণ করিয়াছে থরে থরে মনের বাতাস,
প্রভাত-আকাশ যথা চেনা-অচেনার বহু সুরে
কূজনে গুঞ্জনে ভরা। অনভিজ্ঞ নবকৈশোরের
কম্পমান হাত হতে স্খলিত প্রথম বরমালা
কণ্ঠে ওঠে নাই, তাই আজিও অক্লিষ্ট অমলিন
আছে তার অস্ফুট কলিকা। সমস্ত জীবন মোর
তাই দিয়ে পুষ্পমুকুটিত। পেয়েছি যা অযাচিত
প্রেমের অমৃতরস, পাই নি যা বহু সাধনায়--
দুই মিশেছিল মোর পীড়িত যৌবনে। কল্পনায়
বাস্তবে মিশ্রিত, সত্যে ছলনায়, জয়ে পরাজয়ে,
বিচিত্রিত নাট্যধারা বেয়ে, আলোকিত রঙ্গমঞ্চে
প্রচ্ছন্ন নেপথ্যভূমে, সুগভীর সৃষ্টিরহস্যের
যে প্রকাশ পর্বে পর্বে পর্যায়ে পর্যায়ে উদ্‌বারিত
আমার জীবনরচনায়, তাহারে বাহন করি
স্পর্শ করেছিল মোরে কতদিন জাগরণক্ষণে
অপরূপ অনিবর্চনীয়। আজি বিদায়ের বেলা
স্বীকার করিব তারে, সে আমার বিপুল বিস্ময়।
গাব আমি, হে জীবন, অস্তিত্বের সারথি আমার,
বহু রণক্ষেত্র তুমি করিয়াছ পার, আজি লয়ে যাও
মৃত্যুর সংগ্রামশেষে নবতর বিজয়যাত্রার।
আরো দেখুন
251
Verses
স্মৃতিকাপালিনী পূজারতা, একমনা,
     বর্তমানেরে বলি দিয়া করে
        অতীতের অর্চনা।
আরো দেখুন
158
Verses
POWER TAKES as ingratitude the writhings of its victims.
আরো দেখুন