ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে (dhakira dhak bajay khale bile)

                          পাকুড়তলির মাঠে

                   বামুনমারা দিঘির ঘাটে

               আদিবিশ্ব-ঠাকুরমায়ের আস্‌মানি এক চেলা

                          ঠিক দুক্ষুর বেলা

                       বেগ্‌নি-সোনা দিক্‌-আঙিনার কোণে

                   ব'সে ব'সে ভুঁইজোড়া এক চাটাই বোনে

                          হলদে রঙের শুকনো ঘাসে।

               সেখান থেকে ঝাপসা স্মৃতির কানে আসে

                   ঘুম-লাগা রোদ্‌দুরে

                       ঝিম্‌ঝিমিনি সুরে--

                   "ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে,

               সুন্দরীকে বিয়ে দিলেম ডাকাতদলের মেলে।"

 

                   সুদূর কালের দারুণ ছড়াটিকে

               স্পষ্ট করে দেখি নে আজ, ছবিটা তার ফিকে।

                   মনের মধ্যে বেঁধে না তার ছুরি,

               সময় তাহার ব্যথার মূল্য সব করেছে চুরি।

                   বিয়ের পথে ডাকাত এসে হরণ করলে মেয়ে,

               এই বারতা ধুলোয়-পড়া শুকনো পাতার চেয়ে

                   উত্তাপহীন, ঝেঁটিয়ে-ফেলা আবর্জনার মতো।

                       দুঃসহ দিন দুঃখেতে বিক্ষত

                   এই-কটা তার শব্দমাত্র দৈবে রইল বাকি,

                       আগুন-নেভা ছাইয়ের মতন ফাঁকি।

                          সেই মরা দিন কোন্‌ খবরের টানে

                              পড়ল এসে সজীব বর্তমানে।

               তপ্ত হাওয়ার বাজপাখি আজ বারে বারে

                              ছোঁ মেরে যায় ছড়াটারে,

               এলোমেলো ভাবনাগুলোর ফাঁকে ফাঁকে

                   টুক্‌রো করে ওড়ায় ধ্বনিটাকে।

               জাগা মনের কোন্‌ কুয়াশা স্বপ্নেতে যায় ব্যেপে,

                   ধোঁয়াটে এক কম্বলেতে ঘুমকে ধরে চেপে,

                       রক্তে নাচে ছড়ার ছন্দে মিলে--

                   "ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে।'

 

               জমিদারের বুড়ো হাতি হেলে দুলে চলেছে বাঁশতলায়,

                          ঢঙ্‌ঢঙিয়ে ঘন্টা দোলে গলায়।

 

               বিকেলবেলার চিকন আলোর আভাস লেগে

                   ঘোলা রঙের আলস ভেঙে উঠি জেগে।

                       হঠাৎ দেখি, বুকে বাজে টন্‌টনানি

                   পাঁজরগুলোর তলায় তলায় ব্যথা হানি।

                       চটকা ভাঙে যেন খোঁচা খেয়ে--

                   কই আমাদের পাড়ার কালো মেয়ে--

               ঝুড়ি ভ'রে মুড়ি আনত, আনত পাকা জাম,

                          সামান্য তার দাম,

                       ঘরের গাছের আম আনত কাঁচামিঠা,

                   আনির স্থলে দিতেম তাকে চার-আনিটা।

                       ওই যে অন্ধ কলুবুড়ির কান্না শুনি--

                    কদিন হল জানি নে কোন্‌ গোঁয়ার খুনি

                          সমত্থ তার নাতনিটিকে

                   কেড়ে নিয়ে ভেগেছে কোন্‌ দিকে।

               আজ সকালে শোনা গেল চৌকিদারের মুখে,

                   যৌবন তার দ'লে গেছে, জীবন গেছে চুকে।

                       বুক-ফাটানো এমন খবর জড়ায়

                          সেই সেকালের সামান্য এক ছড়ায়।

                   শাস্ত্রমানা আস্তিকতা ধুলোতে যায় উড়ে--

               "উপায় নাই রে, নাই প্রতিকার' বাজে আকাশ জুড়ে।

                   অনেক কালের শব্দ আসে ছড়ার ছন্দে মিলে--

                       "ঢাকিরা ঢাক বাজায় খালে বিলে।'

 

               জমিদারের বুড়ো হাতি হেলে দুলে চলেছে বাঁশতলায়,

                          ঢঙ্‌ঢঙিয়ে ঘন্টা দোলে গলায়।

 

 

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

অগোচর
Verses
     হাটের ভিড়ের দিকে চেয়ে দেখি,
হাজার হাজার মুখ হাজার হাজার ইতিহাস
     ঢাকা দিয়ে আসে যায় দিনের আলোয়
           রাতের আঁধারে।
         সব কথা তার
     কোনো কালে জানবে না কেউ,
         নিজেও জানে না কোনো লোক।
     মুখর আলাপ তার, উচ্চস্বরে কত আলোচনা,
           তারি অন্তস্তলে
                 বিচিত্র বিপুল
           স্মৃতিবিস্মৃতির সৃষ্টিরাশি।
     সেখানে তো শব্দ নেই আলো নেই,
           বাইরের দৃষ্টি নেই,
               প্রবেশের পথ নেই কারো।
                 সংখ্যাহীন মানুষের
           এই যে প্রচ্ছন্ন বাণী, অশ্রুত কাহিনী
                 কোন্‌ আদিকাল হতে
                 অন্তঃশীল অগণ্য ধারায়
           আঁধার মৃত্যুর মাঝে মেশে রাত্রিদিন,
                 কী হল তাদের,
                         কী এদের কাজ।
হে প্রিয়, তোমার যতটুকু
           দেখেছি শুনেছি
     জেনেছি, পেয়েছি স্পর্শ করি' --
   তার বহুশতগুণ অদৃশ্য অশ্রুত
         রহস্য কিসের জন্য বন্ধ হয়ে আছে,
               কার অপেক্ষায়।
           সে নিরালা ভবনের
           কুলুপ তোমার কাছে নেই।
                 কার কাছে আছে তবে।
           কে মহা-অপরিচিত যার অগোচর সভাতলে
           হে চেনা-অপরিচিত, তোমার আসন?
সেই কি সবার চেয়ে জানে
     আমাদের অন্তরের অজানারে।
        সবার চেয়ে কি বড়ো তার ভালোবাসা
                যার শুভদৃষ্টি-কাছে
           অব্যক্ত করেছে অবগুণ্ঠন মোচন।
আরো দেখুন
আশীর্বাদ
Verses
জ্বলিল অরুণরশ্মি আজি ওই তরুণ প্রভাতে
     হে নবীনা, নবরাগরক্তিম শোভাতে।
          সীমন্তে সিন্দূরবিন্দু তব
          জ্যোতি আজি পেল অভিনব,
চেলাঞ্চলে উদ্ভাসিল অন্তরের দীপ্যমান প্রভা,
শরমের বৃন্তে তুমি আনন্দের বিকশিত জবা।
সাহানা রাগিণীরসে জড়িত আজি এ পুণ্যতিথি,
     তোমার ভুবনে আসে পরম অতিথি।
          আনো আনো মাঙ্গল্যের ভার,
          দাও বধূ, খুলে দাও দ্বার,
তোমার অঙ্গনে হেরো সগৌরবে ওই রথ আসে,
সেই বার্তা আজি বুঝি উদ্‌ঘোষিল আকাশে বাতাসে।
নবীন জীবনে তব নববিশ্ব রচনার ভাষা
     আজি বুঝি পূর্ণ হল লয়ে নব আশা।
          সৃষ্টির সে আনন্দ-উৎসবে
          তব শ্রেষ্ঠধন দিতে হবে,
সেই সৃষ্টিসাধনায় আপনি করিবে আবিষ্কার
তোমার আপনা-মাঝে লুকানো যে ঐশ্বর্যভাণ্ডার।
পথ কে দেখাল এই পথিকেরে তাহা আমি জানি,
     ওই চক্ষুতারা তারে দ্বারে দিল আনি।
          যে সুর নিভৃতে ছিল প্রাণে
          কেমনে তা শুনেছিল কানে,
তোমার হৃদয়কুঞ্জে যে ফুল ছায়ায় ছিল ফুটে
তাহার অমৃতগন্ধ গিয়েছিল বন্ধ তার টুটে।
যদি পারিতাম আজি অলকার দ্বারীরে ভুলায়ে
     হরিয়া অমূল্য মণি অলকেতে দিতাম দুলায়ে।
          তবু মোর মন মোরে কহে
          সে-দান তোমার যোগ্য নহে,
তোমায় কমলবনে দিব আনি রবির প্রসাদ,
তোমার মিলনক্ষণে সঁপিব কবির আশীর্বাদ।
আরো দেখুন
সান্ত্বনা
Verses
সকালের আলো এই বাদলবাতাসে
                 মেঘে রুদ্ধ হয়ে আসে
           ভাঙা কণ্ঠে কথার মতন।
                    মোর মন
           এ অস্ফুট প্রভাতের মতো
      কী কথা বলিতে চায়, থাকে বাক্যহত।
              মানুষের জীবনের মজ্জায় মজ্জায়
      যে-দুঃখ নিহিত আছে অপমানে শঙ্কায় লজ্জায়,
                কোনো কালে যার অস্ত নাই,
                      আজি তাই
      নির্যাতন করে মোরে। আপনার দুর্গমের মাঝে
           সান্ত্বনার চির-উৎস কোথায় বিরাজে,
      যে উৎসের গূঢ় ধারা বিশ্বচিত্ত-অন্তঃস্তরে
                 উন্মুক্ত পথের তরে
                       নিত্য ফিরে যুঝে
               আমি তারে মরি খুঁজে।
                       আপন বাণীতে
               কী পুণ্যে বা পারিব আনিতে
      সেই সুগম্ভীর শান্তি, নৈরাশ্যের তীব্র বেদনারে
           স্তব্ধ যা করিতে পারে।
                 হায় রে ব্যথিত,
      নিখিল-আত্মার কেন্দ্রে বাজে অকথিত
      আরোগ্যের মহামন্ত্র, যার গুণে
                 সৃজনের হোমের আগুনে
      নিজেরে আহুতি দিয়া নিত্য সে নবীন হয়ে উঠে, --
      প্রাণেরে ভরিয়া তুলে নিত্যই মৃত্যুর করপুটে।
           সেই মন্ত্র শান্ত মৌনতলে
      শুনা যায় আত্মহারা তপস্যার বলে।
           মাঝে-মাঝে পরম বৈরাগী
      সে-মন্ত্র চেয়েছে দিতে সর্বজন লাগি।
              কে পারে তা করিতে বহন,
           মুক্ত হয়ে কে পারে তা করিতে গ্রহণ।
              গতিহীন আর্ত অক্ষমের তরে
      কোন্‌ করুণার স্বর্গে মন মোর দয়া ভিক্ষা করে
                     ঊর্ধ্বে বাহু তুলি।
      কে বন্ধু রয়েছ কোথা, দাও দাও খুলি
                       পাষাণকারার দ্বার --
           যেথায় পুঞ্জিত হল নিষ্ঠুরের অত্যাচার,
                    বঞ্চনা লোভীর,
                 যেথায় গভীর
      মর্মে উঠে বিষাইয়া সত্যের বিকার
                 আমিত্ববিমুগ্ধ মন যে দুর্বহ ভার
      আপনার আসক্তিতে জমায়েছে আপনার 'পরে,
      নির্মম বর্জনশক্তি দাও তার অন্তরে অন্তরে।
                 আমার বাণীতে দাও সেই সুধা
      যাহাতে মিটিতে পারে আত্মার গভীরতম ক্ষুধা।
           হেনকালে সহসা আসিল কানে
      কোন্‌ দূর তরুশাখে শ্রান্তিহীন গানে
                       অদৃশ্য কে পাখি
           বার বার উঠিতেছে ডাকি।
      কহিলাম তারে, "ওগো, তোমার কণ্ঠেতে আছে আলো,
                       অবসাদ-আঁধার ঘুচাল।
                     তোমার সহজ এই প্রাণের প্রোল্লাস
                       সহজেই পেতেছে প্রকাশ।
         আদিম আনন্দ যাহা এ বিশ্বের মাঝে,
           যে আনন্দ অন্তিমে বিরাজে,
           যে পরম আনন্দলহরী
      যত দুঃখ যত সুখ নিয়েছে আপনা-মাঝে হরি,
          আমারে দেখালে পথ তুমি তারি পানে
                 এই তব অকারণ গানে।'
আরো দেখুন