অধিকার (adhikar)

জনক রাজা কহিলেন, "এক্ষণে আমার মোহ নির্ম্মুক্ত হওয়াতে আমি নিশ্চয় বুঝিতে পারিয়াছি যে, কোন পদার্থেই আমার অধিকার নাই, অথবা সমুদয় পদার্থেরই অধিকারী। আমার আত্মাও আমার নহে; অথবা সমুদয় পৃথিবীই আমার। ফলতঃ ইহলোক সকল বস্তুতেই সকলের সমান অধিকার বিদ্যমান রহিয়াছে।"--

 

--মহাভারত। আশ্বমেধিক পর্ব্ব। অনুগীতা পর্ব্বাধ্যায়। দ্বাত্রিংশত্তম অধ্যায়।

 

জনক রাজার উপরি-উক্ত উক্তি লইয়া একটা তর্ক উপস্থিত হইল, নিম্নে তাহা প্রকাশ করিলাম।

 

আমি।   যাহা কিছু আমি দেখিতে পাই, সকলি আমার।

 

তুমি।   সে কিরকম কথা?

 

আমি।   নহে ত কি? যে গুণে তুমি একটা পদার্থকে আমার বল, সে গুণটি কি?

 

তুমি।   অন্য সকলে যে পদার্থকে উপভোগ করিতে পায় না, অথবা আংশিক  ভাবে পায়, আমিই কেবল যাহাকে সর্ব্বতোভাবে উপভোগ করিতে পাই, তাহাই আমার।

 

আমি।  পৃথিবীতে এমন কি পদার্থ আছে, যাহাকে আমরা সর্ব্বতোভাবে উপভোগ করিতে পারি? কোনটার ঘ্রাণ, কোনটার শব্দ, কোনটার স্বাদ, কোনটার দৃশ্য, কোনটার স্পর্শ আমরা ভোগ করি, অথবা একাধারে ইহাদের দুই-তিনটাও ভোগ করিতে পারি। কিম্বা হয়ত ইহাদের সকলগুলিকেই এক পদার্থের মধ্যে পাইলাম, কিন্তু তবু তাহাকে সর্ব্বতোভাবে উপভোগ করিতে পারি কই? জগতে আমরা কিছুই সর্ব্বতোভাবে জানি না, একটি তৃণকেও না-- তবে সর্ব্বতোভাবে ভোগ করিব কি করিয়া? কে বলিতে পারে আমাদের যদি আর একটি ইন্দ্রিয় থাকিত তবে এই তৃণটির মধ্যে দৃষ্টি স্বাদ গন্ধ স্পর্শ প্রভৃতি ব্যতীতও আরো অনেক উপভোগ্য গুণ দেখিতে না পাইতাম?

 

তুমি।   তুমি অত সূক্ষ্মে গেলে চলিবে কেন? "সর্ব্বতোভাবে উপভোগ করা"র অর্থ এই যে, মানুষের পক্ষে যত দূর সম্ভব তত দূর উপভোগ করা।

 

আমি। এ স্থলে তুমি উপভোগ শব্দ ব্যবহার করিয়া অতিশয় ভ্রমাত্মক কথা কহিতেছ। প্রচলিত ভাষায় স্বত্ব থাকা, উপভোগ করা, উভয়ের এক অর্থ নহে। মনে কর একজন হতভাগ্য নিজে ভাঙ্গা ঘরে কুশ্রী পদার্থের মধ্যে বাস করে ও গৌরাঙ্গ প্রভুদের জন্য একটি অট্টালিকা ভাল ভাল ছবি, রঙ্গীন কার্পেট ও ঝাড়লণ্ঠন দিয়া সুসজ্জিত করিয়া রাখিয়াছে-- সে অট্টালিকা, সে ছবি, সে উপভোগ করে না বলিয়াই কি তাহা তাহার নহে?

 

তুমি।   উপভোগ করে না বটে, কিন্তু ইচ্ছা করিলেই করিতে পারে।

 

আমি।   সে কথা নিতান্তই ভুল, যদি সে কোন অবস্থায় ছবি উপভোগ করিতে পারিত তবে তাহা নিজের ঘরেই টাঙ্গাইত। মূর্খ একটি বই কিনিয়া কোন মতেই তাহা বুঝিতে না পারুক, তথাপি সে বইটিকে আপনার বলিতে সে ছাড়িবে না।

 

তুমি।   আচ্ছা, উপভোগ করা চুলায় যাউক। যে বস্তুর উপর সর্ব্বসাধারণের অপেক্ষা তোমার অধিক ক্ষমতা খাটে, যে বইটিকে তুমি ইচ্ছা করিলে অবাধে পোড়াইতে পার, রাখিতে পার, দান করিতে পার, অন্যের হাত হইতে কাড়িয়া লইতে পার, তাহাতেই তোমার অধিকার আছে।

 

আমি।   তবুও কথাটা ঠিক হইল না। শারীরিক ক্ষমতাকেই ত ক্ষমতা বলে না। মানসিক ক্ষমতা তদপেক্ষা উচ্চশ্রেণীস্থ। তাহা যদি স্বীকার কর, তাহা হইলে তোমার ভ্রম সহজেই দেখিতে পাইবে। তুমি অরসিক, তোমার বাগানের গাছ হইতে একটি গোলাব ফুল তুলিয়াছ, তোমার হাতে সেটি রহিয়াছে, আমি দূর হইতে দেখিতেছি। তুমি ইচ্ছা করিলে সে গোলাপটি ছিঁড়িয়া কুটিকুটি করিতে পার, সে ক্ষমতা তোমার আছে, কিন্তু সে গোলাপটির সৌন্দর্য্য উপভোগ করিবার ক্ষমতা তোমার নাই-- ইচ্ছা করিলে আর সব করিতে পার, কিন্তু মাথা খুঁড়িয়া মরিলেও তাহাকে উপভোগ করিতে পার না-- আর, আমি তাহাকে ছিঁড়িতে পারি না বটে, কিন্তু দূর হইতে দেখিয়া তাহার সৌন্দর্য্য উপভোগ করিতে পারি। তাহার গোলাব ছিঁড়িবার ক্ষমতা আছে, আমার গোলাপ উপভোগ করিবার ক্ষমতা আছে, কোন্‌ ক্ষমতাটি গুরুতর? তবে কেন সে তাহাকে "আমার গোলাপ" বলে, আর আমি পারি না? তবে, গোলাপ সম্বন্ধে যেটি সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ক্ষমতা আমার তাহা আছে, তবু সে গোলাবের অধিকারী আমি নহি। এ স্থলে দেখা যাইতেছে, যে বলদ চিনি বহন করিয়া থাকে প্রচলিত ভাষায় তাহাকেই চিনির অধিকারী কহে। আর যে মানুষ ইচ্ছা করিলেই সে চিনি খাইতে পারে সে মানুষের সে চিনিতে অধিকার নাই।

 

তুমি হয়ত বলিবে, যাহার উপর আমাদের শারীরিক ক্ষমতা খাটে, চলিত ভাষায় তাহাকেই "আমার" কহে। তাহাও ঠিক নহে, যাহার সহিত আমার হৃদয়ে হৃদয়ে যোগ আছে তাহাকেও ত আমি "আমার" কহি।

 

তুমি। আচ্ছা, আমি হার মানিলাম। কিন্তু তুমি কি সিদ্ধান্ত করিলে শুনি।

 

আমি। যে কোন পদার্থ আমরা দেখি, শুনি, ইন্দ্রিয় বা হৃদয় দিয়া উপলব্ধি করি, তাহাই আমাদের। তুমি যে ফুলকে "আমার" বল তুমি তাহাকে দেখিতে পার, স্পর্শ করিতে পার, ঘ্রাণ করিতে পাও; আমি আর কিছু পাই না, কিন্তু যদি তাহাকে দেখিতে পাই, তবে সে মুহূর্ত্তেই তাহার সহিত আমার সম্বন্ধ বাধিয়া গেল, সে সম্বন্ধ হইতে কেহ আমাকে আর বঞ্চিত করিতে পারিবে না! তুমিও তাহার সব পাও নি, আমিও তাহার সব পাই নি, কারণ মানুষের পক্ষে তাহা অসম্ভব; তুমিও তাহার কিছু পাইলে, আমিও তাহার কিছু পাইলাম, অতএব তোমারও সে, আমারও সে। এই জন্য জনক কহিয়াছিলেন, "কোন পদার্থেই আমার অধিকার নাই, অথবা সমুদয় পদার্থেরই অধিকারী আমি। ফলতঃ ইহলোকে সকল বস্তুতেই সকলের সমান অধিকার রহিয়াছে।"  সন্ধ্যা বা উষাকে কেহ "আমার সন্ধ্যা" "আমার উষা" বলে না  কেন? যদি বল তাহার কারণ তাহারা সকল মানুষের পক্ষে সমান, তাহা হইলে ভুল বলা হয়। আমি সন্ধ্যাকে তোমাদের সকলের চেয়ে অধিক উপভোগ করি,অতএব সেই উপভোগ-ক্ষমতার বলে তোমাদের কাছ হইতে সন্ধ্যার দখলি-স্বত্ব কাড়িয়া লইয়া সন্ধ্যাকে বিশেষ করিয়া "আমার সন্ধ্যা" বলি না কেন? তাহার কারণ  আমি সন্ধ্যাকে সর্ব্বপ্রকারে অধিক উপভোগ করিতেছি বটে, কিন্তু তাই বলিয়া তোমাদের কাছ হইতে সে ত একেবারে ঢাকা পড়ে নাই। এইরূপে একটা পদার্থকে কেহ বা কিছু উপভোগ করে, কেহ বা অধিক উপভোগ করে, কিন্তু সে পদার্থটা তাহাদের উভয়েরই।

 

  •  

Rendition

Please Login first to submit a rendition. Click here for help.

Related Topics

সমাপন
Others
লিখিলেই লেখা শেষ হয় না। পুঁথি যে ক্রমেই বাড়িতে চলিল। আর, সকল কথা লিখিলেই বা পড়িবে কে? কাজেই এইখানেই লেখা সাঙ্গ  করিলাম।
আমার ভয় হইতেছে, পাছে এ লেখাগুলি লইয়া কেহ তর্ক করিতে বসেন। পাছে কেহ প্রমাণ জিজ্ঞাসা করিতে আসেন। পাছে কেহ ইহাদের সত্য-অসত্য আবশ্যক-অনাবশ্যক উপকার-অপকার লইয়া আন্দোলন উপস্থিত করেন। কারণ,এ বইখানি সে ভাবে লেখাই হয়  নাই।
আরো দেখুন
দ্রুত বুদ্ধি
Others
অসাধারণ বুদ্ধিমান লোকদের অনেকের সহসা নির্ব্বোধ বলিয়া ভ্রম হইয়া থাকে । তাহার কারণ --বুঝিবার পদ্ধতিকে, বুঝিবার ক্রম-বিশিষ্ট সোপানগুলিকে অনেক বুঝা মনে করেন।  এই উভয়কে তাঁহারা স্বতন্ত্র করিয়া দেখিতে পারেন না,একত্র করিয়া দেখেন । যাঁহাদের বুদ্ধি বিদ্যুতের মত, বজ্রবেগে যাঁহাদের মাথায় ভাব আসিয়া পড়ে,যাহাদের বুঝার সোপান দেখা যায় না,কঙ্কাল দেখা যায় না,ইট ও মালমসলাগুলো দেখা যায় না, কেবল বুঝাটাই দেখা যায়,সাধারণ লোকেরা তাঁহাদের নির্ব্বোধ মনে করে, কারণ তাহার তাঁহাদের বুঝাকে বুঝিতে পারে না । যাদুকরেরা যাহা করে, তাহা যদি আস্তে আস্তে করে,তাহারা প্রতি অঙ্গ যদি দেখাইয়া দেখাইয়া করে, তবে দর্শক বেচারীরা সমস্ত বুঝিতে পারে। নহিলে তাহাদের ভেবাচেকা লাগিয়া যায়, কিছুই আয়ত্ত করিতে পারে না ও সমস্ত ইন্দ্রজাল বলিয়া ঠাহরায় । অসাধারণ বুদ্ধির এক দোষ এই যে , সে বুঝিতে যেমন পারে বুঝাইতে তেমন পারে না । বুঝাইবে কিরূপে বল?  নিজে সে একটা বিষয় এত ভাল জানে ও এত সহজে জানে যে, তাহাকেও আবার কি করিয়া সহজ করিতে হইবে ভাবিয়া পায় না । ইহারা আপনাকে অপেক্ষাকৃত নির্ব্বোধ না করিয়া ফেলিলে অন্যকে বুঝাইতে পারে না । ইহাদের বুদ্ধি একটা সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইবামাত্র আবার তাহাকে সেখান হইতে বলপুর্ব্বক বাহির বরিয়া দিতে হয় ; যে পথ দিয়া বিদ্যুৎবেগে সে সেই সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইয়াছিল, সেই পথ দিয়া অতি ধীরে ধীরে এক পা এক পা করিয়া তাহাকে ফিরাইয়া লইয়া যাইতে হয় ; সে ব্যক্তি অভ্যাসদোষে মাঝে মাঝে ছুটিয়া চলিতে চায়, অমনি তাহাকে পাক্‌ড়া করিয়া বলিতে হয় -- "আস্তে" ! কেহ বা ইচ্ছা করিলে এইরূপ নির্ব্বোধ হইতে পারে, কেহ বা পারে না । অনেকের বুদ্ধি কোন মতেই রাশ মানে না,তাহাকে আস্তে চালাইবার সাধ্য নাই । এইরূপ লোকেদের নির্ব্বোধ লোকেরা নির্ব্বোধ মনে করে । যাহারা স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়-টানা নৌকায় যায়, তাহারা প্রতি ঝাঁকানিতে প্রতি দাঁড়ের শব্দে বুঝিতে পারে যে, নৌকা অগ্রসর হইতেছে । যাহারা পালের নৌকায় চলে,তাহারা সকল সময়ে বুঝিতে পারে না নৌকা চলিতেছে কি না ।
আরো দেখুন
মনের বাগান-বাড়ি
Others
ভালবাসা অর্থে আত্মসমর্পণ নহে। ভালবাসা অর্থে, নিজের যাহা কিছু ভাল তাহাই সমর্পণ করা। হৃদয়ে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা নহে; হৃদয়ের যেখানে দেবত্রভূমি, যেখানে মন্দির, সেইখানে প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করা।
যাহাকে তুমি ভালবাস তাহাকে ফুল দাও, কাঁটা দিও না; তোমার হৃদয়সরোবরের পদ্ম দাও, পঙ্ক দিও না। হাসির হীরা দাও, অশ্রুর মুক্তা দাও; হাসির বিদ্যুৎ দিও না, অশ্রুর বাদল দিও না। প্রেম হৃদয়ের সারভাগ মাত্র। হৃদয় মন্থন করিয়া যে অমৃতটুকু উঠে তাহাই। ইহা দেবতাদিগের ভোগ্য। অসুর আসিয়া খায়, কিন্তু তাহাকে দেবতার ছদ্মবেশে খাইতে হয়। যাহাকে তুমি দেবতা বলিয়া জান তাহাকেই তুমি অমৃত দাও, যাহাকে দেবতা বলিয়া বোধ হইতেছে তাহাকেই অমৃত দাও। কিন্তু এমন মহাদেব সংসারে আছেন, যিনি দেবতা বটেন কিন্তু যাঁহার ভাগ্যে অমৃত জুটে নাই, সংসারের সমস্ত বিষ তাঁহাকে পান করিতে হইয়াছে-- আবার এমন রাহুও আছে যে অমৃত খাইয়া থাকে।
আরো দেখুন